ইতির_সংসার পর্ব ২৫

0
680

#ধারাবাহিক_উপন্যাস
#ইতির_সংসার
পর্ব ২৫

নার্স এসে নাঈমকে ওটির ভিতরে নিয়ে যায়। সেখানে একটা টেবিলে ডাক্তার ম্যাম বসা, অপর পাশে একটা খালি চেয়ার দেখিয়ে নাঈমকে বসতে বলেন। নাঈম উৎকন্ঠিত হয়ে জানতে চায় কেন ওকে ডেকেছে। ডাক্তার জানায় ইতির বাচ্চা মিসক্যারেজ হয়ে গেছে কিন্তু তার চেয়েও যেটা ভয়াবহ সেটা হল ইতির জরায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্লিডিং যদি বন্ধ না হয় তাহলে জরায়ু ফেলে দিতে হবে। ফলশ্রুতিতে ইতি আর কোনদিন মা হতে পারবেনা।

নাঈম ডুকরে কেঁদে উঠে ডাক্তারের কথা শুনে। পাগল পাগল লাগে ওর নিজেকে। কোনমতে শুধু বলে -“ইতিকে বাঁচিয়ে রাখতে যা করা লাগে করবেন আর সেটা ওকে আপনিই জানিয়ে দিবেন, আমার সাহস নাই ওকে এই সত্যটা বলার।”

ওটির বাইরে এসে নাঈম ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদতে থাকে। ইতির বাবা কিছু না বলে চলে যান মসজিদে। সিজদায় পড়ে রবের কাছে চাইতে থাকেন কন্যার মাতৃত্ব। ইতির মা পাথরের মতো হয়ে যান। অনুভূতি নাই শুধু নাজমা বেগমের।

অনেকক্ষণ পরে ইতিকে পোস্ট অপারেটিভে নেয়া হয়। আরো ডোনার যোগাড় করতে বলে কারণ এদিক দিয়ে র/ক্ত দেয়া হচ্ছে, ওদিক দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার র/ক্ত বন্ধের জন্য সবরকমের ঔষধ দিয়েছেন। তারপরও কমছেনা কিছুতেই, এখন শুধুমাত্র আল্লাহ ভরসা।

নাঈম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ও সকল পরিচিতদের ফোন দিয়ে ১৮ জন ডোনার যোগাড় করে। কিন্তু এতোকিছুর পরেও ইতিকে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হতে দেখে নাঈম ডাক্তারকে বলে দেয় -“যা করা লাগে করেন শুধু ইতিকে বাঁচান।”

নাঈমের থেকে বন্ড সই করে নিয়ে ইতিকে আবারও ওটিতে নেয়া হয়। এর মধ্যে খাদিজা বেগম রান্না করে এনে সবাইকে জোর করে খাওয়ান। নাঈমের কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গেছে। উনি নাঈমের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন -“বাবা, যে কান্নাটা তুমি আমাদের সামনে কাঁদছ সেটা তুমি আল্লাহর কাছে কাঁদো প্লিজ। শুধুমাত্র উনিই পারেন মিরাকল ঘটাতে। আমাদের কি ক্ষমতা আছে বল?”

নাঈমের মধ্যে ভাবান্তর হয় এই কথায়। সে মসজিদে গিয়ে ওজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে চোখের পানি ছেড়ে দেয় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে। মনের যা কষ্ট সব জানিয়ে আল্লাহর কাছে স্ত্রীর সুস্থতা ও জীবন ভিক্ষা করে নাঈম। আল্লাহ সাড়া দেন ওর ডাকে। ব্লি/ডিং স্বাভাবিক হয়ে আসে হঠাৎই। স্বাভাবিক অবস্থা দেখে ডাক্তার আর জরায়ু ফেলে দেয়না। আবারও পোস্ট অপারেটিভে নেয়া হয় ইতিকে। ডাক্তার ইতিকে খুবই সাবধানে থাকতে হবে জানিয়ে দেন সবাইকে।

নাঈমের অফিসের কর্তাব্যক্তিরা এসে দেখে যান ইতির অবস্থা। ডাক্তারের সাথে কথা বলে ওদের এমডি নাঈমের জন্য বিনাসুদে ঋণ মঞ্জুর করেন। চিকিৎসার জন্য যা লাগে করতে বলেন, সব টাকা অফিস থেকে পরিশোধ করা হবে। নাঈমের বেতন থেকে মাসে মাসে কেটে নেয়া হবে। নাঈমের ৭ দিনের ছুটিও মঞ্জুর করে যান এমডি।

নাঈম সারাক্ষণ ইতির হাত ধরে ইতির পাশে বসে থাকে। সেদিন পোস্ট অপারেটিভে আর কোন রোগী না থাকায় নাঈমকে ইতির সাথে থাকার অনুমতি দেন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। পরদিন সকালে ইতিকে কেবিনে শিফট করা হয়, তখনও ইতির জ্ঞান পুরোপুরি আসেনি। আধোঘুম আধোজাগরণেই কেঁদে উঠে ইতি।নাঈম ওর মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চায় কি হয়েছে?

ইতি বাচ্চার কথা জিজ্ঞেস করে। নাঈম উত্তর খুঁজে পায়না। অসহায়ের মতো তাকায় সবার দিকে। সবাই মাথা নিচু করে থাকে। খাদিজা বেগম এগিয়ে এসে বসেন ইতির পাশে। কপালে চুমু দিয়ে আদর করে বলেন -“মা জানো, আল্লাহ তোমার জন্য জান্নাতে ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তোমার বাবুটা তোমার জন্য জান্নাতে অপেক্ষা করছে মা। তুমি যদি কান্নাকাটি কর তাহলে ও জান্নাত থেকে দেখেই কষ্ট পাবে। তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে মা। আমি জানি ধৈর্য ধরা অনেক কঠিন কাজ, কিন্তু এটাও জানি আমাদের ইতিমনি অনেক শক্ত মেয়ে। কত কত ঝড় পাড়ি দিয়েছে আমাদের মেয়েটা। তুমি জানো যাদের বাবুকে আল্লাহ নিয়ে যায় আর তারা ধৈর্য ধরে থাকে তাদের জন্য আল্লাহ জান্নাতের ওয়াদা করেছেন। ধৈর্য ধর সোনা মা আমার।” বলে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নেন ইতিকে। ওর কান্না আটকানোর কাঁপন টের পান বুকের মধ্যে। ইতির মা, নাঈম বের হয়ে যায় কেবিন থেকে নিজেদের কান্না ইতিকে না দেখাতে।

নাঈম ধাতস্থ হয়ে এসে ইতির হাত ধরে বলে -“আমি শুধু আল্লাহর কাছে তোমাকেই ফিরে চেয়েছি ইতু। আল্লাহ আমার ডাক শুনেছেন। তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন আমাদের কাছে। আর কিছু চাইনা। তুমি শান্ত হও ইতু প্লিজ। তুমি শান্ত হও।”

ইতি কিছুটা শান্ত হয়ে এলে দুপুরের ওষুধ খাওয়ানোর সময় হলে ইতির মা জাউ ভাত মাখিয়ে ইতিকে খাইয়ে দিতে যান। এক গ্রাস খাবার মুখে নিয়েই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে ইতি। ওর মা আদর করে দিয়ে কান্নার কারন জিজ্ঞেস করলে বলে -“এইযে তুমি কত সুন্দর তোমার সন্তানকে খাইয়ে দিচ্ছ। আমিতো পারবোনা মা। আল্লাহ আমাকে কেন এতো কষ্ট দিলেন মা? আমি কি পাপ করছি মা?”

ইতির মা মেয়ের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলেন -“মামনি আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন তাকে কষ্ট দু:খ দিয়ে দিয়ে খাঁটি করে নেন। দেখেন এসব কষ্টে তার আল্লাহর উপর ভরসা আছে কি না? নাকি তারা আল্লাহর উপর ভরসা হারিয়ে ফেলেন। আমার সোনামানিক এখন এসব নিয়ে মন খারাপ করিওনা প্লিজ। জানি এই কষ্টে স্বান্তনা দেয়ার মতো কোন কথা নাই কিন্তু একটা কথাই বলব আল্লাহর উপর ভরসা করে ধৈর্য ধর মা। আল্লাহই তোমাকে এই ধৈর্যের প্রতিদান দিবেন ইনশাআল্লাহ। দেখ মা, তোমার বিয়ের আগে যখন তোমার সব বান্ধবীরা একের পর এক রিলেশন করত তখন আমি তোমাকে বলেছিলাম ধৈর্য ধরে আল্লাহ তোমার জন্য যাকে নির্ধারণ করেছেন তার অপেক্ষা করতে কারণ আল্লাহ তার পাক কালামে বলেছেন আমি উত্তম নারীদের জন্য উত্তম পুরুষ আর অধম নারীদের জন্য অধম পুরুষ নির্ধারণ করেছি। দেখ আল্লাহ তোমার ধৈর্যের ফল হিসেবে নাঈমের মতো একজন স্বামী দিয়েছেন, যে তোমাকে এতো ভালোবাসে।”

-“ঐটা তো একটা ছাগলের বাচ্চা। সারাদিন ম্যা ম্যা করে। আমার কোন দিকটা সে বুঝল? আজ আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী তো ওর মা আর বোন।” রাগে ফুঁসে ওঠে ইতি। ওর মা খাইয়ে দিয়ে ওষুধ খাইয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে দেন।

বিকেলে ইতি ঘুম ভেঙে দেখে তুলি আর নাজমা বেগম বসে আছে সবার সাথে। তুলিকে দেখেই ইতি চিৎকার দিয়ে উঠে -“এই খু/নী কেন আসছে? আমার সন্তানকে এই খু/ন করছে। আমি বলছি তুলিই আমার সন্তানের খু/নী।” বলতে বলতে হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো হাঁপাতে থাকে।

নাঈম এসে ওকে ধরে বলে -“কি বলছ তুমি ইতি? কি হইছে আমাকে খুলে বল। আমি নিজেও জানতে চাই। আমি তোমাকে সুস্থ অবস্থায় রেখে কাজে গেলাম। এরমধ্যে কি ঘটল যে আমাদের সন্তানহারা হতে হল। তুলি তুই কি করছিস বল? না আগে ইতি তুমি বল।”

-“নাঈম তুমি সকালে যখন অফিসে যাও তখন কি ওয়াশরুমে পানি ছিল?” ইতির প্রশ্ন।

-“হ্যাঁ ছিল তো। আমি সকালে যাওয়ার আগে ট্যাং/ক ফুল করে রেখে গেছিলাম।” নাঈমের উত্তর।

-“আমি ১০টায় ঘুম থেকে উঠি। তখন এক ফোঁটা পানি ছিলনা। পানির মেশিন ছাড়তে যাই, দেখি মেশিন নষ্ট। তুলিকে বললাম ওর মায়ের ওয়াশরুম থেকে এক বালতি পানি এনে দিতে, দিলনা। জানোই তো ওখানে ড্রাম ভরে পানি রাখে। উল্টো আমাকে বলে আসছে জমিদার, আমার ঠ্যাকা তার টয়লেট যাওয়ার পানি এনে দেই। বলে কানে হেডফোন লাগিয়ে ঘরে যায়। তোমার মা বাসায় ছিলনা। বাবাও বাজারে গেছিলেন। আমি টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে যাই। দেখি কলপাড়ে আধলা গুলো নড়তেছে। তারপরও সাবধানে ছোট এক বালতি পানি তুলে নিয়ে আসতে গেছি, পায়ের নিচের আধলা ডেবে গেল আর আমি তাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলাম। আমার বাচ্চাটা চলে গেল। এতোদিন কিছু হলোনা আর তোমার বোন আসল তার পরদিনই এমন হল? কাকতালীয় বলতে চাও? আমার বাবু হবার খবরে সবাই খুশি কিন্তু তোমার মা বোনের মুখে কখনো খুশির লেশ দেখছ?” বলতে বলতে চিৎকার করে উঠে আর আবারও ফিনকি দিয়ে ব্লি/ডিং শুরু হয় ইতির।

তাড়াতাড়ি ডাক্তার আসেন, ইতিকে আবারও নেয়া হয় ওটিতে।

চলবে
©️সৈয়দা রাজিয়া বিল্লাহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here