Wednesday, April 15, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প কে তুমি মনোহরিণী? কে তুমি মনোহরিণী?’ ২.(সমাপ্তি পর্ব)

কে তুমি মনোহরিণী?’ ২.(সমাপ্তি পর্ব)

‘কে তুমি মনোহরিণী?’
২.(সমাপ্তি পর্ব)

থানা থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে অমিত আগেই ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো। দিন যতই যাচ্ছে ততই একটা অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। ঘর্মাক্ত শরীরে খুব আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। কয়েক মিনিট পরই হাতে সাদা একটা টেডি বিয়ার নিয়ে ঘুমঘুম চোখে এসে গ্রিলের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ালো প্রতিমা। আজকে গায়ে লম্বা একটা গোল জামা। কাঁধ থেকে জামার একাংশ সরে গিয়ে শ্যামলা গলার নিচটুকু স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। গোলগাল মুখটায় ফোলাফোলা ভাব। ঘুম থেকে উঠেছে বোধ হয়। পড়ন্ত সূর্যের মনভোলানো মিষ্টি আভা এসে পড়েছে প্রতিমার মুখে।
কানের পাশে ছোট ছোট চুলগুলো সৌন্দর্যে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। অমিত শুঁকনো ঢোক গিলে। ছোট্ট একটা মেয়ে অথচ অমিতের শক্তপোক্ত বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। ভাবা যায়, কী সাংঘাতিক! অমিত নিজের দৃষ্টিকে সংযত করে। এমন করাটা এই বয়সে এসে মানায় না। কিন্তু, মন কী এতসব নিয়মকানুন মানে? জেনেও সবকিছু অদেখা করে এড়িয়ে চলে যায়। গোলকধাঁধায় ফেলে মস্তিষ্ককে। মন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসিবত। এই মুসিবতকে কেটে শরীর থেকে আলাদা করা যায় না। একটু একটু করে বুকে পুষে অসহায় হয়ে সারেন্ডার করতে হয় এর কাছে। এ যেনো দুধ দিয়ে কালসাপ পোষা। মাত্র এক মাসে মেয়েটা বুকের সর্বোপরি প্রচ্ছন্ন করে মেঘের মতো গর্জন করে ক্ষণে ক্ষণে। অমিতের যেনো মাথা খারাপ লাগলো গেছে। আজ সকালেও কী বিচ্ছিরি একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে সে। বড় পোস্টে পোস্টিং হওয়ার পরে থেকে পুলিশের জীপগাড়ি আসে তাকে নিতে। গাড়িতে উঠে কন্সটেবল তাকে বলল,সে চা খাবে কিনা। অথচ,অমিত তখন প্রতিমার ভাবনায় ভাসছে। সে দেখলো অপরূপা এক নারীমূর্তি তাঁর জন্য চায়ের ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে আছে। অমিত হা করে তাকিয়ে বলল,খাবো প্রতিমা! তুমি বিষ দিলে আমি বিষও খাবো। কন্সটেবল বেচারা অবাক হয়ে বলল, প্রতিমা কে স্যার? আর কী সর্বনাশ আপনি বিষ খাবেন কোন দুঃখে! অমিত থতমত খেয়ে গেছিলো। থানায় পৌঁছেও আরেক ঘটনা। তখন অমিত দুপুরের টিফিন করে জমা ফাইলপত্র ঘাঁটছে। একজন অপরাধীকে ধরে আনলো জমির যে কিনা আরেকজন জুনিয়র অফিসার। অনেকদিন ধরে লোকটা ড্রাগের ব্যবসা করছে। আজ হাতেনাতে ধরে এনেছে সে। নিশ্চয়ই অমিত স্যার তার পিন্ডি চটকাবে। ভেবেই জমির মহাখুশি। কিন্তু, অমিত ফাইল থেকে মুখ তুলে সেখানে কোনো অপরাধী দেখলো না। চোখ অথবা মনের ছলনায় সে দেখলো প্রতিমা বাচ্চা বাচ্চা একটা মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। হাত নেড়ে নেড়ে বলছে, ইন্সপেক্টর মশাই আমাকে আপনার ঘরনি করবেন?আমি ডিম ভাজতে পারি। অমিত হো হো করে হেঁসে উঠলো গা কাঁপিয়ে৷ জমির, আশেপাশের লোক এমনকি স্বয়ং অপরাধীও বোকার মতো তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো এখানে হাসার কী ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু মাথা চুলকেও সেই রহস্য উদ্ধার করতে পারলোনা। অমিত দীর্ঘ শ্বাস ফেললো এসব ভেবে।

প্রতিমা আনমনে কী যেনো দেখছে আকাশের দিকে তাকিয়ে। অমিত ওর দিকে তাকিয়ে বলল,

‘প্রতিমা, আকাশে কী দেখো?’

‘আকাশের দিকে তাকিয়ে মনের কথা কই। আকাশ মনের সব দুঃখ কষ্ট শুষে নেয়। ‘

‘আকাশের কী সে ক্ষমতা আছে প্রতিমা?সত্যিই’

‘আকাশের ক্ষমতার কথা তো জানিনা। তবে, আকাশের নীল পর্দার ওপারে কেউ একজন আমাদের দেখছেন। ‘

‘তো তুমি তাঁকে কী বললে?’

‘বললাম, আপনাকে যেনো সে খুব সুখ দেয় শান্তি দেয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় কী জানেন?’

‘কী?’

‘ভালো মানুষরা পৃথিবীতে বেশি ভালো থাকতে পারেনা। তাদের জন্য মরণের পরে অঢেল সুখ থাকলেও এপারে থাকেনা। ‘

‘প্রতিমা, তোমার বয়স কী সত্যিই সতেরো? সত্তর নয়তো?’

প্রতিমা খিলখিল করে হেঁসে বলল,

‘কেনো মনে হলো? ‘

অমিত হাসিমুখে বলল,

‘এইযে বড়দের মতো গুছিয়ে কথা বলো যে মাঝে মাঝে। অবাক লাগে। ‘

‘ভালো লাগেনা? মন্দ লাগে?’

‘না না, তা হবে কেনো? তুমি সুন্দর কথা বলো প্রতিমা।’

‘আচ্ছা, আজ যে আপনি কাপড়ও বদলাননি! না বদলেই ব্যালকনিতে। ‘

অমিত দ্বিধাবোধ করলো। কী বলবে খুঁজে পেলো না। মিথ্যা একটা কথা বলতে নিয়েও বললোনা৷ সে স্পষ্ট কন্ঠস্বরের সঙ্গে বলল,

‘তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিলো প্রতিমা, আমার জন্য তো কেউ অপেক্ষা করেনা। আগে রোবটের মতো করে মেপে মেপে বাসায় আসতাম, কখনো কখনো বাহিরেই থেকে যেতাম। কিন্তু এখন আমার বাসায় ফিরতে ভালো লাগে। কেউ একজন আমার জন্য পাশের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়ে সময় গোণে আমার ভাবতে ভালো লাগে। তুমি সুন্দর প্রতিমা, তুমি আমার দেখা পৃথিবীর দ্বিতীয় সুন্দর নারী। আমার চোখের প্রথম সুন্দর নারী হলেন আমার মা। আর এরপরেই তুমি। ‘

প্রতিমা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। ভাষাহীন মুখটার দিকে তাকিয়ে অমিত হাসলো। প্রতিমার চোখ দুটো কী যেনো বলতে চাইলো অমিতকে। অমিত সে ভাষাহীন ভাষার গভীরতা বুঝতে পারলো না। প্রতিমা নির্বাক থেকে ধীরে ধীরে রুমের দিকে অগ্রসর হলো। অমিত হতাশ চোখে তাকালো। শুনতে পেলো না, প্রতিমা চোখের কোণটুকু মুছে বিরবির করে বলছে,

‘সঠিক মানুষ দেরিতে কেনো আসে ভগবান? ‘

বাসায় আজ দ্রুত ফিরবে অমিত। এই ভেবেই সব কাজ সাথে সাথেই শেষ করছে। এতো আনন্দের একটা দিন। কোনোভাবেই দেরিতে বাসায় ফিরবেনা সে। প্রতিমাকে সারপ্রাইজ দিবে সে। প্রেয়সীর জন্মদিন বলে কথা। কয়েকদিন আগেই প্রতিমা তাঁকে ভালোবাসার স্বীকৃতি দিয়েছে। আগে যে অমিত রোবটের মতো অনুভূতিহীন ছিলো এখন সে রোজ গল্পের ঝুড়ি খুলে প্রেয়সীর সামনে বসে। কখনো ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায় কথা বলতে বলতে চোখে চোখ রেখে। ভালোবাসা কত সুখের পরশ! অমিত নিজেকে খুব সুখী মনে করে। প্রতিমার কথা সে তাঁর মা’কে জানিয়েছে। মা খুশি হয়েছেন। বলেছেন তিনি আসবেন প্রতিমাকে আশীর্বাদ করতে। দুষ্ট মিষ্টি মুহুর্তে কাটছে সময়। বর্ষাকাল, তাই বাহিরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। অমিত বৃষ্টিতে ভিজে দোকান থেকে ফুলের বুকে কিনে নিয়ে আসলো। একটা লাল শাড়ি, চুড়ি,সিঁদুরের কৌটাও কিনলো। এসব সে বিয়ের পর প্রতিমাকে নিজ হাতে পড়িয়ে দেবে। যতবারই অমিত প্রতিমাকে নিয়ে ভেবেছে ততবারই, এক লাল শাড়িতেই কল্পনায় এসেছে প্রতিমা। একবার চোক্ষু জুড়িয়ে দেখতে ইচ্ছে ছিল লাল শাড়িতে। প্রতিমার গলার একটু নিচে থাকা তিলটায় ঠোঁট চেপে ধরে বলতে ইচ্ছে করে, প্রতিমা তুমি এতো সুন্দর কেনো? তোমাকে দেখে আমার চোখ পুড়ে যায়! এতো পোড়াও কেনো আমায়?

অমিত ভিজে জুবুথুবু হয়ে বাড়িতে আসলো। হাতে ফুল, শাড়ির প্যাকেট দেখে বাড়ির দারোয়ান হাসিমুখে বললেন,

‘এসব কী বৌমণির জন্য নাকি ভাইসাব? বিয়া কবে করলেন?’

অমিত ভিজা চুল ঝাড়তে ঝাড়তে লাজুক মুখে বলল,

‘না দাদা,এসব আপনার হবু বৌমণির জন্য। ‘

‘তাই নাকি,কে সেই ভাগ্যবতী?’

‘কী যে বলেন দাদা! ভাগ্যবতী কিনা জানিনা। কিন্তু আমি ভাগ্যবান। আপনি চিনেন নিশ্চয়ই তাঁকে। ‘

এই কথাতে দারোয়ান উৎসাহিত হয়ে বললেন,

‘সেকি! কার কথা বললেন? আট তলায় থাকে যে একটা আপামনি শ্রাবন্তী নামে, সে?’

‘নাহ, প্রতিমা রায়। আমার পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। ‘

‘কীহ! আপনি কী বললেন? ‘

অমিত ভ্রু কুচকে বলল,

‘কী হয়েছে দাদা?’

দারোয়ানের চোখমুখে অদ্ভুত কিছু দেখলো অমিত। তিনি আঁটকে আঁটকে বললেন,

‘আপনি কী বললেন একটু আগে, প..প্রতিমা রায়? ‘

‘হ্যা, কেনো কী হয়েছে? কোনো সমস্যা দাদা?’

‘আ..আপনার পাশের ফ্ল্যাট তো গত তিন বছর যাবত তালাবদ্ধ করা। ওখানে মানুষ আসবে কী করে! আর প্রতিমা রায় তো তিন বছর আগেই মারা গেছে। ‘

‘হোয়াট!এসব কী আবোলতাবোল কথা দাদা!’

অমিত রেগে গেলো। এমন ফালতু মজা তার একটুও পছন্দ হলোনা। মেজাজ নষ্ট করতে ইচ্ছুক নয় সে। আজ যেহেতু একটা শুভ দিন। তাই বিনাবাক্য ব্যয়ে পা ফেলে লিফ্ট দিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকলো। পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে আছে। লাইট জ্বালিয়ে আগেই সে ব্যালকনিতে আসলো। প্রতিমার নাম ধরে চিৎকার করতে শুরু করলো। পুরো নিস্তব্ধতায় মোড়ানো ঘরটা। চমকে উঠলো অমিত। ব্যালকনি থেকে ভেতরে ঘর দেখা যায়না। ওখানে তাকিয়ে তাঁর মনে হলো, এই ঘর অনেক দিন ধরে এভাবেই বন্ধ হয়ে আছে। চরম ধাক্কা খেলো সে। তাহলে, এতদিন সে কার সাথে কথা বলল! কাকে নিয়ে স্বপ্নের ঘর সাজালো? সবই কী তার মনের ভ্রম? কল্পনা? কীভাবে সম্ভব? তবে,সে কী মানসিক ভারসাম্যহীন রোগী হয়ে গেলো!

আবারও সে ফ্ল্যাট থেকে নিচে নেমে দারোয়ানের কাছে আসে৷ সে প্রথমে কিছু না বলতে চাইলেও অমিতের ইন্সপেক্টর হওয়ায় ভয়ে বলল,

‘আজ থেকে পাঁচ বছর আগে প্রতিমা ও তার মা বাবা এখানে ভাড়া থাকতে এসেছিলেন। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে সে। সদ্য এসএসসি পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। হঠাৎ, তাদের ফ্ল্যাটে ডাকাতি হয়। প্রতিমার মা বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করে মারা হয়। আর প্রতিমাকে গণধর্ষণ করে তিন রাত বেঁধে রাখা হয়। বাড়িতে যে ডাকাত দলের প্রবেশ হয়েছে কেউই জানতোনা। যেহেতু, প্রতিমারা নতুন ছিলো তাই প্রতিবেশী কারো সাথেই তাদের যোগাযোগ ভালো ছিলোনা। এছাড়া, সারাদিন স্বামী স্ত্রী চাকরি করতেন। একা মেয়েটাই বাসায় থাকতো। এরপর দেহ উদ্ধার করা হয়। অনেক দিন পাশের দুই ফ্ল্যাট ভাড়া দেয়া যায়নি। মাঝে একবার ভাড়া হলো। কিন্তু, মালিক এক মাসের মাথায় মারা যান আত্মহত্যা করে। কী কারণে আত্নহত্যা করেন, কেউ জানেনা। আপনার কাছে তাই সস্তায় ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দেয়া হয়। ‘

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো অমিতের। সে কল্পনাও করতে পারেনি এমন কিছু হতে পারে। অমিত একদিন বলেছিলো, সে প্রতিমার ফ্ল্যাটে আসতে চায়। আর নাহয় প্রতিমাকে নিজের ফ্ল্যাটে আসতে হবে। কিন্তু কোনো মতেই রাজি হয়নি প্রতিমা৷ সে বলেছিলো,তার জন্মদিনের দিন সে অমিতের ফ্ল্যাটে আসবে। শুনে ভীষণ খুশি হয়েছিলো অমিত। অথচ, কী হলো এসব!

বিধ্বস্ত অবস্থায় উঠে নিজের ফ্ল্যাটে চলে আসলো অমিত। ধপ করে ব্যালকনির ফ্লোরে বসে পড়লো। দুই ফোটা পুষ্পজল দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো। সে চোখ বন্ধ করে রাখলো। হঠাৎ শুনতে পেলো, ঘুঙুর পড়া দুটি পা তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখ খুললোনা সে৷ ধীরে ধীরে টের পেলো, শাড়ি পরিহিত প্রতিমা এসে তাঁর কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। অমিতের মুখে মৃদু হাসি। সে মনে মনে আওড়ালো,

‘আমি জানিনা, তুমি কে মনোহরিণী? যাই হও, কল্পনা হলেও আমার হয়ে থেকো। জানি, চোখ খুললেই তুমি উধাঁও হয়ে যাবে। এই চোখ আর আমি খুলবোনা। এই চোখ বুঁজে যাক আমরণের জন্য প্রেয়সী। ‘

(সমাপ্ত)
লেখনীতে-নাঈমা হোসেন রোদসী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here