হৃদয়জুড়ে_প্রেয়সীর_আভাস পর্ব_১৬ মোহনা_হক

হৃদয়জুড়ে_প্রেয়সীর_আভাস
পর্ব_১৬
মোহনা_হক

সকাল সকাল আয়াজ কে নিয়ে আসা হলো বাসায়। সাহেদ হসপিটালে। ওর অবস্থা বেশি খারাপ। আরহাম সকালেই আয়াজ কে নিয়ে বাসায় আসে। কাল রাতে
হসপিটালে তুমুল ঝগড়া শুরু হয় দু’জনের। আয়াজ যেহেতু খুব কম জায়গায় ব্যাথা পেয়েছে তাই সে আর হসপিটালে থাকতে ইচ্ছুক নয়। মাথায় শুধু ইকরামুল কে কিভাবে শা/স্তি দিবে সেটাই ভাবছে।

মায়া চৌধুরী ছোট ছেলে কে দেখে জড়িয়ে ধরে। একপাশে আরহাম ধরে আছে। আয়াজের ব্যা/থা পায়ে সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে-
-‘মা তোমাকে আর কতো বোঝাবো বলো?’

আরহাম বি/র/ক্ত স্বরে বললো-‘
-‘আহা মা ওকে ছেড়ে দাও এখন। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে? রুমে যেতে দাও ওকে।’

মায়া চৌধুরী আয়াজ কে ছেড়ে দিলো। তার দু গালে হাত দিয়ে ছেলের কপালে চুমু খেলো।

-‘আমি চাই তুই সব সময় ভালো থাক বাবা।’

আয়াজ হাসে। আরহাম আর মায়া চৌধুরী ধরে নিয়ে যায় রুমে। তারা রুম থেকে চলে যাওয়ার পর আয়াজ একা একা চেঞ্জ করে ফেলে। এই সময়ে রুয়াত কে মনে পড়ছে খুব। সঠিক সময় বিয়ে করলে আজ রুয়াত তার বউ হয়ে থাকতো। এসব কাজে সাহায্য করতো মেয়েটা। রুয়াতের কথা মনে পড়তেই হাসি ফুটে আয়াজের।

(*)

-‘স্যার আয়াজের তো কিছুই হলো না। সে উল্টো সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে।’

ইকরামুল টেবিলে মাথা দিয়েছিলো। আয়াজের কথা শুনেই মাথা তুলে তাকালো তার দলের ছেলেটার দিকে। রক্তিম আভা মুহুর্তেই ছড়িয়ে পড়লো মুখে। আয়াজের জায়গায় সাহেদ এসে পড়েছিলো। দলের লোকদের গাফিলতির ফল এটা। মাথায় ভরপুর চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। একদিকে তার দোকান বন্ধ হয়ে আছে। ইনকামের একটা জায়গা অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়েছে। সাংসারিক ঝামেলা। আর আয়াজের এরূপ অবস্থার জন্য আয়াজ যদি পুলিশের কাছে তার নাম বলে দেয় নিশ্চয়ই পুলিশ তাকে ধরবে সে খেয়াল ও আছে। সব মিলিয়ে বেহাল দশা ইকরামুলের।

-‘তোদের সবার গাফিলতির কারণে আয়াজ সুস্থ আছে। তোদের আসলে আমি আমার দলে রাখি কেনো? কেনো এতো টাকা দিই মাঝেমধ্যে সেটাই বুঝতে পারছি না। এমন ল’ম্প’ট কতগুলো কে রেখে আমি নিজেই নিজের দূর্নাম করছি।’

ইকরামুলের চিৎকারে ছেলেটা একদম চুপসে যায়। বাকি সবাই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। ইকরামুল যে শুধু আজ তাদের এসব বলছে তা না এটা তার নিত্যদিনের বলা কথা। এমন কোনো দিন নেই যে ইকরামুল তার দলের লোকদের উপর চিৎকার করেনি। রাগে ফুসছে সে।

-‘আয়াজের দলের আশরাফ কে জলদি বল আমার সাথে দেখা করতে। কাল দেখলাম না ওকে। বউয়ের সাথে সময় কাটাচ্ছে নিশ্চয়ই?’

কটমট করে কথাটি বলে ইকরামুল। তার মন চাচ্ছে আশরাফ কে মাটিতে পুতে ফেলতে। মেজাজ চরম পর্যায়ে গরম আছে। আশরাফ কে কল দেওয়ার প্রায় বিশ মিনিট পর ইকরামুলের অফিসে। আশরাফ কে দেখেই ইকরামুলের যেনো শরীরে আগুন ধরে যায়। এতো কিছুর পর ও আশরাফের কোনো দেখা পায়নি সে। রাগে টেবিলের উপর থাকা গ্লাসের পানি আশরাফের মুখে মারে।

-‘খুব আনন্দে আছিস তাইনা! খুব পুর্তি করছিস। একবারও কাল দেখা করতে আসলি না। বলেছিলাম না আয়াজের সম্পুর্ণ প্ল্যান আমায় জানাবি কিন্তু তুই কি করেছিস? আর তুই জানিস আয়াজের জন্য আমার সব দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছে? শুনেছিস কারো থেকে? আয়াজ এতো প্রমাণ কোঁথায় পেলো বল।’

আশরাফ লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। তার বউয়ের ডেলিভারি ছিলো কাল। এমন না যে আয়াজের কাছেও গিয়েছে। কারও সাথে দেখা করেনি। বউয়ের জন্য চিন্তায় কোনো কিছুর খবর নেওয়া হয়নি। ইকরামুল যে প্রতিশোধের আগুনে পাগল হয়ে
গিয়েছে বুঝতে বেশি সময় লাগলো না আশরাফের। নিজেকে তটস্থ করে বলে-

-‘স্যার আমার বউয়ের কাল ডেলিভারি ছিলো। আয়াজ স্যারের যে এক্সিডেন্ট হয়েছিলো আমি সেখানেও যাইনি। কাল শুধু

ইকরামুল আর বলতে দিলো আশরাফ কে। ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিলো।
-‘শুন বেশি চালাকি কখনো করার চেষ্টাও মাথায় আনিস না। যদি আমার সাথে এমন করার দুঃসাহস দেখিয়েছিস তাহলে বুঝবি এই ইকরামুল কি জিনিস।’

দ্রুত পা ফেলে ইকরামুল চলে যায়। আশরাফ মাথা দু পাশে ঘুরিয়ে সবাই কে দেখে নিলো। উপস্থিত সবাই মাথা নিচু করে আছে। এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আশরাফ। আবার তার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। আপাতত তার মাথায় শুধু তার বউ আর সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তানের কথা মাথায় ঘুরছে। সন্ধ্যার পর
একবার আয়াজের সাথে দেখা করতে যাবে।

(*)

আজ বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারে। রুয়াত জাফরি কে কোলে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দু’জন বৃষ্টি দেখছে। কারেন্ট ও নেই তাই তারা বারান্দায় এসেছে। রুমে ইনিমা আরহামের সাথে কথা বলছে। জাফরি হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি ভিতরে এনে রুয়াতের মুখের উপর ঝাড়া দিচ্ছে। রুয়াত বাচ্চাটির আনন্দ উপভোগ করছে।

ইনিমা ফোনের একপাশে শুয়ে আছে। আরহাম ভিডিও কল দিয়েছে।

-‘আজ আসবে বাসায়?’

ইনিমার শরীর খুব দূর্বল তাও বলে-
-‘হ্যাঁ আসবো। আমার তো উচিৎ একবার আয়াজ কে দেখে আসা। নাহলে মানুষ কি ভাববে।’

-‘শুনো ইনিমা শরীর ভালো থাকলে আসবে নাহলে আসার দরকার নেই। আর মানুষের ভাবাভাবি কে এতো পাত্তা না দেওয়াই ভালো। আজ অনেক পলিটিক্যাল লোকজন বাসায় আসবে আয়াজের সাথে দেখা করার জন্য।’

-‘তাহলে তো মায়ের উপর আজ অনেক চাপ পড়বে। আর আমি মা কে একটু টুকটাক হেল্প না করলে ওনার কাজ শেষ হয় না। আমি আসবো আজ। তারপর বিকেলেই চলে আসবো। এখন তো সবেমাত্র এগারোটা বাজে।’

আরহাম তার অফিসে বসে আছে। বউয়ের কথায় মাথা দোলায়।
-‘এসো সমস্যা নেই। আমি গাড়ি পাঠাবো তোমার জন্য?’

-‘হ্যাঁ।

-‘আচ্ছা শুনো রুয়াত কে ও নিয়ে এসো তোমার সাথে। তারপর দু’জন একসাথে বিকেলে চলে যেতে পারবে সমস্যা নেই। তুমি আমায় রেডি হয়ে আবার একটা কল দিও আমিই আসবো তোমাদের নিতে।’

ইনিমা মাথা নাড়ায়৷ কল কেটে দেয়। শোয়া থেকে উঠে বসে। হালকা করে হাত খোঁপা করে ফেলে। এক্ষুনি গেলে মায়া চৌধুরীর কিছু হেল্প করতে পারবে। সে ঠিক করলো এই সময়েই যাবে ওই বাড়িতে। রুয়াত কে বলার আগে আগে মেহরুবার কাছে গেলো। পারমিশন নেওয়ার জন্য। মেহরুবা শোনার পর রুয়াত কে ও যাওয়ার অনুমতি দিলো। ইনিমা আবার আসে রুমে। রুয়াত কে ডাক দেয়। ইনিমার ডাকে রুয়াত তাড়াতাড়ি জাফরি কে নিয়ে রুমে আসে।

-‘আপু ডেকেছিলে?’

ইনিমা আলমিরা থেকে একটা থ্রি পিস বের করতে করতে বলে-
-‘আমি আর তুই এখন ওই বাসায় যাচ্ছি।’

রুয়াত কিছুটা অবাক হয় কথাটা শুনে।
-‘আপু আমি কিভাবে? আর মা যেতে দিবে না বোধহয়।’

-‘আমি মা কে বলেছি। আর মা অনুমতি ও দিয়েছে। তুই তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যা। একটু পর আরহাম আসবে আমাদের নিতে।’

রুয়াত মাথা নাড়ায়। জাফরি কে বেডে বসিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। সে ও ইনিমার মতো একটা থ্রি পিস বের করে পড়ে নেয়। তাদের রেডি হওয়া শেষে ইনিমা কল দেয় আরহাম কে। আরহাম এসে তাদের নিয়ে যায়। আজকে অনেক গার্ড বাসার সামনে। রুয়াত তাদের দেখে ভ্রু কুচকে ফেলে। তার মাথায় শুধু এটাই ঘুরছে আর সময় কেনো এরা থাকে না? আজ এতো গার্ড বাসার সামনে থাকার কারণ বুঝছে না রুয়াত। আরহাম গাড়ি থামায় বাসার সামনে। ইনিমা রুয়াতের হাত ধরে ঢুকে বাসার ভিতরে। মায়া চৌধুরী বেশ অবাক হয় তাদের দেখে। এসেই ইনিমা আর রুয়াত কে এক সাথে জড়িয়ে ধরে।

-‘তোমরা আসবে আমি ভাবিওনি। এসেছো আমি খুব খুশি হয়েছি।’

ইনিমা এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে মায়া চৌধুরী কে।
-‘আপনার ছেলে বললো আজ বাসায় অনেক অতিথি আসবে। আমাদের আরও পরে আসার কথা ছিলো কিন্তু আপনি একা সামলাতে পারবেন কিনা সবকিছু তাই তাড়াতাড়ি এসে পড়েছি।’

রুয়াত ইনিমার দিকে তাকায়। তার বোন একবারও বলেনি আজ যে এই বাসায় অতিথি আসবে। মায়া চৌধুরী হেসে বলে-

-‘আচ্ছা যাও তোমরা আয়াজের সাথে দেখা করে এসো। তোমাদের দেখলে ও আমার থেকে বেশি অবাক হবে।’

ইনিমা সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
-‘জ্বী মা যাচ্ছি। কিন্তু বাবা বাসায় নেই?’

মায়া চৌধুরী জাফরি কে কোলে নিয়ে বলে-
-‘আরে আর বলো না। সে কাউকে না জানিয়ে কিছু কাজের জন্য ঢাকায় গিয়েছে। গত রাতে আমাকে বলেছে। আরহাম আজ সকালে বাসায় এসে তো অনেক বকেছে তার বাবা কে।’

রুয়াত চুপ করে ইনিমা আর মায়া চৌধুরীর কথা শুনছে। আপাতত সে নিরবতা পালন করছে।

-‘মা জাফরি কে আমার কোলে দিন। আমরা সবাই দেখা করে আসছি আয়াজের সাথে।’

ইনিমা জাফরি কে কোলে নিলো। রুয়াতের হাত ধরে নিয়ে গেলো আয়াজের রুমে। রুমটা অন্ধকার করে রেখেছে। রুয়াত ইনিমা কে বললো-‘

-‘আপু ওনি মনেহয় ঘুমাচ্ছে।’

গলার স্বর একটু উঁচু করে ইনিমা বললো-‘
-‘দেবর সাহেব ঘুমাচ্ছেন আপনি?’

আয়াজ রুমের সব লাইট বন্ধ করে শুয়েছিলো। ইনিমার কথা শুনে ঘুম উবে যায় তার। উঠে বসে।

-‘না লাইট অন করুন। ঘুমাইনি আমি।’

ইনিমা লাইট জ্বালিয়ে দেয়। আয়াজ হঠাৎ রুয়াত কে দেখে ভুত দেখার মতো চমকে যায়। ইনিমার সাথে যে রুয়াত আসবে এটা যেনো বিশ্বাসই হচ্ছে না। ইনিমা আয়াজের পাশে দাঁড়ায়। জাফরি কে আয়াজ তার কাছে টেনে নেয়। মেয়েটা চাচ্চু কে পেয়ে তার বুকে মাথা দিয়ে ফেলে। আয়াজ আধ শোয়া হয়ে বসে আছে।

-‘কি অবস্থা এখন তোমার।’

আয়াজ মাথা নাড়ায়।
-‘আলহামদুলিল্লাহ আগের থেকে অনেকটাই ভালো আছি। কখন এসেছেন?’

ইনিমা হেসে বলে-
-‘এইতো কিছুক্ষণ আগে এসেছি।’

আয়াজ রুয়াতের দিকে তাকিয়ে ছোট করে উত্তর দেয়।
-‘ওহ্।

-‘আচ্ছা আমি মায়ের কাছে যাই। রুয়াত তুই কথা বল আয়াজের সাথে। আমি একটু মা কে হেল্প করি গিয়ে।’

রুয়াত বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়লো। ইনিমা চলে গেলো। আয়াজ চোখগুলো ছোট ছোট করে রুয়াতের দিকে তাকিয়ে আছে।

-‘ওদিক ঘুরো।’

রুয়াত বুঝলো না আয়াজের কথা।
-‘বুঝিনি।’

আয়াজ কাঠকাঠ গলায় বললো-
-‘ওদিক ঘুরতে বলেছি।’

রুয়াত অবুঝের মতো ওদিক ঘুরলো। আয়াজ হেসে রুয়াতের হাত ধরে টেনে বসালো তার সামনে।রুয়াতের
পিঠ ঠেকে আয়াজের বুকে। রুয়াত মুখ খিচে অধর কাটে।

-‘আসবে বলোনি তো।’

কাঁপা স্বরে রুয়াত বলে-
-‘আপু নিয়ে এসেছে। আমিও আগে জানতাম না। বলার পর তারপর জেনেছি।’

আয়াজ এক হাত দিয়ে রুয়াতের হাত চেপে ধরে আছে। আরেক হাত দিয়ে জাফরি কে আলতো করে মাথায় হাত বুলাচ্ছে।

-‘জাফরি তোমার মিম্মিম কে একটু মাইর দিই?’

জাফরি মাথা নাড়ায় দু’পাশে। রুয়াত মাথা ঘুরিয়ে জাফরি কে দেখলো। আয়াজ মাথা ঠেকায় রুয়াতের মাথায়।

-‘প্রেয়সী তুমি আমার হৃদয়ে বয়ে আনা অদৃশ্য শান্তি, সুখ। এইযে এখন তোমায় দেখেছি আমার সব ব্যাথা সেরে গিয়েছে।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here