Monday, April 13, 2026

হঠাৎ_হাওয়া,০৪,০৫

#হঠাৎ_হাওয়া,০৪,০৫

(৪)

দিহান একটু হেসে বলল
—তুমিই তো আমাকে কল করেছিলে
মায়া একটু লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল,
—আসলে আমি খুবই দুঃখিত, বাট সিচুয়েশানটাই এমন ছিল যে আমার তখন এটাই ভালো মনে হচ্ছিল,
দিহান পশ্রয়ের হাসি হেসে বলল,
—শুনলাম মিষ্টিকেও নাকি বাবা অসুস্থ বলে দরজা খুলিয়েছো
মায়া মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে ফেললো।
হিমালয় বাইরে বের হয়ে ওদের কথা কিছু বুঝতে পারলো না মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—কি হয়েছে, কোনো সমস্যা?
দিহান হ্যান্ডশেকের উদ্দেশ্যে হাত এগিয়ে বলল,
—আমি সৈয়দ দিহান।
হিমালয় হ্যান্ডশেক করতে করতে বলল,
—হিমালয় আহমেদ।
—আসলে আজ আমার বোনের গায়ে হলুদ, কাল বিয়ে, একটু ফ্যামিলি প্রবলেম ছিল এই ম্যাডাম সলভ করে দিয়েছে,
হিমালয় হেসে বলল,

—ও আচ্ছা!
—তো আমার বোন চাইছে যাতে মায়া ওর বিয়েতে এটেন্ড করে,
মিষ্টি মায়ার হাত ধরে বলল,
—তুমি এলে আমি খুবই খুশি হবো, তোমার জন্যেই ভাইয়া এলো না হলে ওর যে জেদ কেউ ওকে বোঝাতে পারে না
মায়া হেসে বলল,
—তোমার ভাইয়া তোমার জন্য এসেছে মিষ্টি তার জেদের থেকেও তুমি তার কাছে ইম্পর্টেন্ট।
—তুমি আসবে তো?
—আমি তো একা নই মিষ্টি আমার সাথে আরো অনেকে আছে
দিহান বলল,
—আর কে?হিমালয় তো? তুমি অবশ্যই ওকে নিয়ে এসো
মায়া হাত নেড়ে বলল
—না না শুধু মহারাজ নয়,কথা আপু,পুষ্প আপু,নিরব ভাইয়া, আবির ভাই, ধ্রুব
মায়া বড় একটা দম ফেললো হাপিয়ে গেছে এমন ভাব,হিমালয় ওকে থামিয়ে বলল,
—আহা মায়া তুমি ওনাদের বিরক্ত করছ কেন! এতগুলো মানুষ হুট করে বললেই হয়? তুমি বরং এটেন্ড করো
দিহান হেসে বলল,
—না না মায়া বলছে যখন তখন তোমরা সবাই ইনভাইটেড, ডু সামথিং কল দেম আমি নিজে ওদের সবাইকে বলতে চাই।
হিমালয় আমতা আমতা করে বলল,
—ওকে লেট মি কল।

হিমালয়ের কল পেয়ে সবাই বাইরে বের হয়ে এলো দিহান ওদের বলল আপনারা সবাই আসুন এখনই হলুদের প্রোগ্রাম শুরু হবে মায়া অবাক হয়ে বললো
—রেডি হবো না!
দিহান হেসে বলল,
—আচ্ছা আচ্ছা রেডি হয়েই এসো।

দিহান চলে যেতেই সবাই মায়াকে ঘিরে ধরলো ঘটনা শোনার জন্য মায়া বলল,
—সব পরে হবে এখন একটা কম্পিটিশন করে দেখি কে আগে রেডি হয় চলো।
বলেই মায়া দৌড় লাগালো কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সবাই মেয়েটার কান্ড দেখে চেয়ে রইলো হঠাৎ ধ্রুব দৌড় লাগিয়ে বলল,
—আমি হারতে রাজি নই তোরা থাক।

মায়া হলুদরঙা গোল জামা পড়ে চুল পোনিটেইল করে গায়ে একটা সাদার উপরেই সাদা সুতোর কাজ করা চাদর জড়িয়ে বাইরে এসে দাড়িয়েছে ও এসে দেখলো সাদা প্যান্ট আর শার্টের সাথে হলুদরঙা একটা ব্লেজার পড়ে হিমালয় আগে থেকেই বাইরে দাঁড়িয়ে হিমালয় আড় চোখে তাকিয়ে ঠোট বাকিয়ে হেসে বলল,
—আমি জিতে গেছি
মায়া একরাশ বিরক্তি নিয়ে হিমালয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—কোনো প্রুভ আছে?
হিমালয় অবাক হয়ে বলল,
—মানে!
—মানে এখনো কেউ আসে নি, আপনি আর আমি ছাড়া কেউ জানে না আমাদের মধ্যে কে আগে এসেছে
হিমালয় খুবই আহত হয়ে বলল,
—তার মানে?
—এত মানে মানে করছেন কেন আমি কি বলছি তা আপনিও বুঝতে পারছেন আমিও পারছি
হিমালয় হাল ছেড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—হাউ মিন!
মায়া মুখ যথাসম্ভব কঠিন করে বলল,
—দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন না দীর্ঘশ্বাস ফেলার মত কিছুই হয় নি।
পরে দুজনেই একসাথে হেসে ফেললো তখন একে একে সবাই বের হতে লাগলো,ধ্রুব বিরক্ত মুখে বলল,
—হেরে গেলাম নাকি! জিতলো কে?মায়া নিশ্চয়ই?
মায়া হিমালয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—না মহারাজ।
হিমালয় মায়ার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসতে লাগলো।

হলুদের প্রোগ্রাম বেশ বড়সড় ই মনে হচ্ছে একটা বড় গাছের নিচে মিষ্টির গায়ে হলুদের স্টেজ করা হয়েছে সামনে কাঠ দিয়ে আগুন জ্বেলে তার চারপাশে সম্ভবত এখানকার আদিবাসী নাচ করছে, মিষ্টির বাবা এসে মায়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—মায়া
—হ্যা আঙ্কেল বলুন
মিষ্টির বাবা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন কি বলবেন হয়তো গুছিয়ে নিতে পারছে না মায়া একগাল হেসে বললো
—ইউ আর ওয়েলকাম আঙ্কেল এন্ড ইটসওকে
মিষ্টির বাবা একটু বিব্রত ভঙ্গিতে হাসলেন।তারপর সস্নেহে বললেন
—আমাদের খুব বেশি আত্মীয় আসতে পারে নি তোমরা নিজের মনে করেই আমাদের পাশে থেকো।
সবাই মিষ্টির কাছে গিয়ে একে একে হলুদ মাখালো শুধু আবির গেলো না ও একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইলো, মায়া খেয়াল করে আবিরের কাছে গিয়ে বললো
—আবির ভাই
আবির কিছু না বলেই এক মনে সামনে জ্বলন্ত আগুনের দিকে তাকিয়ে রইলো,মায়া আবিরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—যখন আমার মাম্মাম মারা যায় আমার বাবা একদম একা হয়ে যায় আমি ছাড়া আমার বাবার দুনিয়াতে কিন্তু সত্যি বলতে আপন কেউ নেই তার নিজের বোনও আছে তার সম্পত্তির লোভে।আমি যে কি না বাবার একমাত্র আপন মানুষ সেও বাবাকে একা ফেলে চলে এসেছি তাও অসম্মানজনক পরিস্থিতিতে, সেক্ষেত্রে আমি বিশ্বাসঘাতক তাইনা?
আবির এবার সরাসরি মায়ার দিকে চাইলো কন্ঠ নিচু করে বলল,
—তোমার উচিত তোমার বাবাকে একটা ফোন করা করেছিলে?
—এমন অনেক কিছুই আমাদের উচিত আমরা কি তা করি? আবির ভাই আমি এখানে আসার পর আপনার অন্য সব বন্ধুরাই কিন্তু একবার না একবার তার বাসায় কথা বলেছে এমনকি অল্পভাষী নিরব ভাইয়াও তার মাকে আমার সামনেই ২/৩ বার কল করেছে আপনি কি একবারো আপনার বাসায় কল করেছেন?
—এ ব্যাপারে আমি কিছুই বলতে চাই না।
—আচ্ছা ঠিকাছে বলবেন না। আমিই বলছি কিছু কিছু ভালোবাসা থেকে দায়িত্ববোধ জন্মায় আর কিছু কিছু দায়বদ্ধতা মায়া তৈরি করে যার শক্তি ভালোবাসার অনেক উপরে। কেউ আপনার সাথে বেইমানী করেছে বলে, আপনাকে ভেতর থেকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে বলে আপনি সবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন এটা সমাধান নয়।বরং আপনি সুযোগ খুজুন অসহায় কারো অবলম্বন হওয়ার।হয়তো আপনি কল করবেন না জেনেও আপনার বাসায় আপনার আম্মু ফোনের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে। এটুকুই বলার ছিল।আমি বরং মিষ্টির কাছে যাই।
মায়া দৌড়ে আবিরের সামনে থেকে চলে গেলো আবির মায়ার যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো।হিমালয় এতক্ষণ একটু দূরে দাড়িয়ে ওদের কথা গুলো শুনছলো ও এসেছিলো আবির কে ডাকতে আবির একমাত্র হিমালয়েরই যা একটু কথা শোনে, হিমালয় এগিয়ে আবিরের কাধে হাত রেখে বলল,
—কি ভাবছিস?
—অনেক কিছুই যা আরো আগে ভাবা উচিত ছিল,তোরা যা আমি আম্মুকে একটা কল করে আসি।

আবির ফোন করে ফিরে আসতেই দেখলো ভেতরে একটা জটলা মতো হয়েছে বেশ কিছু কান্নাকাটির শব্দও শোনা যাচ্ছে ও এগিয়ে হিমালয়ের কাছে দাড়িয়ে কারণ জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো মিষ্টির যার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো সে নাকি বাড়িতে নেই, বিয়ে হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। মায়া ভাবলেশহীন ভাব্র দাড়িয়ে আছে , মিষ্টির মা কান্নাকাটি করছেন দিহান রাগে কাপছে হাতের কাছে যা পাচ্ছে ছুড়ে মারছে হিমালয় ধ্রুব এগিয়ে গিয়ে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, মিষ্টি এতক্ষণ চুপচাপ দাড়িয়ে ছিলো পাথরের মতো হঠাৎ ও এক ছুট লাগালো, দিহান দৌড়ে ওর পিছু নিলো বেশিদূর মিষ্টি যেতে পারলো না তার আগেই আবির বা হাত দিয়ে শক্ত করে মিষ্টির ডান হাতের কব্জিটা ধরে ফেললো, মিষ্টি হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।পড়ে যাওয়ার আগেই আবির ওকে ধরে ফেললো। আবির বুঝলো মেয়েটার সারা শরীর খুব ঠান্ডা হয়ে গেছে। দিহান দৌড়ে এসে মিষ্টিকে কোলের মধ্যে নিলো পানির ছিটা দিয়ে ওর জ্ঞান ফেরানো হলো, দিহানের বুকের মধ্যে মুখ নিয়েই মিষ্টি কেদে ফেললো।হুট করে আবির একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো, ও দিহানের দিকে তাকিয়ে বললো
—আমি মিষ্টি কে বিয়ে করতে চাই।
ওর বন্ধুরা সবাই আবিরের দিকে হা হয়ে তাকিয়ে রইলো, মিষ্টির বাবা মাও বেশ অবাক হলো দিহান কিছু বলার আগেই মিষ্টি কঠিন করে বললো,
—আমি কারো দয়া চাই না।
আবির মিষ্টির দিকে না তাকিয়ে দিহানের চোখে চোখ রেখে বলল,
—আপনারা এটা কে দয়া বা করুণা মনে করবেন না, অনেক কিছুই আমরা ভেবে চিনতে সিদ্ধান্ত নিয়ে সময় নিয়ে শুরু করি আবার কিছু জিনিস হুট করেই হয়। আমি নিজেও জানিনা আমার এরকম সিদ্ধান্তের কারণ কি,একটু আগেই মায়া আমাকে বলছিলো অনেক ভালোবাসা থেকে দায়িত্ববোধ জন্মায় আর কিছু কিছু দায়িত্ববোধ এমন মায়া তৈরি করে যা ভালোবাসার অনেক উর্ধ্বে। ছেলে হিসেবে বা পরিবার হিসেবে কোনো দিক দিয়েই মনে হয় না আমি মিষ্টির অযোগ্য হবো। বাকিটা আপনারা বিবেচনা করে দেখতে পারেন।
মিষ্টির বাবা আবিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোমার পরিবার?
—আমার সিদ্ধান্তই আমার পরিবারের সিদ্ধান্ত। মিষ্টির বাবা একটু থেমে বলল,
—আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না যা দিহান ভালো বোঝে।
দিহান আবিরের চোখে তাকিয়ে বলল,
—তুমি কি আজ রাতে বিয়ে টা করতে পারবে আবির?
—হ্যা পারবো,আপনি আজ রাতের মধ্যে চাইলে আমার সম্পর্কে খোজ নিয়ে জেনে নিতে পারেন আমার ব্যাকগ্রাউন্ড।
—আমার কিছু জানবার নেই জেনে বুঝে তো অনেকে অনেক কিছু করলো। তোমার মধ্যে লয়ালিটি আছে এন্ড দ্যাটস এনাফ,
মিষ্টি দিহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—ভাইয়া!
দিহান মিষ্টির মাথায় হাত রেখে বলল,
—ভাইয়ার ওপর বিশ্বাস আছে না?
মিষ্টি আর কিছু বলল না সেদিন রাতে গায়ে হলুদের কাপড়েই মিষ্টির বিয়ে আবিরের সাথে হয়ে গেলো।

চলবে….
সামিয়া খান মায়া

#হঠাৎ_হাওয়া (৫)

হিমালয় আর আবির পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, হিমালয় সবসময় আবিরকে সাপোর্ট করেছে সবটা ক্ষেত্রে হিমালয় কে কিছু না বলতে দেখে আবির একটা সিগারেট জ্বালালো,লম্বা একটা টান দিয়ে আকাশে ধোয়া ছেড়ে বলল,
—কিছু বলবি?
—বুঝতে পারছি না, মানে তুই বিয়ে করে ফেলেছিস তুই!
—বিশ্বাস হচ্ছে না তাইনা?অথচ আমার পক্ষের সাক্ষী তুই।
—হচ্ছে,
তারপর কিছুক্ষন দুজনেই চুপচাপ থাকার পর হিমালয় বলল,
—তুই সবটা মানিয়ে নিতে পারবি,সবটা ভুলে নতুন করে শুরু করতে?
—সিগারেট খাবি?
—কথা চেঞ্জ করিস না, তুই জানিস আমি এসব খাই না।
—তুই তো আমাকে আমার চেয়ে বেশি চিনিস তুই বল পারব কি না?
হিমালয় চুপ করে থেকে বলে উঠলো
—আমি জানি তুই পারবি।চল মিষ্টির কাছে যাবি।

প্রায় মাঝরাত দিহান ওদের রিসোর্টের সামনে একটা বেঞ্চে বসে আছে। পাশে মিষ্টি নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে দিহানের খুবই কষ্ট হচ্ছে মিষ্টির কষ্ট ও কিছুতেই সহ্য করতে পারে না।কিছুক্ষণ বাদে মায়া,হিমালয় আর ওর বন্ধুরা সবাই ওদের কাছে এলো আবির মিষ্টির কাছে গিয়ে ওর সামনে আবিরের ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
—আমার আব্বু তোমার সাথে কথা বলতে চায় তুমি কি একটু কথা বলবে?
মিষ্টি হাত বাড়িয়ে ফোন টা নিয়ে কানের কাছে ধরলো কান্না সামলে বলল,
—হ্যালো
ওপাশ থেকে আবিরের আব্বু বলল,
—কি কারণে কি হয়েছে আমি কোনোদিন জানতে চাইবো না, আমার একটাই ছেলে ওর জীবনেও দূর্ঘটনা ছিল, আমার মা বেচে নেই এতই হতভাগ্য ভেবেছিলাম একটা মেয়ে হলে তাকে মা ডাকবো তা বাদ দিয়ে ওই গাধার বাচ্চাটা জন্ম নিলো,
মিষ্টি হেসে ফেললো সাহস নিয়ে বলল,
—গাধা টা তবে কে?
এপাশ থেকে সবাই মিষ্টির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে,আবিরের বাবা বলল,
—আমার মা তো খুব কথা জানে,তুই হবি আমার মা?
মিষ্টি এবার কেদে ফেললো
—উহু কান্নাকাটি করা যাবে না চোখ মুছে ফেলো সময় নাও তারপর তোমার বাড়ি ফিরে এসো আমি আমার মায়ের জন্য অপেক্ষায় থাকবো।
কল কেটে মিষ্টি মাথা নিচু করে রইলো,ধ্রুব একটু রসিকতা করতে বলল,
—পরিবেশ দূষণ হচ্ছে এত মানুষের কার্বন ডাই অক্সাইডে তোমরা সবাই একটু জায়গা টা খালি করে দাও আবির আর মিষ্টি একটু অক্সিজেন নিক।
দিহান কিছু না বলে আস্তে উঠে দাড়ালো সবকিছু এমন একটা পরিবেশ তৈরি করেছে যে আসলেই বিব্রতকর।দিহান আবিরের সামনে দাড়িয়ে বলল,
—আমি জানি না ঠিক করেছি না ভুল প্লিজ আমাকে ভুল প্রমাণ করে দিও না, ছোট থেকে ওকে কক্ষনো কোনো কষ্ট দেই নি ওর কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না।
হিমালয় এবার এগিয়ে দিহানের কাধে এক হাত রেখে বলল,
—ও জীবনে এত বড় কষ্ট পেয়েছে যে আর কাউকে কষ্ট দেওয়ার ক্ষমতা ওর নেই।
কথা এগিয়ে গিয়ে বলল,
—চলো আমরা বরং ভেতরের দিকে গিয়ে কথা বলি।

দিহানের সাথে এতক্ষণ সবাই ভাব জমিয়ে ফেলেছে, কথায় কথায় জানা গেলো পুষ্প আর দিহান দুজনেই উত্তরা ৯ নং সেক্টরে থাকে অথচ পরিচিত হলো এখানে এসে। নিরব আড়চোখে দেখছে পুষ্প ওর দিকে একবারো তাকাচ্ছে না মেয়েটা খুব জেদী।সবাই কথা বলছে শুধু মায়া চুপচাপ, একফাকে মায়া উঠে পাহাড়ের কিনারে গিয়ে দাড়ালো ওর দৃষ্টি বহুদূরে ভাবনা এলোমেলো, ওর খুবই কান্না পাচ্ছে।হিমালয় মায়ার পাশে গিয়ে দাড়ালো, মায়ার বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করছে, হিমালয় আশেপাশে থাকলেই ওর এরকম লাগে কেমন জানি হিমালয়ের সামনে ওর কষ্টগুলো ঝেড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে।
—এখানে কি করো
—দাঁড়িয়ে আছি
—ও আচ্ছা আমি তো দেখতেই পাই নি দাড়িয়ে আছো।
মায়া চুপ করে রইলো, হিমালয় মায়ার দিকে তাকালো,তারপর বলল,
—তোমার হাতটা দাও তো
মায়া ঘাড় ঘুরিয়ে হিমালয়ের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো,
হিমালয় মায়ার হাত ওর হাতের মধ্যে নিয়ে দেখলো খুবই ঠান্ডা, হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,
—কোনো সমস্যা?টেনশন করছ কেন?
মায়া জোড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—টেনশন করছি না, ভাবছি।
—ও আচ্ছা, টেনশন করছ না ভাবছো খুবই ভালো।
—আপনি কি ডাক্তার?
—কেন বলো তো?
—না তখন দেখলাম মিষ্টির ভাইকে কি যেন সাজেস্ট করছিলেন মিষ্টি সেন্সলেস হয়ে গেছে বলে, যদিও তখন স্পষ্ট শুনিনি।
হিমালয় হালকা হেসে বললো,
—আমরা ছয় জনই ডাক্তার একই মেডিকেল কলেজ থেকে গতবছর পাশ করেছি।
মায়া অবাক হয়ে হিমালয়ের দিকে তাকালো, তারপর বিস্ময় নিয়ে পেছনে ঘুরে আড্ডায় মশগুল হিমালয়ের বন্ধুদের দিকে তাকালো
হিমালয় হাসিমুখে বলল,
—এত অবাক হচ্ছ কেন! কোনোদিন ডাক্তার দেখো নি?
মায়া আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
—আমি কাল থেকে এতগুলো ডাক্তারের সাথে আছি!
—তুমি এমন ভাবে বলছ যেন তুমি খুনীদের সাথে আছো!
মায়া মুখ ফিরিয়ে খুশি খুশি ভাব নিয়ে বললো
—যাক সারাজীবনে আর চিকিৎসার জন্য কোনো খরচ করতে হবে না।
হিমালয় অদ্ভুত ভাবে মায়ার দিকে তাকিয়ে রইলো এই মেয়েটার কণ্ঠে অদ্ভুত মাদকতা আছে, হিমালয় প্রতিবার চুম্বকের মত মেয়েটার দিকে আকর্ষিত হয়, এই মেয়েটার সঙ্গ পেতে ওর ভালোলাগে মেয়েটার বাচ্চা স্বভাব মেয়েটার গুরুগম্ভীর কথা সব হিমালয়ের ভালো লাগে!

মিষ্টি কাচা হলুদ রঙের জামদানী পড়েছিল চিকন সবুজ পার, ম্যাচিং ব্লাউজ, হাত ভর্তি সোনার চুড়ি,কানে ছোট্ট সোনার দুল ব্যাস এটুকুই ওর বিয়ের সাজ! কত্ত দামী শাড়ি কত ভারী গহনা কত্ত সরঞ্জাম বিয়ের জন্য কত্ত প্লান অথচ ওর বিয়েটা নাকি এভাবে হলো! নিজের জন্যেই ওর মুখে এক টুকরো তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো, শাড়ির আচল ঘাড়ের উপর তুলল একটু কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। আবির পাশে বসা মেয়েটাকে এবার চেয়ে দেখলো,
—তোমার কি ঠান্ডা লাগছে?
মিষ্টি মাথা নিচু করে বসে রইলো, এমনিতে আবির রগচটা খুব অথচ একটা মেয়ে সমানে ওকে ইগনোর করছে আর ওর রাগ হচ্ছে না অদ্ভুত!
—মিষ্টি আমি তোমার সাথে কথা বলছি
—বলুন, আমি শুনছি
—তোমার কি ঠান্ডা লাগছে?
মিষ্টি খুব কান্না পেয়ে গেলো গলায় কান্না আটকে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—না।
—ঘরে যেতে চাও?
—আমি আপনার বাসায় যেতে চাই
—তুমি আমার বাসায়ই যাবে, আমরা এখানে ৪ দিনের প্লান করে এসেছিলাম আজ সকালেই এলাম, আমি যদি কাল চলে যেতে চাই ওদেরও ফিরে যেতে হবে।
—বেশ তাহলে চারদিন পরই যাবো।
—ধন্যবাদ
মিষ্টি শব্দ করে হেসেই কেদে ফেললো তারপর বললো
—আপনাকে ধন্যবাদ আমার পরিবারের সম্মান বাচানোর জন্য আমাকে দয়া করার জন্য।
আবির মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল
—আমি কাউকে দয়া করি নি
—তাহলে কি করেছেন? একপলক দেখেই নিশ্চয়ই আপনি আমাকে ভালোবেসে ফেলেন নি।
—না।এমনকি আমি আর কোনোদিন কাউকে ভালোবাসতেও পারব না।
—তাহলে?
—আমি জানিনা।
—বেশ কোনোদিন জানলে অবশ্যই আমাকে জানাবেন।
—আমি জানি অল্প কিছু সময়ে তোমার পুরো পৃথিবীটাই পালটে গেছে স্পব মেনে নিতে তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে
—অদ্ভুত! আপনার সব মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে না!
—না আমার আর কষ্ট হয় না।
মিষ্টি এবার আবিরের দিকে তাকালো ওর পাশে বসে থাকা লোকটি এখন ওর স্বামী দেখতে নিঃসন্দেহে সুপুরুষ,ব্যাক্তিত্বও অসাধারণ লোকটির! অথচ তার চারপাশে অদৃশ্য দেয়াল সে তুলে রেখেছে যা কেউ অতিক্রম করতে পারে না!আবির পরিবেশ হালকা করতে রসিকতার সুরে বললো
—এভাবে তাকিয়ে থেকো না প্রেমে পড়ে যাবে।
মিষ্টি চোখ ফিরিয়ে নিলো না দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে তাকিয়ে রইলো।

চলবে….
সামিয়া খান মায়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here