হঠাৎ হাওয়া,পর্বঃ১৫,১৬

হঠাৎ হাওয়া,পর্বঃ১৫,১৬
সুমনা ইসলাম
পর্বঃ১৫

রাত বারোটা নাগাদ রুমে ফিরে এল নিরু আর ফারহান। নিরু তো আসতেই চাইছিলো না। ফারহান জোর করে নিয়ে এসেছে। প্রায় দুই ঘন্টা ভিজেছে তারা। বেশ লম্বা সময়। রাতেই না জানি জ্বর এসে পড়ে আবার।

নিরু জামা-কাপড় পাল্টে ফারহানকে জামা-কাপড় পাল্টাতে বলে বারান্দায় চলে আসলো। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে বারান্দার এক কোণে মেলে দিল। দোলনায় বসে বৃষ্টি দেখছে। এখনো পুরোদমে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। থামা-থামির নাম নেই। মাঝেমাঝে ঝড়ো হাওয়ায় বৃষ্টির ছিঁটা আসছে বারান্দায় তবে নিরুকে স্পর্শ করতে পারছে না৷ সে তুলনামূলক ভাবে একটু দূরেই বসেছে।

নিরু বৃষ্টি দেখছে আর ভাবছে, এতটা সুখও তার ভাগ্যে লেখা ছিল! ফারহানের সংস্পর্শে থাকলে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটা বোধহয় সে। মানুষটা কত্ত ভালোবাসে তাকে। দেখতে দেখতে সে নিজেও কতটা ভালোবেসে ফেলেছে টেরই পায়নি। ফারহান পাশে না থাকলেই সব শূন্য শূন্য লাগে। মনে হয় সে কতটা একা। অথচ যখন ফারহান পাশে থাকে তখন মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত সুখ তার কাছে এসে ধরা দিয়েছে। ভালোবাসা কী অদ্ভুত! আজ থেকে আড়াই মাস আগেও তার জীবনে ফারহানের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। জানতো না মানুষটাই তার জীবনসঙ্গী হবে। তাকে এতটা ভালোবাসবে।

ফারহান জামা-কাপড় পাল্টে সোজা বারান্দায় আসলো। তার পরনে ছাই রঙা টিশার্ট আর কালো ট্রাউজার। চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। হয়তো মাথা না মুছেই বেরিয়ে পড়েছে। ফারহান নিরুকে একদৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তার পাশে গিয়ে বসলো। নিরুর চুল বেয়েও পানি পড়ছে। চুলের পানিতে ব্লাউজ ভিজে একাকার। ফারহান দড়ি থেকে টাওয়াল নিয়ে নিরুর মাথা মুছে দিতে দিতে বললো, “চুলটাও ঠিক মতো মুছতে পারো না। এই চুলের পানিতেই তো ঠান্ডা লেগে যাবে। একদম নিজের খেয়াল রাখো না। যখন আমি থাকবো না তখন কে রাখবে তোমার খেয়াল?”

নিরুর শেষের কথাগুলো শুনে চোখ পাকিয়ে তাকালো ফারহানের দিকে। ফারহান বুঝতে পেরে একটু মেকি হেসে বললো, “আরে আমি তো কথার কথা বলছিলাম। এত রাগ করে না বউ। সরি। আর হবে না।”

নিরু কিছু না বলে গোমড়া মুখে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলো।

ফারহান ওর মুখ নিজের দিকে ঘুরিয়ে বললো, “সরি বললাম তো। আবারো সরি। প্লিজ একটু হাসো। এভাবে মুখ গোমড়া করলে তো তোমাকে একদম টমেটো টমেটো লাগে।”

নিরু কিছু না বলে ফারহানের হাত থেকে তোয়ালে নিয়ে ওর মাথা মুছে দিতে দিতে বললো, “নিজেও তো ঠিকমতো চুল মুছো না আবার আমাকে বলো। চুলে এখনো পানি কেন?”

“আরে চুল মুছতে ভালো লাগে না। এই ছোট ছোট ক’টা চুল এমনিতেই শুকিয়ে যাবে।”

“এখানে ক’টা চুল? আমার চেয়ে তো তোমার চুলই বেশি ঘন। আর বেশ বড়ও হয়েছে। চুল কাটাচ্ছো না কেন?”

“সময় করে উঠতে পারছি না। অফিসের ভীষণ চাপ। সামনের শুক্রবারে সময় করে কাটিয়ে নেব।”

নিরু তোয়ালেটা আবারো মেলে দিয়ে বললো, “চলো ঘুমাবো। ঘুম পাচ্ছে প্রচুর।”

ফারহানও বারান্দার দরজাটা আটকে নিরুর সাথে রুমে চলে আসলো। তারও ঘুম পাচ্ছে। দীর্ঘসময় বৃষ্টিতে ভেজার কারণে চোখ কেমন ভার ভার লাগছে। একটু জ্বলছেও।

_________________

সূর্যের আলো চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল ফারহানের। জানালা দিয়ে সূর্যের রশ্মি সরাসরি তার মুখের উপরেই পড়েছে। রাতে জানালা বন্ধ করতে মনেই ছিল না। সারারাত বৃষ্টি শেষে ঝলমল করছে প্রকৃতি। গাছের পাতায় পানির ফোঁটা ছাড়া বৃষ্টির আর কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট নেই। বেশ বেলা হয়ে গেছে।

ফারহান চোখ ডলে উঠে বসতে চাইলো। কিন্তু পারলো না। নিরু তার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। চেহারা দেখা যাচ্ছে না। খোলা চুলে মুখ ঢেকে আছে। এ কারণেই রোদ তার চোখে-মুখে পড়েনি। নাহলে এতক্ষণে ঘুম ভেঙে যেত।

ফারহান আলতো হাতে চুলোগুলো সরিয়ে দিল। এলোমেলো হয়ে যাওয়া শাড়ি ঠিক করে দিল। অতি যত্নে নিরুকে পাশের বালিশে শুইয়ে দিয়ে উঠে পড়লো। ফ্রেশ হয়ে এসে তারপর নিরুকে ডাকবে। মেয়েটা ততক্ষণ ঘুমাক।

ফারহান ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে দেখলো নিরু পিটপিট করে চোখ খুলছে। ঘুমের রেশ এখনো কাটেনি। তার মধ্যে এত আলোতে ঠিকমতো চোখ খুলতে পারছে না। ফারহান গিয়ে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো।

নিরু ততক্ষণে উঠে বসেছে। হাই তুলতে তুলতে বললো, “তুমি ওখানে কী করছো?”

ফারহান এবার সরে এসে বললো, “তুমি আলোতে চোখ খুলতে পারছিলে না তাই ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।”

নিরু কিছু না বলে হাসলো। সবদিকেই তার কত খেয়াল।

ফারহান আয়নার সামনে গিয়ে চুল ঠিক করতে করতে আদুরে স্বরে বললো, “ঘুম কেটেছে নিরুপাখি?”

নিরু মাথা নাড়িয়ে বললো, “হু, কয়টা বাজে?”

“সাড়ে আটটা।”

নিরু অবাক চোখে তাকিয়ে বললো, “সাড়ে আটটা! এত বেলা হয়ে গেল আমি টেরই পেলাম না? নাস্তা বানাতে হবে। ভার্সিটিতে যেতে হবে। দেরি হয়ে যাবে আবার।” বলেই নিরু তাড়াহুড়ো করে ওয়াশরুমে চলে গেল।

ফারহান নিরুর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো।

নিরু ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে চুলগুলো হাত খোঁপা করতে করতে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। ফারহান পেছন থেকে চেঁচিয়ে বললো, “এখন তাড়াহুড়ো করে নাস্তা বানাতে হবে না তোমার। আমি উঠেই মোড়ের রেস্টুরেন্টের মন্টুকে বলে দিয়েছি নাস্তা দিয়ে যেতে। ও নিয়ে আসবে।”

নিরু পুনরায় ফেরত এসে বললো, “কখন?”

“এইতো এখনি চলে আসবে।”

ওদের কথার মাঝেই কলিংবেল বেজে উঠলো। ফারহান উঠে বললো, “তুমি থাকো। আমি দেখছি।”

ফারহান আর নিরু মা-বাবার সাথে বসে নাস্তা করে দুজনেই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়লো। আজকে নিরুর আবার একটা ক্লাস টেস্ট আছে। দেরি হয়ে গেলেই সর্বনাশ।

নিরু ভার্সিটিতে যেতে যেতে পাঁচ মিনিট দেরি করে ফেলল। এত তাড়াতাড়ি কী সব হয় না-কি? তবুও ভাগ্য ভালো এখনো স্যার আসেননি।

নিরু স্বস্তির শ্বাস ফেলে দৃষ্টির পাশে গিয়ে বসলো। বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে তাদের। নিধির পরে হয়তো এই একজনই যে নিরুর সবচেয়ে কাছের বান্ধবী। দুজনে সবসময় একসাথেই বসে।

নিরুর দেরি হয়েছে দেখে দৃষ্টি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, “এত দেরি করলি কেন?”

নিরু ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করতে করতে বললো, “এত দেরি কোথায়? মাত্র পাঁচ মিনিট।”

“স্যার এসে গেলে এই পাঁচ মিনিটই তোর কাল হতো।”

“আসেনি বলেই একটু রিল্যাক্স মুডে আছি। নাহলে আজকে আর ক্লাসে ঢোকা হতো না। বাইরেই কাটিয়ে দিতে হতো। ওই স্যারটা এত কড়া কেন রে?”

দৃষ্টি কাঁধ উঁচিয়ে ঠোঁট উল্টালো। তার জানা নেই এই প্রশ্নের উত্তর। কী করেই বা জানবে?

ওরা কথা বলতে বলতেই স্যার ক্লাসে চলে আসলো। নিরু ফিসফিস করে বললো, “এখন আর কথা বলিস না কিন্তু। স্যার দেখলে বারোটা বাজবে।”

দৃষ্টিও বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ালো।

_________________

আজ একটু তাড়াতাড়িই বাসায় ফিরেছে নিরু। দুপুরের খাবার খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। তবে ঘুমাবে না। নিধির সাথে কথা বলবে ভাবছে। মেয়েটা কেমন আছে কে জানে। ওর বারবার মনে হয় নিধি হয়তো সুখে নেই, খুশি নেই। ওর চোখের চাহনিই ওর ভেতরের সুপ্ত কষ্টটার জানান দেয় বারংবার।

প্রথম দু’বার রিং হয়ে কেটে গেল। তিনবারের বেলায় কল রিসিভ করলো নিধি।

নিরু প্রশ্ন করলো, “কল ধরছিলিস না কেন?”

“ওয়াশরুমে ছিলাম। কেমন আছিস?”

“এইতো ভালো। তুই কেমন আছিস?”

“ভালো।”

নিরু সন্দিহান কণ্ঠে বললো, “আসলেই কী ভালো আছিস?”

নিধি চটপট উত্তর দিল, “হুম।”

নিরু আগের মতোই বললো, “তাহলে তোকে দেখে আমার মনে হয়েছিল কেন তুই ভালো নেই?”

নিধি ফুপিয়ে উঠলো এবার। ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার। নিরুর কাছ থেকে লুকাতে পারছে না। ছোটবেলা থেকেই পারে না। দু’দিন আগে না-হয় পরে বলেই দেয়। তবে এবার বলতেও পারছে না আবার লুকিয়েও রাখতে পারছে না।

নিরু বিচলিত হয়ে বললো, “এই নিধি, কী হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন? বল আমাকে।”

নিধি কিছু না বলে চুপ করে রইলো।

নিরু আবারো বললো, “বলবি না আমায় কী হয়েছে?”

নিধি আর এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। একটু শব্দ করে কেঁদে ফেললো। পরমুহূর্তেই কান্নাটাকে দমানোর চেষ্টা করে বললো, “কেন আমার সাথে এমন হলো নিরু?”

নিরু উদ্বিগ্ন হয়ে বললো, “কী হয়েছে নিধি? সিয়াম ভাইয়া কিছু করেছে?”

“ও ভালোবাসে না আমায়। ভালোবাসে না।”

“মানে? তাহলে তোরা পালিয়ে কেন গেলি? বিয়ে কেন করলি?”

“সবটাই ওর নাটক ছিল। ও আমাকে কখনোই ভালোবাসেনি। ও তোকে চায়।”

“কী বলছিস তুই এসব?”

“ঠিকই বলছি আমি। ও তোকে পছন্দ করতো। মাঝখান থেকে অজান্তেই আমি বাঁধা হয়ে দাঁড়াই। তার শাস্তিই তো ভোগ করছি এখন।”

“ডিভোর্স কেন দিচ্ছিস না? এখনো চুপ করে আছিস কেন?”

“পালিয়ে যাওয়াতে তো বাবা-মায়ের কম মান যায়নি। এখন ডিভোর্স নিয়ে কোন মুখে দাঁড়াবো আমি তাদের সামনে? সমাজের লোক তো এমনিতেও কটু কথা শোনাতে ছাড়ে না। এরপরে কী হবে?”

“তুই নিজের কথা না ভেবে সমাজের লোকেদের কথা ভাবছিস? তাদের কথা ভাবলে কখনো নিজে শান্তি পাবি না।”

নিধি নিচুস্বরে বললো, “সিয়ামকে ভালোবাসি আমি।”

“তুই এখনো ওই লোকটাকে ভালোবাসিস? কীভাবে পারিস নিধি? কীভাবে?”

“মানুষটা খারাপ তবে আমার ভালোবাসাটা তো মিথ্যা নয়।”

“তাহলে কী করবি এখন?”

“আমি আমার সবটা দিয়ে চেষ্টা করবো তাকে ফিরিয়ে আনতে। তবুও যদি না হয় তাহলে পরেরটা পরে দেখা যাবে।”

“আমার মনে হচ্ছে তুই ঠিক করছিস না নিধি। সে তোর জন্য ভালো নয়। যেকোনো সময় তোর কোনো ক্ষতি করে দিতে পারে। আর তার খারাপ দিকগুলো জেনেও কী করে এই কথাগুলো বলছিস?”

“জানি না আমি। আমি ওকে ঘৃণা করতে চাই। তবে পারি না। রাখছি এখন। ও একটু বাইরে গেছে। এক্ষুনি এসে পড়বে বোধহয়।”

নিরু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কল কেটে দিল। সামনে কী হবে কে জানে। সত্যিকারের ভালোবাসা গুলো বোধহয় এমনি হয়।

চলবে__??

হঠাৎ হাওয়া
সুমনা ইসলাম
পর্বঃ১৬

রাত আটটা বাজে। নিরু পড়ার টেবিলে বসে আছে। বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে ঠিকই তবে পড়া মাথায় ঢুকছে না কিছুতেই। শত চেষ্টা করেও মন বসাতে পারছে না। নিধির জন্য চিন্তা হচ্ছে তার। মেয়েটা কেন এমন করছে? কেন বেরিয়ে আসছে না সম্পর্কটা থেকে? ফারহানও এখনো আসছে না। কল করে অবশ্য বলেছে রাস্তায় আছে। তবুও নিরুর ধৈর্যে কুলোচ্ছে না। মনে হচ্ছে কখন ফারহান আসবে আর কখন ওকে সবটা বলবে। যদি ফারহান কোনো সমাধান দিতে পারে এই ভেবেই বলার জন্য এত উশখুশ করছে। যদিও এটা সম্পূর্ণই নিধির ব্যক্তিগত ব্যাপার তবুও বান্ধবী তো। কীভাবে তার খারাপ পরিস্থিতি সহ্য করতে পারবে নিরু?

মিনিট দশেক বাদেই ফারহান চলে এলো। ফ্রেশ হয়ে এসে নিরুকে এমন মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখে চিন্তিত স্বরে প্রশ্ন করলো, “কী হয়েছে নিরু? তোমাকে এমন মনমরা দেখাচ্ছে কেন? কিছু হয়েছে?”

নিরু এতটাই মনমরা ছিল যে ফারহানের কথা শুনে খানিকটা চমকে উঠেছে। একটু সময় নিয়ে ধাতস্থ হয়ে বললো, “তোমাকে কিছু বলার আছে।”

ফারহান বিছানায় বসে নিরুকে ওর পাশে বসতে ইশারা করে বললো, “হুম, বলো।”

নিধির সাথে হওয়া সব কথাই নিরু ফারহানকে বিস্তারিত ভাবে বললো।

ফারহান সব শুনে কিছুটা থম মেরে রইলো। সিয়াম যে জেদ ধরে আছে এটা বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না তার। ফারহান নিরুর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো, “সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত কেউ আলাদা করতে পারবে না আমাদের। কখনো না। সম্পর্কে যতই ঝামেলা আসুক না কেন যতই ভুল বুঝাবুঝি হোক না কেন আমরা কখনো একে অপরকে ছাড়বো না। একজন ঝগড়া করলে অপরজন শান্ত থাকবো। কখনো অভিমান বাড়তে না। অভিমান বাড়িয়ে রাগের কারণ সৃষ্টি করবো না। সারাজীবন একে অপরকে ভালোবেসে যাব।”

নিরু ফারহানকে আলতো স্পর্শে জড়িয়ে ধরলো।

ফারহানও নিরুকে জড়িয়ে ধরে বললো, “কিন্তু নিধি কেন এখনো সম্পর্কটায় আটকে আছে? ডিভোর্স কেন দিচ্ছে না?”

“ও ডিভোর্স দিতে চাইছে না। ওই লোকটাকে বোঝাতে চাইছে কিন্তু কীভাবে সম্ভব সেটা। আমি তো আর ওর বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু বলতে পারি না।”

“এটা ওদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।”

নিরু ফারহানকে ছেড়ে বললো, “তবুও। নিধির জন্য টেনশন হচ্ছে আমার।”

“আমার মনে হয় আমাদেরও সিয়াম ভাইকে বোঝানো উচিত।”

“কীভাবে বোঝাবো আমরা? ওই লোকটা শুনবে আমাদের কথা? ওনার মাথায় জেদ চেপে আছে। পরিস্থিতির কথা চিন্তা না করে জেদ ধরে আছে। এটা ভাবছে না যে আমি বিবাহিতা আমার স্বামী আছ। তারও একটা বউ আছে। ওনার মতিগতিই বুঝতে পারছি না আমি। কী চাইছেন টা কী উনি?”

“সেটা জানতেই আমাদের তার সাথে কথা বলা উচিত৷ নিধির জন্য এটা আরো ভালো হবে যদি আমরা তাকে বোঝাতে সক্ষম হই।”

“কীভাবে কথা বলবো? দেখা করে না-কি ফোনে?”

“সামনা-সামনি কথা বলাটাই সবচেয়ে বেটার হবে। ফোনে সব বলা যায় না।”

নিরু উঠে বললো, “আচ্ছা, এসব কথা আবার পরে হবে। আসতে না আসতেই চিন্তায় ফেলে দিয়েছি। চলো আগে খেয়ে নেবে। বাবা-মায়েরও নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে।”

ফারহান ভ্রু কুঁচকে বললো, “খেয়ে নেবে মানে? তুমি খাবে না?”

“খেতে ইচ্ছে করছে না।”

ফারহান চোখ গরম করে বললো, “ইচ্ছে না করলেও খেতে হবে।”

নিরু আর প্রতিত্তোরে কিছু বলতে পারলো না। কখন না জানি ফারহান এক ধমক মেরে দেয়।

_____________

ডিনার করে এসে ফারহান অফিসের কিছু কাজ নিয়ে বসলো আর নিরু পড়ার টেবিলে। সন্ধ্যা থেকে একটুও পড়া হয়নি। এখন যদি একটু মাথায় ঢুকে।

ফারহান কাজ শেষ করে দেখলো নিরু পড়তে পড়তে টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। মাথাটা আরেকটু সরলেই পড়ে যাবে। ফারহান দ্রুত গিয়ে নিরুকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল। আরেকটু দেরি হলে হয়তো পড়েই যেত।

ফারহান বেডসাইড টেবিল থেকে পানি খেয়ে নিজেও ওর পাশে শুয়ে পড়লো। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নিরুর মুখের দিকে। ঘুমিয়েছে তবুও কপালে ভাজ পড়ে আছে। হয়তো আবারো কিছু নিয়ে ভাবছিল আর ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছে।

ফারহান নিঃশ্বব্দে হেসে হাত দিয়ে নিরুর কপালের ভাজ সোজা করে দিল। নিরু একটু নড়েচড়ে উঠে ফারহানের হাত জড়িয়ে আবারো ঘুমিয়ে পড়লো। ফারহান এখনো নিরুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে সে-ও ঘুমিয়ে পড়লো।

_____________________

প্রতিদিনকার মতো আজও ফারহানের সাথে ভার্সিটিতে গিয়েছিল নিরু। ক্লাস শেষ হতেই যথাসময়ে আবার ফিরেও এসেছে। ফারহানের সাথে ফোনে কথা হয়েছে একবার। রায়হান সাহেব বাড়িতে নেই। বাড়ির পাশের চায়ের দোকানে গেছেন। আর মিসেস মুক্তা ঘরে শুয়ে আছেন। সকালে সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে বেকায়দায় পা ফেলায় ব্যথা পেয়েছে অনেকখানি। নিরু এতক্ষণ তার কাছেই ছিল। উনিই একটু আগে জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছেন একটু রেস্ট নেওয়ার জন্য। ভার্সিটি থেকে এসে নিশ্চয়ই ক্লান্ত হয়ে গেছে।

নিরু বারান্দায় বসে আজকেও নিধিকে কল করলো। আজ প্রথমবারেই রিসিভ করলো নিধি। কুশলাদি বিনিময় করে নিরু বললো, “তুই আবারো ভেবে দেখ নিধি। এখনো সময় আছে কিন্তু।”

ওপাশ থেকে নিধির রুগ্ন স্বর ভেসে এল, “আমি প্রেগন্যান্ট।”

নিরু বিস্ময় নিয়ে বললো, “কী? ঠিক বলছিস তো তুই? মানে সিউর তো?”

“আমি ঠিকই বলছি। আমি সিয়ামের বাচ্চার মা হতে চলেছি। এখন ডিভোর্স দিলে আমার বাচ্চার ভবিষ্যৎ জীবনটা কী সুখের হবে?”

“আগের যুগের মানুষের মতো কতা বলিস না নিধি। ডিভোর্স হলেই যে বাচ্চা মানুষ করতে পারবি না এমন তো নয়।”

নিধি কিছু না বলে চুপ করে রইলো।

খানিকক্ষণ বাদে নিরু নিজের রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করে বললো, “সরি রে। একটু রাগ উঠে গিয়েছিল। ডিভোর্স দেওয়া না দেওয়া তোর ব্যাপার। তবে খুশির খবর তো পেলাম। খালামণি হতে যাচ্ছি আমি। ভাইয়াকে জানিয়েছিস?”

“উঁহু। আমি দু’দিন আগে জানলাম। এখনো জানানোর সাহস হয়নি। যদি রেগে যায়?”

“রেগে যাবে কেন? বাবা হবে শুনে কেউ রাগ করতে পারে? হতেই তো পারে এই খবর শুনেই তোদের সব ঝামেলা মিটে গেল। সব ঠিক হয়ে গেল। দেরি না করে বলে ফেল।”

“ও আমাদের বাড়ি থেকে আসার পর থেকে আগের মতো অতটাও খারাপ ব্যবহার করে না। তবে কোনো কারণে রাগ উঠে গেলে ভাঙচুর করে প্রচুর।”

“তুই তো তোর সিদ্ধান্তেই অটল। দেখিস আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“হুম।”

নিরু কল কেটে এবার ফারহানকে কল করলো। সিয়ামকে কিছু বলার আগেই ফারহানকে মানা করতে হবে। না-হয় সিয়াম যদি জানে যে নিধি ওকে সবকিছু বলে দিয়েছে তাহলে হিতে বিপরিত হতে পারে। তখন আবার আরেক ঝামেলা। তারচেয়ে কিছুদিন বরং আগের মতোই চলুক। ক’টা দিন যাক তারপরে দেখা যাবে কী হয়।

নিরু ফারহানকে সব কথা বুঝিয়ে বলতেই ফারহানও সায় জানালো। আর আরেকটা খুশির খবর দিল যে তারা দুই দিন পর বান্দরবান ঘুরতে যাবে। ফারহান ছুটি নিয়েছে দুই দিন পরে থেকে। নিরু তো মহাখুশি। কত্তদিন পর দূরে কোথাও ঘুরতে যাবে। ভাবতেই আনন্দ উপচে পড়ছে।

_____________

নিরুর গোছগাছ করতে ব্যস্ত। পুরো ট্রলি ভর্তি শুধু জামা-কাপড়ে ঠাঁসা। ফারহান বসে বসে নিরুর কাজকর্ম দেখছে। আজ বৃহস্পতিবার। আগামীকাল তারা ঘুরতে যাবে। সন্ধ্যা থেকেই নিরু জামা-কাপড় গোছানো শুরু করে দিয়েছে। কোন শাড়ি ছেড়ে কোন শাড়ি নেবে তাই বুঝতে পারছে না। ফারহান একবার সিলেক্ট করে দিতে গিয়েছিল তবে তার এত কম জামা-কাপড় সিলেক্ট করা নিরুর পছন্দ হলো না৷ একটু চোখ পাকিয়ে তাকাতেই ফারহান আবারো চুপচাপ বসে আছে। কিছুই বলবে না সে। লোকের ভালো করতে নেই। ভালো করতে গেলে উল্টো ঝারি খেতে হয়।

নিরু তার মনমতো গোছগাছ করে হাফ ছেড়ে বিছানায় এসে বসলো। তাকে দেখে মনে হচ্ছে কত বড় কাজ সে করে ফেলেছে। ফারহানকে চুপ থাকতে দেখে নিরু ভ্রু কুচকে বললো, “কী হলো এমন চুপ করে আছো কেন?”

“ও আমার দিতে তোমার নজর পড়লো তাহলে? এতক্ষণ তো আমাকে পাত্তাই দিচ্ছিলে না। মনে হচ্ছিলো আমার সাথে নয় তুমি তোমার এই ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে একা একাই বান্দরবান চলে যাবে।”

ফারহানের কথায় নিরু শব্দ করে হেসে ফেললো।

ফারহান আঁড়চোখে তাকাতেই নিরু হাসি থামিয়ে বললো, “সেই প্ল্যানই করছিলাম কিন্তু আমি একা গেলে তো তোমার ছুটি নেওয়া বৃথা যাবে তাই তোমার সাথেই যাবো ভাবছি।” কথা শেষে নিরু আবারো হেসে ফেললো।

নিরুকে এত হাসতে দেখে ফারহান এবার ওকে কাতুকুতু দিতে শুরু করলো। নিরু এবার একটু চেঁচিয়ে বললো, “ফারহান থামো বলছি। থামো। আর না। প্লিজ। আমি কিন্তু খাট থেকে পড়ে যাবো এবার। তখন তোমার কোলে চড়ে ঘুরবো। বলতে পারবে না আমার কোমড় ব্যথা করছে।”

ফারহান না থেমে বললো, “তাহলে তো আরো বেশি করে দিতে হবে। কোলে নিয়েই ঘুরবো তোমাকে। তখন আবার তুমি বলো না যে তোমার লজ্জা লাগছে।”

“থামো।”

“উঁহু।”

দু’মিনিট বাদেই দুজনে বিছানায় শুয়ে পড়লো। নিরু এখনো হাসছে। ফারহানও তার সাথে সাথে হাসছে। হাসি যেন মুখ থেকে সরছেই না।

নিরু হাসি থামিয়ে বললো, “আমি যে চিৎকার করলাম। বাবা-মা শুনলে কী ভাববে?”

“কিছুই ভাববে না। কারণ তুমি এতটাও জোরে চিৎকার করোনি যে বাবা-মায়ের রুম অবধি শব্দ যাবে।”

“তাহলে ঠিক আছে।”

“হুম, এখন ঘুমাও তো। সকাল সকাল উঠতে হবে আবার। দেরি হলে কিন্তু বাস মিস।”

“আমার তো ঘুমই আসছে না।”

“চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকো। এসে যাবে।”

নিরু ফারহানের কথামতো চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো। সকালে কিছুতেই দেরি করে উঠতে চায় না সে।

চলবে__??

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here