স্বর্ণাভ_সুখানুভূতি,পর্ব-৭,৮

#স্বর্ণাভ_সুখানুভূতি,পর্ব-৭,৮
আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা

বারান্দার দু’পাশে ফুলের টব সাজানো। মাঝে পাতানো দুটো লবি চেয়ার। সেথায় বসে আছে জাওয়াদ-মুশরাফা। পাশাপাশি, মাঝে এক হাতের দূরত্ব। জাওয়াদের দৃষ্টি মুশরাফার দিকেই স্থির। দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করছে বারংবার, কিন্তু ফলাফল শূন্যের কোঠায়। অবাধ্য চোখজোড়ার অনিমেষ চাহনি প্রেয়সীর পানে। যেন তারা পণ করেছে, বহুল প্রতীক্ষিত সাক্ষাতে প্রেয়সীর থেকে চোখ সরাবে না।

গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেল। আকাশটা স্বচ্ছ নীল। সারি সারি মেঘের ভেলা, মৃদু হাওয়ার পসরা বইছে। ছুঁয়ে দিচ্ছে অরুণ রাঙা পোশাকে আবৃত মেয়েটাকে। মেয়েটার দৃষ্টি আকাশ পানে, এখনো চোখে চোখ পড়েনি। চোখ মুখ স্বাভাবিক, কোন অস্বস্তির আভা নেই। জাওয়াদের তাকিয়ে থাকার মাঝে দৈবাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল মুশরাফা। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল। জাওয়াদের হৃদপিণ্ড লাফিয়ে উঠল। চমকাল, থমকাল।
অথচ মুশরাফা স্বাভাবিক, দ্বিধাহীন। স্থির চোখে সেকেন্ড দশেক সময় নিয়ে জাওয়াদকে পরখ করল। তারপর দৃষ্টি ফিরাল। তাকে একটুও বিচলিত দেখাল না।

মুশরাফার এই অবিচল দৃষ্টিভঙ্গি, বিচলিত করে ফেলল জাওয়াদকে। একদলা অস্বস্তি এসে গা ছুঁলো, হাঁসফাঁস করে উঠল সে। দৃষ্টি সরে গেল। নার্ভাস হয়ে পড়ল। জাওয়াদ খুব করে জানে, এই মুহুর্তে তার কিছু বলা উচিত। আলাপের সূচনা করা উচিত। সে নীতিজ্ঞানকে প্রাধান্য দিয়ে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু স্বর বেরুল না। নিজেকে ভীষণ নার্ভাস অবস্থায় পেল। আশ্চর্য! এত অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে কেন? স্কুল লাইফ থেকে ভার্সিটি লাইফ অবধি হাজারটা মেয়ের সাথে কথা বলেছে। কই কথা বলতে গিয়ে কখনো তো আটকায় নি, জড়তা কাজ করেনি। নির্দ্বিধায়, নিঃসঙ্কোচে অনর্গল কথা বলেছে। কত মেয়ে চোখে চোখে রেখেছে, হাতে হাত রেখেছে, কখনো এতটা দমবন্ধকর অনুভূতি হয় নি। আজ কী হলো হঠাৎ! আকস্মিক এত জড়তা আসছে কোথা থেকে! নিজের উপরই বিরক্ত হলো সে। সরিয়ে নেয়া দৃষ্টি আবার নিবদ্ধ করল পাশসঙ্গীর উপর। মেয়েটা নির্দ্বিধায় তখনো আকাশ দেখছে। বোধহয় তার আলাপ শুরুর অপেক্ষা করছে।
নড়েচড়ে বসল জাওয়াদ। এখন মুখ না খুললেই নয়। নিজেকে ধাতস্থ করল, আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনল। মৃদুশব্দে কাশল। তার কাশিটা যেন মুশরাফাকে বলল, জাওয়াদ আলাপ শুরু করবে, তুমি মনোযোগ দাও। মুশরাফা স্বচ্ছ নীলাকাশ থেকে চোখ ফিরিয়ে টবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।

সাহস সঞ্চার করে জাওয়াদ বলল,
‘কেমন আছো?’

‘আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। ‘ ছোটো করে উত্তর দিল মুশরাফা। তার স্বরে কোমলতা নেই, স্বরটা গম্ভীরতায় ভরা। তবুও মধুর শুনাল জাওয়াদের কানে। মুশরাফা সৌজন্যবোধে তাকে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। খানিকটা অপমানবোধ করলেও প্রখর অনুভূতির কাছে বিশেষ গ্রাহ্যতা পেল না। জাওয়াদ ভাবল, এরপর কী বলা যায়! ভেবে পেল না। কথার ভাণ্ডারে চোখ বুলিয়ে দেখল, শূন্যতা ছেয়ে আছে। নিজেকে ধিক্কার দিল, তোর কথার কারণে মেয়েরা তোর উপর মরতো, সেই তুই কথা হারিয়ে বসে আছিস!
খেই হারিয়ে ফেলল ও। ভাবনায় কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেসা আসছে না। কী জিজ্ঞেস করবে! খানিক ভেবে বলল,
‘তোমার সম্পর্কে কিছু বলো।’

মুশরাফা তাকাল জাওয়াদের পানে, সরাসরি। চোখ মুখ একবারেই স্বভাবিক। স্বরে গম্ভীরতা টেনে বলল,
‘আমি মুশরাফা সিদ্দিকী। কুরআনিক সাইন্স নিয়ে পড়ছি। চেষ্টা করছি, জানা বিষয়বলি মেনে চলার। এই তো।’

জাওয়াদ কৌতুহলী হয়ে জানতে চাইল, ‘ আরও কিছু বলো, যা আমার জানা নেই।’

‘আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আপনি আগ থেকে আমাকে পড়েছেন, আমার সম্পর্কে সব জানেন। ‘ কথাটা ধারণার মতো শুনালেও মুশরাফার স্বর‍টা ছিল দৃঢ়। যেন সে নিশ্চিত।

জাওয়াদ বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ়। মেয়েটা জানল কিভাবে! সে তো কিছু বলে নি। অনিক ছাড়া দ্বিতীয় কেউ তো জানে না। মা জানে এক আধটু। কিন্তু তিনি তো বলবেন না। তবে কিভাবে টের পেল? সমীকরণ মেলাতে গিয়ে ব্যর্থ হলো সে। অবাক হয়ে তাকাল এক পলক। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘এমন মনে হওয়ার কারণ?’

মুশরাফা আকাশ পানে চেয়ে খানিক সময় নিয়ে জবাব দিল,
‘আপনি বিগত দশমিনিটে তেত্রিশবার আমার দিকে তাকিয়েছেন। সেই সাথে প্রথম সম্বোধন ‘তুমি’ দিয়ে শুরু করেছেন। ‘তুমি’ সম্বোধনে আপনার মাঝে কোন দ্বিধা ছিল না। এই ধাঁচটা চেনা কারো জন্য প্রয়োগ হয়ে থাকে। তাছাড়া, আপনার মুখভঙ্গী, দৃষ্টি স্পষ্ট বলে দিচ্ছে আপনি আমাকে জানেন আগ থেকে।’ মুশরাফার স্বর দৃঢ়, তার কথার মাঝে আত্মবিশ্বাস লক্ষণীয়। যা স্পষ্ট প্রমাণ করে মেয়েটা সবটা পরখ করেছে।

জাওয়াদ ধাক্কাটা ভালোই খেল। মুশরাফা ওকে এভাবে পরখ করবে তা অকল্পনীয় ছিল। মেয়েটা তো অন্যদিকে ফিরে আছে, তবে এতসব পরখ করল কখন! সামনের দিকে তাকিয়ে ওর তাকানো পরখ করেছে, সেই সাথে হিসেব কষেছে! এই মেয়েতো ভীষণ চতুর! সাংঘাতিক। ধরা পড়ে লজ্জার আবহে ডুবল জাওয়াদ। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এই প্রথম কোন মেয়ের সামনে তাকে লজ্জা পেতে দেখা যাচ্ছে। অস্বস্তিতে হাঁসফাঁস করতে দেখা যাচ্ছে। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য। জাওয়াদ আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু বলতে চাইল স্বর বেরুল না। কথারা হারিয়ে গেছে। নিরবতায় গা মাড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।

মনে চাপা একটা কৌতূহল অনেকক্ষণ যাবত বের হওয়ার সংগ্রাম করছে। কথা হারিয়ে সেই কথাকে মুক্ত করল। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল,

‘আমার সম্পর্কে তোমার মতামত কী? বিয়েতে হ্যাঁ বলবে?’

জাওয়াদের প্রশ্নে ওর পানে তাকাল মেয়েটা। চোখ মুখ স্বাভাবিক রেখে গম্ভীর স্বরে বলল,

‘আমি তো আপনাকে দেখিনি। না দেখে মতামত জানানো সম্ভব হচ্ছে না।’

জাওয়াদ অবাক স্বরে বলল,

‘তুমি আমাকে দেখো নি! ‘

মুশরাফা চোখ নামিয়ে নিঃসঙ্কোচে উত্তর দিল, ‘না’

জাওয়াদের বিস্ময়ের মাত্রা বাড়ল। মুশরাফার কথার মর্মার্থ বুঝতে পারছে না সে। মেয়েটা কী বলতে চাইছে?
‘তোমার সামনে যে বসে আছে, সে নিশ্চয়ই কোন ভূত নয়!’ বিদ্রুপ করল জাওয়াদ।

মুশরাফা আম্ভরিক গলায় বলল,
‘ বাহ্যিক রূপটা আপনি নন, আপনি হলেন আপনার ভেতরকার ব্যক্তিত্ব। বিয়েটা আপনার রূপের সাথে নয়, আপনার ব্যক্তিত্বের সাথে হবে। যে ব্যক্তিত্বকে আপন ভেবে পার করতে হবে সারাজীবন। আমি সেই ব্যক্তিত্ব দেখিনি। মতামত জানার হলে আপনাকে প্রথমে সেই ব্যক্তিত্ব উপস্থাপন করতে হবে, যা পরখ করে আমি মতামত জানাতে পারব।’

জাওয়াদ চমকাল, ভড়কাল। মেয়েটাকে প্রথম দেখায় সে লাজুক ভেবেছিল। মেয়েটা লাজুক নয়, কেমন গম্ভীর! স্ট্রং, বোল্ড পার্সোনালিটির। এত মেয়ের সাথে ডেটে গেছে। প্রথম সাক্ষাতে সবার মাঝে লাজুকতা ভর করেছে। টমবয় মেয়ে অবধি প্রথম সাক্ষাতে লজ্জা, অস্বস্তিতে লাল হয়েছিল। অথচ এই মেয়ে অনড়, গম্ভীর, অস্বস্তিহীন। লজ্জা নেই, দ্বিধা নেই। স্বর দৃঢ়। কথা স্পষ্ট। স্বরে আত্মবিশ্বাস মাখানো। কথাগুলো বেশ গুছানো। কথার ধাঁচে আন্দাজ করা যায়, শিক্ষিত, মার্জিত, প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক নারীর বসা তার পাশে।
জাওয়াদের মনে হলো, তার চেনা হাজারটা মেয়ের সাথে এই মেয়ের ব্যক্তিত্বের মিল নেই। এই মেয়ে আলাদা, সবার চেয়ে আলাদা। এত বোল্ড পার্সোনালিটির মেয়ে ইতঃপূর্বে দেখা হয়নি তার। আজই দেখল, তাও প্রেয়সী রূপে!

বারান্দার এক কোণে একটা দশ বছরের ছেলে বসা। ছেলেটার নাম জিহান। সম্পর্কে জাওয়াদের ভাইয়ের ছেলে। দুজনের সাক্ষাতের পাহারাদার হিসেবে পাঠানো হয়েছে তাকে। সে তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে না। হাতে ফোন। গভীর মনোযোগ দিয়ে ফোনে গেমস খেলছে। এদিকে মনোযোগ আছে বলে মনে হয়না। ভাগ্নেকে পরখ করল জাওয়াদ। তারপর নিচুস্বরে বলল,
‘ সুযোগের অভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারিনি। আমার সু্যোগ প্রয়োজন। ‘

থামল সে। মুশরাফাকে পরখ করল। ওর দৃষ্টি মেঝেতে আবদ্ধ। মুখে মনোযোগী ভাব স্পষ্ট। জাওয়াদ চোখ ফেরাল না, ওর মুখ পানে চেয়ে মনের ডায়েরির প্রথম পাতায় বড়ো অক্ষরে লেখা বাক্যটি উচ্চারণ করল,
‘ জীবনে জীবন জড়িয়ে নিজেকে উপস্থাপন করার সুযোগটা, তুমি কি আমায় দিবে?’

জাওয়াদের ধারণা এবার মুশরাফার চোয়ালে লজ্জা, অস্বস্তির আভা ফুটে উঠবে। উঠবেই। কিন্তু তার ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে অস্বস্তি কিংবা লজ্জার টিকি চিহ্ন ও দেখা গেল না। মুখভঙ্গির কোন পরিবর্তন হলো না। স্থির থাকা নেত্রপল্লব ঘনঘন দু’বার উঠানামা করল শুধু। পরপরই চোখ তুলে চাইল পাশে। নিঃসঙ্কোচে উত্তর দিল,

‘ ‘বিয়ে দুটো মানুষের সারাজীবনের ভালো থাকার প্রশ্ন। উত্তরটা তৎক্ষনাৎ দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি ভাবব এ সম্পর্কে। যদি আদতেই মনে হয়, আপনাকে নিয়ে জান্নাতে যাওয়ার দোয়াটা আমি নির্দ্বিধায় করতে পারব, তবে আমি আপনাকে সুযোগ দিব ইন শা আল্লাহ। ‘

আর কথা খুঁজে পেল না জাওয়াদ। কথারা সব পুরিয়ে গেছে। সে নিশ্চুপ বসে রইল। মুশরাফাও কোন কথা বলল না। অনেকটা সময় পেরুলো এভাবে। আকস্মিক প্রশ্নঝুলি খেলে বসল মুশরাফা,
‘আপনি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন?’

মুশরাফা থেকে আসা প্রথম প্রশ্নে কিছুটা চমকাল জাওয়াদ। প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ল। ধর্মীয় কাজ বলতে ওই নামাজটাই পড়ে। তাও প্রতি ঝুম’আ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া হয় না ওর। রমজানের রোজাটা ও রাখে না। সিগারেটের ক্রেভিংএর জন্য মধ্যবেলাতেই রোজা ছাড়ার ব্যাপারটা অহরহ ঘটে। জাওয়াদ ভেবে দেখল সে ধর্মীয় অনুশাসন মানে না। ব্যাপারটা স্বীকার করতে চাইল না। বলল,
‘চেষ্টা করি।’

‘আমি যদি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে চাই, আপনি বা আপনার পরিবার থেকে কোন বাধা আসবে?’

‘না।’ ছোটো করে উত্তর দিল জাওয়াদ।

আকস্মিক অস্বস্তিবোধ হলো তার। কেন কে জানে। কেমন হাঁসফাঁস করে উঠল।
আকাশে গোধূলি নেমেছে। চলছে আলো আঁধারির খেলা। বারান্দাটা কালচে ধূসর আলোয় ছেয়ে আছে। সন্ধ্যা নামতেই মশার উপদ্রব বেড়ে গেল। কয়েকটা মশার কামড় খেয়ে উঠে দাঁড়াল জিহান। ফোন বন্ধ করে জাওয়াদের উদ্দেশ্যে বলল,
‘চাচ্চু চলো এবার যাই। মশা কামড়াচ্ছে। থাকা যাচ্ছে না।’

জাওয়াদ যেন একটা অস্বস্তিঘন পরিস্থিতির থেকে মুক্তির পথ দেখল। ওকে উৎফুল্ল দেখাল। ওর পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি। জুম’আ নামাজের জন্য পরেছিল এই পাঞ্জাবি। অনিক চেঞ্জ করতে না দিয়ে সেভাবেই নিয়ে এসেছে। মুখে কদিনের না কাটা দাঁড়ি। এটাও উকিলবাবার নির্দেশে। পাত্রী দেখতে যাওয়ার সময় তাকে ধার্মিক বেশ নিয়ে যেতে হবে। নাহলে মুশরাফার পছন্দ হবে না, এমন আশঙ্কা অনিকের।

জাওয়াদ কুচকে যাওয়া পাঞ্জাবি টেনে সোজা করল। তারপর উঠে দাঁড়ানোর সময় মুশরাফার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ এবার আমাদের যাওয়া উচিত। ‘

মুশরাফাও উঠে দাঁড়াল। জিহান আগে আগে হাটা ধরল। জাওয়াদ সামনের দিকে পা বাড়িয়ে বলল,
‘ আসি? ভালো থেকো। আবার দেখা হবে।’

‘আচ্ছা।’ ছোটো করে উত্তর দিল মুশরাফা।

প্রথমালাপের ইতি টেনে বেরিয়ে গেল জাওয়াদ। গিয়ে বসল বসার ঘরে। সেখানে নাজমুল সাহেব, ফরিদা, জাওয়াদের বাবা জয়নাল আবেদীন, মা, মায়মুনা আক্তার, অনিক বসে গল্প করছেন। মেয়ে মায়মুনার পছন্দ হয়েছে। জাওয়াদকেও খুব একটা খারাপ লাগে নি ফরিদার। তিনি মায়মুনার সাথে আলাদা কথা বলে নিয়েছেন ভাগ্নীর জীবনধরণ সম্পর্কে। মায়মুনাও আশ্বাস দিয়েছেন। বাইরের মানুষ থেকে পুত্রবধূকে দূরে রাখবেন। মায়মুনার সাথে কথা বলে ফরিদা মনের কোণে আশ্বাস জন্মেছে, এই মহিলার কাছে তার ভাগ্নী ভালো থাকবে। ইনি অন্তত লায়লার মতো কঠোর হবেন না। এখন যদি মুশরাফা ইতিবাচক জবাব দেয় তবে বিয়ের কথা আগাতে কোন দ্বিরুক্তি করবেন না তারা।

লায়লার কথা মনে হতেই মনটা বিষিয়ে গেল ফরিদার। পাত্র পক্ষকে দেখতে আসার আমন্ত্রণ জানানোর পর লায়লাকে ফোন করেছিলেন তিনি। মুশরাফার জন্য সমন্ধ এসেছে জানালেন। বিপরীতে তিনি কোন আগ্রহ দেখালেন না। বললেন, ‘আপনাদের যদি ভালো লাগে তবে বিয়ে দিন, আপদ বিদায় হোক। ‘
দুই পক্ষের বৈঠকে তাদের থাকতে বলেছেন ফরিদা। জবাবে লায়লা সাফ মানা করে দিলেন। আগের বার যে অপমানিত হয়েছেন, এখনো তা হজম করতে পারেন নি। আবার অপমান সহ্য করার ইচ্ছে নেই জানালেন। সেই সাথে বললেন, ‘আপনারা আছেন তো, আমরা লাগবে না। আপনারা ম্যানেজ করে নিন। পারলে বিয়েটাও দিয়ে দিন। আমরা কিছু মনে করব না। টাকা লাগলে বলবেন, আমি পাঠাব।’

তার এই বাঁকা কথায় ফোন রেখে ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়েছেন ফরিদা। মা ও এমন হয়! এত পাষাণ! রাগের বশে আর ফোন করেন নি। নিজেরাই সব ব্যবস্থা করেছেন।

জাওয়াদকে দেখে ফরিদা অন্তর্ভেদী চোখে পরখ করলেন। বুঝার চেষ্টা করলেন, পাত্রী সম্পর্কে ওর ধারণা কী? মনোভাব ইতিবাচক না নেতিবাচক? হ্যাঁ বলবে? ছেলে তার সামনের সোফায় বসে বন্ধুর সাথে নিচুস্বরে আলাপ সারছে। শ্যামবর্ণের সুদর্শন চোয়ালে রাগ কিংবা বিরক্তির আভা নেই, তবে খুব একটা উৎফুল্ল ও দেখা যাচ্ছে না। ফরিদা দ্বিধায় পড়লেন। ইতিবাচক, নেতিবাচক মনোভাব ধরতে পারলেন না। ওপাশের কী খবর? জানার প্রয়াসে উঠে দাঁড়ালেন। অনুমতি নিয়ে ভেতরে গেলেন।

মুশরাফার রুমে গিয়ে খুঁজলেন ওকে। মুশরাফা রুমে নেই। ওয়াশরুমে পানির শব্দ শুনা যাচ্ছে। মাগরিবের আযান হচ্ছে চারদিকে। বোধহয় অযু করতে গেছে, আন্দাজ করলেন ফরিদা। খাটে অপেক্ষায় বসলেন। সেকেন্ড দশেক বাধে বেরিয়ে এলো মুশরাফা। মুখে অযুর পানি। ফরিদা উদ্ধিগ্ন হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,

‘কেমন দেখলি? পাত্র…

মুশরাফা চোখের ইশারায় কী যেন বলল। কথার মাঝে থেমে গেলেন ফরিদা। চারদিকে আযান হচ্ছে, আযানের সময় কথা বলা সুন্নাহপরিপন্থী কাজ। এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে মুশরাফা। ফরিদা উদ্ধিগ্নতা চেপে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
চেয়ারের হাতলে রাখা টাওয়াল। মুশরাফা টাওয়াল তুলে মুখ মুছল। টাওয়াল রাখল। আযান শেষ, বিড়বিড় করে দোয়া পড়ল। ফরিদা অন্তর্ভেদী চোখে পরখ করলেন ওকে। চোখ মুখ একবারে স্বাভাবিক। এর মাঝে কি রাজি? উৎকন্ঠিত হয়ে প্রশ্ন করলেন,
‘এবার বল?’

‘বলো, কী জানতে চাও?’ শান্ত, কোমল স্বরে প্রশ্ন করল মুশরাফা। ফরিদা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

‘পাত্র কেমন? বিয়ের জন্য রাজি তুই?’

মুশরাফা ভেবেচিন্তে জবাব দিল, ‘বিয়েটা সারাজীবনের ব্যাপার। হুটহাট এক দেখায়, একদিনে কিভাবে সিদ্ধান্ত নিই? আমাকে সময় দাও, ভেবেচিন্তে জানাব। ‘

ফরিদা উত্তর বুঝলেন না। এই মেয়ে হ্যাঁ বলল না কি না! দ্বিধায় পড়লেন। এই মেয়ে একটু বেশিই গম্ভীর! বুঝার চেষ্টায় পরবর্তী প্রশ্ন করলেন,

‘পাত্রের মায়ের তোকে পছন্দ হয়েছে। রিং পরাতে চাচ্ছেন। কী বলব?’

মুশরাফা জায়নামাজ বিছাতে বিছাতে বলল,
‘ দ্বিধার চিহ্ন উঠবে না আমার আঙুলে। বলো, সঙ্গী বাছাইয়ের অধিকারটা পাত্রপাত্রীর। দেখাদেখি পর্বের পর বিয়ের সিদ্ধান্তটা পাত্র পাত্রীর উপর ছেড়ে দিই। তারা ভেবে জানাক, একে অপরের সাথে সারাজীবন কাটাতে পারবে কি না।

ফরিদা এবারও মুশরাফার কথায় উত্তর খুঁজতে গিয়ে হতাশ হলেন। তার কাছে মনে হলো এটা কোন রহস্যজাল। ভীষণ কৌতুহল কাজ করছেন, সমাধান জানার জন্য। কিন্তু উত্তর মিলছে না। কোন সূত্রের ও দেখা নেই, যা দিয়ে তিনি সমাধান আন্দাজ করবেন। শুধু মনে একটাই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, উত্তরটা কী হবে?

চলবে…

#স্বর্ণাভ_সুখানুভূতি। (পর্ব-৮)
আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা।

আলতো হাতে ফরিদার মাথায় তেল মালিশ করছে মুশরাফা। ফরিদা মেঝে বসে ড্রেসিংটেবিলের আয়নায় মুশরাফাকে পরখ করছে। দু’দিন হয়ে গেল, অথচ মুশরাফার কোন হেলদোল নেই। না সে বিষন্ন, আর না সে আনন্দিত। মুশরাফার চেহারায় কোন পরিবর্তন নেই, সে একবারেই স্বাভাবিক। এদিকে ফরিদার চিন্তার অন্ত নেই। ভাগ্নীর উত্তর কী হবে ভাবতে ভাবতে চোখের নিচে কালি পড়েছে। সকালেই অনিক ফোন দিয়েছে উত্তর জানার জন্য। তিনি রাতে জানাবেন বলেছেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে সেই ক্ষণে। এখনো উত্তর জানা হয়নি। কিছুক্ষণ পর হয়তো অনিকের ফোন আবারও আসবে, তখন তো ভালোমন্দ একটা জানাতে হবে। উত্তর জানাটা জুরুরি। ফরিদা নড়েচড়ে বসলেন। তারপর বললেন,
‘দু’দিন কিন্তু হয়ে গেছে।’

মুশরাফা তেলের বোতল থেকে হাতের তালুতে তেল নিচ্ছিল। মামীর কথায় থেমে গেল। আয়নার মামীর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ আমার ভাবনায় ছিল ব্যাপারটা।’

ফরিদা খুশি হলেন। তিনি ভাবেছেন, ব্যাপারটা মুশরাফার মাথা থেকে সরে গেছে। আগ্রহী গলায় প্রশ্ন করলেন,
‘কী সিদ্ধান্ত নিলি? জাওয়াদকে বিয়ে করবি?’

মুশরাফা তৎক্ষনাৎ উত্তর দিল না। ফরিদার থেকে চোখ সরিয়ে তেল মালিশে মন দিল। এক ফাঁকে বলল,
‘বিয়েটা কিন্তু একবারে ঘরোয়াভাবে হবে মামী। বেশি ভিড়ভাট্টা যাতে না হয়। তুমি আগে কথা বলে নিবে। ‘

মুশরাফার পরোক্ষ কথার মাঝে উত্তর খুঁজে পেলেন ফরিদা। তড়িৎ ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরলেন । খুশির ঝিলিক তুলছে তার চেহারায়। জানান দিচ্ছে আনন্দের মাত্রা কতখানি। উৎফুল্লতার সাথে বললেন,
‘তুই সত্যি জাওয়াদকে বিয়ে করবি?’

মুশরাফা এক পলক তাকাল মামীর দিকে। চোখে চোখ পড়তেই একরাশ অস্বস্তি এসে গা ছুঁলো। তৎক্ষনাৎ চোখ ফেরাল। তারপর মৃদু হাসল। তার হাসি যেন কত কী বলে দিল! ফরিদা উঠে দাঁড়ালেন। খুশিতে আত্মহারা হয়ে বললেন,
‘আমি এখনই তোর মামাকে গিয়ে বলছি। ‘

ঝড়ের বেগে নিজের রুমের দিকে ছুটলেন ফরিদা। খানিক আগেই অফিস থেকে ফিরেছেন নাজমুল সাহেব। ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। ফরিদা গিয়ে স্বামীকে সুখবর দিলেন। নাজমুল সাহেবকে ও খুশি দেখাল। অনিককে সুসংবাদ জানালেন। এবার দুই পরিবারের বিয়ে সমন্ধীয় আলাপে বসার আহ্বান করলেন। অনিক পরদিন কোন রেস্টুরেন্টে বিয়ের ফর্দনামা নিয়ে বসার আমন্ত্রণ জানাল।

পরদিন দুই পক্ষের গুরুজন বসার কথা। নাজমুল সাহেব তৈরি হয়ে বেরুনোর সময় মুশরাফাকে ডাকলেন,
‘রাফা, এদিকে আয় তো?’

মুশরাফা রুমে থেকে বেরিয়ে এলো। মামার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ডাকছিলে, মামা?’

নাজমুল সাহেব ইতস্ততবোধ করলেন পরবর্তী কথাটা বলতে গিয়ে,
‘আমি যাচ্ছি পাত্রপক্ষের সাথে বিয়ের পাঁকা কথা বলতে। তোর কোন দাবিদাওয়া আছে? বিয়ে, কাপড়, গহনা, মোহরানা সমন্ধীয় ব্যাপারে?’

মুশরাফা উত্তর দিতে একটু ও ইতস্ততবোধ করল না। নির্দ্বিধায় বলল,
‘ প্রথমত, বিয়েটা একবারে সাদামাটাভাবে হবে। জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করে টাকা অপচয় করা যাবে না। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যে বিয়েতে খরচ বেশি হয়, সে বিয়েতে সুখ কম হয়। এখানেই সুখটাই মূখ্য। দুই পরিবারের মানুষ থাকবে, সুন্নতি পদ্ধতিতে বিয়ে হবে। আর কাপড়, গহনা, এসবে আমার কোন আক্ষেপ নেই। খুশিমনে তারা যতটুকু দেয়, তাই যথেষ্ট। ‘

‘ তারা যদি বলে গহনা দিবে না, তবে? স্বর্ণ গহনা ছাড়া বিয়ে হয়?’ ফোঁড়ন কাটলেন নাজমুল সাহেব। মুশরাফা হেসে বলল,

‘গহনা কি সুখ আনে? আনে না। ধরো, স্বর্ণ গহনা দেয়ার সামর্থ নেই তাদের। তারপর ও তুমি জোর করলে, তারা রাজিও হলো। কোনমতে ম্যানেজ করে, ভরি ভরি স্বর্ণালংকার দিল। তুমি খুশিমনে মেয়ে বিয়ে দিলে। বিয়ের পরদিন যদি তারা সোনার গহনা বিক্রি করে দেয়, তখন? বিয়েতে পাত্রীপক্ষের চাপে লক্ষ টাকার কাপড় কিনল, কিন্তু বিয়ের পর দেখা গেল, স্বামী স্ত্রীকে হাজার টাকার একটা কাপড় দিতেও হিমসিম খাচ্ছে, এক কাপড়ে বছর চালাতে হচ্ছে। তখন?
স্বর্ণ গহনা এসব শুধু লোক দেখানো মাত্র। যাতে মানুষকে রসিয়ে বলা যায়, আমার মেয়ের বিয়েতে, জামাই এত ভরি গহনা দিয়েছে, লক্ষ টাকার কাপড় দিয়েছে। অনেক ভালো বিয়ে দিয়েছি। এ ছাড়া আর কিছুই নয়। ওই লক্ষ টাকার স্বর্ণালংকার, কাপড় চোপড় কি পরে পরা হয়? হয়না বললেই চলে।
এটা মূলত, একদিনের শো-অফ। একদিনের লোক দেখানোর জন্য পাত্রপক্ষকে এত চাপ দিতে হবে কেন? পাত্রী পক্ষের কাছে যৌতুক চাওয়া যেমন অন্যায়, পাত্রের সামর্থ না থাকার পর ও ভরি ভরি অলংকার, কাপড়চোপড় তারউপর চাপিয়ে দেয়াটাও তেমন অন্যায়। স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর কাধে। তিনি তার সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে যেভাবে সাজিয়ে নেন সেভাবে খুশি থাকা উচিত। আমি তাতেই খুশি। তুমি এতে কোন প্রকার চাপ দিও না।’

নাজমুল সাহেব অবাক চোখে চেয়ে রইলেন ভাগ্নীর দিকে। আজকালকার যুগে মেয়েরা বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন বুনে। সেই স্বপ্নের দাম কোটি টাকা। পাত্রীপক্ষের দাবি মানতে গিয়ে পাত্রের জামানো টাকা শেষ হয়ে যায়, তাও পূরণ হয় না। লক্ষ টাকার লেহেঙ্গা, বেনারসি, ব্রান্ডেড কসমেটিকস, ভরি ভরি সোনার গহনা এসব না হলে বিয়েই হয়না যেন। পাত্রী আগেই পাত্রের সাথে কথা বলে সব ঠিক করে নেয়। একটা বিয়ের পিছনে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হয়ে যায়। তাও পাত্রীপক্ষ সন্তুষ্ট হয় না। খুঁত ধরে, বিয়ের শাড়ির বাজেট যেন কম হলো, গলার শীতা হারটা আরেকটু লম্বা হলে ভালো হতো, পাত্রপক্ষ দেখি কিপটে একটা চোকার ও দিল না।
কখনো কখনো পাত্রপক্ষকে ঋণগ্রস্ত ও হতে হয়। পাত্রী কিংবা পাত্রী পক্ষ ওসবে চোখ দেয় না। বিয়ে তো একবারেই হয়। একটু জাঁকজমকপূর্ণ না হলে হয়?
কিন্তু রাফা এ যুগের মেয়ে হয়েও সব ছেড়ে দিচ্ছে! কী আশ্চর্য! ছাড়ার পেছনে আবার কী সুন্দর যুক্তি দাঁড় করিয়েছে! আসোলেই তো। বিয়েতে পাত্রীক্ষের কষ্টগুলো হাইলাইট করা হয়, কিন্তু একটা বিয়ের পিছনে একটা পাত্রকে কতটা ব্যয় করতে হয়, কয়েকমাস আগ থেকে খেয়ে না খেয়ে কত কষ্ট করে অর্থ আয় করতে হয়, জোগাড় করতে হয় । পাত্রী পক্ষ থেকে তাদের খরচটা হয় দিগুন। কিন্তু এটা কেউ হাইলাইট করেনা। সবাই পাত্রীর, পাত্রীর বাবার ইমোশনকে প্রাধান্য দেয়। কেউ পাত্রের বিয়ের পেছনে বিহাইন্ড দ্যা সিন এ চোখ রাখে না।

সমাজের আর সব মানুষের মতো নাজমুল সাহেবের ভাবনাও এক ছিল। আজ ভাগ্নির কথা তার মস্তিষ্কে ও কিছু কথা আটকাল। ধারণা বদলালো। এভাবে ভাবা হয়নি কখনো। তিনি প্রসন্ন হাসলেন। প্রশ্ন করলেন,
‘আর দেনমোহর? সেটা ও ধরব না?’

মুশরাফা ধীর স্বরে বলল,
“দেনমোহর ধরবে। তবে ফিক্সড না। এখানেও পাত্রপক্ষকে চাপ দেয়া যাবে না। প্রথমে পাত্রের সাথে কথা বলে নিবে একান্তে। তাকে জিজ্ঞেস করবে, ‘তুমি কী পরিমাণ মোহরানা নগদ দেয়ার সামর্থ্য রাখো।’ তিনি তার সামর্থ্য অনুযায়ী যে অংকটা বলবেন, তাই ফর্দনামায় দেনমোহর হিসেবে লিখবে। ‘

নাজমুল সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন,
‘ সমাজে দেহমোহরকে বিয়ের খুটি হিসেবে ধরা হয়। তাই পাত্রীপক্ষ জোরগলায় লাখ থেকে কোটি টাকার অংকে গিয়ে দাঁড়ান। তুই কম বললি কেন? ‘

মুশরাফা উত্তরে বলল,
‘এটা আমাদের সমাজের ভুল ধারণা। একটা মেয়ে বিয়ে দেয়ার সময় মেয়ের বাবা ভাবেন, লাখ লাখ টাকা দেনমোহর ধরলে, ছেলে কখনো মেয়েকে ডিভোর্স দেয়ার কথা ভাববে না। দেনমোহরের বলেই বিয়ে টিকে থাকবে। তাই তারা জোরপূর্বক বিশালসংখ্যার মোহর চাপিয়ে দেয় পাত্রপক্ষের উপর। তারপর ফলাফল দেখা যায়, বিয়ের পর স্বামী দেনমোহর তো দেয়ই না, উলটো ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে মাফ চেয়ে নেয়।
ইসলামে, তালাকের সাথে দেনমোহরের কোন সংযোগ দেখা যায়নি। যে বিয়ে টিকে থাকার তা দেনমোহর ব্যতীত টিকে থাকবে, যা ভেঙে যাওয়ার তা দেনমোহর-সমেত ভেঙে যাবে। দেনমোহর কখনো তালাক আটকাতে পারেনা। এটা ভুল ধারনা।
মূলত, আমাদের সমাজ ‘দেনমোহর’ এর মানেটাই বুঝে না। দেনমোহর হলো,বিয়ের একটা অবশ্যম্ভাবী শর্ত। যা বর কতৃক কনেকে নগদে প্রদান করা হয়। এটা স্ত্রীর প্রতি কোন করুণা নয়, এটা স্ত্রীর অধিকার। ইসলাম বলে, বরের সামর্থ্য অনুযায়ী দেনমোহর ধার্য্য করতে, যা সে স্ত্রীকে স্পর্শের আগে নগদে দিয়ে দিতে পারে। এই টাকাতে স্ত্রী ছাড়া কারো কোন হক নেই, স্ত্রীর বাবা মায়ের ও না। স্ত্রী তার ইচ্ছেমাফিক খরচ করতে পারবে। চাইলেই সে তার পরিবারকে দিতে পারবে, না চাইলে কেউ জোর করতে পারবেনা। স্বর্ণ যদি মোহরানায় অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে ওই গহনায় কারো কোন প্রকার অধিকার নেই। স্বামী শ্বাশুড়ি কেউ ওই গহনায় হাত দিতে পারবে না। আমাদের সমাজে দেনমোহরে অন্তর্ভুক্ত গহনা স্বামী শ্বাশুড়ি নিয়ে যায়, জোরগলায় বলে, আমাদের জিনিস আমরা নিয়েছে, এতে তোমার কোন অধিকার নেই। মূলত, এটা অন্যায়।
যাক গে, সে অন্যকথা। আমার কথা হলো, দেনমোহর ধার্য্যের ক্ষেত্রে কোন উনাকে কোন প্রকার চাপ দিবে না। আমি চাই বিয়ের সকল ধাপে ইসলামি রীতিনীতি মেনে চলা হোক। ‘

নাজমুল সাহেব মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে গেলেন। বিস্ময়, মুগ্ধতা ঘিরে ধরেছে তাকে। এই মেয়ের চিন্তা ভাবনা এত গভীর কেন? আর এত সুন্দরইবা কী করে! এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে ও তিনি তো কখনো এভাবে ভেবে দেখেন নি। তার ভাবনায় এলো না কেন ব্যাপার গুলো? তিনি ও তো বড়োমেয়ে ফাবিহার বিয়েতে মোটা অংকের মোহরানা ধরেছিলেন। ফাবিহার শ্বশুর বারবার কমাতে চেয়েছেন। বলেছেন, আমার ছেলের একক আর্থিক অবস্থা এতটা উঁচু নয়। কিন্তু নাজমুল সাহেব শুনেননি। গো ধরে নিজের কথা মানিয়েই ছেড়েছেন। ফাবিহার স্বামী জিদান কি মোহরানা পরিশোধ করেছে? ফাবিহা তো কিছু বলল না, করেনি নিশ্চয়ই । এতগুলো হাতে পেলে অবশ্যই তাকে বলতো। এই মুহুর্তে এসে তিনি বুঝতে পারলেন, জিদানের প্রতি তিনি অন্যায় করে ফেলেছেন, মেয়ের প্রতিও। মেয়ের হক নষ্ট করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে এর জন্য শান্তি দিবেন! অজানা ভয় হলো নাজমুল সাহেবের। সে সাথে ভাগ্নীর জন্য গর্ববোধ ও হলো। ভাগ্নীর মাথায় হাত রাখলেন। মন থেকে দোয়া এলো, তোর জীবনটা সুখে ভরে যাক। হেসে বললেন,
‘তুই যেভাবে চাস সেভাবেই হবে।’

খুশিমনে বাসা থেকে বের হলেন নাজমুল সাহেব। যথারীতি দুই পক্ষের গুরুজন বসলেন রেস্টুরেন্টে। বেশ কয়েকবার ফোন দেয়ার পর ও মুশরাফার বাবা ভাই কেউ এলো না। বাবা তার দুই ভাইকে পাঠালেন। দায়িত্ব দিলেন কোনমতে ম্যানেজ করার। বরপক্ষের মুরুব্বিরা এসেই পাত্রীর বাবাকে খুঁজল। মুশরাফার বড়োচাচা হাফিজুর রহমান অযুহাত দিলেন, মুশরাফার ভাই মিদহাদ দেশের বাইরে আছে। আর বাবা মেয়ের বিয়ের চিন্তায় আসার আগে হুট করেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শরীর দুর্বলতার কারণে আসতে পারেননি। তিনি চাননি তার জন্য বিয়ের কাজ আটকে থাকুক, তাই তার ভাইদের পাঠিয়েছেন।
। জাওয়াদের বাবা জয়নাল আবেদীন দুঃখী গলায় প্রস্তাব রাখলেন, কদিন বাদে আলাপে বসার। এতে মুশরাফার ছোটো চাচা সাজিদুর রহমান প্রস্তাব গ্রহন না করে আজই ফর্দনামা সেরে ফেলার জোর দেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সায় জানান জয়নাল আবেদীন। মেয়ের বাবা অনুপস্থিতিতে বিয়ের কথা আগাতে বাধছে তার, তবুও কী করা। পাত্রীপক্ষের মুরুব্বিদের জোরাজুরিতে আগাতে হলো।

জাওয়াদ আসেনি। অনিক এসেছে। নাজমুল সাহেব অনিকের সাথে মোহরানা বিষয়ক আলাপ করলেন। মুশরাফার মতামত জানালেন। সেই সাথে বাকি বিষয় আশয় ও। অনিক জাওয়াদকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করল, দেহমোহর পরিমাণ কত হবে? সে নগদে দিতে পারবে কি-না। জাওয়াদ খানিক সময় নিয়ে তার বর্তমান একক অবস্থার কথা জানাল। সেই সাথে বন্ধুকে বললো, তার বর্তমান অবস্থা অনুযায়ী নগদে উপর পঞ্চাশ হাজার টাকাই দেয়ার মতো সামর্থ্য আছে তার। বাবার অনেক টাকা থাকলেও তার কাছে খুব বেশি টাকা নেই। দেহমোহর পঞ্চাশ হাজার লিখা হলো। দেহমোহরে কাপড়চোপড়, গহনা, কসমেটিকস যুক্ত করা হলো না। এটা স্বামী বা তার পরিবার থেকে কনের জন্য উপহার স্বরূপ বিধায় এটাকে দেহমোহরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। নাজমুল সাহেব এসব ব্যাপারে কোন চাপ দিলেন না। জয়নাল আবেদীনের উদ্দেশ্যে বললেন,
‘ স্ত্রীর অন্ন, বস্ত্র,বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জাওয়াদ তার স্ত্রীর জন্য যে বস্ত্রের ব্যবস্থা করে দিবে, তাতে আমাদের কোন আপত্তি থাকবে না। বিষয়টা জাওয়াদ এবং আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম। আমাদের কোন দাবিদাওয়া নেই।’

জয়নাল আবেদীন হেসে বললেন,
‘আপনার ভাগ্নী আমার মেয়ে হয়ে যাবে। আমি আমার মেয়েকে যেভাবে সাজিয়ে বিয়ে দিয়েছি, পুত্রবধূকে ও সেভাবে সাজিয়ে আনব। ব্যাপারটা যেহেতু আমাদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন, তবে আমরা নিজ দায়িত্ব ভালোভাবে সবটা সামলে নিব। আশা করি অভিযোগের সুযোগ হবে না আপনাদের।’

নাজমুল সাহেব ও হেসে সায় জানালেন। বিয়ে বিষয়ক সকল আচার অনুষ্ঠান ঘরোয়াভাবে করার প্রস্তাব রাখলেন। যেহেতু মেয়ের ধার্মিকতা সম্পর্কে জয়নাল আবেদীন সাহেব আগেই শুনেছেন, সেহেতু তিনি খুব একটা অবাক হলেন না। স্বাভাবিকভাবেই প্রস্তাব গ্রহন করলেন। আলাপচারিতা সেরে বিয়ের তারিখ ফেললেন সপ্তাহ খানেক পর, অর্থ্যাৎ আগামী শুক্রবার। সাদামাটা ভাবে মসজিদে বিয়ে সারা হবে।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here