সূর্যের_পারিজাত (পর্ব ১)

#গল্প১৩৮

#সূর্যের_পারিজাত (পর্ব ১)

‘সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণ বিচার সাপেক্ষে আসামি আয়ুস্মান আহসান সূর্যকে এই আদালত বিশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ঘোষণা করছে। আর এই মামলার বিচারাধীন আরেকজন আসামি পারিজাত চৌধুরীকে নির্দোষ ঘোষণা করে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো’।

মাননীয় জাজ সাহেবের ঘোষণাটা বেশ সাদামাটা ভাবেই শেষ হয়। অনেকটা অনুমেয়ই ছিল এই মামলার রায়। আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শান্তভাবেই রায়টা শোনে সূর্য, মনে মনে একটা স্বস্তি টের পায়। বছরখানেকের বেশি সময় ধরে এই মামলা চলছে, আদালত আর হাজতে যাওয়া আসা আর ভালো লাগছিল না। এটা তো সত্যি খুনটা ওই করেছিল, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছিল। তারপরও এরা কেন যে এত সময় নিল তা কিছুতেই ওর মাথায় আসে না। আজ সেই বিচারের চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে গেল, একদিক দিয়ে ভালোই হলো। এবার সব মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে, আশার আলোটুকু নিভিয়ে একদম একাকী হয়ে যাবে।

মা এসেছে, একবার মাথা তুলে তাকায় সূর্য। এখনো কেঁদেই চলছে। মনটা খারাপ হয়ে যায় সূর্যের, মায়ের দায়িত্বটুকু ও পালন করতে পারল না। বাবা তো সেই কবেই এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে ওদের একলা করে দিয়ে চলে গেছে। ভাগ্যিস মা একটা স্কুলে চাকরি করত, তাতেই জীবন সংগ্রামের লড়াইটা চালিয়ে নেওয়া গেছে। মাস্টার্সটা এ বছরেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সূর্যের আফসোস হয়, যে সময়ে মায়ের পাশে ওর দাঁড়ানোর কথা ছিল ঠিক তখনই এই অভিসম্পাতের মতো ঘটনা। আচ্ছা মা ওকে ছাড়া এখন থাকবে কী করে? এই শহরে ও ছাড়া আর যে কেউ নেই মায়ের!

কয়েকজন পুলিশ এগিয়ে আসছে ওর দিকে, বেশ সম্মান দিয়েই কাঠগড়া থেকে নামায়। আজ থেকে ও স্বীকৃত খুনি, আদালত কর্তৃক স্বীকৃত। তাই হয়তো খাতিরটা আলাদা। কাঠগড়া থেকে নামতে গিয়ে একবার তাকায় পারিজাতের দিকে, মুখ নিচু করে আছে মেয়েটা। গায়ে একটা পাতলা কালো শাল জড়ানো। ফর্সা দুটো হাত বের হয়ে আছে, মুঠোবন্দি। সূর্য মনে মনে আফসোস করে, পারিজাতের মুখটা দেখতে পাচ্ছে না। ও একটু ঝুঁকে মুখটা দেখতে যাবে এমন সময় মায়ের আকুল চিৎকার শুনতে পায়, ‘সূর্য, আমি আপিল করব, তুই ভয় পাস না বাবা।’

সূর্যর বুকটায় বর্ষার মেঘলা দিনে নদীর পানির উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো হু হু করে ওঠে। মা গো, এত মায়া কেন তোমার। আমি ভয় পাব না মা, আমি তো তোমার সূর্য।

মেহেরুন্নেসা আদালত থেকে বের হবার পথটার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। একজন বলেছে এই পথ দিয়েই সূর্যকে নাকি নিয়ে যাবে, শেষ দেখাটুকু দেখতে চান। একজন উকিলের সাথে কথা হয়েছে, বলেছেন কাগজপত্র হাতে পেলেই উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। মনে একটা ভরসা পান, সূর্যর সাজাটা হয়তো কমানো যাবে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথা হয়ে গেছে, কখন যে প্রিজন ভ্যানটা বেরোবে। চিন্তিত মুখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন।

আদালতের কাজগুলো শেষ হতে সময় লাগে অনেক। সূর্যকে যখন প্রিজন ভ্যানে ওঠানো হয় ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে। এরা দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা করেনি, খুব ক্ষুধা পেয়েছে। আচ্ছা, মা তো নিশ্চয় আজ দুপুরে খায়নি। আজ থেকে হয়তো প্রায়ই মানুষটা না খেয়ে থাকবে।

প্রিজন ভ্যানে ওর সাথে আরো কয়েকজন আসামিকে ওঠানো হয়। আদালতে যেতে আসতে এই গাড়িটা বেশ পরিচিত হয়ে গেছে ওর। প্রথম দিকে হাতে হাতকড়া পরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আসতে সমস্যা হতো। গাড়ির গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। গড়পড়তা মানুষের চেয়ে ও একটু বেশিই লম্বা, পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি। তাতে প্রিজন ভ্যানের উপরের দিকে আট আঙুল মতো লোহার গরাদ দেওয়া ছোট্ট জানালা দিয়ে বাইরের পৃথিবীটা দেখতে পাওয়া যায়। সূর্য আজো আগ্রহ নিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। গাড়িটা আদলতের চত্বর থেকে বের হয়ে সামনের রাস্তার মোড়টা পেরোতেই ও মাকে দেখতে পায়। আকুল দৃষ্টিতে প্রিজন ভ্যানের উপরের দিকে লোহার গরাদ দেওয়া জানালার দিকে ওকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সূর্য যতটুকু পারে মুখটা লোহার শিকের সাথে চেপে ধরে। বার বার ‘মা’, ‘মা’ বলে চিৎকার করে।

মেহেরুন্নেসা দিশেহারা চোখে প্রিজন ভ্যানের দিকে তাকিয়ে সূর্যকে খুঁজতে থাকেন। ওইটুকু ফাঁকা জায়গা দিয়ে কিছুতেই ছেলের মুখটা খুঁজে পান না। এর মধ্যেই প্রিজন ভ্যানটার গতি বেড়ে গেছে। একটা সময় নীল গাড়িটা ওর সব আশাটুকু ছিনিয়ে নিয়ে দূরে মিলিয়ে যায়।

পারিজাতের হাত পা কেমন ভেঙে আসছে, দূর্বল পায়ে গাড়িতে ওঠে। বাবা গাড়ির সামনে বসেন, পেছনে মা ওকে একটা হাত দিয়ে পেঁচিয়ে বুকের কাছে ধরে রেখেছে। পৃথিবীর তাবৎ বিপদ আপদ থেকে নিজের আত্মজাকে লুকিয়ে রাখার প্রাণপণ প্রয়াস যেনো। গাড়িটা ছাড়তেই বুক কাঁপিয়ে একটা নিশ্বাস পড়ে পারিজাতের, এই আদালত চত্বরে আর আসতে হবে না। আদালতের রায় যখন ঘোষণা হচ্ছিল তখন অনেক চেষ্টা করেও সূর্যের মুখের দিকে ও তাকাতে পারেনি। যে ভয়টা এই একটা বছর প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহুর্ত পেয়ে আসছে আজ তার অবসান হলো। পারিজাত সেদিনের সেই ঘটনার কথাটা মনে পড়তেই একবার কেঁপে ওঠে। নিলুফার বেগম মেয়েকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন, ফিসফিস করে বলেন, ‘তুই আজ থেকে মুক্ত। আদালত তোকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। আর কোনো ভয় নেই মা।’

পারিজাতের শুধু সূর্যের কথা মনে হচ্ছিল। আজকের পর থেকে আর কী দেখতে পাবে ওকে?
সূর্য যে আজ থেকে মেঘের আড়ালে চলে গেল, কখনো কী এই মেঘ কাটবে?

প্রিজন ভ্যানটা কাশিমপুর কারাগারের সামনে এসে থামতেই সাবধানে ওদের নামিয়ে আনা হয়। প্রয়োজনীয় কাজ সেরে ওকে নতুন একটা ওয়ার্ডে দেওয়া হয়। কথায় কথায় জানতে পারে আজ থেকে ও আর হাজতি না কয়েদি। ও আর বিচারাধীন আসামি না, বরং সাজাপ্রাপ্ত আসামি।

নতুন ওয়ার্ডে এসে ও হতাশ হয়, এখানেও গাদাগাদি। একটা সুবিধে ও খুনের আসামি, সবাই একটু সমীহই করে। অন্যান্যরা শোবার জন্য এক হাত জায়গা পেলেও সূর্য একটু বেশিই জায়গা পায়। তাতে ওকে ইলিশ শোয়া শুতে হয় না। ইলিশ শোয়া কথাটা ও প্রথম এখানে এসে শেখে। হাজতিরা সবাই গাদাগাদি হয়ে এককাত হয়ে শুয়ে থাকে। অনেকগুলো ইলিশ যখন রাখা হয় তখন একে কাত করে রাখা হয় যাতে কম জায়গা লাগে। কারাগারে স্থান সংকুলান না হওয়াতে এভাবেই ঘুমাতে হয় সবাইকে। এককাতে ঘুমিয়ে থাকতে হয়। সূর্য অবশ্য একটু বেশি জায়গা পায়, তাতে এপাশ ওপাশ হয়ে ঘুমোতে পারে অন্তত।

সূর্য যখন ঘুমোতে যায়, ততক্ষণে অর্ধেক রাত পার হয়ে গেছে। চোখটা বন্ধ করে ভাবে, বিশ বছর কারাগারে থাকতে হবে। মনে মনে হিসেব কষে, তার মানে ও যখন মুক্তি পাবে তখন ওর বয়স হবে তেতাল্লিশ বছর। জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়, জীবনে কিছু করে দেখাবার সময়টুকুই ওকে এখানে বন্দী থাকতে হবে! দায়িত্ব নেবার সময়টুকুতেই এমন দায়িত্বহীন হয়ে থাকা যে ভীষণ কষ্টের। ভাবতেই মনটা হতাশার কালো চাদরে ডুবে যায়। হঠাৎ একটা কথা মনে হতেই মুখটা উজ্জ্বল হয়ে যায়। জেলখানায় তো ন’মাসে এক বছর। ও যখন প্রথম এখানে আসে তখনই নিয়মটা জেনেছিল। এবার ও দ্রুত হিসেব করে ফেলে, তার মানে ক্যালেন্ডারের সময় অনুযায়ী পনের বছর। উম, তখন ওর বয়স ৩৮ হয়ে যাবে। একটু যেনো মন ভালো হয়ে যায়, ওই বয়সেও ও ইচ্ছে করলে কিছু শুরু করতে পারবে। আচ্ছা মা কী ততোদিন বেঁচে থাকবে? যদি মায়ের বড় কোনো অসুখ করে কিংবা বিপদ হয়? ভাবতেই মনটা আবার খারাপ হতে শুরু করে।

সূর্য চোখটা বন্ধ করে, ক্লান্তিতে দু’চোখ জড়িয়ে আসছে। কাল থেকে ওর কয়েদি জীবনের শুরু, ও এখনো জানে না এতটা লম্বা সময় এই কারাগারে কী করে কাটিয়ে দেবে। ঘুমোনোর আগে পারিজাতের অস্পষ্ট মুখটা ভেসে ওঠে, মেয়েটা মাথা নিচু করে বসেছিল। শেষ সময়ে পারিজাত কী ওর মুখটা দেখতে চায়নি?

(চলবে)

মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সুবাস
শিমুলতলী, গাজীপুর
১২/০২/২০২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here