সুপ্ত_অনুরাগে-২০,২১

#সুপ্ত_অনুরাগে-২০,২১
#প্রভা_আফরিন
[২০]

চেয়ারে গা ছাড়া ভাব নিয়ে বসে আছে সুপ্ত। ধূসর নীল শার্টের ওপরের বোতাম খোলা। শ্বেতশুভ্র বুক তার বিশাল ছাতিতে এক ভরসার আবাসস্থল নিয়ে উঁকি দিয়েছে সেখানটায়। অপু আড়চোখে সেদিকে তাকিয়ে মনোযোগ সরায়। সুপ্তের চোয়ালের কাঠিন্য নজরে বিদ্ধ হতেই ফাকা ঢোক গেলে। ঠোঁট, জিভ, গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার। সে পানিতে গলা ভেজায়। এভাবে পানি খেতে থাকলে নির্ঘাত ওয়াশরুমে ছুটতে হবে।
সুপ্তের নিশ্বাস ঘন ও ধীর। দূরে বসেও সেই শ্বাসের ভারী শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে অপু। যেন তাকে উদ্দেশ্য করেই নিক্ষেপিত হচ্ছে প্রতিটা শ্বাস। রাগে উত্তেজিত হলে লোকটার ফরসা মুখ লাল টকটকে হয়ে যায়, এই প্রথম অবলোকন করল অপু।

সুপ্তের দৃষ্টি ইস্পাতকঠিন। মনোযোগ সহকারে দেখছে অপরাজিতা ও তন্ময়কে। তন্ময়ের অবশ্য তাতে কোনো হেলদোল নেই। সে আরাম করে খাচ্ছে। মাঝে মাঝে এটাওটা এগিয়ে দিচ্ছে অপুর দিকে। কিন্তু অপুর গলা দিয়ে পানি ব্যতীত কিছুই নামছে না। এমন একটা ধাক্কা খাওয়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে। সুপ্ত কিনা তন্ময়ের ভাই! একেই বলে যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। পৃথিবীতে এত লোক থাকতে কেন সুপ্ত সম্পর্কিত বিষয়ই তাকে আষ্টেপৃষ্টে রাখে? অবশ্য অপু মনে মনে শুকরিয়া করছে ভাগ্যিস নিগার আন্টি উপস্থিত। নয়তো আজ, এক্ষুণি কিছু একটা ঘটে যাওয়া থেকে ওই একরোখা লোকটাকে কেউ ঠেকাতে পারত না। অপু আরেকটু হেলে বসে নিগার আন্টির দিকে। নিগার চৌধুরী প্রশ্নবোধক চাহনিতে সুপ্তকে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোরা একে-অপরকে চিনিস?”

সে প্রশ্নে অপু আরেকবার বিপদের আভাস পেল। সুপ্ত যদি সত্যিটা বলে দেয়? এই মুহূর্তে সে তো অস্বস্তিময় পরিস্থিতিতে পড়বেই সঙ্গে বাবার কানেও সংবাদটা পৌঁছাতে সময় লাগবে না। আসন্ন বিপদের শঙ্কায় অপু তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
“ভাইয়া! হ্যাঁ, উনি আমার ভাইয়া হন।”

সুপ্ত বিশেষ কোনো হেলদোল দেখাল না সেই উত্তরে। অবাক হওয়ার ক্ষমতা তার চলে গেছে যেন। অপুর অস্থির দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে দৃঢ় গলায় বলল,
“আর উনি আমার আপা। তাইনা আপা?”

প্রশ্নটা অপুর পানে ছুড়ে চেয়ারে আরেকটু গা এলিয়ে দিলো সে। অপু প্রত্যুত্তরে কিছুই বলতে পারল না। তিথি ভ্রু কুচকে বলল,
“তোমরা কোন সম্পর্কের ভাইয়া-আপা?”
উত্তরটা সুপ্তই দিলো,
“ভার্সিটির সিনিয়র-জুনিয়র। পারিবারিক সম্পর্কের নয়।”
নিগার হেসে বললেন,
“ওহহ আচ্ছা। তাহলে তো ভালোই। সব চেনাজানার মধ্যেই।”

অপু হাপ ছেড়ে বাঁচল। অন্তত একটা দিক সামাল দেওয়া গেছে। তন্ময় খাওয়ার মাঝে বলে উঠল,
“কিন্তু এখন থেকে আপা নয়, ভাবী ডাকবি ওকে।”
সুপ্ত সজোরে তার বিশাল হাতের থাবা হানল তন্ময়ের কাঁধে। হাসির ছলে বলল,
“বিয়েটা হোক আগে। ততদিন নাহয় পুরোনো সম্পর্কটা থাকুক। কী বলেন আপা?”

ব্যথায় তন্ময়ের মুখটা এক মুহূর্তের জন্য নীল হয়ে গেল। তবে সুপ্তের ঠোঁটে মশকরার হাসি দেখে বিশেষ প্রতিবাদ করতে পারল না। কিন্তু অপু ঠিকই বুঝল। জোরপূর্বক হেসে বলল,
“ঠিক আছে ভাইয়া।”

তিথির দৃষ্টি কিছুটা সন্দিগ্ধ। সুপ্ত এসেই যেভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে তাকিয়ে ছিল অপু ও তন্ময়ের পানে তাতে মনে হয়েছিল বিরাট এক ক্ষো’ভ পুষছে সে দুজনের প্রতি। কিন্তু হুট করে সেই ভঙ্গিমার পথ বদল হয়ে এতটা সুগম হয়ে ওঠার মানে তার কাছে অস্পষ্ট। কিছু একটা ব্যাপার সে ধরতে পারছে না। সে আবার জিজ্ঞেস করল,
“তোমাদের পরিচয় কীভাবে সুপ্ত ভাইয়া?”
“এক্সিডেন্ট করেছিলাম যেদিন, আপা খুব হেল্প করেছে আমায়। সেখান থেকেই পরিচয়। তখনই বুঝেছি, আপা খুবই দয়াবতী।”
“ওহহ, আই সী!” তিথি বলল। এরপর অপুকে উদ্দেশ্য করে আবার বলল,
“তুমি তো কিছুই খেলে না।”
অপু সৌজন্যের হাসি হেসে বলল,
“খেয়েছি তো। আর খাব না।”

খানিক বাদেই সবাই উঠে পড়ল শপিংয়ের জন্য। সুপ্তও সঙ্গ নিল। অপুর হৃৎপিণ্ডটা যেন কেউ হাতুড়িপেটা করছে। শেষ কবে এতটা ভয় পেয়েছে সে মনে করতে পারল না। ধরা পড়ার ভয় ওকে কাবু করে ফেলছে প্রতিনিয়ত। অথচ তার বিন্দুমাত্র ভয় পাওয়ার কথা নয়। সে তো প্রেম করেনি যে দায় নেবে। বরং ঝামেলায় পড়ার কথা সুপ্তের। কিন্তু মস্তিষ্ক তাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। লোকটাকে সে যতটুকু চিনেছে কিছু তো একটা ঘটাবেই। অপু নিগার আন্টির পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। বাকিটা সময় আন্টির পাশ থেকে নড়ল না। তন্ময় কিংবা সুপ্ত কেউই ওর নাগাল পেল না। অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করার পর তিথি তন্ময় ও অপুর কিছুটা একান্তে সময় কাটানোর প্রয়োজনবোধ করে মাকে নিয়ে আলাদা চলে গেল। অপুর মনে হলো তাকে কেউ মাঝ নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে গেল। ছোটোবেলার মতো মেঝেতে শুয়ে হাত-পা ছুড়ে কাঁদতে ইচ্ছে হলো খুব। এ কেমন পরিস্থিতিতে নিপতিত হয়েছে সে!

তন্ময় পাশে এসে বলল,
“চলো ওদিকটায়। আমাদের এঙ্গেজমেন্ট-এর রিং চুজ করি নাহয়। খুব বেশিদিন তো নেই আর।”
অপু পাশ ফিরতেই সুপ্তকে দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। সাপের মতো ঠান্ডা দৃষ্টি তারই দিকে নিবদ্ধ। অপু বলল,
“আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।”
তন্ময় উদগ্রীব হয়ে উঠল,
“তাই মনে হয় খেতে পারলে না। আগে বলবে তো? বেশি খারাপ লাগছে?”
বলতে বলতে তন্ময়ের হাতটা আবারো অপুর আঙুলগুলো স্পর্শ করল। উফ! এই ছেলেটা এত গায়ে পড়ে কেন? অপু বিরক্তি, রাগ ও ভয় একইসাথে সংযত করে তড়িঘড়ি করে হাত সরিয়ে নিল। ছোটো করে বলল,
“ঠিক বুঝতে পারছি না।”

সুপ্ত স্মিত হাসি দিয়ে পকেটে হাত রেখে এগিয়ে এলো।
“আমি বুঝতে পারছি।”
“কী?” তন্ময় জানতে চাইল।
“আপা বোধহয় বাড়ি ফিরতে চান। অসুস্থ কিনা!”
অপু মাথা নাড়ল। সে সত্যিই বাড়ি ফিরতে চায়। মুক্তি চায় এ দ্বৈত উত্তেজনাকর পরিস্থিতি থেকে। তন্ময় চিন্তিত হয়ে ওঠে,
“আগে বরং হসপিটালে যাই।”
“আহ কী দরদ!” সুপ্ত বিড়বিড় করল। তন্ময় না শুনলেও অপুর সে কথা ঠিকই কর্ণগোচর হলো। অথবা সুপ্ত শোনালোই শুধু অপুকে। সে বলল,
“হসপিটালে যেতে হবে না। বাড়ি গিয়ে রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাব।”
তবুও তন্ময়ের চিন্তা কমল না। জানতে চাইল,
“তুমি গাড়ি অবধি হেঁটে যেতে পারবে?”
“পারব পারব, খুব পারব।”

তন্ময় অপুকে নিয়ে পার্কিং লটে চলে এলো। বলাবাহুল্য সুপ্ত পিছু ছাড়েনি। গাড়িতে উঠতে যাবে সেই সময় অপু বাধা দিয়ে বলল,
“আমি রিক্সায় করে চলে যাচ্ছি। এটুকুই তো পথ। আপনি বরং মা-বোনের সঙ্গে থাকুন।”
“তা কী করে হয়। ওদের ফোন করে বলে দিচ্ছি। তোমায় পৌঁছে দিয়ে ফিরব।”
“প্লিজ! আই নিড সাম স্পেস।”
তন্ময় কিছুক্ষণ চুপ রইল। কী বুঝল বোঝা গেল না। মাথা কাত করে বলল,
“ওকে দ্যান, চলো রিক্সা ঠিক করে দেই।”

অপুকে রিক্সায় তুলে দেওয়া অবধি সুপ্ত চুপ রইল। রিক্সা দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করতেই তন্ময় দাঁত বের করে বলল,
“কেমন দেখলি?”
সুপ্ত সে কথার উত্তরে গেল না। ওর দৃষ্টি তন্ময়ের হাতের রোলেক্স ঘড়িটায়। ছেলেটা ব্র‍্যান্ড নিয়ে বেশ সচেতন। সুপ্ত খপ করে ওর হাত ধরে বলল,
“বাহ! ঘড়িটা কবে নিলি?”
“মাসখানেক হলো।”
কথার মাঝে টানাটানি করে তন্ময়ের হাত থেকে ঘড়িটা প্রায় ছিনিয়ে নিল সুপ্ত। এরপর তন্ময়কে মর্মাহত করে সেটা সজোরে নিক্ষেপ করল পিচঢালা পথে। তন্ময় হতবিহ্বল হয়ে দেখল। টের পেল তার ঘড়ির ওপর দিয়েই শুধু একের পর এক গাড়ির চাকা ছুটে যাচ্ছে না বরং তার বুকের ওপর দিয়েও যাচ্ছে। মাথায় হাত দিয়ে চ্যাচিয়ে বলল,
“কী করলি ভাই! আমার সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার ঘড়ি!”
“হু কেয়ার’স!”
সুপ্ত কাঁধ ঝাকিয়ে বাইকে উঠে গেল। তন্ময়ের শোকাহত মুখের দিকে তাকিয়ে বলে গেল,
“ফুলকে ছোঁবে আর কাটার আঘা’ত পাবে না সে তো অলীক কল্পনা।”

তন্ময়কে ফেলে তার বাইক ছুটে গেল অপুর রিক্সার পেছনে। কিছুদূর গিয়ে ধরেও ফেলল। রিক্সার গতি রোধ করে বাইক থামাল সে। আচমকা ব্রেক কষায় অপু পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। সম্মুখের মানুষটাকে দেখে সে আরেকদফা ভড়কায়। সুপ্ত অপুর হাত চেপে ধরে নামিয়ে নেয় রিক্সা থেকে। ভাড়া মিটিয়ে তাকে টেনে নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড় করায়। ওর হাত ঠিক সেখানটাতেই চেপে বসেছে যেখানটায় তন্ময় একটু আগে ধরেছিল। অপু আ’র্তনাদ করে ওঠে।
“আহ! লাগছে…”
“লাগুক।” সুপ্তের নিরুত্তাপ উত্তর।
“আমি ব্যথা পাচ্ছি।”
“আর আমার ব্যথা চোখে পড়ে না?”
“এতে আমার কী দোষ?”
“একজন বারবার হাত ধরে টানাটানি করছে আর বলছো এতে আমার কী দোষ? তুমি প্রশ্রয় না দিলে ও সাহস পায় কীভাবে?”

অপু নিশ্চুপ। পড়ন্ত বিকেলের হিমেল হাওয়া তার কপালে ঘাম হওয়া আটকাতে পারছে না৷ সুপ্ত অতি সুক্ষ্ম অথচ নি’ষ্ঠুর স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠল,
“কী যেন বলছিলে? আমি ভাইয়া?”
অপু মিনমিন করে উঠল,
“আপনিও তো আমায় আপা ডেকেছেন।”
“তো কী ভাইয়া ডাকার বিপরীতে খালা ডাকব?”
সুপ্তের গলার স্বর চড়ে গেল। আশেপাশের মানুষ মুখ ফিরিয়ে তাকাল তাদের দিকে। অপুর চোখ ছলছল করে ওঠে। তা দেখে সুপ্ত মাথা চেপে ধরে। বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে, “ওহহ আল্লাহ! এর বিহিত না করা অবধি ধৈর্য দাও আমায়।”
কিছুটা শান্ত হয়ে তিরস্কারের সুরে বলল,
“তুমি বানালে ভাইয়া, আমি বানালাম আপা। অথচ আমার হওয়ার কথা তোমার বেবীর পাপা। তন্ময় ঠিক নামই দিয়েছে, তুমি আস্ত বাংলিশ ফুল!”

অপুর নাক ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। রেগে গিয়ে বলল,
“পেয়েছেনটা কী আমায়? সবকিছুর দায় আমারই হবে কেন? আপনার ভাইয়ের জন্য মেয়ে কোথায় দেখা হচ্ছে আপনি খোঁজ নিতে পারলেন না?”
সব উত্তর যেন আজ সুপ্তের জিভের ডগায় বসে আছে। তাচ্ছিল্য করে বলল,
“কী করে নেব? যার মন পাওয়ার জন্য, যার বাপের মনের মতো হওয়ার জন্য এদিকে আমি চাকরির পেছনে খেটে ম’রছি উনি কিনা আমারই ভাইয়ের বউ হতে তৈরি হচ্ছেন? ভাবী হওয়ার খুব সাধ জেগেছে তাই না? ওই বিদেশী গা’ধার ব্যবস্থা তো আজই করছি। সুপ্তকে তো চেনোনি! একটা কথা কান খুলে শুনে অন্তরে গেঁ’থে নাও, তুমি আমার উডবি গার্লফ্রেন্ড। অন্যকারো উডবি বউ হওয়ার কথা ভাবলে ঠ্যাং ভেঙে দেব। শুধু ঠ্যাং না, হাতও ভাঙব যদি আরেকদিন তন্ময়ের সঙ্গে হাত ধরাধরি করতে দেখেছি।”
“হু’মকি দিচ্ছেন?”
“উহুম, শুধু ইনফর্ম করছি।”
“গু’ন্ডা কোথাকার!”

চলবে..

#সুপ্ত_অনুরাগে
#প্রভা_আফরিন
[২১]

বিকেলের ম্লান রোদে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে সুপ্ত ও অপরাজিতা। সম্মুখের সরু পথে একটু পর পরই ছুটে যাচ্ছে যানবাহন। সেই ছুটে চলার ঝাপটায় সৃষ্ট বাতাস এসে জড়িয়ে নিচ্ছে দুটি মানব-মানবীকে। যাদের মনে এখন সত্যিই শান্তির বাতাস প্রয়োজন। অপুর মুখটা ভার। চোখ ছলছল করে আবার শুকিয়ে যাচ্ছে। কান্নাটা এসেও আসছে না, আবার গিয়েও যাচ্ছে না ধরনের একটা বিচ্ছিরি অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থান করছে। অপু অবশ্য কাঁদতে চাইছেও না। চোখের জল দেখিয়ে নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করার সাধ একদমই নেই। তাও আবার এমন চূড়ান্ত অপমান করা লোকের সামনে? কক্ষনো না।

অপু ছোটোবেলা থেকে স্বভাবতই বাবা-মায়ের বাধ্যগত, শান্তশিষ্ট মেয়ে হওয়ায় বকাঝকা খুব একটা কপালে জোটেনি। আর না প্রেম নামক কোনো বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে কারো অধিকারবোধ নিজের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে দিয়েছে। তার নিজের ওপর আপন অধিকারবোধটাও ফসকা বাধনের মতো। কিংবা বলা যায়, নিজের ওপরও যে নিজের কর্তৃত্ব থাকে সেই বিষয়টা কদাপি তার ভালো মেয়েসুলভ মস্তিষ্কে আগমন ঘটেনি। ফলে সুপ্তের এই অধিকারবোধ, বকাঝকা কিংবা সুক্ষ্ম বাক্যের অপমান তাকে একটু বেশিই পীড়ন করছে। সৃষ্টি করছে টানাপোড়েন, অস্থিরতা। নতুন করে নিজের স্বভাবের সঙ্গে পরিচয় ঘটাচ্ছে, যা তাকে থেকে থেকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। তন্ময় ও সুপ্ত, মানুষ দুটি এসে তার গতানুগতিক, সাজানো দুনিয়াতে বারবার ভূমিকম্পের উদ্ভব ঘটাচ্ছে। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ অপু নিজের স্বভাবগুলোকে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করছে, যা এক প্রকার মানসিক যন্ত্রণাও বটে।

সুপ্ত শক্তমুখে দাঁড়িয়ে আছে। শিরায় শিরায় ক্রোধের উত্তাপ। তন্ময়ের সেদিন হেয়ালি করে বলা কথাটা বিধাতা কীভাবে যে মিলিয়ে দিলো? শেষে কিনা তারই ভালোবাসার মানুষের ওপর তন্ময়ের দুর্বলতা! শুধু দুর্বলতাই নয় একেবারে আইনত দখল করার তোড়জোড় স্বরূপ বিয়ের কথাবার্তা চলছে! তন্ময়ের ভাগ্যের ওপর বিধাতা বোধহয় একটু বেশিই প্রসন্ন। অন্যদিকে সুপ্তের ওপর বিরূপ। তাই দুজনের পছন্দ সর্বদা এক তো বটেই কিন্তু সেই পছন্দের ভাগ শুধু তন্ময়ই ভোগ করার সুযোগ পায়।

সুপ্তের ধৈর্যের বাধে ফাটল ধরেছে এবার। মাকে নাহয় দিয়ে দিতে হয়েছে। কারণ সেই বিষয়টা তার জ্ঞান হওয়ার আগেই ঘটে গেছে। তাছাড়া তার বাবা-মায়ের সম্পর্কটা সেখানে মুখ্য। তারা একসঙ্গে থাকতে চায়নি বা পারেনি। অতএব সুপ্ত ছোটো থেকেই সেই বিষয়টা আরোপিতভাবে গ্রহণ করে বড়ো হয়েছে। কিন্তু এবার সুপ্তের সম্পূর্ণ জ্ঞান ও পরিস্থিতিবোধ আছে। এই বোকা মেয়েটা বুঝেও না বোঝার ভান করলেও সে জানে অপরাজিতা তার প্রতি কিঞ্চিৎ পরিমাণ হলেও দুর্বল। যাকে ভালোবাসায় অলংকৃত করার চেষ্টা সুপ্ত নিরন্তর করে যাচ্ছে। সফলতা এই ভীতু নারীর সমর্পণের অপেক্ষা মাত্র। এমন অবস্থায় তন্ময়ের অযাচিত হস্তক্ষেপ সে বরদাস্ত করতে পারবে না। কিছুতেই না।

অপু নীরবতা খন্ডন করে বলল,
“আমি ফিরব।”
সুপ্ত ফিরে তাকাল। উপেক্ষিত স্বরে বলল,
“তো দাঁড়িয়ে আছো কেন?”

অপুর মনে হতো তার ক্রোধ তারই মতো নম্র, ভদ্র। মারাত্মক দরকার ছাড়া অহেতুক বিষয়ে তারা উঁকি দেয় না। কিন্তু সম্মুখের চরম নির্লজ্জ লোকটির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর অপুর সেই ধারণা প্রতিনিয়ত ভেঙে গুড়ো গুড়ো হয়ে গেছে। নিজেকে বদরাগী মনে হয়। যেমনটা এখন হলো। তাকে রিক্সা থেকে নামিয়ে, হু’মকি ধামকি দিয়ে এখন বলছে দাঁড়িয়ে আছো কেন? অবশ্য এটা মারাত্মক নাকি অহেতুক রাগ সেই তর্কে যাওয়ার মানসিকতা অপুর নেই। অপু পায়ের ওপর সমস্ত রোষ ঢেলে ধুপধাপ পদধ্বনি বাজিয়ে এগিয়ে চলল পথের ধার ঘেঁষে। বেশিদূর যেতে হলো না। সুপ্ত আবারো তার উড়ালপঙ্খী ছুটিয়ে এসে পথ রোধ করল। চিবুকের কাঠিন্য তখন মজবুত, চাহনি দৃঢ়। ঠান্ডা স্বরে বলল,
“উঠে এসো।”
“পা’গল! সামনেই আমার এলাকার। বদনাম না করলে আপনার হচ্ছে না?”
সুপ্তের ক্রো’ধানলে জ্ব’লতে থাকা ওষ্ঠদ্বয় কিঞ্চিৎ ধ’নুকের ন্যায় হেসে উঠল। বলল,
“এক কাজ করা যাক।”
অপুর সেই হাসি সুবিধার মনে হলো না। সন্দিগ্ধ কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“কী?”
“তোমাকে বাড়ি ফিরতে না দেই বরং। আমার কাছে আটকে রাখি। মাঝরাতে নাহয় বাইকে করে পৌঁছে দেব। গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে একটু দুষ্টুমিও করে নেব। তুমি চিৎকার করবে। এলাকার লোক জড়ো হবে। আমাদের ধরেবেধে বিয়ে পড়িয়ে দেবে।”

অপুর মুখশ্রীতে বিস্ময়, সংশয়, লজ্জা ও ক্রোধ চৌপথে আ’ক্র’মণ করে বসল। মিশ্র প্রতিক্রিয়ার কবলে কণ্ঠ রোধ হয়ে এলো। নিজেকে সংবরণ করতে সময়ও লাগল খানিক। এরপর তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আওড়াল,
“জঘন্য!”
“তোমার মতো অতি ভদ্র মেয়ের কপালে জঘন্যই জুটবে, মিলিয়ে নিয়ো। এবার উঠে এসো। গলির মাথায় নামিয়ে দেব।”

অপু উঠল না। সুপ্তের কণ্ঠ তীক্ষ্ণ হয়,
“তন্ময়ের মতো হাত ধরে ওঠাতে হবে? বেবী ফ্লাওয়ার কিনা!”

তন্ময়ের নাম জড়িত অ’ত্যা’চার থেকে বাঁচতে অপু উঠে বসল। নির্লজ্জদের সাথে তর্কে যাওয়া মানে নিজেও নির্লজ্জ হওয়া। অবশ্য অপু সতর্ক করতেও ভুলল না তাকে যেন আগেই নামিয়ে দেওয়া হয়। সুপ্ত তখন সম্মতি দিলেও পরবর্তীতে কথাটা রাখল না। ঝড়ের গতিতে গিয়ে পৌঁছাল অপুদের বিল্ডিংয়ের সামনে। অপু আতঙ্কে চাপা চিৎকার করে উঠল,
“কী করলেন?”
সুপ্ত শ্রাগ করে বলল,
“ব্রেইনটাকে বাপের আলমারিতে তুলে না রেখে একটু ব্যবহার করো। আমি তন্ময়ের ভাই। এ পরিচয়টাই যথেষ্ট। নাকি আরো ভেঙে বোঝাতে হবে?”

অপু ভয়ে কোনো কথা না বলে ছুটল গেইটের দিকে। সুপ্তও দ্রুত পদে তার পিছু নিল। সিড়িতে ওঠার আগেই অপুকে ধরে ফেলল সে। অপু ভীতু, উত্তেজিত, চাপা স্বরে বলল,
“কেন আসছেন পিছু পিছু? আমাকে শেষ না করলে আপনার হচ্ছে না? দয়া করুন, প্লিজ! চলে যান।”
সুপ্ত তখন প্রশস্ত হেসে এমন এক কান্ড ঘটাল, অপু স্থানেই জমে গেল।
_________________

অপু যখন সুপ্তের বাইক থেকে নামল সেই দৃশ্য তিন তলা থেকে দেখতে পেল বেলী। শুধু দেখেই ক্ষান্ত হলো না, আগের বারের মতো যেন এবারও প্রমাণ ফসকে না যায় তাই মাকে তড়িৎ ডেকে তা দেখাতেও ভুলল না।
“তোমরা শুধু আমাকেই দোষারোপ করে গেলে। এবার নিজের চোখে দেখো মেয়ের কান্ড। আমার মুখের কথা তো বিশ্বাস হয় না। দুদিন পর দেখবে পাড়া-পড়শীরাও কানাঘুষা করছে। তোমার মেয়ে বহুত সেয়ানা। এমন ভান করে চলে যেন তার মতো সরল, ভালো মানুষ দুটো নেই। বাবার পছন্দে বিয়ে করে নেবে। অথচ ভেতরে ভেতরে যে কী করে বেড়ায় খবরও জানো না। মাঝরাতে অবধি বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। তোমাদের বিশ্বাসের ব্যবহার করছে।”

জাহেদা বেগম অবাকের চরম পর্যায়ে। অপু তার সবচেয়ে নির্ঝঞ্ঝাট সন্তান। মেয়েটার মনে নেতিবাচক গুণ খুবই নগন্য। একটা বন্ধুও ঠিকমতো বানাতে পারত না। সেখানে ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা! তাও কিনা যখন বিয়ের কথাবার্তা এগোচ্ছে! বেলীর কথায় জাহেদা বেগম কেমন দ্বিধায় পড়ে গেলেন।

অপু বাড়ির কলিংবেল যখন চাপল তখনও অনেকটা ঘোরের মাঝে বিচরণ করছে। মস্তিষ্ক যেন জলশূন্য কলসের মতো ফাকা। দরজা খুলল বেলী। তেরছা হেসে বলে উঠল,
“বিশেষ বন্ধুকে গেইট থেকে ফিরিয়ে দিলি? বাড়িতে ডাকতি।”

অপুর হাত-পা হিম হয়ে এলো। ফাকা মস্তিষ্ক এবার আতঙ্কে ভরে উঠছে। কোনোভাবে কী আপু দেখে ফেলল! তুতলে উঠে বলল,
“কী বলছো বুঝলাম না।”
“কেন যার বাইকে করে এলি, তার কথা বলছি।”

জাহেদা বেগম তখন মুখ খুললেন। বললেন,
“কে নামিয়ে দিয়ে গেল তোকে? কী সম্পর্ক তার সঙ্গে?”
অপু খাবি খাওয়া মাছের মতো হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তন্ময় সুপ্তের আত্মীয়তা সম্পর্কে জানা, সুপ্তের রাগ, বকাঝকা, নিষেধ সত্ত্বেও বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যাওয়া এরপর সিড়ির কাছে… এতসব ঝামেলা একই দিনে তাকে কোনঠাসা করতে উদয় হতে হলো! এখন আবার মা-বোনের জেরা। দিনটা তার জন্য ঘোর অমঙ্গলের। ক্যালেন্ডারে মার্ক করে রাখবে নিশ্চয়ই। জাহেদা বেগম উত্তর না পেয়ে কণ্ঠস্বর আরেকটু কর্কশ করলেন,
“কী হলো? উত্তর দিচ্ছিস না কেন? ছেলেটা কে?”

অপুর মাথায় তখনই সুপ্তের বলা কথাটা হিট করে গেল। সুপ্ত তন্ময়ের ভাই। এই কথাটাই যথেষ্ট। বলল,
“উনি তন্ময় চৌধুরীর ভাই হন। নিগার আন্টি শপিংয়ে ডেকেছিল জানো নিশ্চয়ই। ফেরার পথে ড্রপ করে দিয়ে গেছে। বিশ্বাস না হলে ফোন করে জেনে নাও।”

ফোন করে জেনে নেওয়ার কথাটা একটু দুঃসাহসিক হয়ে গেল। সুপ্ত তাকে ড্রপ করবে সেটা কেউই জানে না। নিজের মিথ্যেয় অপু নিজেই চমকিত। একেই বলে সঙ্গদোষ। লোকটা তাকে বিগড়ে দিচ্ছে! অপু উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে বুঝে রুমে চলে যেতে নিলে জাহেদা বেগম কণ্ঠ নরম করে বললেন,
“নিচে থেকেই বিদায় দিলি? বাড়িতে আসতে বললি না?”
“বলেছি, উনি আসলেন না।”
অপু আরো মিথ্যা বলার হাত থেকে বাঁচতে তড়িঘড়ি করে প্রস্থান করল। জাহেদা বেগম বেলীর দিকে অসন্তুষ্ট হয়ে তাকালেন।
“আমার মেয়ে বিগড়ে যায়নি। তুই নিজের বিগড়ানো মাথাটা ঠিক কর।”
বেলী আরো একবার ভুল প্রমাণিত হয়ে উত্তর দেওয়ার ভাষা পেল না।
_________________

সন্ধ্যা গড়িয়েছে সবে। সারা দিনের হাঁসফাঁ’স করা অনুভূতি থেকে মুক্তি পেতে অপু গোসল করে নিল। ভেজা চুল টাওয়াল থেকে অবমুক্ত করতেই খেয়াল হলো ফোন বাজছে। তন্ময়ের ফোন। অপুর ইচ্ছে হয় না রিসিভ করতে। ক্রমাগত বেজে চলায় অনিচ্ছায় কথা বলতে হলো,
“হ্যালো!”
“এখন কেমন আছো, ফুল?”
অপুর বলতে ইচ্ছে হলো,
“একদমই ভালো নেই। আপনারা দুই ভাই আমার শান্তি কেড়ে নিয়েছেন।”
কিন্তু মুখ ফুটে বলল,
“ভালো। শুধু মাথাটা ধরে আছে।”
“মাথা ধরাটা শারীরিক নাকি মানসিক?”
“মানে?”
তন্ময় ফোনের ওপাশে স্মিত হাসল। বলল,
“যদি মাথা ধরাটা শারীরিক হয় তবে বলব মেডিসিন নিয়ে শুয়ে পড়ো। আর যদি মানসিক হয় তবে বলব কারণটা অনুসন্ধান করে তার নিষ্পত্তি করে ফেলো। অসুখ জিইয়ে রাখা ঠিক না। আমার দ্বারা ডিস্টার্ব হলে জানিয়ো। স্পেস দিতে কার্পণ্য করব না।”
“আপনি কী সেই কথাটায় মাইন্ড করেছেন?”
“উহুম, আমি চাই বাবার ইচ্ছেয় নয় তুমি নিজের ইচ্ছেয় বিয়েতে মত দাও। বাকি জীবনে কিন্তু পরিবার সবসময় পাশে থাকবে না। আল্লাহ না করুক এমন পরিস্থিতি এলো যখন তোমার আশেপাশে কেউ নেই সঠিক পরামর্শ দেওয়ার। তখন কিন্তু নিজের ওপর নির্ভর করেই ডিসিশন নিতে হবে। যদিও পরিস্থিতি মানুষকে অনেক কিছুই শিখিয়ে দেয়, তবুও আগে থেকেই নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস, আত্মনির্ভরতা থাকা ভালো।”
“আপনি খুব সুন্দর কথা বলেন।”
“আমি মানুষটাও সুন্দর। একটু চেয়েই দেখো না।”

অপু ফোন রাখল। এখন আর কথা ভালো লাগছে না। সঙ্গে সঙ্গে সুপ্তের ফোন এলো। রিসিভ করা মাত্রই ভারী কণ্ঠস্বরের মালিক রাগান্বিত হয়ে বলল,
“কী ব্যাপার? পৌঁছে দিয়ে এলাম ঘন্টাও পেরোলো না, এরই মাঝে ফোন বিজি! তন্ময়ের সঙ্গে রঙ্গতামাশা জুড়ে দিয়েছো?”

অপু অতিষ্ট মেজাজে চোখ বুজল। এই দুই ভাই তাকে নির্ঘাত পা’গল করে ছাড়বে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here