রঙ চা পর্বঃ১৯,২০

রঙ চা
পর্বঃ১৯,২০
লেখা – মাহফুজা_মনিরা

কাল থেকে পিউ’র ফাইনাল পরীক্ষা। তাই নম্রতা সকাল সকাল এসেছে ওকে পড়ার ব্যাপারে খুটিনাটি দেখিয়ে দিতে। এরপর আবার ভার্সিটিও যাবে সে। কথার ছলেই পিউ’র থেকে নিশুতি নামক মেয়ের সব ডিটেইলস জেনে নেয় নম্রতা। এটাও জেনে নেয় যে নিশুতি এখন বাড়ি নেই। অনেকদিন যাবত তার কাকার বাসায় বেড়াতে গেছে।
তাদের পাশেই একটু দূরত্ব নিয়ে বসে আছে প্রত্যুষ। কপালে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ভাঁজ তার। মেজাজ গরম হচ্ছে প্রচুর। কালকে থেকে প্রায়াণের নাম্বারে ফোন করে যাচ্ছে,কিন্তু ফোন লাগছে না।
একপর্যায়ে বিরক্ত হয়েই প্রত্যুষ বলে উঠলো,
———আম্মু আপনার ছোট নবাবের তো ফোনই লাগছে না। ফোন বন্ধ তার।

মিনু শেখ পান বানাচ্ছিলেন। বানাতে বানাতেই বললেন,
———নম্রতা তোমার সাথে প্রায়াণের কথা হয়েছে মা?
নম্রতা মাথা নাড়ায়। তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
———ওর সাথে আমার গত দুদিনেও কথা হয়নি!!
মিনু শেখ আহাজারি করতে করতে বলেন,
———প্রত্যুষের অফিসে প্রায়াণের জন্য একটা ভালো পোস্টের কথা বলে রেখেছিল প্রত্যুষ। সেখানে কাল ইন্টারভিউ। অথচ দেখো,ওকে হারিকেন খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না। কি ঝামেলায় পড়লাম বলো দেখি মা!
নম্রতা ম্লান মুখে বললো,
———আমি আর কী বলবো আন্টি!
প্রেমা ধোঁয়া উঠা চা’য়ের কাপ নিয়ে আসে। সে হালকা কণ্ঠে বলে,
———হয়তো ভাইয়ের ফোনে নেটওয়ার্ক পাচ্ছে না।
প্রত্যুষ কিরকির করে উঠে রাগে। বললো,
———বরিশালের মেইন শহরের সব জায়গায় সব সিমের নেট পাওয়া যায়।
নম্রতা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,
———-নিশুতি কে খুঁজি তাকেও পাই না। প্রায়াণ কেও পাই না। কি আজব!
কথাটা বলে নিজেই থতমত খেলো নম্রতা। সে কেনো এই কথা বলতে গেলো কে জানে। কিন্তু তার কথা শুনে তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সবাই।
নম্রতা মাথা নিচু করে ফেলে। মিনু শেখ বলে উঠেন,
——–তোমার কী কোনো সন্দেহ হচ্ছে নম্রতা?
নম্রতা আমতা আমতা করে বলে,
———কি জানি! নিজেও জানিনা। এমনিই বললাম আর কি।

প্রত্যুষ কে উদ্দেশ্য করে মিনু শেখ বলেন,
———জানিস,শেষ যখন প্রায়াণের সাথে আমার কথা হয়,তখন আশেপাশে একটা মেয়ে কণ্ঠ শুনেছি আমি। ঠিকভাবে শুনতে পারিনি তাই বলতেও পারবো না কার কণ্ঠ কিন্তু কণ্ঠ টা আমার অনেক পরিচিত মনে হচ্ছিল।
পিউ মাঝখান দিয়ে বললো,
——–মা ভাইয়া তো তার খেলার কোনো সরঞ্জাম বা জামা কাপড় কিছুই নিয়ে যায়নি।
মিনু শেখ কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রত্যুষ কে বললো,
———ওর স্পোর্টস টিমের লিডার কে ফোন লাগা। জিজ্ঞেস কর তাকে। নাম্বার আছে না তোর কাছে?
———হুম আছে আম্মু।
.
.
প্রত্যুষ ফোনে কথা বলার পর মিনু শেখ কে যেটা বললো,সেটা শুনে শুধু মিনুই না,ওখানে থাকা প্রতিটা মানুষই যারপরনাই অবাক হয়।

প্রত্যুষ বললো,
———-ওদের নাকি কোনো খেলা নেই বরিশালে আর ওর লিডার ও ঢাকায়। তাহলে ও কার সাথে গেছে বরিশাল?
কি জন্য গেছে বরিশাল?

পিউ উত্তর দিলো,
———–ভাইয়া তলে তলে টেম্পু চালাচ্ছে আর আমাদের জানালো না! হুহ। এবার আসুক ভাইয়া।

মিনু শেখ কঠিন গলায় বলে,
———-ও যেখানে আছে সেখানেই থাকুক। ওর আর জায়গা হবে না এই বাসায়।

কেউ আর কোনো কথা বাড়ালো না। প্রত্যুষ চুপচাপ নিজের অফিসের জন্য বের হয়ে গেলো। আর পিউ,স্কুলের জন্য। মিনু শেখ নিজের রুমে চলে গেলেও সোফায় বসে রইলো একা নম্রতা। বুকের ভেতরে নাম না জানা এক তুফান উঠেছে। তাহলে প্রায়াণ কে পাওয়ার যেটুকু আশা ছিল,সেই আশার প্রদীপ ও নিভতে চললো?

প্রেমা চায়ের কাপ গুলো রান্নাঘরে নিয়ে আসে। কাপের ঠান্ডা চা বেসিনের উপর ঢালতে ঢালতে প্রেমা বিরবির করে,
———প্রায়াণ ভাইয়া তুমি যে কতবড় বাশ খেতে চলেছো,তা তুমি নিজেও টের পাবা না।
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
.
.
কোলাহলের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় নিশুতির। মিটমিট করে চোখ খুলে দেখে প্রায়াণ তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্ছে। প্রথম যেদিন,এমন হয়েছিল। সেদিন নিশুতির লেগেছিল লজ্জা আর অপ্রস্তুত ভাব। তবে আজ লজ্জা লাগলেও ভালো লাগছে খুব। কেনো যেনো প্রায়াণ কে নিজের মনে হচ্ছে। একদম কাছের কেউ…
নিশুতি নড়েচড়ে উঠে। তাবুর বাহিরে কোলাহলের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। নিশুতি আস্তে করে ধাক্কা দেয় প্রায়াণ কে।
——–এই যে। উঠো না…
প্রায়াণ পিটপিট করে চোখ খুলে তার। একটা হাই তুলে বলে,
———গুড মর্নিং।
———গুড মর্নিং। উঠুন না প্লিজ। বাহিরে এতো চিল্লাচিল্লি হচ্ছে কিসের। দেখেন তো।
প্রায়াণ আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বললো,
———–উহু উঠবো না। দেখবোও না।
———–কেনো??
———–এই যে তুমি আমাকে আপনি আপনি করে বলছো তাই!!
নিশুতি ছোট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
———-বাবু আমার। লক্ষী সোনা। দেখো তো বাহিরে কি হচ্ছে। যাও না!
প্রায়াণ হেসে শোয়া থেকে উঠে বসে। নিশুতির কপাল থেকে এলোচুল গুলো আঙুলের ডগা দিয়ে সরিয়ে দেয় আলতো করে। তারপর বলে,
——–তুমি বসো। আমি দেখছি।

প্রায়াণ বেরিয়ে যায়। নিশুতি কম্বলের ভেতরেই বসে থাকে। একটা স্নিগ্ধ ভালোলাগা তার সারা শরীর মন ছেয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। মনে মনে ভাবে,এভাবে যদি প্রতিটা সকাল সে প্রায়াণের স্পর্শে কাটাতে পারতো!

নিশুতির ভালো লাগার অনুভূতি চিরচির করে ফেটে যায় বাহিরের তীব্র কোলাহলে। প্রায়াণেরও গলা পাওয়া যাচ্ছে। অনেক চেঁচাচ্ছে প্রায়াণ। নিশুতি ভয় পায়। সে মাথায় ওড়না দিয়ে বাহিরে বের হয়। আর তখনি দেখে,একদল লোক তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ মোবাইল দিয়ে ছবি তুলছে অনবরত। তাদের মাঝে ফেসে আছে প্রায়াণ।
প্রায়াণ চিল্লিয়ে বলে,
——–নিশুতি তুমি ভেতরে যাও।
সে কথা নিশুতির কান অব্দি গেলেও সে যায় না। তার পা যেন জমে গেছে ভয়ে। এসব কি হচ্ছে,সেটাই ভাবতে থাকে তার ব্রেইন।
.
.
দুপুরবেলা ছাদ থেকে নামার সময় ইফতির দেখা পায় প্রেমা।

——-ইফতি।

প্রেমার ডাক শুনে ইফতি দাঁড়ায়। আবার কি জিজ্ঞেস করবে প্রেমা,কে জানে!

——জ্বি আপু।

——-নিশুতি কই?

——-এখনো কাকার বাসায়। বেড়াচ্ছে। আসবে দু-একদিন পর। কেনো?

প্রেমা সরাসরি বলে,
———নিশুতি প্রায়াণ ভাইয়ার সাথে তাইনা? তারা কোথায় আছে?

ইফতি অবাক হয়ে যায়। কি উত্তর দিবে এখন সে! ভেবেও পাচ্ছে না।

প্রেমা আবার বললো,
———বলো। আমার থেকে লুকিয়ে রেখো না প্লিজ। বাসায় সমস্যা হচ্ছে আমাদের।

ইফতি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
——–প্রায়াণ ভাইয়া আর নিশুতি সিলেট আছে।

কথাটা শুনে প্রেমা একটুও চমকায় না৷ সে যেন জানতোই এমন কিছু।
নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সে বললো,
———-ওখানে কেনো?
ইফতি বলে,
———-আমি নিজেও জানিনা কিভাবে প্রায়াণ ভাইয়া ওখানে। যাওয়ার কথা ছিল একা নিশুতির। কিন্তু কয়েকদিন বাদে নিশুতিই জানায় ওখানে প্রায়াণ ভাইয়াও নাকি আছে ওর সাথে।
——-ওহ।
———হুম আপু।

মিনু শেখের চিল্লাচিল্লি শোনা যায় হঠাৎ করেই। প্রেমা অবাক হয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় ঢোকে তার। ইফতি দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রয়।

প্রেমা ঢুকেই দেখে টিভি তে খবরে প্রায়াণ ও নিশুতির ছবি দেখাচ্ছে।

খবর টা এরকমঃ
সিলেটে ঘুরতে যাওয়ার নাম করে অবিবাহিত যুবক যুবতীর একসাথে বসবাস। হাতে নাতে ধরা…

আর সেখানে প্রায়াণ নিশুতির ছবিও আছে।

মিনু শেখ ফোনে প্রত্যুষ কে বলেন,
——-তুই খবর দেখছিস?? ঐ মেয়ের জন্য আমার ছেলেটা এভাবে মান সম্মান খোয়ালো!! আমাদের কথাও ভাবলো না একবার? তুই এখনি বাসায় আয় বাবা। আমার শরীর ভালো লাগছে না। তোর বাপকেও খবর দে এখুনি।
——–আম্মু শান্ত হও। আমি আসতেছি। তুমি শান্ত হও।

মিনু শেখ আর কথা বললো না। ধপ করে সোফার উপর বসে পড়লো। তাকে ধরলো প্রেমা। বাসায় আর কেউ নেই। প্রেমা মনে মনে বিরবির করে বললো,
———এটা তুমি কি করলে ভাইয়া!! কি করলে!!
.
.
ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে বসে আছে নিশুতি। একটা অফিসে নিয়ে এসেছে তাদের। ওখানে তাবু টানিয়ে যারা যারা ছিলো,তাদের কেও নিয়ে আসা হয়েছে। প্রায়াণ কে ডেকে নিয়ে গেছে তারা। এখনো নিশুতির মাথায় কিছুই ঢুকছে না। কোথা থেকে কি হয়ে গেলো!!

কিছুক্ষণ বাদে প্রায়াণ আসে। সাথে দুজন লোক। প্রায়াণের মুখ ফ্যাকাশে। থমথমে গলায় প্রায়াণ বললো,
——–এখুনি বিয়ে করতে হবে আমাকে। পারবা?

নিশুতি উত্তর দেয় না। শুধু মাথা কাত করে। প্রায়াণ ঐ লোকদের একজনের নাম্বার দিয়ে তার এক বন্ধুকে ফোন করে যার বাড়ি সিলেটেই।

পাক্কা চল্লিশ মিনিট পর তার বন্ধু আসে। ঢাকা থেকেও আসে দুজন বন্ধু গাড়ি নিয়ে আরো পরে।
সন্ধ্যার দিকে কাজী অফিসেই একদম সিম্পালের মধ্যে বিয়ে হয়ে যায় তাদের। ঐ লোকেরা তবুও কিছু টাকা রাখে প্রায়াণের থেকে। এরপর ছেড়ে দেয় তাদের।

বন্ধুদের সাথে আনা গাড়িতে করে প্রায়াণ নিশুতি রওনা হয় ঢাকার উদ্দেশ্যে।
নিশুতি চুপ করে বসে আছে। কান্না গুলো দলা পাকিয়ে গলায় আটকে আছে তার। প্রায়াণ যদিও চেষ্টা করছে নিশুতির সাথে কথা বলার,কিন্তু নিশুতি বলছে না কোনো কথা। আচ্ছা,এই সম্পর্কের শেষ পরিণতি কি হবে? প্রায়াণ আর নিশুতির সংসার জীবন শুরু হলো? নাকি ভালোবাসার জীবনের এখানেই শেষ?

চলবে….

রঙ চা
পর্বঃ২০
লেখা – মাহফুজা_মনিরা

প্রায়াণ নিশুতি সোফায় একদম পাশাপাশি বসে আছে। তাদের সামনা সামনি বসে আছে জালাল শেখ, মিনু শেখ, আজহার হোসেন, শারমিন হোসেন। প্রত্যুষ, পিউ,প্রেমা আর নম্রতাও আছে।
মিনু শেখ গমগমে গলায় বললো,
“তাহলে এই সেই মেয়ে যার জন্য তুই তোর পরিবারের কথা একবারো ভাবলি না? এই মেয়ে তুমি কি জাদু করেছো আমার ছেলের উপর?”

নিশুতি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। সে তো কোনো জাদু টোনা করেনি প্রায়াণের উপর। ভালোবাসা কি জাদু দিয়ে হয়! কি অদ্ভুত!

নিশুতি চুপ করে থাকে। উত্তর দেয় প্রায়াণ,বেশ শান্ত স্বরে…
“মা ও আমার বিবাহিত স্ত্রী এখন। আমরা কাল সন্ধ্যায় বিয়ে করেছি।”

এই কথাটা শোনার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না বোধহয়। মিনু শেখ অবিশ্বাস্য চোখে নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। জালাল শেখ এর চোখে আগুন। শারমিন হোসেন বলে উঠে,
“দেখছো আমি আগেই বলছিলাম না এই ছেলের সাথে তোমার ডায়নী মেয়ের লটরপটর আছে। এখন দেখলা তো? আমার কথা ফললো তো?”

আজহার হোসেন বিব্রতবোধ করেন। ধমকের গলায় বললো,
“চুপ করবা? বেশি বকবক করো।”

শারমিন হোসেন একটা মুখ ভেংচি দিয়ে চুপসে গেলেন। প্রায়াণ আবারো বললো,
“ইচ্ছাকৃত ভাবে বিয়েটা করিনি। একটা ঝামেলায় পড়ে করা লাগছে। কিন্তু যখন হয়েই গেছে,আমি এখন মন থেকেই আমার স্ত্রী হিসেবে মানি।”

“যখন এতোই স্ত্রী হিসেবে মানো,তখন এখানে কেনো এসেছো? তুই আর তোর স্ত্রীর কোনো দরকার নেই আমাদের।”

মিনু শেখ এর কথায় প্রায়াণ আহত হয়। সে আগে থেকেই জানতো তার মা এরকম কিছুই বলবে। কিন্তু ইনডাইরেক্টলি যে বাসা থেকেও চলে যেতে বলবে সেটা ভাবেনি।
প্রায়াণ ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়লেও বাহিরে তা প্রকাশ করলো না। বেশ শান্ত গলাতেই বললো,
“বেশ। তাহলে আমরা চলেই যাই। চলো নিশুতি।”

নিশুতি অবাক চোখে প্রায়াণের দিকে তাকায়। প্রায়াণ কি সত্যিই সব ছেড়ে তার হাত ধরবে!
ওরা দুজনে সোফা থেক উঠে দাড়ালে জালাল শেখ মুখ খুলেন।
ধমকে বসতে বলেন ওদের দুজন। নিশুতির ভয়ে আত্মা কেপে উঠে। সে চুপ করে বসে পড়ে আবার। প্রায়াণ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বসে। তারপর কিছুক্ষণ নিরবতা। জালাল শেখ আজহার হোসেন কে উদ্দেশ্য করে বলে,
“ছেলে মেয়ে যখন একটা ভুল করেই ফেলছে,আমরা তো সেই ভুল টাকে আরো টানতে পারিনা তাইনা?”

“জ্বি ভাই”

“আপনি কি রাজী আমার ছেলের সাথে আপনার মেয়েকে দিতে?”

আজহার হোসেন কিছু একটা ভাবেন। তারপর বললো,

“জ্বি রাজী।”

“আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে আজ থেকে আপনার ঘরের মেয়ে,আমার ঘরেরও মেয়ে।”

আজহার হোসেন মুখে টেনে হাসির রেখা ফুটান।

পিউ থেমে থেমে নিঃশব্দে হাসতে থাকে। প্রেমা ফিসফিসিয়ে বলে,
“তুই হাসতেছিস ক্যান কুত্তি? আম্মু দেখলে বকবে।”

“কি করবো আমার অনেক হাসি পাচ্ছে যে! নইলে দেখো পরিস্থিতি টা।আমি যাকে মন থেকেই চাইতাম আমার ভাবী হোক,সেই হলো। হোক সেটা ছোট ভাইয়ের।”

“তুই নিশুতিকে ভাবী হিসেবে চাইতি?”

“তা নয়তো কী? কি সুন্দর আপুনি। কথাবার্তা চালচলন সবকিছুই আমার ভালো লাগে। নাচতেও পারে। আমাকে বলছিল একবার।আর আমি চাইবো না?”

“আর আমাক চাইতে না?”
নম্রতার কথায় প্রেমা পিউ দুজনেই তার দিকে তাকায়। তারা ভুলেই গেছিল নম্রতার কথা। নম্রতার চোখে পানি। অথচ মুখে হাসি। প্রেমা নিচু স্বরে বলে,
“সরি আপু।”

“ইটস ওকে।।তোমাদের তো আর কোনো ভুল নেই।”

“তবুও…!”

নম্রতা আঙুলের ডগা দিয়ে চোখের পানি মুছে বললো,
“যে আমার ছিল না,তাকে হারাতেও বেশি কষ্ট লাগানো উচিত না।”

প্রেমা পিউ দুজনেই চুপ হয়ে যায়। তাদের তো কিছু বলার নেই এই জায়গায়।

মিনু শেখ রাগী চোখে তাকিয়ে থাকে তার স্বামীর দিকে। কোনো খুশিতে সে এদের কে মেনে নিচ্ছে কে জানে! মনে মনে ভাবে,একবার সবাই যাক,এর ফল তাকে বোঝাবে।

আরো কিছু টুকটাক কথা বার্তা শেষে আজহার হোসেন ও শারমিন হোসেন নিজেদের বাসায় চলে যান।

বাসায় ঢুকতেই শারমিন হোসেন গর্জে উঠলো,
“তুমি ঐখানে মায়া দিবার লইগা রাজি হইয়া গেলা ক্যান?? মায়ার প্রতি এত দরদ উঠলো কবে থেইকা??”

“দরদ না দরদ না। বিনা খরচে মেয়ে বিদায় করেছি। এর থেকে বড় আর কী হয়?”
শারমিন হোসেন মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে,
“তোমার যে এতো বুদ্ধি! আসলেই একটা ভালো কাজই করেছো।”
.
.
প্রায়াণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে। নিশুতি প্রেমা পিউর সাথে আছে। নম্রতা এই ফাকে বারান্দায় ঢুকে পড়ে।
হালকা গলায় ডাকে,
“প্রায়াণ।”

প্রায়াণ পিছন ফিরে নম্রতাকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে ।সত্যি বলতে এই মেয়ের তো কোনো দোষ ছিল না আদৌও। তাও শুধু শুধু তার কারনে কষ্ট পাচ্ছে!
প্রায়াণ ব্যথাতুর কণ্ঠে বলে,
“একচুয়ালি আমি তোমাকে কোনোদিনই ভালোবাসিনি নম্রতা। আমার মা আর তোমার মা চাইতো আমাদের বিয়ে হোক কিন্তু আমি তো তোমাকে একটা ফ্রেন্ড ছাড়া কখনো কিছু ভাবিনি। তবুও আ’ম সরি। আমার জন্য অনেক কষ্ট পেতে হচ্ছে তোমার।”

নম্রতা কিছু বললো না। আচমকাই ঝাপিয়ে পড়লো প্রায়াণের বুকে। কান্না জড়িত কণ্ঠে বলতে লাগলো,
“কেনো এরকম করলে? আমার থেকেও ও বেশি সুন্দরী? যখন থেকে প্রেম ভালোবাসা কি জিনিস বুঝেছি তখন থেকে তোমাকে ভালোবেসেছি। তোমাকে কখনো ভাই বা ফ্রেন্ড এর চোখে দেখিনি আমি। আমার স্বামীর রূপে দেখেছি। আর সেই তুমি কিভাবে পারলে এত বড় একটা কাজ করতে? একবারও আমার কথা মাথায় আসলো না?”

প্রায়াণ থতমত খায়। ঠেলে সরিয়ে দেয় নম্রতাকে। কঠিন গলায় বলে,
“প্লিজ নম্রতা। আমি তো তোমাকে বললাম যে আই ডোন্ট লাভ ইউ। আর কখনোই ভালোবাসিনি। না তোমাকে কোনো স্বপ্ন দেখিয়েছি! মা রা চাইলো,আর বিয়ে দিয়ে দিলো, এমন তো হবে না। বিয়ে মানে দুটো পরিবারেরই মিল না, দুটো মনেরও মিল আর সেই মিল আমি খুঁজে পেয়েছি নিশুতির সাথে। তোমার সাথে না নম্রতা। সো প্লিজ,আর এসব কথা বার্তা নিয়ে আমার কাছে আসবে না।আমার ভালো লাগেনা।”

প্রায়াণ দুম করে বারান্দা থেকে বেরিয়ে যেতেই দেখে মিনু শেখ দাঁড়িয়ে। প্রায়াণ তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। নম্রতা জানালার গ্রিল ধরে ঢুকরে কেঁদে উঠে। তার পাশে আসে মিনু শেখ। নম্রতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
“আমি তোমাকে ছোট বেলা থেকে আমার ছেলের বউ হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছি না? সেই স্বপ্ন আমিই পূরণ করবো। তুমি কেঁদো না মা।”
.
.
“বাবা আসবো?”

জালাল শেখ কঠিন গলায় বললো,
“আসো।”

প্রায়াণ কাচুমাচু হয়ে রুমে ঢোকে। অপরাধী ভঙ্গিতে তার বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কৈফিয়তের সুরে বলতে লাগে,
“আসলে বাবা। নিশুতি পালিয়ে যাচ্ছিল ওর বাসা থেকে। ওকে জোর করে বিয়ে দিবে তাই। তখন আমি ওকে দেখি তো তাই…”

“আমি তোমার থেকে এসব শুনতে চাইনি।”

প্রায়াণ চুপ হয়ে যায়। জালাল শেখ বলেন,
“তুমি আমাদের ছোট ছেলে। তুমি কি করেছো,ইচ্ছে করে নাকি ভুল করে নাকি কেনো করেছো আমি জানতে চাইনা। কিন্তু তোমাকে তো একদম ফেলে দিতে পারিনা। এলাকায় একটা সম্মান আছে আমাদের। সেই সম্মান টাও নষ্ট হতে দিতে পারিনা। সারা এলাকা খবরে তোমাকে আর নিশুতিকে দেখছে। এখন তারাও বলবে,তোমাদের বিয়ে দেওয়া উচিত। যেহেতু সেটা আগেই করে ফেলেছো তাই মেনে নেওয়া ছাড়া আমার আর কিছুই করার নেই।”

প্রায়াণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
“ধন্যবাদ বাবা।”

“এবার আসতে পারো।”

প্রায়াণ চুপ করে রুম থেকে বের হয়ে যায়। নিশুতি কে অনেকক্ষণ যাবত দেখছে না,কোথায় মেয়েটা!
.
.
প্রায়াণের ঘরে বসে আছে নিশুতি। তাকে ঘিরে রেখেছে প্রেমা আর পিউ। দুজনের মুখেই হাসি। পিউ বলে,
“তুমি খুব ভালো ভাবী। তুমি আসলা আর আমার স্কুলে যাওয়া টা মিস করিয়ে দিলা। আজকে আর স্কুল যাওয়া হলো না।।কি আনন্দ!!”

নিশুতি মৃদু হাসে পিউর কথা শুনে। প্রেমা কপাল কুঁচকে বলে,
“চুপ কর। তুই আছিস তোর ফাকিবাজি নিয়ে। আচ্ছা তুই তো এখন থেকে আমার ভাবী হয়ে গেলি রে! তোকে ভাবী ভাবী করে ডাকতে ভীষণ বেগ পোহাতে হবে আমার৷ তবে অভ্যাস হয়ে যাবে ডোন্ট টেনশন।”

“তুই আমার ফ্রেন্ড ছিলি,ফ্রেন্ডই থাকবি। এসব ভাবী টাবি বলতে হবে না।”

“আর আমি কি বলবো?”
পিউ বলে উঠে।

“তোমার যেটা ইচ্ছা”

“আমি বেনে বৌ বলবো?”

প্রেমাও অবাক হয়। সাথে নিশুতিও।
নিশুতি বলে,
“বেনে বৌ কেনো?”

“কারন তুমি বেনে বৌ পাখির মতোই সুন্দরী। ”

পিউর কথায় প্রেমা নিশুতি দুজনেই খিলখিল করে হেসে উঠে।
তখনি প্রায়াণ আসে।

“কি নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে ননদ ভাবীর মধ্যে?”

“তোমাকে কেনো বলবো? এগুলা আমাদের পারসোনাল ব্যাপার। ”

পিউর কথা শুনে ওর মাথায় গাট্টা মারে প্রায়াণ। বলে,
“হইছে। অনেক পারসোনাল ব্যাপার বলছিস। এখন বাহিরে যা। তোর ভাবীর সাথে আমার কথা আছে।”

পিউ মুখ বাকিয়ে বলে,
“রাতে যখন বাসর রাত হবে তোমাদের,তখন যত কথা বলার বলিও। এখন আমরা বলি। তুমি যাও।”

প্রায়াণ ভ্যাবাচ্যাকা খায়। প্রেমা মুখ টিপেটিপে হাসে। অথচ নিশুতি, ধীরে ধীরে লজ্জায় লাল হয়ে উঠছে।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here