মেহের,পর্ব:৬ (শেষ পর্ব)

#মেহের,পর্ব:৬ (শেষ পর্ব)
লেখনীতে—ইলোরা জাহান ঊর্মি

ঘুমের ঘোরে বারকয়েক কারো গোঙানির শব্দ কানে এল আদ্রিশের। প্রথমে অলসতাকে পেছনে ফেলে চোখ খুলতে ইচ্ছে করল না।‌ কিন্তু যখন গোঙানির শব্দটা থামাথামির নাম নিল না, তখন বাধ্য হয়েই সে চোখ খুলল। ডিম লাইটের আবছা আলোয় ঘুম ঘুম চোখে সারা রুমে চোখ বোলালো। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই চট করে শোয়া থেকে উঠে বসল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই বুকটা ধক করে উঠল। মেহের ডানে-বায়ে মাথা দোলাচ্ছে আর করুণ সুরে গোঙাচ্ছে। পা দুটোও থেমে থেমে মোচড়াচ্ছে। আদ্রিশ দ্রুত রুমের লাইট অন করে এগিয়ে গিয়ে মেহেরের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে গালে হাত রাখতেই চমকে উঠল। কপাল আর গলায়ও হাত ছোঁয়াল। বাড়াবাড়ি রকমের জ্বর উঠেছে মেয়েটার। দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টিতে ভেজার ফল এটা। আদ্রিশ মেহেরের গালে মৃদু টোকা মেরে ডাকল,
“মেহের? মেহের? শুনছো?”
আদ্রিশের ডাক মেহেরের কানে পৌঁছালেও সে সাড়া দেওয়ার শক্তি পেল না। হঠাৎ সে দূর্বল হাতটা উঠিয়ে আদ্রিশের টি-শার্টের বুকের কাছটায় খামচে ধরল। আদ্রিশ পুনরায় ডাকতেই মেহের শব্দ করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আদ্রিশের মাথা এবার ফাঁকা ফাঁকা লাগল। সবকিছু ভুলে সে হুট করে মেহেরকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে বুকে চেপে ধরল। জ্বরের ঘোরে মেহেরও আদ্রিশের টি-শার্ট আরও জোরে চেপে ধরে তার বুকে নিজেকে গুটিয়ে নিল। আদ্রিশের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। অনুভূতিগুলো পেছনে ফেলে সে ব্যস্ত হয়ে বলল,
“মেহের? কাঁদছো কেন? আমি আছি তো। কোথায় কষ্ট হচ্ছে, বলো আমায়।”
মেহের চোখ-মুখ কুঁচকে অনেক কষ্টে কাঁপা কাঁপা অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
“মাথা আর শরীর ব্যথা।”
আদ্রিশ খেয়াল করল কথা বলার সময় মেহেরের ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। পরক্ষণেই খেয়াল হলো মেয়েটার সারা শরীর কাঁপছে। হয়তো শীত লাগছে। আদ্রিশ মেহেরকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে পড়ল।
ভারী একটা কম্বল এনে মেহেরের গায়ে চাপিয়ে দিলো। ফোনের স্ক্রিনে দেখল রাত পৌনে দুইটা বাজে। বাড়ির সবাইকে এখন ডাকা কি ঠিক হবে? কপাল চেপে ধরে কিছুক্ষণ ভেবে আদ্রিশ দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। ফিরল একটা বাটি হাতে। বাটিতে পানি ঢেলে রুমাল ভিজিয়ে মেহেরের কপালে জলপট্টি দিতে লাগল। মেহের সমানে কেঁপে চলেছে আর ক্ষণে ক্ষণে গোঙাচ্ছে। আদ্রিশ আরও একটা কম্বল এনে মেহেরের গায়ে দিলো। ড্রয়ার হাতড়ে দেখতে লাগল কোনো নাপা ঔষধ আছে কি না। নাপা পেল না, তবে প্যারাসিটামল পেল। গ্লাসে পানি ঢেলে মেহরকে এক হাতে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে মাথাটা একটু উঁচু করে ঔষধ খাইয়ে দিলো। মেহেরের চোখের কোণের চিকচিকে পানিটুকু মুছে দিয়ে সে ভালোভাবে কম্বল গায়ে টেনে দিলো। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আদুরে গলায় বলল,
“শান্ত হও। ঘুমানোর চেষ্টা করো, ঠিক হয়ে যাবে।”

আদ্রিশ বিছানায় উঠে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়ল। এবার আর বিপরীত দিকে মুখ করে না শুয়ে, মেহেরের দিকে মুখ করে শুলো। মাথার নিচে হাত দিয়ে মেহেরের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা শান্ত হচ্ছে না। একইভাবে হাত-পা মোচড়াচ্ছে, একটু পর পর মাথা দোলাচ্ছে আর কপাল কুঁচকে গুঙিয়ে উঠছে। কিছুক্ষণ এ দৃশ্য দেখে আদ্রিশ ঝট করে শোয়া থেকে উঠে বসে পড়ল। দুহাতে মুখ ঢেকে ফোঁস করে বারকয়েক লম্বা দম নিল। তারপর হঠাৎ রুমের ডিম লাইট জ্বালিয়ে মেহেরের কম্বলের ভেতর নিজেও ঢুকে গেল। কোনোকিছু না ভেবেই মেহেরকে বুকে টেনে নিয়ে দুহাতে শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল। নিজের পায়ের ভাঁজে মেহেরের পা দুটো আটকে ফেলল। নিজের অজান্তে অসুস্থ মেহেরও আদ্রিশের টি-শার্ট খামচে ধরে আদুরে বিড়াল ছানার মতো তার বুকে লেপ্টে গেল। মেহেরের শ্বাস প্রশ্বাসের প্রতিটা শব্দ আদ্রিশ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। শরীর আর চুলের মেয়েলি গন্ধটা নাকে এসে ধাক্কা লাগছে। মেয়েটার শরীরের উত্তাপ যেন আদ্রিশের কাল হয়ে দাঁড়াল। মুহুর্তেই তার গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। মেহেরের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আদ্রিশ তার শুকনো ঠোঁটটা জিব দিয়ে ভিজিয়ে বার কয়েক ফাঁকা ঢোক গিলল। ভেতরের অনুভূতিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। পবিত্র অধিকার ফলানোর ইচ্ছেটা ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আদ্রিশ নিজেও জানে না এভাবে সে কতক্ষণ নিজেকে সামলাতে পারবে। এ কদিন তো খুব পেরেছে। চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও সে মেহেরের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টাটুকুও করেনি। তবে আজ কেন? মেয়েটা এত কাছে আছে বলে? তিল পরিমাণ দূরত্ব নেই দুজনের মধ্যে। এ কারণেই হয়তো নিষিদ্ধ বাসনাগুলো জেগে উঠছে। না চাইতেও বারবার আবছা আলোয় মেয়েটার মায়াবী মুখে দিকে দৃষ্টি আটকে যাচ্ছে। মেহের এখন আর আগের মতো ছটফট করছে না। অনেকটা শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। দুর্বল শরীরটা আদ্রিশের বাহুডোরে আবদ্ধ। আদ্রিশ চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। নিজের প্রতিই অসহ্য বোধ হচ্ছে। কেন আজ তার এত তৃষ্ণা? সে তো চায় মেহের স্ব-ইচ্ছায় তার কাছে ধরা দিক। আদ্রিশ আর চোখ খুলল না। মেহেরকে জাপটে ধরে চুপচাপ চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল। চোখে নিদ্রা নামলে তবেই তার স্বস্তি মিলবে।

রাত তিনটা ঊনচল্লিশ। ভ্যাপসা গরমে মেহেরের ঘুম ছুটে গেল। কপাল কুঁচকে পিটপিট করে চোখ খুলে আড়মোড়া ভাঙার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। নড়াচড়া করতে পারছে না। মনে হচ্ছে কিছুর সাথে আটকে আছে। বার তিনেক চোখ ঝাপটে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেই ডিম লাইটের আবছা আলোয় নিজেকে আদ্রিশের বাহুডোরে আবদ্ধ দেখে মেহের ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। চোখ দুটো ছানাবড়া করে মাথা তুলে দেখল আদ্রিশ তাকে দুহাতে জাপটে ধরে রেখেছে। পা দুটোও আদ্রিশের পায়ের ভাঁজে বন্দী। গায়ের কম্বলটা পায়ের কাছে সরে গেছে। মনে পড়ে গেল মাঝরাতে তার শারীরিক অবস্থার কথা। লোকটা কীভাবে আগলে নিয়েছিল তা-ও মনে পড়ল। না জানি কত কষ্ট করেছে মাঝরাতে। অস্বস্তি আর লজ্জায় মেহের কুকরে গেল। অস্থিরতা এসে ভর করল মনে। সেই সাথে আদ্রিশের প্রতি কোথাও একটা সম্মানবোধ, ভালো লাগা কাজ করল। প্রথমদিকে লোকটাকে সে যেমন ভেবেছিল, আসলে মনের দিক থেকে লোকটা ঠিক তার বিপরীত। আদ্রিশের মুখের দিকে তাকিয়ে মেহের থমকে গেল। আবছা আলোয় মানুষটার মুখটা কী স্নিগ্ধ, নিষ্পাপ লাগছে! এর আগে কখনও এত কাছ থেকে এভাবে দেখা হয়নি। লোকটা বোধ হয় একটু বেশিই সুন্দর। না জানি কত সুন্দরী মেয়ের মন কেড়েছে। অথচ শেষমেষ সব সুন্দরী মেয়েদের রেখে তাকে বিয়ে করল। তা-ও আবার ভালোবেসে! অজান্তেই মেহেরের হাত আদ্রিশের গাল ছুঁয়ে দিলো। কেমন যেন একটা অন্যরকম অনুভুতি হচ্ছে। হৃদস্পন্দন ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এভাবে থাকলে হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে তার দমটাই বন্ধ হয়ে যাবে। পুনরায় নড়াচড়া করতে গিয়েও মেহের থেমে গেল। সে যে দুহাতে আদ্রিশের টি-শার্ট মুঠোয় চেপে ধরে ঘুমাচ্ছিল তা মাত্র খেয়াল হলো। দ্রুত সে আদ্রিশের টি-শার্ট ছেড়ে দিলো। মাঝরাতে ঘুম নষ্ট করে লোকটাকে না জানি সে কত জ্বালিয়েছে! এখন আবার ঘুম ভাঙাতে বিবেকে বাঁধলো। আদ্রিশ যে হাত দিয়ে তার কোমর আঁকড়ে ধরে রেখেছে, সেই হাতটা আলতো করে ধরল। কোনোরকমে আদ্রিশের হাতটা কোমর থেকে সরানোর চেষ্টা করতেই আদ্রিশ নড়েচড়ে উঠল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আদ্রিশের কাঁচা ঘুমটাও ভেঙে গেল। মেহেরের চিন্তায় তার কিছুতেই ঘুম আসছিল না। অনেকক্ষণ অব্দি হাঁসফাঁস করে কিছুক্ষণ আগেই ঘুমিয়েছিল সে। পুনরায় ঘুম ভেঙে যাওয়ায় কপাল কুঁচকে ফেলল। চোখ খুলে মেহেরকে তার হাত সরানোর চেষ্টা করতে দেখল। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আদ্রিশ নিজেই মেহেরের কোমর থেকে হাত সরিয়ে কপালে রাখল। মেহের চমকে উঠে ফিরে তাকাল। আদ্রিশ তাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ রেখেই কপালে, গলায় হাত ছুঁয়ে দিলো। মেহের তার এহেন কান্ডে শুকনো ঢোক গিলল। আদ্রিশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“যাক জ্বরটা ছেড়েছে একটু। যা চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলে! এখন শরীর কেমন লাগছে?”
কথাটা বলতে বলতে আদ্রিশ মেহেরের চোখের দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে মেহেরের সাথে একদফা চোখাচোখি হয়ে গেল। মেহেরের অস্বস্তি আর জড়োসড়ো ভাব দেখে আদ্রিশের টনক নড়ল। দ্রুত মেহেরকে বাহুডোর থেকে মুক্ত করে শোয়া থেকে উঠে বসে পড়ল। মেহেরও উঠে মাথানত করে কিছুটা সরে বসে অগোছালো শাড়ি গোছাতে ব্যস্ত হলো। আদ্রিশ গভীর দম নিয়ে সুইচ টিপে লাইট জ্বালিয়ে বিছানা থেকে নেমে গেল। তোয়ালে হাতে নিয়ে বিছানার একপাশে দাঁড়িয়ে মেহেরের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল,
“প্রচুর ঘেমে গেছ। মুছে নাও, নইলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
মেহের বিনা বাক্যে আদ্রিশের হাত থেকে তোয়ালেটা নিয়ে ঘাম মুছতে লাগল। ঘাম মোছা শেষ হলে আদ্রিশ পুনরায় তোয়ালেটা চেয়ারে ঝুলিয়ে রেখে এল। বিছানায় উঠে বসে বলল,
“শরীর কেমন লাগছে বললে না তো।”
মেহের নতজানু হয়েই মিনমিনে গলায় উত্তর দিলো,
“ভালো।”
“মাথা ব্যথা করছে এখনও?”
“হালকা।”
“চা খাবে?”
মেহের অবাক হলো। এই মুহূর্তে বাড়ির কেউ জেগে নেই। সে অসুস্থ দেখেও লোকটা কাউকে না ডেকে নিজেই সামলে নিয়েছে। আবার এখন জিজ্ঞেস করছে চা খাবে কি না। সে যদি হ্যাঁ বলে তাহলে কি এই সময় রান্নাঘরে গিয়ে চা করবে? নিজের বিস্ময়টা চেপে রেখে মেহের মাথা দুলিয়ে বলল,
“না।”
“খেলে মাথা ব্যথাটা কমবে।”
মেহেরও জানে চা খেলে হয়তো মাথা ব্যথাটা কমবে। কিন্তু লোকটাকে আর খাটাতে ইচ্ছে করল না। তাই মিথ্যে বলল,
“খেতে ইচ্ছে করছে না। ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে।”
“আচ্ছা তাহলে শুয়ে পড়ো।”
মেহের সঙ্গে সঙ্গেই নিজের জায়গায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। মেহেরকে বিপরীত দিকে মুখ করে শুতে দেখে আদ্রিশ নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ডিম লাইট জ্বালিয়ে সে-ও শুয়ে পড়ল। তবে বিপরীত দিকে মুখ করে নয়, মেহেরের দিকে মুখ করে। মেয়েটা নড়াচড়া করেই চলেছে। কিছুক্ষণ আগেও মেয়েটা তার বুক জুড়ে ঘুমিয়ে ছিল। বুকটা প্রশান্তিতে ভরে গিয়েছিল। আর এখন বুকটা কেমন হাহাকার করছে, ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা নেই। আবছা আলোয় আদ্রিশের দৃষ্টি আটকাল মেহেরের কোমরের ভাঁজে। আঁচল সরে গিয়ে যে মেহেরের কোমর দৃশ্যমান হয়ে আছে, সে খেয়াল তার নেই। মেয়েটা একদম শাড়ি সামলে ঘুমাতে পারে না। তবু কেন শাড়ি পরে ঘুমাতে চলে আসে কে জানে? এ দৃশ্য নতুন নয়। বিয়ের পর থেকেই আদ্রিশ ব্যাপারটা খেয়াল করে নিরবে পুড়েছে। মনের সব বাসনাগুলো পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু আজ কেন জানি নিজেকে সামলানো দায় হয়ে পড়ছে। আজই প্রথম স্পর্শ, কাছে আসা, এটাই হয়তো কারণ। আদ্রিশ জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল। তারপর হঠাৎ কোমল কন্ঠে ডাকল,
“মেহের?”
মেহের ঘুরে না তাকিয়েই সাড়া দিলো,
“হুঁ?”
“বিয়ের পাঁচদিন হয়ে গেল।”
“জানি।”
“তোমার মনে হয় না এখন সবকিছু গুছিয়ে নেওয়া উচিত?”
মেহের উত্তর দিলো না। চোখ দুটো হঠাৎ করেই ছলছল করে উঠল। আদ্রিশ মেহেরের উত্তর না পেয়ে আবার বলল,
“সব সত্যি তো তুমি জেনেছ, আর বুঝতেও পেরেছ। আমি তোমাকে ভালোবাসি, এটাও বিশ্বাস করেছ। তবু তুমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছো না। একটু বোঝার চেষ্টা করো, আমার নিজেকে সামলাতে কষ্ট হয়। শত হলেও তুমি আমার স্ত্রী। আমাদের সম্পর্কটা পবিত্র। আমি চাই না তোমার অমতে আমাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হোক। তবু, কখন কী হয়ে যায় তার তো নিশ্চয়তা নেই। আকর্ষণ, ঘোর, শারীরিক চাহিদা, এসব সামলে ওঠা খুব কঠিন। অন্তত এটুকু বলো, আমাকে কি এখনও তুমি মেনে নিতে পারছো না? এখনও তোমার মনে হচ্ছে আমার সাথে বিয়ে হয়ে তোমার ক্ষতি হয়েছে?”
মেহেরের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে সে ভেজা গলায় বলল,
“জানি না।”
“ভালোবাসবে না আমায়?”
“জানি না।”
আচমকা আদ্রিশ মেহেরের একদম কাছে চলে গেল। আদ্রিশের বুকে পিঠ ঠেকতেই মেহের হকচকিয়ে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে কিছু বলার আগেই আদ্রিশ তার আঁচলের ফাঁক দিয়ে পেটে হাত গলিয়ে দিলো। “কী করছেন” বলে আঁতকে উঠে মেহের উঠে যেতে নিতেই আদ্রিশের হাত শক্ত হয়ে এল। উদরে শক্ত হাতের চাপ পড়তেই মেহের উঠতে ব্যর্থ হলো। আদ্রিশের হাতটা মুঠোয় চেপে ধরে সে ছাড় পাওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“প্লিজ ছাড়ুন। এমন করছেন কেন?”
মেহেরের কথায় আদ্রিশ মেহেরের উদরে আরও কিছুটা চাপ দিয়ে কাঁধে থুতনি রাখল। ব্যথিত কন্ঠে বলল,
“কেন এমন শাস্তি দিচ্ছ পাখি। তোমাকে ভালোবেসে তোমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য বিয়ে করেছি, এভাবে অবহেলা পাওয়ার জন্য নয়। আর পারছি না আমি ধৈর্য ধরে থাকতে। আমারও তো কিছু স্বপ্ন আছে আমাদের সম্পর্কটা ঘিরে। প্লিজ একটু বোঝো। কিছু তো বলো মেহের, প্লিজ।”
মেহের ছটফটানি থামিয়ে দিলো। নির্বিকার অশ্রু বিসর্জন দিয়ে চলেছে সে। বুকের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে। লোকটার মনে কি সে একটু বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলেছে? এত ব্যথিত কেন তার কন্ঠ? এই মুহূর্তে তার কী বলা উচিত? মেহেরের ভাবনার মাঝেই আদ্রিশ বলে উঠল,
“যদি তুমি আমাকে মানতে না-ই পারো, তাহলে এই মুহূর্তে দূরে ঠেলে দাও। আর যদি পারো, তাহলে আমি বুঝে নিব।”
মেহের থমকে গেল। এ কেমন শর্ত? এমন কঠিন শর্তও মানুষ দেয়? যে মানুষটা তাকে মন থেকে ভালোবাসে, তাকে এত সম্মান করে, তাকে কী করে সে দূরে ঠেলে দিবে? মেহেরের মনে পড়ল, সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আদ্রিশ তাদের সম্পর্কটা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সে বাঁধা দিবে না। নিরব থেকেও সাপোর্ট করবে। কিন্তু এখন? অস্বস্তিরা এসে তো জাপটে ধরেছে। আদ্রিশ মেহেরকে চুপ থাকতে দেখে ‘মেহের’ বলে ডাকতেই মেহের শব্দ করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আদ্রিশকে অবাক করে দিয়ে সে নিজের শাড়ির আঁচলের ফাঁক দিয়ে পেটে রাখা আদ্রিশের হাতের ওপর হাত রাখল। আদ্রিশ উত্তেজনায় কাঁপা গলায় পুনরায় ডাকল,
“মেহের?”
মেহের আদ্রিশের আঙুলের ভাঁজে নিজের আঙুল রেখে বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেই চলল। আদ্রিশ যা বোঝার বুঝে গেল। তৃপ্তির হাসি হেসে মেহেরের হাতের মুঠো থেকে নিজের হাত সরিয়ে আলতো করে মেহেরকে নিজের দিকে ঘুরাল। মেহের আদ্রিশের চোখে চোখ রাখল না। অন্যদিকে তাকিয়ে কেঁদে চলল। আদ্রিশ মেহেরের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে দুহাতে আলতো করে তার মুখটা তুলে ধরল। সযত্নে চোখের পানি মুছে দিয়ে চাপা উচ্ছসিত কন্ঠে বলল,
“সিরিয়াসলি মেহের? তুমি সত্যিই আমাকে মেনে নিয়েছ? সত্যি? মেহের, কাঁদবে না। প্লিজ কান্না থামাও। তাকাও আমার দিকে। আমি রেগে যাব মেহের।”

মেহের নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল। বহুকষ্টে কান্না থামাল। অশ্রুসিক্ত চোখে আদ্রিশের দিকে তাকাতেই মানুষটার মুখের উপচে পড়া খুশি দেখেই সে স্তব্ধ হয়ে গেল। শুধুমাত্র মেনে নিয়েছে বুঝতে পেরেই লোকটার এত আনন্দ! আদ্রিশ মৃদু হেসে মেহেরের কপালে কপাল ঠেকাল। মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“ভালোবাসি বউ। খুব, খুব, খুব বেশি ভালোবাসি।”
মেহের চোখ বন্ধ করে পুনরায় দু ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিলো। কষ্টে নয়, আনন্দে। এই মানুষটা তাকে ঠিক কতটা ভালবাসে, তা যেন সে এক মুহুর্তেই বুঝে গেল। কপালে কপাল ঠেকিয়ে নীরব কথপোকথন চলল বেশ কিছুক্ষণ। হঠাৎ আদ্রিশ ফিসফিস করে ডাকল,
“মেহের?”
“হুঁ”, চোখ বন্ধ করে সাড়া দিলো মেহের।
“একবার অধর স্পর্শ করার দুঃসাহস দিবে? ওই অধরে আমার হাজার জনমের তেষ্টা জমে আছে।”
মেহের কেঁপে উঠল। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। নিমেষেই ঠোঁট দুটো শুকিয়ে গেল, যেন তারাও তৃষ্ণার্ত। আদ্রিশ মেহেরের সাড়া পাওয়ার আশায় উন্মুখ হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। মেহের অস্বস্তি বোধ করে দুরুদুরু বুকে জিব দিয়ে শুকনো ঠোঁটটা ভিজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। এ দৃশ্য যেন পাগল প্রেমিকের তৃষ্ণা বহুগুণ বাড়িয়ে দিলো। আঙুল দিয়ে প্রেয়সীর শুষ্ক ঠোঁট স্পর্শ করল। জবুথবু প্রেয়সীর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেল। শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। প্রেয়সীর তপ্ত নিঃশ্বাস মুখে আছড়ে পড়তেই প্রেমিকের ওপর উন্মাদনা এসে ভর করল। প্রণয়ের উন্মাদনা। অধরে অধর ডুবল। শিহরিত প্রেয়সী খামচে ধরল প্রেমিকের চুল। ক্ষণিক সময় পেরোতেই প্রেয়সী ছটফট করল প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য। উন্মাদ প্রেমিক বুঝতে পেরে অধর মুক্ত করেও দমে গেল না। অধর ছোঁয়ালো গলদেশে। উত্তেজিত প্রেয়সীর হাত চুল ছেড়ে টি-শার্টের কলার খামচে ধরল। নখের আঁচড়ে প্রণয়ের চিহ্ন আঁকলো প্রেমিকের ঘাড়ে। প্রণয়ের উন্মাদনা বাড়ার সাথে সাথে প্রেমিকের স্পর্শের প্রগাঢ়তা ক্রমশ বেড়েই চলল। পুরুষত্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আজ যেন তার বহু কালের অপেক্ষার অবসান হলো। প্রেয়সী বাঁধা দিতে গিয়েও থেমে গেল। আজ না হয় সম্পর্কের পূর্ণতার সাথে সাথে অনুভূতিগুলো ভয়ানক তোলপাড় সৃষ্টি করুক। আগামী দিনগুলো ভালোবাসার আলোয় আলোকিত হোক। প্রেমিককে জাপটে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে প্রেয়সী চোখের কার্নিশে সব দুঃখ আজীবনের জন্য বিসর্জন দিয়ে দিলো। কোমল নারী মন এক নিমেষেই ভেবে নিল, এই মানুষটাকে আঁকড়ে ধরেই সে বাকি জীবন বাঁচতে চায়।

_____________________________

সূয্যিমামা পশ্চিমাকাশে মুখ লুকিয়েছে। গোধূলির লালচে আভায় ছেয়ে গেছে সমস্ত নীলিমা। রাস্তাঘাটে মানুষজনের উপচে পড়া ভীড়। পাখিরা নিজেদের নীড়ে ফিরতে ব্যস্ত। বেলকনির রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ধরনীর ব্যস্ত প্রকৃতি মনোযোগ দিয়ে দেখছে মেহের। হঠাৎ অতিপরিচিত স্পর্শে ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসির রেখা ফুটে উঠল। প্রেয়সীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি রেখে হাস্যোজ্জ্বল মুখে আদ্রিশ বলল,
“এতক্ষণ অব্দি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে কী এত দেখছে আমার অ্যাংরি বার্ডটা?”
মেহের অভিমানী গলায় বলল,
“কেউ একজন তো আমার থেকে নিজের কাজকে বেশি ভালোবাসে। আমার আর কাজ কী একাকী উদাসীন হয়ে থাকা ছাড়া? তাকে শুধু শুধু মন ভোলানোর চেষ্টা করতে হবে না। আমি এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমার কাছে আসতে হবে না। সে তার কাজ নিয়েই জীবন পার করুক।”
স্ত্রীর অভিমানভরা কথায় আদ্রিশ ঠোঁট টিপে হাসল। গলা ঝেড়ে চাপা স্বরে বলল,
“দিনশেষে তো আমার আশ্রয় একটাই। মেহের নামক আশ্রয়।”
“বিয়ের দিন তো দিব্যি হেসে হেসে বলেছিলে আমারও এক্স গার্লফ্রেন্ড আছে। তাকে আমি এখনও অনেক ভালোবাসি। তো যাও তার কাছে। আমার কাছে কী?”

মেহেরের চাপা অভিমান আর থমথমে গলায় আদ্রিশ পুনরায় হাসল। প্রেয়সীর কাঁধে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
“কী করব বলো? মেহের নামক সর্বনাশী তো আমার পুরো মনটাই কেড়ে নিয়েছে। এখন আর আমি আমার চারদিকে সে ছাড়া আর কাউকেই দেখি না। বিয়ের দিন তো তোমার কথাই বলেছিলাম মজা করে। জেনেও বারবার খোঁচা মারো কেন? আমার প্রতিটা হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাসে তো কেবল মেহের মিশে আছে। আমার প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা মেহের। তুমি বুঝবে কীভাবে? আমি তো আর তোমার প্রথম ভালোবাসা না।”
নিমেষেই মেহেরের সমস্ত মুখ জুড়ে একরাশ কালো মেঘ এসে ভীড় জমাল। মুখটা চুপসে গেল। ছোটো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হুট করে সে নিজের কোমর থেকে আদ্রিশের হাত দুটো সরিয়ে দিলো। আদ্রিশের দিকে না তাকিয়েই গটগট করে বেলকনি থেকে রুমে চলে গেল। আদ্রিশ বার কয়েক পিছু ডাকলেও ফিরে তাকাল না। সে নিজেও জানে কিছুক্ষণ পর এমনিতেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষটার মুখে এমন কথা তার সহ্য হয় না। বুকে কাঁটার মতো বিঁধে যায়। বিয়ের প্রায় তিন মাস কেটে গেছে। মেহের আদ্রিশের অফিসের কাছাকাছি একটা ভার্সিটিতে অ্যাডমিশন নিয়েছে। আদ্রিশের পরিবারের সাথে নিজেকে বেশ ভালোভাবে মানিয়ে নিয়েছে সে। আদ্রিশ নিজের কাজ নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে। এদিকে মেহের চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করে কখন মানুষটা কাজ শেষ করে আসবে। কখন আলতো করে জড়িয়ে ধরে কপালে ঠোঁটের আদুরে স্পর্শ দিবে। দিনশেষে যখন মানুষটা ফিরে তখন তার হাজারো অভিমান জমা হয়। কিন্তু তা নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী। একটু আদুরে স্পর্শেই অভিমানের বরফ গলে যায়। এ তিন মাসে স্নিগ্ধ নামটা মেহের মন থেকে সম্পূর্ণভাবে মুছে দিয়েছে। আর তাতে অবদান শুধুই আদ্রিশের। মেহেরকে সবসময় নিজের ভালোবাসা দিয়ে সে জয় করেছে। আর এখন মেহেরের ধ্যান-ধারণা, জীবন-যাপনে ওতপ্রোতভাবে শুধু আদ্রিশ মিশে আছে। কারো ভালোবাসায় কোনো কমতি নেই। মেহের আদ্রিশকে সেই প্রথমেই বলেছিল স্নিগ্ধ নামটা আর কোনোদিনও সে মনে আনতে চায় না। সে যেন কখনও ওসব মনে না করায়। অথচ আজ আদ্রিশ সেটাই করল। বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা অনুভব করছে মেহের। আদ্রিশ তার পেছন পেছন রুমে আসতেই সে রুম থেকে চলে যাবার জন্য পা বাড়াল। সঙ্গে সঙ্গে আদ্রিশ দৌড়ে গিয়ে তার হাত টেনে ধরল। মেহের হাত মোচড়াতে মোচড়াতে থমথমে মুখে বলল,
“হাত ছাড়ো।”
আদ্রিশ মেহেরকে বুকে টেনে নিয়ে নরম গলায় বলল,
“উঁহু, কী হয়েছে?”
“ছাড়তে বললাম না”, চাপা রাগ দেখিয়ে বলল মেহের।
আদ্রিশ হাতের বাঁধন শক্ত করে বলল,
“তুমি বললেই আমি ছেড়ে দিব? আমারই তো বউ তুমি।”
“ভালো লাগছে না। ছাড়ো তো।”
“কেন ভালো লাগছে না?”
মেহেরের মাথায় রাগ চেপে বসল। চাপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,
“ঢং করছো? বুঝতে পারছো না? তোমাকে বলেছি না আমার অতীত নিয়ে খোঁচা মেরে কথা বলবে না? আমার সহ্য করতে কষ্ট হয় এসব। স্নিগ্ধ আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিল। আমার প্রথম,‌ শেষ বলতে শুধু তুমিই আছো। তুমি নিজেই তো বুঝিয়েছিলে এসব আমাকে। এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে? আমি জানতাম একদিন আমাকে এসব নিয়ে কথা শুনতেই হবে।” বলতে বলতে মেহেরের গলা ধরে এল। দুচোখ ছলছল করে উঠতেই আদ্রিশ এক হাত তার গালে রেখে ব্যস্ত হয়ে বলল,
“এই মেহের, এসব কী বলছো তুমি? আমি তো মজা করেছি লক্ষ্মীটি। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। এজন্যই কাঁদতে হবে? তুমি জানো না তুমি আমার কাছে ঠিক কী? আমার মেহের আমার জীবন। ভালোবাসি তো পাগলি।”
মেহের হঠাৎ শব্দ তুলে কেঁদে উঠল। আদ্রিশের বুকে আলতো করে কয়েকটা থাপ্পর মেরে বলল,
“আমি তোমাকে ভালোবাসি না। একদমই বাসি না। এক ফোঁটাও না। খারাপ লোক।”
আদ্রিশ মৃদু হেসে মেহেরকে বুকে চেপে ধরে বলল,
“বাসতে হবে না। আমার ভালোবাসা দিয়ে পুষিয়ে নিব। তুমি শুধু আজীবন আমার বুক জুড়ে থেকো।”
মেহের আদ্রিশের পিঠে হাত ঠেকিয়ে তার বুকে লেপ্টে গেল। নাক টেনে বলল,
“কীভাবে পারো এত ভালোবাসতে?”
আদ্রিশ হাসল। প্রেয়সীর চুলের ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে চুমু খেয়ে বলল,
“একটা ভালো খবর আছে।”
মেহের প্রশ্নভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সুধাল,
“কী?”
“বড়ো আপুর জন্য খুব ভালো পরিবার থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। ছেলেটা উপযুক্ত, দেখতেও সুন্দর। আপুকে খুব পছন্দ করেছে। বাবা রাজি। এখন তোমার কী মনে হয়, আপু রাজি হবে?”
“কবে এল? আগে বলনি তো।”
“আমার মাথাতেই ছিল না ব্যাপারটা। মিটিং-ফিটিংয়ের চাপে ভুলে বসে ছিলাম। গতকাল এসেছে।”
“আপুকে আমি রাজি করাব। এভাবে আর কত বছর পার করবে? জীবনটা নতুনভাবে সাজানোর একটা চেষ্টা অন্তত করা উচিত।”
“হুম, কিন্তু আপুর মানসিক আঘাতটা গভীর ছিল।”

বোনের কথা ভাবতেই মেহেরের মুখে অন্ধকার নেমে এল। মন থেকে যাকে ভালবেসেছিল, তাকে ছাড়তে হয়েছিল বাবার কঠোরতার কারণে। সেই থেকেই মেয়েটা একদম চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল সবকিছু থেকে। তারপর যখন নিজেকে একটু সামলে নিয়েছিল, তখন বাবা বিয়ে ঠিক করেছিল বেশ ভালো ছেলের সাথেই। ছেলেটার সাথে যোগাযোগ করতে করতে বন্ধুত্ব, ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল। কিছু অনুভূতিও কড়া নেড়েছিল। কিন্তু বিয়ের আগেরদিন রাতেই বিল্ডিংয়ের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সেই অনুভূতিগুলো ঝলসে গিয়েছিল। মানুষটার পুড়ে খাক হওয়া শরীরটা সে দেখতে গিয়েছিল। আর সেই থেকে তার মন অনুভূতি জন্মাতেও ভুলে গেছে। কেমন জীবন্ত লাশের মতো বেঁচে আছে! কপাল পোড়া, অপয়া, অলক্ষ্মী নামে আখ্যায়িত করে ভালো কোনো পরিবার থেকে বিয়ের প্রস্তাবও আসেনি। হয় ডিভোর্সি, নয় অনুপযুক্ত ছেলের জন্য প্রস্তাব এসেছে।
মেহের দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মনে মনে ভেবে নিল এবার পাত্র যখন উপযুক্ত আর আপুকেও পছন্দ করেছে, তখন যে করে হোক সে রাজি করাবে। মেহেরের থমথমে মুখটা দুহাতে তুলে ধরে আদ্রিশ আদুরে গলায় বলল,
“মন খারাপ করছো কেন? এবার আমরা দুজন মিলে আপুকে রাজি করাব। এখন এখানে বসো তো একটু।” বলতে বলতে আদ্রিশ মেহেরকে বিছানায় বসিয়ে দিলো। চোখের ইশারায় পাশে দেখিয়ে বলল,
“ওটা খুলে দেখো।”
আদ্রিশের দৃষ্টি অনুসরণ করে পাশে তাকিয়ে একটা শপিং ব্যাগ দেখতে পেল মেহের। ব্যাগটা হাতে নিয়ে প্রশ্ন করল,
“কী এনেছে?”
“খুলে দেখো না।”
মেহের শপিং ব্যাগের ভেতর একটা প্যাকেট পেল। প্যাকেট দেখেই বুঝতে পারল ভেতরে কী আছে। কৌতুহল নিয়ে প্যাকেটটা খুলতেই একটা কালো শাড়ি বেরিয়ে এল। শাড়িটা নজর কাড়ার মতো সুন্দর। মেহের শাড়িটার ভাঁজ খুলে দেখতে দেখতে বলল,
“হঠাৎ কালো শাড়ি আনলে যে?”
“কালো শাড়িতে কখনও দেখা হয়নি তোমায়। হঠাৎ ইচ্ছে জাগল দেখার, তাই নিয়ে এলাম”, মেহেরের পাশে বসতে বসতে বলল আদ্রিশ।
“কালো শাড়ি আমার পরনে মানাবে না। সুন্দরী মেয়েদের মানায় এসবে।”
“কে বলল?”
“বলা লাগে না কি?”
“আমার কাছে তুমিই সুন্দরী। সব রং মানাবে তোমার গায়ে। তাছাড়া শাড়িতে তোমাকে এমনিতেই দারুণ লাগে। জানোই তো আমি বারবার প্রেমে পড়ে যাই।”
মেহের হেসে বলল,
“আমি সুন্দর?”
“হুঁ। আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর রমণী।”
“আমার থেকে আরও অনেক সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করতে পারতে তুমি।”
আদ্রিশের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল। চোয়াল শক্ত করে সে হঠাৎ মেহেরের এক বাহু চেপে ধরে ঝুঁকে পড়ে বলল,
“বারবার না করেছিলাম তোমাকে এসব বলতে। মেজাজ খারাপ হয় এসব শুনলে। আমি তোমার মায়াবী মুখটার প্রেমে পড়েছিলাম, গায়ের রংয়ের নয়। এক কথা একবার বললে বোঝা না কেন তুমি?”
মেহের ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত করে বলল,
“ভুল কী বললাম?”
“মেহের”, চোখ গরম করে চাপা স্বরে ধমকে উঠল আদ্রিশ।
মেহের চুপ মেরে গেল। একবার আদ্রিশের রাগ উঠলে যে মানানো দায় হবে, সে বিষয়ে সে অবগত। সে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“আচ্ছা আর বলব না। হাত ছাড়ো, লাগছে। এভাবে কেউ চেপে ধরে?”
সঙ্গে সঙ্গে আদ্রিশ মেহেরের বাহু ছেড়ে দিলো। এই মুহূর্তে আদ্রিশের গম্ভীর মুখটা মেহের মানতে পারল না। এতক্ষণ মানুষটা কী সুন্দর হেসে হেসে কথা বলল। হঠাৎ এমন রেগে গেলে কার ভালো লাগে? মেহের আদ্রিশের খুব কাছে সরে গিয়ে দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরল। আদ্রিশ কপাল কুঁচকে তাকাতেই সে মিষ্টি হেসে চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করে বলল,
“ভালোবাসি।”
আদ্রিশের রাগের পাহাড় ধসে পড়তে এই ছোট্ট শব্দটাই যথেষ্ট। কপালের ভাঁজ মিলিয়ে গিয়ে আদ্রিশের ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসির রেখা ফুটে উঠল। দুহাতে মেহেরকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে কাঁধে থুতনি ঠেকাল। মেহেরও হাস্যোজ্জ্বল মুখে প্রিয় মানুষটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অনুভব করল। মিনিট খানেক পর আদ্রিশ নামানো গলায় মোহনীয় কন্ঠে বলল,
“পৃথিবীতে হাজারো মেহেরের জন্ম হোক। হাজারো আদ্রিশ সেই মেহেরের প্রেমের শিকলে আবদ্ধ হোক। পাগল প্রেমিক উপাধি পাক। প্রণয়ের উন্মাদনা কেবল মেহেরেই সীমাবদ্ধ থাকুক। পৃথিবী জানুক আমার শ্বাস-প্রশ্বাসেও একটা মেহের মিশে আছে। মেহের ছাড়া আদ্রিশের অস্তিত্ব কল্পনাতীত। শেষ নিঃশ্বাস অব্দি সে আমার অস্তিত্বে মিশে থাকুক। হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে ভালোবাসি মেহের। আমৃত্যু তুমি কেবলই আমার মেহের হয়ে থাকবে। আদ্রিশের মেহের।”

সমাপ্ত

(চাইলে গল্পটা বড়ো করতে পারতাম। কিন্তু ইচ্ছে করল না। আরও পাঁচ মাস আগে প্রথম অংশটুকু লিখে রেখেছিলাম বলে ছোটো গল্প হিসেবে শেষ করলাম। ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এবং মন্তব্য করে যাবেন। গল্পটা কেমন লেগেছে আপনাদের কাছে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here