মেঘকন্যা☁️ Part_23,24

মেঘকন্যা☁️
Part_23,24
Writer_NOVA
Part_23

ঘুমের ঘোরে টের পেলাম কারো ঘনঘন নিশ্বাস আমার কানে বারি খাচ্ছে। কিছুটা নড়েচড়ে উঠলাম।কিন্তু ঘুম ভাঙলো না।মিনিট খানিক পর কানে কারো ঠোঁটের আলতো ছোঁয়া পেলাম।ধরফরিয়ে উঠে বসলাম।সামনে তাকাতেই দেখলাম ওয়াহাব শয়তানি হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।তার মানে এই রকম লুচু মার্কা কাজ এই শয়তানটাই করেছে।মাথার মধ্যে চিনচিন রাগ উঠছে। যেকোন সময় এই ব্যাটাকে আমি মেরে ফেলতে পারি।

ওয়াহাবঃ কি ব্যাপার মেঘকন্যা,উঠে পরলে যে?আমি কি বিরক্ত করে ফেললাম?আসলে তোমার ঘুমন্ত মুখটা দেখে আমি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম।এমনিতেও আজকে তুমি আমার হবে।

আমিঃ কি ধরনের বেয়াদবি এটা ময়ূর রাজ? আপনি আমার কানে ঠোঁট ছোঁয়ালেন কেন?এটাও যে একটা অভদ্রতা সেটা কি জানেন আপনি?

ওয়াহাবঃ ভয় পেয়ে গেছি মেঘরাজ্যের রাজপুত্র আবরার আওসাফ আয়িশের বিবি। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম আমি কার সাথে অভদ্রতা করছি।দুঃখীত জনাবা।মাফ করে দিবেন।
(ভয় পাওয়ার অভিনয় করে)

আমিঃ মামামমমমানে কি যা তা বলছেন?(তুতলিয়ে)

ওয়াহাবঃ কেন কিছু ভুল বললাম নাকি?কি ভেবেছিলে তুমি? তুমি তোমার পরিচয় লুকিয়ে আমার থেকে ইশালের মৃত্যু ছোড়া নিয়ে ভাগবে।তাতো আমি কিছুতেই হতে দিবো না।আমার এত সামনে এসে আমাকে ধোঁকা দিয়ে চলে যাবে।আমি বেঁচে থাকতে তা সম্ভব নয়। তোমাকে আমি আজ রাতে বিবাহ করবো।তৈরি থেকো,নয়তো তোমার ক্ষতি।তুমি সানন্দে বিবাহ করলে আমি তোমায় সানন্দে ছোড়া দিয়ে দিবো।

আমিঃ মরে যাবো তাও আপনাকে বিয়ে করবো না। আমি শুধু আয়িশের।আয়িশ ছাড়া কাউকে আমি স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে পারবো না।

ওয়াহাবঃ তুমি হয়তো জানো না মেঘকন্যা,তোমার মেঘরাজ্যের মানুষ খুব ঘোর বিপদে আছে। তাছাড়া তোমার স্বামী,শ্বশুর, শাশুড়ী এখন ইশালের হাতে বন্দী।তাদেরকে বাঁচাতে হলে তো তোমার ইশালের মৃত্যু ছোড়া লাগবে।আর মৃত্যু ছোড়া লাগলে আমাকে বিবাহ করতে হবে।

ওয়াহাবের কথা শুনে আমি হন্তদন্ত হয়ে আমার হাতে থাকা সাদা ডায়মন্ড পাথরের আংটির দিকে তাকালাম।পুরো পাথর গাঢ় সবুজ হয়ে গেছে। তার মানে আমার আয়িশের ঘোর বিপদ। হে খোদা,আমি এতটা মনভুলো হলাম কি করে? গতকাল বিকেল থেকে একবারও আমি এটার দিকে তাকাইনি।আমার হাত-পা কাঁপতে লাগলো।খুব নার্ভাস লাগছে।শরীর ঘামের ওপর ঘাম দিচ্ছে।

আমিঃ দয়া করে আমাকে যেতে দিন।তাদের খুব বিপদ।আমি না গেলে ইশাল তাদের মেরে ফেলবে।আমাকে মৃত্যু ছোড়াটা দিয়ে দিন।(কাকুতি মিনতি করে)

ওয়াহাবঃ নিশ্চয়ই যেতে দিবো।তবে আজ রাতে তোমার ও আমার বিবাহের পরে। আমিও তোমার সাথে যাবো তাদের উদ্ধার করতে।তাদের কথা শুনে কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেল?খবরদার এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করবে না।তাহলে হীতের বিপরীত হয়ে যাবে। তোমার আপন মানুষদের বাঁচানোর অস্ত্র কিন্তু আমার কাছে।সুতরাং সাবধান।তাদের বাঁচাতে চাইলে চুপচাপ আমাকে বিবাহ করে নেও।

কথাগুলো বলে ওয়াহাব রুম থেকে চলে গেল। আমি ফ্লোরে বসে নিরবে কাঁদছি। হঠাৎ তাদের কি হলো?আর এই ওয়াহাব জানলোই বা কি করে যে আমি মেঘকন্যা?আমার নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে।

🌨️🌨️🌨️

যত দূর চোখ যায় চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ।।হ্যাঁ,এটা সেই উত্তরের জঙ্গল।পৃথীবির ঘন অরণ্যের মাঝে একটা প্রকান্ড গুহা।বেশ বড় ও গভীর।সেখানেই আটকে রাখা হয়েছে মেঘরাজ্যের রাজা,রাণী,রাজপুত্র, মন্ত্রী, সেনাপতিকে।তাদেরকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য, অগণিত কালো সাপ।পায়ের নিচে হালকা করে জ্বলন্ত কয়লা।তাছাড়া ইশালের সৈন্যতো আছেই। হঠাৎ করে ইশাল সেখানে এসে রাগে ফুঁসতে লাগলো।

ইশালঃ ময়ূর রাজ মুশতাক আবসার ওয়াহাব। তোকে এর মাশুল খুব বাজেভাবে দিতে হবে।আমাকে ভয় দেখাস।আমি চাইলে তোর রাজ্য পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারতাম।কিন্তু তোর কাছে আমার মারণাস্ত্র থাকায় আমি কিছু করতে পারলাম না।আমাকে হুমকি দিস আমি তোর রাজ্য আক্রমণ করলে তুই মেঘকন্যাকে আমার মৃত্যু ছোড়া দিয়ে দিবি।তোকে শুধু পারিনি কাঁচা গিলে খেতে। তুই অপেক্ষা কর,আমি শক্তিশালী হলে সবার আগে তোর ব্যবস্থা করবো।

ইশাল খোঁজ পেয়েছে যে মেঘা ময়ূর রাজ্যে আছে।তাই ওকে আনতে ভোর সকালে সেখানে গিয়েছিল।কিন্তু ওর এবং ওয়াহাবের মাঝে দ্বন্দ্ব বেঁধে যায়।যাতে বেশ কিছু সময় ওদের দুজনের মধ্যে তলোয়ার যুদ্ধ চলে।আর ইশালের সাপের সাথে ওয়াহাবের সাদা ময়ূরের আক্রমণ। ইশালের থেকে ওয়াহাব জানতে পারে সে যাকে মেঘপরী বলে সেই মেঘকন্যা।বেশ কিছু সময় লড়াইয়ের পর ইশাল হেরে যায়।কিন্তু ইশাল সেখান থেকে মেঘাকে না নিয়ে ফিরতে চায় না। তখন ওয়াহাব ওকে হুমকি দেয় ইশাল যদি এখান থেকে এই মুহুর্তে না যায় এবং পরবর্তীতে এই রাজ্য আক্রমণ না করে। যদি করে তাহলে মেঘকন্যাকে ওয়াহাব ওর মৃত্যু ছোড়া দিয়ে দিবে।রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেখান থেকে চলে আসে।

রাজাঃ কি ইশাল আমাদের কন্যা কোথায়?তাকে তো তোমার সাথে দেখছি না।তুমি নাকি কন্যাকে না নিয়ে কিছুতেই ফিরবে না।তা এখন খালি হাতে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে এলে কেন?

রাকিনঃ তুই না বললি মেঘকন্যাকে না নিয়ে ফিরবি না।তাহলে এখন চলে এলি কেন?আসলে তোর দ্বারা এসব কিছুতেই সম্ভব না।তুই শুধু বড় বড় কথাই বলতে পারিস।

আয়িশঃ ওর মতো একটা পুঁচকে শয়তান পারবে এই অসাধ্য সাধন করতে?কি যে বলিস না রাকিন?গতকাল যদি আমাদের কে কালো জাদু দিয়ে ঘেরা না করতো, তাহলে আমাদের কিছুতেই এখানে এনে বন্দী করে রাখতে পারতো না। কিন্তু কাপুরুষটা তো পারেই পেছন থেকে হামলা করতে।

মন্ত্রীঃ ওর মরণ ঘনিয়ে আসছে।তাই তো ও এতো লাফাচ্ছে।ওর মৃত্যুর সাথে সাথে পুরো অঙ্গরাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।শুধু নিজের নয় পুরো রাজ্যের মরণ ডেকে এনেছে ইশাল।খুব শীঘ্রই আমাদের কন্যা আসছে।একবার শুধু মৃত্যু ছোড়াটা দিয়ে ওর বুকে রিহিসকে সহ ছোড়া বসিয়ে দিবে। তারপর ওর কাম তামাম হয়ে যাবে।

রাণীঃ আমাদের কন্যা এখনো আসছে না কেন?আমাদের বিপদের খবর কি ও পায়নি।আমারো বিশ্বাস আছে, আমাদের কন্যা ঠিক আমাদের খুঁজে বের করবে।সাথে এই শয়তানের বিনাশ করবে।

ইশাল ওদের কথা শুনে খুব রেগে গেলে। চোখ দিয়ে আগুন ছুঁড়ে তাদের পায়ের নিচে জলন্ত কয়লায় আগুন ধরিয়ে দিলো।খালি পায়ে থাকায় প্রত্যেকের পা জ্বলে যাচ্ছে। তাদের কষ্ট অনুভব করতে দেখে এখন একটু ইশালের শান্তি লাগছে।

🌨️🌨️🌨️

রাজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক ধ্যানে বাইরের প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখছি।যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ।উঁচু উঁচু পাহাড়,দূরে বিশাল এক ঝরনা।সেখান থেকে পানি আছড়ে পরার শব্দ কানে আসছে।পাহাড়ের ওপর প্রাসাদ।চারিদিকে সাদা আর সাদা।এখানকার সবকিছুর রং সাদা।বাগান ভর্তি নাম না জানা বিভিন্ন সাদা ফুলের গাছ।যেদিকে চোখ যায় সেদিকে সাদা ময়ূরের দেখা পাই।ওয়াহাবের শক্তি নাকি এই ময়ূরের মাঝে। আমি এটা গোপনে জানতে পেরেছি।আমি প্রথমে ভেবেছি ওয়াহাব বোধহয় নাগিন সিরিয়ালের মতো মানুষ থেকে ময়ূর হতে পারে।কিন্তু আমার ধারণাটা সঠিক নয়।সে ময়ূরদেরকে বশ করতে পারে।সারা রাজ্যে মানুষের চেয়ে বেশি সাদা ময়ূর।আমি প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা কক্ষের বাইরে যাই না।বেরুলেই সবাই ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে।নিজেকে তখন আজব চিড়িয়া মনে হয়।

তাছাড়া এখন তো আরো বের হতে পারবো না। আমার কক্ষের সামনে ৭/৮ টা সাদা ময়ূর পাহারায় রেখেছে ওয়াহাব।তাজিনকেও আমার কক্ষে ঘেঁষতে দিচ্ছে না। কারণ তাজিন এই বিয়ের ঘোর বিরোধে।অন্যের বউকে সে কিছুতেই তার ভাইকে বিয়ে করতে দিবে না।এটাতো অনেক বড় অন্যায়।যার কারণে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছে। সারা রাজ্যে খুশির জোয়ার।তাদের রাজা আজ রাতে মেঘপরীকে বিয়ে করবে।পুরো রাজ্যকে খুব সুন্দর করে সাজানো হচ্ছে। চারিদিকে হৈচৈ কলরব। আমি এখন বসে বসে অশ্রু বিসর্জন করছি।

কুহুকলিঃ অনেক বড় বিপদ হয়ে গেছে মেঘকন্যা।রাজা মশাই,রাণী মা,আমার বন্ধু আয়িশ,সেনাপতি রাকিন,মন্ত্রী মশাইকে শয়তান ইশাল ধরে নিয়ে গেছে। তোমাকে খুব শীঘ্রই এখান থেকে মৃত্যু ছোড়া নিয়ে পালাতে হবে। নয়তো অনেক বড় সর্বনাশ হয়ে যাবে।

মিষ্টি একটা স্বর শুনে আমার ধ্যান ভাঙ্গে।আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজতে থাকি কোথা থেকে আসছে।তখনি দেখি জানলায় বসা এক নাম না জানা পাখি।আমার পরনে আজ হালকা ফিরোজা রঙের বিশাল বড় ড্রেস।
সবসময় সাদা পরে থাকতে ভালো লাগে না।নিজেকে বিধবা,বিধবা মনে হয়। আমার আয়িশ কি মারা গেছে নাকি যে আমি সবসময় সাদা ড্রেস পরবো।ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম,পাখির পালকের রংটাও আমার ড্রেসের রং।দেখতে অনেকটা টিয়া পাখির মতো।

আমিঃ কে তুমি? আর তুমি আমাকে চিনলে কি করে?তুমি কথা বলছো কিভাবে?

কুহুকলিঃ আমি কুহুকলি মেঘকন্যা।তুমি কি সত্যি আমাকে চিনোনি।আমি তোমার সাহায্য করতে এসেছি। তোমায় এখান থেকে দ্রুত পালাতে হবে।

আমিঃ কুহুকলি তুমি!!!আমি সত্যি তোমায় চিনতে পারিনি।কি হয়েছে আমায় সব খুলে বলো তো।আমার আয়িশের বিপদ হয়েছে তাই না?দেখো আমার হাতে থাকা আংটিটা সবুজে পরিণত হয়েছে।

কুহুকলি আমায় সব খুলে বললো।যা শুনে ইশালের প্রতি আমার রাগটা আরো বেড়ে গেলো।ইচ্ছে করছে ব্যাটাকে জ্যন্ত কবর দেই।

আমিঃ ওদের কোথায় আটকে রেখেছে কুহুকলি?

কুহুকলিঃ উত্তরের ঘন জঙ্গলের ভেতরে ভয়ংকর এক গুহায়।আমি তোমাকে সেখানে নিয়ে যাবো।আমি গতকাল তোমার কাছে আসতে চেয়ে ছিলাম।কিন্তু তারপর ভেবে দেখলাম তখন আমার লুকিয়ে ইশালকে লক্ষ্য করা উচিত।যাতে আমি পরবর্তীতে তোমাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারি।তুমি এবার পালানোর পথ খুঁজো মেঘকন্যা।

আমিঃ আমিও কি কম বড় বিপদে পরেছি ভেবেছো?ও ব্যাটা ময়ূর রাজ ওয়াহাব আমাকে আজ রাতের মধ্যে বিয়ে করবে বলেছে।যদি তাকে বিয়ে না করি তাহলে আমাকে সেই মৃত্যু ছোড়া দিবে না।আর এত কষ্ট করে এখানে এসে ঐ মৃত্যু ছোড়া না নিয়ে কি করে যাই বলো?সেটা নিত্যাতন্ত বোকামি ছাড়া কিছু নয়।

কুহুকলিঃ তুমি ওর আশায় কেন বসে আছো মেঘকন্যা?ঐ ওয়াহাব তোমাকে জীবনেও মৃত্যু ছোড়া দিবে না।তোমাকে মিথ্যে বলেছে।যাতে তুমি ওকে বিবাহ করতে রাজী হও।তুমি যদি ওকে বিবাহ করো তাহলে সারাজীবনের জন্য তোমাকে ওর দাসী বানিয়ে রাখবে। তুমি অন্য পন্থা অবলম্বন করো।আমি তোমাকে সাহায্য করবো।

আমিঃ এই কক্ষ থেকে বের হওয়া আমার জন্য মুশকিল। চারিদিকে সাদা ময়ূরের কড়া নজরদারি। আমি এখন থেকে এক চুলও নাড়তে পারবো না। তুমি কিছু করো। আমার অনেক ভয় করছে। আমি কি সবাইকে রক্ষা করতে পারবো?

কুহুকলিঃ তুমি চিন্তা করো না। আমি ঠিক রাস্তা বের করে নিবো। তুমি অবশ্যই সবাইকে রক্ষা করতে পারবে।তোমাকে যে পারতেই হবে।আমার কাছে একটা বুদ্ধি আছে।তুমি সেটা কাজে লাগাতে পারো।তাছাড়া তুমি ময়ূর রাজ্যের রাজকন্যা তাজিনের সাহায্য নিতে পারো।মেয়েটা খুব ভালো। ও তোমাকে নিশ্চয়ই সাহায্য করবে।

🌨️🌨️🌨️

কুহুকলির কথা শুনে আমি একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লাম।তারপর বিষন্ন মনে বললাম।

আমিঃ ওকে আমার কক্ষে আসতে দিচ্ছে না। তাজিনও জেনে গেছে আমি মেঘকন্যা। তবে আমি বিবাহ অনুষ্ঠানে কোন ফাঁকে ওর কাছে সাহায্য চাইতে পারি।আর তোমার বুদ্ধিটা বলো।

কুহুকলিঃ শোনো তাহলে…………………বুঝতে পেরেছো আমি কি বলছি?এবার আমাকে কিছু জঙ্গলের গাছ-গাছালি ও পাতা সংগ্রহ করতে যেতে হবে।নয়তো এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

আমিঃ হ্যাঁ তুমি ঠিক বলেছো।এবার কেউ দেখে ফেলার আগে এখান থেকে পালাও।

কুহুকলিঃ আচ্ছা, আমি আসি।তুমি সাবধানে থেকো।ভয় পেয়ো না,আমি তোমার আশেপাশেই আছি।মাথা ঠান্ডা করে কাজ করো।

আমিঃ তুমিও সাবধানে যেয়ো।অদৃশ্য জঙ্গলে কিন্তু পদে পদে বিপদ।তোমার ক্ষতি হতে পারে।কোন কিছু ভুলে যেও না।

ওয়াহাবঃ কি ভুলে যাবে না? আর কেই বা ভুলে যাবে না? তুমি কার সাথে কথা বলছো মেঘপরী?(রেগে)

ওয়াহাবের গলার আওয়াজ পেয়ে আমার গলা শুকিয়ে গেলো।ব্যাটা বিটকেল আবার সব শুনে নেয়নি তো।তাহলে তো আমার ঘোর বিপদ।ভয়ে এদিক সেদিক তাকাতে লাগলাম।মনে হয় কুহুকলিকে দেখেনি।নয়তো ওর নাম অবশ্যই নিতো। আমি অনেক ভয় পাচ্ছি। মনে হচ্ছে ওয়াহাব অনেক রেগে আছে।এবার কি হবে?

আমিঃ কেউ না।কে আছে এখানে যে তার সাথে কথা বলবো?আপনি তো আমাকে কারো সাথে মিশতেই দিচ্ছেন না।তাই আপন মনে নিজের সাথে কথা বলছি। নিজে নিজে আয়িশকে বলছিলাম, সে যেনো আমাকে কখনো ভুলে না যায়।

নিজেকে যথেষ্ট শান্ত ও স্বাভাবিক রেখে কথার উত্তর দিলাম আমি।আল্লাহ মাফ করো।নিজেকে ও কুহুকলিকে বাঁচাতে আমার মিথ্যে কথা বলতে হলো।ওয়াহাবের মনে হয় আমার কথাটা বিশ্বাস হলো। তাই রাগটাকে দমিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো।

ওয়াহাবঃ ওহ্ আচ্ছা। বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। রাতে আমাদের বিবাহ অনুষ্ঠান। আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি।এবার তুমি নিজেকে তৈরি করে নেও।আমি দাসীদের পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমাকে সাজিয়ে দেয়ার জন্য। যত তাড়াতাড়ি আমকে বিবাহ করবে তাতে তোমার রাজ্যের লোক ও তোমার আয়িশের জন্য ভালো।কথাটা মনে রেখো।

ওয়াহাব চলে যেতেই আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।আর কয়েক সেকেন্ড থাকলে কুহুকলি ও আমি বিপদে পরতাম।আল্লাহ সাথে ছিলো বলে রক্ষা।

চলবে

#মেঘকন্যা☁️
#Part_24
#Writer_NOVA

রাতের অন্ধকারে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে একটা ময়ূরের গাড়ি খুব দ্রুত ছুটে যাচ্ছে। বারবার পেছনে তাকাচ্ছি আমি।আমার সাথে তাজিন ও কুহুকলি।কোনরকম জীবন বাজি রেখে ময়ূর রাজ্য থেকে পালাচ্ছি। ওয়াহাবকে শরাবের সাথে নেশার জড়িবুটি খাইয়ে আমি ছোড়া নিয়ে পালিয়েছি।আমাকে সাহায্য করছে তাজিন।হঠাৎ ময়ূর গাড়ি থেমে গেল।আমরা কিছুটা সামনে ঝুঁকে পরলাম।চারিদিকে টিমটিম আলো জ্বলছে।

তাজিনঃ কি হলো হঠাৎ থেমে গেলো কেন?
আমিঃ আমিও তো কিছু বুঝতে পারছি না।
কুহুকলিঃ সর্বনাশ হয়ে গেছে মেঘকন্যা।(ভয় পেয়ে)
আমিঃ কেন কি হয়েছে? (ঢোক গিলে)
তাজিনঃ কি সর্বনাশ কুহুকলি?

আমাদের কথা শেষ হওয়ার আগেই অনেকগুলো সৈন্য আমাদের গাড়ি ঘিরে ফেললো।সবার পোশাক সাদা। ময়ূরের পেখমের পোশাক দেখে আমরা খুব অবাক হলাম। ওয়াহাব এখানে এলো কি করে? আমাদের জোর করে গাড়ি থেকে নামালো।গুটি গুটি পায়ে সামনে এগিয়ে দেখলাম একজন উল্টো দিকে ঘুরে আছে।বর্তমানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি পাহাড়ী রাস্তার বাঁকে।

ওয়াহাবঃ কোথায় পালাচ্ছিলে মেঘপরী?

ওয়াহাবের গলার স্বর পেয়ে আমি ভয়ে জমে গেলাম।ওকে তো আমি শরাবের সাথে নেশার জড়িবুটি মিশিয়ে অজ্ঞান করে রেখে এসেছিলাম।তাহলে এখানে আসলো কি করে? ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে।
আমি তাজিনের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছি।

ওয়াহাবঃ নিশ্চয়ই ভাবছো নেশার জড়িবুটি মেশানোর পরেও আমি সুস্থ-সবল কীভাবে দাঁড়িয়ে আছি? আমার থেকে পালানো এত সহজ নয় মেঘপরী।তুমি আজই আমাকে বিবাহ করবে। নয়তো তোমার অনেক বড় সর্বনাশ হয়ে যাবে। তুমি মৃত্যু ছোড়া নিয়ে আমার নাকের ডোগা দিয়ে পালাবে। আর আমি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবো।এটা কি হয়?

আমিঃ আমাকে যেতে দিন।নয়তো আপনার প্রাণনাশের আশংকা আছে ময়ূর রাজ। (রাগী স্বরে)

আমার কথা শুনে ওয়াহাব শয়তানি হাসি দিয়ে ঘাড় কাত করে আমার দিকে তাকালো। আমার দিকে এগিয়ে আসতে নিলে তাজিন আমার সামনে এসে আমাকে আটকে দাঁড়ালো। কুহুকলিকে আমি আশেপাশে দেখতে পাচ্ছি না।তাকে লুকিয়ে যেতে বলেছি।কারণ মৃত্যু ছোড়াটা তার কাছে।

তাজিনঃ ভাইয়া তুমি মেঘকন্যাকে যেতে দেও।আমি থাকতে তোমায় কখনো ওকে বিবাহ করতে দিবো না।এটা অন্যায়।তুমি জেনেশুনে এই অন্যায় কাজ করতে পারো না।তুমি হয়তো ওর রূপে পাগল হয়ে পাগলামি করতে পারো।কিন্তু আমি একটা মেয়ে হয়ে আমার চোখের সামনে কখনো অন্য মেয়ের ক্ষতি হতে দিতে পারি না।তুমি আরেক পা এগুলে আমি ভুলে যাবো তুমি আমার ভাইয়া।

ওয়াহাবঃ নিজের ভালো চাইলে ওর সামনে থেকে সরে যা।নয়তো আমি খারাপ হতে বাধ্য হবো।(রেগে)

তাজিনঃ তুমি আরেক পা এগুলে আমিও ভুলে যাবো তুমি আমার ভাইয়া। আমি ভালোভাবে বলছি মেঘকন্যাকে যেতে দেও।

ওয়াহাবঃ বুঝেছি, তোকেও তোর বাবা-মায়ের সাথে উপরে পাঠাতে হবে।ভেবেছিলাম তুই বেঁচে থাকলে আমার লাভ হবে, তাই তোকে সেদিন তোর বাবা-মায়ের সাথে মারি নি।কিন্তু এখন দেখছি তোকে না মেরে আমি সবচেয়ে বড় ভুল করেছি।তুই এখন আমার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিস।আমার সামনে দিয়ে তুই মেঘপরীকে সাহায্য করে ওর গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছিস।আমার রাস্তায় কাটা হয়ে দাঁড়ালে আমি তা উপরে ফেলি।তাহলে তোকে কি করে বাঁচিয়ে রাখি বল।(রেগে +চিৎকার করে)

তাজিনঃ মামামানে!!! তুমি আমার বাবা-মা কে মেরে ফেলোছো!!!এতটা শয়তান তুমি কি করে হলে ভাইয়া?উনারা তোমারও বাবা-মা ছিলো। ছিঃ কতটা নিচ তুমি। ধিক্কার জানাই এমন সন্তানকে।যে নিজের বাবা-মাকে মারতেও পিছপা হয় না।

ওয়াহাবঃ আমার দ্বারা সব সম্ভব। তাছাড়া তোর বাবা-মা তো আমার বাবা-মা ছিলো না।আমাকে ছোট বেলায় কুড়িয়ে পেয়েছিলো তারা।কিন্তু আমার হাতে রাজ্য তুলে দিতে চায়নি।তাইতো তাদেরকে অত্যাচার করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে আমি সিংহাসন জয় করে নিয়েছি।সেদিন যদি তোকে শেষ করে দিতাম তাহলে আজ এই দিন দেখতে হতো না।

তাজিনঃ পরগাছা সবসময় পরগাছাই হয়।তাদের আপন করতে নেই। আমি বাবা-মা তোর মতো শয়তানকে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করে অনেক বড় ভুল করেছে।তাইতো তারা এমন মাশুল দিয়েছে। আমি তোকে নিজের আপন ভাই হিসেবে জানতাম।কিন্তু তোর এই ভালো মানুষির মধ্যে যে এতবড় একটা শয়তান চরিত্র লুকিয়ে আছে তা কখনো ধরতে পারিনি।তাই তো মেঘকন্যাকে আমাকে এসব কথা বলায় আমি বিশ্বাস করিনি।কিন্তু এখন সে আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে তোর আসল রূপ দেখিয়ে দিয়েছে। তোর ওপর আমার থু থু ফেলতেও ঘৃণা করছে।অমানুষ কোথাকার?

ওয়াহাব রেগে তেড়ে এসে তাজিনের গলা চেপে ধরলো। আমাকে সৈন্যরা আটকে রেখেছে। আমি সুযোগ বুঝে তাদের সাথে নিজের শক্তি দিয়ে লড়াই করছি।সৈন্যরা আমার সাথে পেরে উঠছে না।তাই ওয়াহাব তাজিনকে ছেড়ে আমার দিকে লড়াই করতে এগিয়ে এলো।আমরা দুজন এখন বেশ শক্তি নিয়ে একে অপরের আঘাত প্রতিহত করছি।কারো থেকে কেউ কম নয়।এখন পুরো বিষয়টা বুঝতে আমাদের অতীত থেকে ঘুরে আসতে হবে।

🌨️🌨️🌨️

অতীত…….

বিশাল বড় এক সাদা ড্রেসে আমাকে সাজানো হয়েছে।অসম্ভব সুন্দর ড্রেসটা।নিচের দিকে কোণাচে করে সাদা পাথরের কাজ করা। পুরো মুখ ঢাকা এক পাতলা ওড়না দিয়ে। বুঝতে পারছি না ঢং করে এরকম পাতলা ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকার মানে কি?সব তো দেখাই যাচ্ছে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম।সবার নজর এখন আমার দিকে।ওয়াহাব লুচু ব্যাটা আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। হাতে থাকা নেশার জড়িবুটি পাউডারের কৌটা-টা লুকিয়ে ফেললাম।চারিদিকে শুধু সাদা আর সাদা। চোখ ধাঁধিয়ে আসছে।তাজিন কোণার দিকে মন খারাপ করে বসে আছে।

ওয়াহাবঃ স্বাগতম, আমার রাণী।উপস্থিত প্রজা ও রাজ্যের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ আপনাদের হবু ময়ূর রাণী চলে এসেছে। কিছু সময় পর বিবাহ অনুষ্ঠান শুরু হবে।আপনারা আনন্দে মেতে উঠুন ।

ওয়াহাবের পরনে আজ সাদা ময়ূরের পেখমের পাঞ্জাবী।আশেপাশের সবাই আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। আমি হাত মুচড়া-মুচড়ি করছি।কারণ কোন সুযোগ খুঁজে পাচ্ছি না। এখন শক্তি দিয়ে লড়াই করা সম্ভব নয়। কারণ এতে আমাকে বন্দী করে ফেলবে।তাহলে আরেক ভেজাল।আমাকে নিয়ে সিংহাসনে বসানো হলো।আমি তাজিনের দিকে তাকালাম।তাজিন চোখের ইশারায় বুঝালো সব ঠিক আছে। ওয়াহাব আমার পাশের সিংহাসনে বসতেই ওর মুখটা কালো হয়ে গেল।আর আমি মিটমিট করে হাসতে লাগলাম।

ওয়াহাবঃ সিংহাসনে পানি কে ফেলেছে?(রেগে)

আমিঃ কারো সাহস আছে আপনার সিংহাসনে পানি ফেলার।এত জরুরি যখন আপনার ওয়াস রুমে যেতে হবে আমাদের বললেই পারতেন।কাপড় নষ্ট করার কি দরকার ছিলো ময়ূর রাজ? (মুখ টিপে হেসে)

আমার কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। ওয়াহাব সবাইকে এক রাম ধমক দিয়ে গটগট করে নিজের কামরায় চলে গেল। ওয়াহাব কে চলে যেতে দেখে সবাই একে অপের সাথে কথা বলতে মশগুল হয়ে গেলো। আমি সেই ফাঁকে তাজিনের কাছে চলে গেলাম।ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম।

আমিঃ শুকরিয়া তাজিন।তুমি যদি সিংহাসনে পানি না ফেলতে তাহলে আমি এই সুযোগটা পেতাম না।

তাজিনঃ তুমি কথা না বলে কোষাগারের দিকে ছোটো।তোমাকে দেরী করলে চলবে না।মৃত্যু ছোড়া নিয়ে তোমাকে পালাতে হবে।

আমিঃ তুমি ঠিক বলেছো।তুমি এদিকে খেয়াল রাখো।

আমি ড্রেস উঁচু করে কোষাগারের দিকে ছুটলাম।সামনে এসে প্রহরীদের মুখে হাতে থাকা জড়িবুটি পাউডার মুখে ছুঁড়ে মারলাম।তারা কিছু সময়ের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পরে গেল।আমি স্টেপ বাই স্টেপ একেক দরজা খুলে ছোড়ার কাছে পৌঁছে গেলাম।আমি ছোড়াটা হাতে নিতেই চারিদিকে সোনালি আলো ছড়িয়ে পরলো।আমার সারা শরীর একটা কাঁপুনি দিয়ে উঠলো।ছোড়া লুকিয়ে বের হতেই দেখি কুহুকলি আমার দিকে উড়ে আসলো।

কুহুকলিঃ কাজ হয়েছে মেঘকন্যা?

আমিঃ হ্যাঁ,এই নাও ছোড়া।তুমি এটা নিয়ে যত শীঘ্র সম্ভব রাজপ্রাসাদ থেকে বের হয়ে যাও।আমি কিছু সময়ের মধ্যে আসছি।

কুহুকলির পাখা বাড়িয়ে ছোড়াটা নিয়ে নিজের শক্তি দিয়ে সেটা অদৃশ্য করে ফেললো।আমি ড্রেস উঁচিয়ে আবার সিংহাসনের দিকে দৌড় দিলাম।রাজদরবারে গিয়ে দেখি এখনো ওয়াহাব আসে নি।তাজিন শরাবের পাত্র হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তাজিনঃ কাজ শেষ মেঘকন্যা?

আমিঃ সব শেষ। এখন তুমি সবার চোখের আড়ালে এখান থেকে বের হয়ে যাও।দেরী করলে চলবে না।

তাজিনঃ আমি আমার ময়ূর গাড়ি নিয়ে তোমার জন্য রাজফটকোর বাইরে অপেক্ষা করবো।তুমি জলদী চলে এসে।আর হ্যাঁ,সব ময়ূর এখন উত্তরের কক্ষে আছে। ওদের খাবার খেতে দেওয়া হয়েছে। তুমি তাদেরকে আগুনে জ্বালিয়ে দিয়ে যেয়ো।নয়তো ভাইয়ার কিছুই হবে না।

আমিঃ সবকিছু করেই আমি রাজ্য ত্যাগ করবো। শয়তান ওয়াহাবের বিনাশ আজ হবে।

তাজিনঃ তুমি বিকেলে আমাকে সব বলেছে।কিন্তু তারপরেও আমার কেন জানি বিশ্বাস হয় না।আমার ভাইয়া আমার বাবা-মা কে মারতে পারে না।কিন্তু আমি জানি তুমি মিথ্যে বলছো না। তারপরেও মনটা সায় দিচ্ছে না। কিন্তু নিজের প্রাণ থাকা অব্দি আমি তোমাকে সাহায্য করবো।

আমিঃ তুমি আমাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারো।যদি সময় পাই তাহলে তোমার ভাইয়ের ভালো মানুষের আড়ালের কুৎসিত রূপটাও তোমাকে দেখিয়ে দিবো।

আমি চটজলদি শরাবের পাত্রে হাতে থাকা সবটুকু জড়িবুটি পাউডার মিশিয়ে দিলাম।তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সিংহাসনে বসে পরলাম।কিছু সময় পর ওয়াহাব চলে এলো।তাজিন হাতের শরাবের পাত্রটা একটা দাসীর হাতে দিয়ে সেখান থেকে আস্তে করে কেটে পরলো।ওয়াহাব আমার পাশে বসতেই আমি খুশি মনে তার হাতে শরাবের গ্লাস তুলে দিলাম।সে আমার দিকে এতটায় বুদ হয়ে তাকিয়ে ছিলো যে কিছু না বলে পরপর কয়েক গ্লাস শরাব পান করলো।কিছু সময়ের মধ্যে সে ঢলে পরলো।রাজদরবারের সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরলো।আমি ফাঁক বুঝে সেখান থেকে দৌড়ে পালালাম। আসার সময় উত্তরের কক্ষে নিজের শক্তি দিয়ে ঘেরা দিয়ে ময়ূরের ওপর আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে আসলাম।

রাজ ফটকের সামনে এসে দেখি তাজিন ও কুহুকলি ময়ূর গাড়ি নিয়ে বসে আছে। তখনি কয়েকজন সৈন্য আমাকে পালাতে দেখে ফেললো।তারাও আমার পিছু নিলো।সারা রাজদরবারে বাতাসের মতো ছড়িয়ে গেলো তাদের রাণী পালিয়েছে।

তাজিনঃ জলদী মেঘকন্যা।এখানে এক মুহুর্তও নয়।

আমিঃ আমাকে কিছু সৈন্য দেখে ফেলেছে। সচারাচর ব্যবহৃত পথ দিয়ে যাওয়া যাবে না।তুমি আমাকে অন্য কোন পথ দিয়ে নিয়ে চলো।

তাজিনঃ একটা পথ আছে।সেটা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে। তবে অনেক কষ্ট হয়ে যাবে।

আমিঃ হোক,তারপরেও আমাদের সেখান দিয়ে যেতে হবে।

আমি ময়ূরের গাড়িতে চড়ে বসতেই বাতাসের বেগে সেটা চলতে আরম্ভ করলো।আমি পেছনের দিকে মাথা হেলিয়ে দিলাম।আজ যদি তাজিন না থাকতো তাহলে আমার বড় বিপদ হয়ে যেতো। আজকের ঘটনাটা অনেকটা আয়িশের সাথে বিয়ের ঘটনার মতো হয়ে গেলো।তাই ভেবে একটা মুচকি হাসি দিলাম।

🌨️🌨️🌨️

বর্তমান…….

ওয়াহাব ও আমি দুজনেই অদৃশ্য শক্তি দিয়ে একে অপরের সাথে মোকাবিলা করছি।ওর ওপর নেশার জড়িবুটি বেশিক্ষণ কাজ করেনি।কিছু সময় পর জ্ঞান ফিরে এসেছে।আমাদের পুরো পরিকল্পনাটা ছিলো কুহুকলির।কুহুকলি বিকালে আমাকে এই বুদ্ধিগুলোই দিয়েছিলো।সব ওর কথামতোই হয়েছে। জঙ্গলের থেকে নানা পাতা,গাছের বাকল খুঁজে এনে আমাকে নেশার জড়িবুটি পাউডার বানাতে সাহায্য করেছে কুহুকলি।কিন্তু এতো কষ্ট করেও লাভ হলো না। সেই ধরা পরেই গেলাম।

ওয়াহাব যখনি শুনেছে আমি পালিয়েছি তখনি সৈন্য নিয়ে আমাদের আগে অন্য পথ দিয়ে আমাদের আগে পাহাড়ের বাকে চলে এসেছে।দুজনের মধ্যে বেশ জমজমাট লড়াই চলছে। তাজিন এগিয়ে এসে ওয়াহাবকে পেছন থেকে আটকে দিলো।ওয়াহাব ওকে ঝাড়া মেরে ফেলে দিলো। তাজিন একটা পাথরের সাথে বারি খেয়ে সেখানেই পরে রইলো।হাত দিয়ে মাথা ধরে রেখেছে।

আমিঃ তাজিন কি হয়েছে তোমার?

তাজিনঃ তুমি আমার জন্য চিন্তা করো না।এই শয়তানকে ধ্বংস করে দেও।ওকে ছাড়বে না। ও আমার বাবা-মাকে মেরে ফেলেছে। তুমি ওকে নৃশংস মৃত্যু উপহার দিবে।(চেখ,মুখ কঠিন করে)

ওয়াহাবঃ মাথায় আঘাত পেয়েও মনের বারুদ নিভেনি।ভালো চাস তো আমার পথ থেকে সরে দাঁড়া। একবার শুধু মেঘপরীকে কাবু করতে দে।তারপর তোর ব্যবস্থা করবো।অন্ধ কুঠুরিতে সারাজীবনের জন্য ধাক্কা মেরে ফেলে দিব।

তাজিনঃ আমার সর্বনাশের কথা না চিন্তা করে নিজের কথা ভাব তুই। তোর মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে। থেমে রয়েছে কেন মেঘকন্যা?ওকে শেষ করে দেও। ওর মতো মানুষের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই।

আমিঃ আমিতো ঠিক সময়ে ময়ূরের ওপর আগুন ধরিয়ে দিয়ে এসেছি। ওয়াহাবের শক্তি যদি ময়ূরে থাকে তাহলে এতক্ষণে ওর মৃত্যুর কোলে ঢলে পরার কথা।কিন্তু এখনো বেঁচে আছে কি করে? (মনে মনে)

ওয়াহাবঃ ভেবেছিলাম তোকে জানে মারবে না।কিন্তু তুই একটু বেশি ফালাচ্ছিস।তাই তোকে এখন মারতেই হচ্ছে।(সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে) সৈন্যরা তোমরা গিয়ে তাজিনকে ধরে এই পাহাড় থেকে ফেলে দেও।ওকে বাঁচিয়ে রেখে আমার কোন লাভ নেই। ওর মরার সময় হয়েছে।তাই আমার মুখে মুখে তর্ক করছে।(রেগে হুংকার দিয়ে)

আমি এগিয়ে এসে সৈন্যদের বাঁধা দিতে গেলে ওয়াহাব তার শক্তি দিয়ে আমাকে দূরে ছিটকে ফেলে দিলো।হাত-পায়ে বেশ খানিকটা চোট পেলাম।ততক্ষণে তাজিনকে জোর করে সৈন্যরা পাহাড়ের কিনারায় নিয়ে গেছে। আমি দৌড়ে সেদিকে যেতে চাইলে ওয়াহাব আমার পথ আটকে দাঁড়ায়।

ওয়াহাবঃ খুব ভালোভাবে দুজনকে বললাম আমার সাথে রাজ্যে ফিরে চলো।কিন্তু কারোর ভালো লাগলো না। তাই একজনকে মেরে আরেক জনকে আধমরা করে আমি চললাম।খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে মেঘপরী।আমার সাথে চলো।ভালোবেসে সব কষ্ট পুষিয়ে দিবো।

আমিঃ মরে যাবো তাও তোর মতো জঘন্য মানুষের হাতে নিজেকে তুলে দিবো না।ভালো চাইলে তাজিনকে ছেড়ে দিতে বল।নয়তো তোকে আমি কি করবো নিজেও জানি না।

ওয়াহাবঃ ওরে বাবা,অনেক ভয় পেয়েছি। এত চোখ উল্টিয়ো না মেঘপরী।বুকের বাপাশটা খুব করে লাগে।তোমার এই কড়া কড়া কথাগুলো আমার কাছে মিষ্টির মতো মধূর মনে হয়। (বাঁকা হেসে)

ওয়াহাব সামনে আসতেই আমি চোখ বন্ধ করে নিজের শক্তি দিয়ে ওর উপর সাদা ধোঁয়ার কুন্ডলি ছুঁড়ে মারি।সাথে সাথে ওয়াহাবের গায়ে আগুন ধরে যায়।ওয়াহাব চিৎকার করা শুরু করে। ওয়াহাবের চিৎকার শুনে সৈন্যরা তাজিনকে পাহাড় থেকে ফেলে ওর দিকে এগিয়ে যায়।সৈন্যরা সামনে যেতেই ওদের শরীরেরও আগুন ধরে যায়।সবাই এখন নিজেকে বাচাতে ব্যস্ত।আমি দৌড়ে পাহাড়ের কিনারায় ছুটে যাই।কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে।

আমিঃ তাজিন!!!!!(চিৎকার করে)

তাজিন নিচের দিকে পরে যাচ্ছে। তবে ওয়াহাবের গায়ের আগুন ধরানোর দৃশ্যটি ও দেখতে পেয়েছে।যাতে করে ওর ঠোঁটের কিনারায় আমি তৃপ্তির হাসি দেখতে পেয়েছি।নিজের বাবা-মায়ের খুনীর সর্বনাশের খুশিতে ছিলো সেই হাসি।কয়েক মিনিটে পুরে ছারখার হয়ে যায় ওয়াহাব ও তার সৈন্যরা।ইতিমধ্যে মৃত্যুর স্বাদ তারা গ্রহণ করে ফেলেছে।তাজিনকে বাঁচাতে দিকপাশ না ভেবে আমিও লাফ দিলাম পাহাড় থেকে।বিশাল উঁচু পাহাড়। জানিনা আদোও আমরা দুজন বাঁচবো কিনা।কুহুকলি কোথায় আছে কে জানে?থাকলে হয়তো ওকে আমি শেষ দেখাটা দেখতে পারতাম।আমার আয়িশ কি আমাকে ছাড়া ভালো থাকবে?কে জানে কি করবে ছেলেটা?নিশ্চয়ই পাগলামী করবে আমার মৃত্যুর খবর পেয়ে। মেঘরাজ্য ও তার প্রজাদের কি হবে?আর কিছু ভাবতে পারছি না। নিজের শরীরটা পুরো হালকা লাগছে।পরম আবেশে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললাম।
জানি না আর খুলতে পারবো কিনা???

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here