মানুষ খাওয়া ভূত paet 3

মানুষ খাওয়া ভূত
paet 3

এরপর সকাল সকালই মিসির আলি সাহেব আবির সাহেবকে একটা জরুরী কাজ আছে বলে তার বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। মিসির আলি সাহেব নিজের বাড়িতে গিয়েই এই ধরণের অদ্ভুত শিশু সম্পর্কে কোন বই আছে কিনা তা খুঁজতে থাকেন । কিন্তু এই রকম শিশুকে নিয়ে কোন বইই পাননি তিনি!

এরপর মিসির আলি সাহেব ভাবলেন, শম্মীর জন্মের সময় যে ডাক্তার তার মায়ের অপারেশন করে ছিলো তার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে হবে। নিশ্চই সে ই আবির সাহেব এবং তার স্ত্রীর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাদের সাথে একটা ভয়ংকর গবেষণার পরীক্ষা চলিয়েছিলো! যার ফল আজ এই ভয়ংকর হিংস্র মেয়ে শম্মী! সেই ডাক্তারই তার গবেষণার বস্তু বানায় শম্মী এবং তার মা কে। তাই সে ভেকসিনের নাম করে তার গবেষণায় উৎপন্ন কোন মেডিসিন শম্মীর মায়ের শরীরে প্রয়োগ করে।

কিন্তু তার গবেষণার বিষয়টা কী ছিলো? সে কী কোন হিংস্র মানুষ তৈরি করতে চাইছিলো! কিন্তু কেন? এইসব প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিলো মিসির আলি সাহেবের মাথায়। এইসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে মিসির আলি সাহেবকে ৬ বছর আগে ফিরে যেতে হবে যখন শম্মীর জন্ম হয়। এবং তখন ডাক্তার ওয়াজেদ আলি কী নিয়ে গবেষণা করছিলো এটাও জানতে হবে!

এরপর মিসির আলি সাহেব প্রায় ৬ বছর আগের শম্মীর জন্মের
পরেরদিনের পত্রিকাগুলো অনেক কষ্টে একজনকে দিয়ে খুঁজিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। আবির সাহেবের কথাই ঠিক ছিলো। শম্মীর যেদিন জন্ম হয় সেদিনই একটা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ডাক্তার ওয়াজেদ আলি এবং খবরটা পরের দিন প্রকাশিত হয় খবরের কাগজে! খবরের কাগজ গুলো পড়ে ডাক্তার ওয়াজেদ আলি অনেক কিছু সম্পর্কেই স্পষ্ট ধারণা পায় মিসির আলি সাহেব।

খবরের কাগজে ওয়াজেদ আলির বাড়ি কোথায়, তিনি গবেষণা কোথায় করতেন, তিনি কী কী বিষয় নিয়ে গবেষণা করে সফল হয়েছেন, কী কী বিষয়ের উপর পুরষ্কার পেয়েছেন, তার বিশ্বস্ত সহযোগি কারা ছিলো, তার প্রিয় বন্ধু কারা ছিলো এসব কিছু সম্পর্কেই বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া ছিলো!

যদিও মৃত্যুর আগের সময়টাতে ওয়াজেদ আলি কী নিয়ে গবেষণা করছিলেন এই বিষয়ে পত্রিকাতে কিছুই প্রকাশ পায়নি!

এরপর মিসির আলি সাহেব খবরের কাগজ থেকে ডাক্তার ওয়াজেদ আলির বিশ্বস্ত সহযোগিদের নাম দেখে তাদের ঠিকানা বা টেলিফোন নাম্বার বের করে তাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। যদিও অনেক জনকেই পায় না সে! শুধু অল্প কয়েক জনের সাথেই কথা বলার সুযোগ পান তিনি। তারা মিসির আলি সাহেবকে জানান, ডাক্তার ওয়াজেদ আলির শেষ গবেষণাটা ছিলো অনেকটা গোপন গবেষণা! সে স্বভাবতই যেকোন গবেষণা একা করতেন না। তার সহযোগিদের সাথে নিয়ে তিনি তার জীবনের প্রায় সবগুলো গবেষণাই করেন!

কিন্তু তিনি মৃত্যুর আগে যে গবেষণাটা করছিলেন সে গবেষণায় তিনি তার সাথে আর কাউকেই নেয়নি! তিনি একা একাই তার শেষ গবেষণাটা পরিচালনা করেন। তিনি তার নিয়মিত গবেষণা যে গবেষণাগারে করতেন এই গবেষণাটা সেখানেও করেন না। গবেষণাটি করেন ব্যাক্তিগত ভাবে তার নিজস্ব বাড়িতে। তাই তার কোন সহযোগিই জানেন না যে , মৃত্যুর পুর্বে ডাক্তার ওয়েজেদ আলি কী নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছিলেন।

কিন্তু মিসির আলি সাহেব ভালোমতই বুঝতে পারেন যে ডাক্তার ওয়াজেদ আলি তখন কী বিষয় নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি বিভিন্ন হিংস্র প্রাণির জিনকে একটা গর্ভবতী মহিলার শরীরে প্রবেশ করাতে চাইছিলেন। তিনি চাইছিলেন সেই জিনটা রক্তের মাধ্যমে সেই গর্ভের শিশুটির শরীরে প্রবেশ করুক এবং এরপর অস্বাভাবিক ক্ষমতা সম্পন্ন একটা শিশুর জন্ম দিক।

যে শিশুটা দেখতে মানুষের মতোই হবে কিন্তু তার ভেতর জঙ্গলের যে কোন হিংস্র প্রাণির বৈশিষ্ট থাকবে! সে যেমন হিংস্রতা প্রদর্শন করতে পারবে ঠিক তেমন ভাবে সেই সকল প্রাণিদের রুপও ধারণ করতে পারবে। যদিও তিনি গবেষণাটা পুরোপুরি শেষ করার আগেই মারা যান। মৃত্যুটা হয়তো কাকটালীয়!

সে এই আবির সাহেবের বাচ্চা মেয়ের মাধ্যমেই তার এই অদ্ভুত গবেষণার প্রথম পরীক্ষাটি করেন ! তিনি যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে হয়তো এইরকম আরো অনেক হিংস্র মানুষের সৃষ্টি করতে পারতেন।

মিসির আলি সাহেব ভাবতে থাকেন,
যেহেতু ডাক্তার ওয়াজেদ আলি একজন গবেষক। তাই হয়তো সে মৃত্যুর আগেই কোথাও না কোথাও তার এই অদ্ভুত গবেষণার নথিপত্র তৈরি করে রেখে গিয়েছেন। তিনি কোথাও না কোথাও এই রহস্যের থিওরিতো অবশ্যই লিখে রেখে গিয়েছেন! হয়তো তিনি এই গবেষণাটা যেই জায়গাতে করেছিলেন অর্থাৎ তার বাড়িতে গেলে এই গবেষণার বেশ কিছু সুত্র অবশ্যই পাওয়া যাওয়ার কথা।

হয়তো ঐখানে গেলেই এই গবেষণায় সৃষ্ট শিশুর জটিলতা সম্পর্কে বিস্তারিত অনেক কিছু জানা যাবে ,হয়তো এর সমাধানও সেখানে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই ৬ বছরে কী বাড়িটা তার আগের অবস্হাতেই আছে? নাকি সেই সব কিছুই বদলে ফেলা হয়েছে? এটাই একটা বড় প্রশ্ন!

এরপর মিসির আলি সাহেব ডাক্তার ওয়াজেদ আলির বাড়ি সম্পর্কে নানান তথ্য জোগাড় করেন। তিনি জানতে পারলেন যে ডাক্তার ওয়াজেদ আলির এই পৃথিবীতে আপন কেউ ছিলো না। তাই তার মৃত্যুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ঐ বাড়িটা পরিত্যাক্ত অবস্হাতেই পড়ে রয়েছে। ঐ বাড়িতে অবশ্য যে কারোই প্রবেশ নিষেধ।

আর কেইবা ঐ বাড়িতে প্রবেশ করবে? তার বাড়িতে মূল্যবান জিনিস বলতে কিছুই তো আর পড়ে নেই! তার মৃত্যুর পরেই নানান চোর তার ঘরের মূল্যবান জিনিস পরিস্কার করার দায়িত্ব নেন।

এছাড়াও মিসির আলি সাহেব ছাড়া আর কেউই ডাক্তার ওয়াজেদ আলির এই অদ্ভুত গবেষণা সম্পর্কে কিছুই জানে না !
তাই কারো ঐ বাড়ি সম্পর্কে আগ্রহ না থাকাটাই স্বাভাবিক!

এরপরেই মিসির আলি সাহেব ডাক্তার ওয়াজেদ আলির বাসার দিকে রওনা হলেন। ডাক্তার ওয়াজেদ আলির বাসা
টা আসলেই বেশ নির্জন একটা জায়গায়। তার বাড়িতে পৌছাতে পৌছাতে মিসির আলি সাহেবের প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। তাই বাড়ির আশেপাশে তিনি কাউকেই দেখতে পেলেন না! এরপর বাড়ির সামনে যেতেই তিনি দেখলেন বাড়ির বড় গেটে তালা দেওয়া

মিসির আলি সাহেব বুঝতে পারলেন যে তালা ভেঙে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করাটা ঠিক হবে না! তাই তিনি দেয়াল টপকে পাইপ বেয়ে জানালা দিয়ে ওয়াজেদ আলির বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলেন। মিসির আলি সাহেব আগে থেকেই জানতেন যে বাড়িতে কোন বিদ্যুৎ সংযোগ থাকবে না! তাই তিনি আগে থেকেই সাথে করে একটা টর্চ লাইট নিয়ে এসেছিলেন।

এরপর সেই লাইটের আলোতে তিনি পুরো বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন। বাড়িটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে কেউ এই বাড়িতে প্রবেশ করেনি। এতদিন ধরে বাড়িটা বন্ধ থাকায় পুরো বাড়িটা মাকরসার জাল আর ধুলাবালিতে ভরে গেছে! ঘরের জিনিস-পত্র ও সব এলোমেলো ভাবে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে! মিসির আলি সাহেব ভাবলেন, ডাক্তার ওয়াজেদ আলি যদি তার গবেষণা সম্পর্কে কোন নথিপত্রও রেখে যান এখানে সেগুলোও হয়তো এতদিনে ইদুরে কেটে শেষ করে ফেলেছে!

এরপর তিনি হাঁটতে হাঁটতে ডাক্তার ওয়াজেদ আলির বাড়ির লাইব্রেরিতে গিয়ে পৌঁছালেন!! লাইব্রেরিতে এসে তিনি বেশ চমকে গেলেন। লাইব্রেরিটা বেশ বড়!
লাইব্রেরিতে মোট ৪টা বুক সেলফ রয়েছে! বুক সেলফ গুলোর উপর দিয়ে ধুলা-বালি আর মাকরসার জালে ভরা থাকলেও এর ভেতরের বইগুলোতে এর একটু আচও পড়েনি

আসলে বুক সেলফগুলো শক্ত ষ্টিল এবং কাঁচের তৈরী। যার ফলে কোন মানুষ ছাড়া এই বুক সেলফের ভেতর অন্য কোন প্রাণি ঢুকে বইগুলো নষ্ট করতে পারবে না। মিসির আলি সাহেব বেশ ভালো ভাবেই বুঝতে পারলেন যে, একটা বইও নষ্ট হয়নি! ৩টা বুক সেলফ ভরাই অনেক রকমের বই। অবশ্য ৪র্থ বুক সেলফটা একটু ব্যাতিক্রম ! এই বুক সেলফে কোন বইই নেই! তবে অনেকগুলো হাতের লেখা ডায়েরি রয়েছে।

এরপর বুক সেলফটা খুলে কয়েকটা ডায়েরি বের করে পর্যবেক্ষণ করেই মিসির আলি সাহেব বুঝতে পারলেন যে এই ডায়েরি গুলো কিসের! মিসির আলি সাহেব যেটা খোঁজার জন্য এই বাড়িতে এসেছেন সেগুলো এখন তার সামনে। প্রত্যেকটা ডায়েরিতেই ডাক্তার ওয়াজেদ আলির নানান গবেষণা সম্পর্কে নানান তথ্য নিজের হাতে লিখে ওয়াজেদ আলি এখানেই ক্রমিক নাম্বার দিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন।

তার বিভিন্ন সময়ের সব গবেষণা সম্পর্কিত ডায়েরিই এখানে রয়েছে! এরপর মিসির আলি সাহেব ডাক্তার ওয়াজেদ আলির শেষ গবেষণাটা নিয়ে যে ডায়েরিটা রয়েছে সেটা খুঁজতে লাগলেন। এরপরেই তিনি একটা ডায়েরি পেলেন। ডায়েরির উপর লেখাছিলো, “গবেষণা নাম্বার ৩৯, মানুষের জিনে হিংস্র প্রাণির জিনের প্রবেশ।” মিসির আলি সাহেব ডায়েরিটা দেখেই বুঝতে পারলেন যে, এটাই সেই ডায়েরি যেই ডায়েরিতে শম্মীর রহস্য লুকিয়ে রয়েছে।

এই ডায়েরিটা পড়লেই হয়তো জানা যাবে যে, শম্মীর এই আচরণের প্রধান কারণটা কী? সে দিনের অর্ধেকটা সময় স্বাভাবিক এবং বাকি অর্ধেকটা সময় অস্বাভাবিক আচরণ করে কেনো? তার এই হিংস্রতা আর কতটা বৃদ্ধী পেতে পারে বা তার এই হিংস্রতার আয়ু আর কয় বছর?এরপর মিসির আলি সাহেব ভাবলেন, এত বড় ডায়েরিটা এই বাড়িতে এই লাইটের আলোতে পড়াটা বেশ মুশকিল হবে! তার চেয়ে ভালো ডায়েরিটা বাড়িতে নিয়ে গিয়েই ভালোমতো পড়া যাবে! তখন এই গবেষণার রহস্যটাও ঠান্ডা মাথায় চিন্তাও করা যাবে।

এরপর মিসির আলি সাহেব যেই লাইব্রেরি থেকে বেড় হতে যাবেন, ঠিক সেই সময়েই জানালা দিয়ে অন্য কারো এই বাড়িতে ঢুকার শব্দ শুনতে পেলেন! মিসির আলি সাহেব পুরো আৎকে উঠলেন! তিনি ভাবলেন, এই বাড়িতেতো কারো আসার কথা না! তাহলে এতোরাতে জানালা দিয়ে কে বাড়িতে ঢুকলো? . . . .

. . . . . .চলবে . . . . . .

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here