#মন_তুমি_ছুঁয়ে_দেখো_না #সাদিয়া_জাহান_উম্মি #পর্বঃ২০

#মন_তুমি_ছুঁয়ে_দেখো_না
#সাদিয়া_জাহান_উম্মি
#পর্বঃ২০
একটু আগের গরমের ছ্যাট এখন আর নেই।প্রকৃতিতে ঠান্ডা হিমেল হাওয়া বইছে।প্রাণ জুরিয়ে যাওয়ার মতো বাতাস যাকে বলে।সূর্য তার প্রখরতা দেখাতে পারছে না।কারন একটু আগের শুভ্র মেঘে ভরা আকাশটা।এখন ঘনকালো মেঘে ঢেকে গিয়েছে।সেই কালো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গিয়েছে সূর্য।পৃথিবীর বুকে বর্ষন নামার আগমনি বার্তা দিচ্ছে তারা।ঠান্ডা এই পরিবেশের মতোই ঠান্ডা হয়ে আছে পিহু আর প্রিয়ান।একটু আগে অথৈয়ের করা প্রশ্নে তারা ঠিক কি জবাব দিবে জানে না।পিহু একটু পর প্রিয়ানের দিকে তাকাচ্ছে।তার চোখেও স্পষ্ট ভেসে আছে।সেও জানতে চায় কি চায় প্রিয়ান।ঠিক কি কারনে সে পিহুর সাথে ওইদিন ওরকম ব্যবহার করেছিল।ওদের চুপ থাকতে দেখে অথৈ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে,
‘ কি? মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছিস কেন?জবাব দিচ্ছিস কেন?তাড়াতাড়ি দে জবাব। নাহলে ভালো হবে না।’

পিহু কাচুমাচু হয়ে বসল।আমতা আমতা করে বলে,
‘ কি বলব?কিসের জবাব দিতে বলছিস?আমি কিছু বুঝতে পারছি না।’

আহিদ এইবার গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
‘ পিহু বাই এনি চান্স। তুই কি আমি এখানে দেখে ভয় পাচ্ছিস বলতে?দেখ আমি তোর ভাই এটা ঠিক আছে।সাথে কিন্তু আমরা বেস্টফ্রেন্ডও।তাই কোনো কিছু লুকাতে হবে না।সোজাসাপ্টা বলে ফেল।’

পিহু আহিদের কথায় নাক মুখ কুচকে ফেলল।বলল,
‘ এমন একটা ভাব করছিস যেন আমি তোকে কতো ভয় পাই।আর সেই ভয়ে একদম গুটিয়ে থাকি।ভুলে যাস না আমি তোর দু মিনিটের বড়ো।সো তোকে ভয় পাওয়ার কোনো কারন নেই।আর তাছাড়া আমাকে প্রশ্ন করে লাভ নেই।কারন আমার কাছে কোনো উত্তর নেই।যা জিজ্ঞেস করার প্রিয়ানকেই কর।সেই ভালো জবাব দিতে পারবে।’

পিহুর কথায় আহিদ রাখি চোখে তাকালো।এই মেয়েটা তাকে দু পয়সার দাম দেয়না।আহিদ বির বির করল,’ বট গাছের ডা*য়নি কি কখনো কাউকে ভয় পায়?’

পিহু শুনলো আহিদ কিছু বলেছে।কিন্তু কি বলেছে তা শোনতে পায়নি।তাই বলল,’ কিছু বললি আমায়?’
‘ নাহ, তোকে আর কি বলব।তুই আমাকে ভয় পাস না।তাই তোকে কিছু বলে লাভ আছে?’
‘ এইতো লাইনে এসেছিস।’

অথৈ সবার কথার মাঝে ফোঁড়ন কেটে বলে উঠে, ‘ তোরা চুপ থাকবি?এখানে সিরিয়াস ডিসক্যাশন করছিলাম আমরা।আর তোরা ঝগরা করছিস।আর আহিদ,তুই এমন ঝগড়া করতে শিখেছিস কার থেকে?’

আহিদ বলল,’ ঝগড়া আবার না শিখে থাকা যায়?তুই একটা,রিধি একটা আর দুই দুইটার( প্রিয়ান আর পিহুকে দেখিয়ে) কথা তো বাদই দিলাম।যেই ঝগড়া করিস।তো আমি বাদ থাকবো কেন?’

আহিদের বলতে দেরি চারজোড়া রাগি চোখের দৃষ্টি ওর দিক পরতে দেরি হয়নি।অথৈ,রিধি,পিহু,প্রিয়ান ওই রাগি চোখের দৃষ্টির তেজে আহিদকে পারলে ভস্ম করে দেয়।আহিদ থতমত খেয়ে বলে,’ কিরে এইবাভে তাকিয়ে আছিস কেন?’

রিধি রাগি স্বরে বলে, ‘ তুই আমাদের ঝগড়াখোর বলছিস।তো এইজন্যে কি তোকে চুমু দিব?’

আহিদ রিধির কথায় দুষ্টু হাসল।লজ্জা পাওয়ার অভিনয় করে বলে, ‘ যাহ,সবার সামনে এসব কি বলিস? আমার লজ্জা করে নাহ।আর তাছাড়া যদি এতোই আমায় চুমু দিতে চাস তো অন্য জায়গায় গিয়ে দিতে পারিস।আমি মাইন্ড করবো নাহ।’

আহিদের এই কথায় রিধি চোখ বড়ো বড়ো করে তাকাল।পরপরেই খেকিয়ে উঠল,’ আহিদ্দার বাচ্চা।তোরে তো আমি আজকে শেষ করে দিবো।বান্দর পোলা।’

রিধি গিয়ে আহিদের চুল টেনে ধরল।আকস্মিক হামলায় আহিদ ভড়কে যায়।চেঁচিয়ে উঠে,’ ছাড় আমাকে।উফ ছাড়।আমার কতো যত্নের চুল এগুলা।আমার একটা চুলও যদি ছিড়ে না। তাহলে তোর মাথায় একটা চুলও থাকবে না।’

এদিকে অথৈ বিরক্ত হয়ে বসে বসে এদের কান্ড দেখছে।সে এদের কি এইজন্যে ডেকেছিল? কি করতে এসেছে এখানে।আর কি হচ্ছে।তার এই মেন্টা’ল বন্ধুগুলো ভালো হবার নয়।তা সে বুঝে গিয়েছে।এদের সাথে যে একটা সুস্থ্য আলোচনা করবে বসে শান্তভাবে তা আর হবে না বোধহয় কোনোদিন।অথৈ দীর্ঘশ্বাস ফেলল তারপর উঠে গিয়ে রিধিকে টেনে সরিয়ে আনল।রিধি তখনও রাগে ফুসছে আহিদের দিকে তাকিয়ে।এদিকে আহিদ মাথায় হাত বুলাচ্ছে।এভাবে চুল ধরে টানাটানি করায় সে বেশ ব্যথা পেয়েছে।এদিকে অথৈ পিহুর কানে কানে বলে,’ কিরে এই আহিদ্দার হলোটা কি?ও তো এমন ব্যবহার তো কোনোদিন করে না।মনে হচ্ছে ও একটু বেশিই হ্যাপি মুডে আছে।কেমন যেন ঘ্যাপলা লাগছে।ডাল মি কুছ কালা হ্যায়।দায়া থুক্কু পিহু পাতা লাগাও।’

পিহু ভাবুক গলায় বলে,’ কিন্তু পাতা লাগায় কিভাবে?আমি তো জানি গাছ লাগায়।’

পিহুর কথায় অথৈ ওর মাথায় গাট্টা মারল,’ গাধি একটা।’

পিহু দাঁত কেলালো।এইভাবেই হইচই করে সারাটা বিকেল কেটে গেল।অথৈ ইচ্ছে করেই আর ঘাটেনি পিহু আর প্রিয়ানকে।যা তারা এখন বলতে চাচ্ছে না তা জোড় করে লাভ নেই।সময় হলে নিজেরা এসেই বলবে তা অথৈও ভালোভাবেই জানে।তবে এদের যে আগের মতো স্বাভাবিক করতে পেরেছে তাই অনেক।ওদের আড্ডার মাঝে আকাশে তীব্র স্বরে গর্জন করে উঠল।ওরা হাসি ঠাট্টায় এতোটাই মত্ত ছিলো যে আকাশের পরিস্থিতির কথা ভুলেই গিয়েছিল।কিন্তু যতোক্ষণে সজাগ হয়েছে ততোক্ষণে শো শো বাতাস ছেড়ে, আকাশে তীব্র মেঘের গর্জন করে,ঝমঝমিয়ে মুষুলধারে বৃৃষ্টি নেমে গেল।সামনে নদী,নদীর পানিতে বাতাসের কারনে উত্তাল ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে,ঝড়ো হাওয়া,কালো মেঘে ঢাকা আবছা আধারে ছেঁয়ে থাকা প্রকৃতি, সাথে ঝুমঝুম বৃষ্টি।সেই বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা পাঁচজন বন্ধু।আহা আর কি চাই এই মুহূর্তে। ওরা পাঁচজন বন্ধু মিলে হইহুল্লোড় করে বৃষ্টিবিলাশে মত্ত হয়ে গেল।প্রায় একঘন্টা পর বৃষ্টি কমে আসছে।চারপাশ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে।তাই সিদ্ধান্ত নেয় এখান সবাই চলে যাবে।হলোও তাই।আহিদ আর পিহু চলে গেল একটা বাইকে করে।আর প্রিয়ান অথৈ আর রিধিকে সাথে নিয়ে চলে গেল।বাড়িতে এসে অথৈ ক্লান্ত শরীরে বাড়ির কলিং বেল বাজালো।মিনহা বেগম এসে দরজা খুলে মেয়েকে এমন জুবজুবে ভেজা অবস্থায় দেখেই শুরু করে দিলেন বকাবকি।অথৈ কানে নিলো না।নিজের রুমের দিকে যেতে লাগল।কিন্তু তার আগেই বসার ঘর থেকে ইহানের ডাকে থেমে গেল।
‘ এইভাবে ভিজে এসেছিস কেন?নিশ্চয়ই সবগুলো মিলে বৃষ্টিতে ভিজেছিস?’

অথৈ জোড়পূর্বক হাসল।ভাইয়ার বকা সে সহজে খায় না।তবে ইহান যখন রেগে যায়।তখন ইহানকে অথৈ অনেক ভয় পায়।ইহান অথৈর নিজেকে হেলাফেলা একদম সহ্য করতে পারে না। তখনই ও রেগে অথৈকে বকাঝকা করে।অথৈ ইহানের বকা খাওয়ার ভয়ে বলে,
‘ আরে, কি বলছিস ভাইয়া?এমন কিছুই না।ওই প্রিয়ানের বাইক দিয়ে এসেছি তো।রাস্তা দিয়ে আসতে আসতে ভিজে গিয়েছি।’

ইহান গম্ভীর গলায় বলে,’ আমাকে মিথ্যে বলে লাভ নেই।আমি তোর সম্পর্কে সবকিছুই জানি।ভুলে যাস না আমি তোর ভাই।সো এইসব লেইম এক্সকিউজ একদম দিবি না।আমায়।এখন যা দ্রুত চেঞ্জ করে নেহ।জ্বর আজকে আসবে তা নিশ্চিত আমি। আম্মুকে দিয়ে গরম দুধ পাঠাচ্ছি।কোনোরকম ভণিতা ছাড়া খেয়ে নিবি।নাহলে তোর কপালে শনি আছে।’

অথৈ শুকনো ঢোক গিলল।ইহানের ভয়ে আর নাকচ করল না।না এদিক সেদিক তাকালো।একদৌড়ে নিজের রুমে।অথৈকে ভয় পেতে দেখে ইহান মুচঁকি হাসলো।পরক্ষণে হঠাৎ করেই তার রিধির কথা মনে পরে গেল।মেয়েটাও নিশ্চয়ই বৃষ্টিতে ভিজেছে।ঠান্ডা,জ্বরে তো সেও ভুগবে।পরমুহূর্তে নিজের ভাবনায় নিজেই হতভম্ব হয়ে যায়।আশ্চর্য! তার কেনো আজ হঠাৎ হঠাৎ রিধির কথা মনে পরছে।সে বোধহয় পাগল হয়ে যাচ্ছে।নিজের মনে বিরবির করতে করতে ইহান নিজের রুমে চলে গেল।
——-
গরম পানি দিয়ে গোসল দিয়ে অথৈ কম্বল মুরি দিয়ে শুয়েছে।শরীর ম্যাজম্যাজ করছে,মাথা ব্যথা, সেই সাথে চোখ দিয়ে পানি পরছে অনবরত।তাকে যে ভয়ানকভাবে জ্বরটা কাবু করে নিচ্ছে তা সে ভালোভাবে বুঝতে পারছে।এমনসময় আজিজুর সাহেব অথৈয়ের রুমে আসলেন।অফিস থেকে ফিরে এসেই মিনহার কাছ থেকে শুনেছেন তার মেয়ে নাকি আজ বৃষ্টিতে ভিজে এসেছেন।তাই অথৈকে দেখতে আসলেন।নিশ্চয়ই জ্বর আসবে মেয়েটার।আজিজুর সাহেব রুমে প্রবেশ করে রুমের আলো জ্বালাতেই অথৈ চোখের উপর হাত রেখে মুখ ঢেকে ফেলল।মূলত অথৈ অন্ধকারে থাকতে বেশি পছন্দ করে।দিনের বেলায় রুমের পর্দা দিয়ে রাখে আর রাতে কাজ ছাড়া সহজে আলো জ্বালায় না।এদিকে হঠাৎ করে আলো এসে মুখে পরতেই অথৈ চোখে ঠাওর করতে পারেনি।আস্তে আস্তে আলোটা সয়ে আসতেই অথৈ চোখ থেকে হাত সরায়।তারপর সামনে তাকাতেই আজিজুর সাহেবকে চিন্তিত অবস্থায় তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে;কষ্ট হলেও কোনোরকমে উঠে বসল অথৈ।বিছানার হেডবোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে বসে দূর্বল গলায় বলে,
‘ আরেহ, বাবা তুমি কখন আসলে।আর ওখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?এদিকে আসো।’

মেয়ের ভাঙা গলার আওয়াজ শুনেই আজিজুর সাহেব যা বুঝে ফেলার বুঝে ফেললেন।দ্রুত মিনহা বেগমকে হাক ছুড়ে ডেকে মেয়ের কাছে গেলেন।গিয়েই আগে অথৈয়ের কপালে হাত রাখল।জ্বরে মেয়েটার গা পুড়ে যাচ্ছে।ইহান আর মিনহা বেগম তখন রুমে আসলেন।তাদের দেখে আজিজুর সাহেব বলেন,
‘ দেখেছ?মেয়ে আমার জ্বরে ভুগে এখানে পরে আছে।তুমি যেহেতু দেখেছ ও বৃষ্টিতে ভিজে এসেছে।তুমি এসে ওকে দেখবে না?আমি না আসলে তো মেয়েটা আমার এইভাবেই পরে থাকত।এতোটুকু খেয়াল রাখতে পারো না তুমি মিনহা?’

মিনহা বেগম স্বামির কথায় রেগে গিয়ে বলে,’ হ্যা,এখন সব দোষ আমার তাই নাহ?তোমার গুনধর মেয়ে গিয়েছে কেন বৃষ্টিতে ভিজতে?সে জানে না তার যে জ্বর আসবে?’
‘ ও তো ছোটো মানুষ বুঝে নাই।’
‘ হ্যা এমন ধিঙি মেয়েকে ছোটো ছোটো বলে আরও মাথায় উঠাও।এমনিতেই আমার কথা শুনে না।তোমার আহ্লাদে আহ্লাদে মেয়েটা পুরো বখে গিয়েছে।একটা কথাও শোনে না আমার।ওর যে বিয়ে হয়ে গিয়েছে।সেই খেয়ালও কি ও করে? এখন তো একটু শান্ত শিষ্ট হতে পারে?না তা হবে কেন?এটা করলে আমাকে জ্বালাবে কে?সব জ্বালা হয়েছে আমার।আমি চলে গেলেই বুঝবে তোমরা।’

মিনহা বেগম আরও অনেক কিছু বলতে বলতে রান্নাঘরে চলে গেলেন।মেয়ের জন্যে তিনিও চিন্তিত।দ্রুত চুলায় রঙচা বসালো।এটা খেলে গলা ব্যথা যদি থাকে সেরে যাবে।তারপর স্যুপ বানাতে লেগে পরলেন।ভাত যে তার মেয়ে এখন একটুও।মায়েরা এমনি।সন্তানের কিছু হলে তারা অস্থির হয়ে পরেন।কিভাবে সে সন্তানকে সুস্থ করে তুলবেন।

এদিকে আজিজুর সাহেব ইহানকে বললেন গিয়ে এক বালতি পানি আনতে অথৈয়ের মাথায় পানি ঢালতে হবে।ইহানও তাই করল।আজিজুর সাহেব নিজ হাতে মেয়ের সেবা করতে লাগল।এদিকে জ্বর বাড়ার কারনে অথৈ কথাও বলতে পারছে না।চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।গা থেকে মনে হয় লাভার আগুনের তাপ বের হচ্ছে এমন।
হঠাৎ ইহানের মোবাইল বেজে উঠল।ইহান মোবাইলে তাকিয়ে দেখে রুদ্রিক কল করেছে।ইহান একবার অথৈয়ের দিকে তাকিয়ে ফোনকল রিসিভ করে কানে লাগাল।পরপরেই শুনতে পেল রুদ্রিকের চিন্তিত কণ্ঠস্বর,’ ইহান?অথৈ কোথায়?ওর ফোনে কল দিচ্ছি।কিন্তু ওর মোবাইল বন্ধ শোনাচ্ছে।’

ইহান আশেপাশে তাকালো।তারপর দেখল ওয়ারড্রবের উপর অথৈয়ের ফোন চার্জে লাগানো।বোধহয় চার্জ নেই।ইহান বলল,’ ওর ফোনে চার্জ নেই।’

রুদ্রিক শ্বাস ফেলল সস্তির।কিন্তু তারপরেও ওর কেমন যেন লাগছে।মনে হচ্ছে অথৈ ঠিক নেই।রুদ্রিক বলল,’ অথৈ কোথায়?ওকে একটু দে তো।আজ সারাদিন কথা হয়নি।বলল বন্ধুদের সাথে পিকনিকে যাচ্ছে।তাই আমি ডিস্টার্ব করিনি।কিন্তু এখন কথা না বললে যে আমার রাতে ঘুম আসবে না।’

ইহান কি বলবে ভেবে পেলো না।সে কি এখন রুদ্রিককে বলে দিবে অথৈয়ের জ্বর এসেছে?রুদ্রিক যদি এই কথা শোনো তো পাগলামি করবে।কারন সে জানে তার বন্ধু অথৈকে ঠিক কতোটা ভালোবাসে।দুটো বছর যাবত নিজ চোখে দেখে আসছে তা।কিন্তু না বলেও পারছে না।সে অথৈয়ের হাজবেন্ড।তার জানার অধিকার কাছে।যা হওয়ার হবে।তাই ইহান আর বেশি ঘাটল না।সত্যি কথাটাই বলল,’ বন্ধুরা পিকনিক করতে গিয়েই ঝামেলা পাকিয়ে এসেছে।সবগুলো মনে হয় একসাথে এই সময়ের বৃষ্টিতে ভিজে এসেছে।এখন দেখ বাড়ি এসেই নেতিয়ে পরেছে।জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।’

ইহান কথাগুলো বলেই রুদ্রিকের পাগলামি শোনার আশায় রইলো।কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে রুদ্রিক বলল,’ মেডিসিন দিয়েছিস?’

ইহান অবাক হয়ে গেল।সে ভাবেনি রুদ্রিক এতোটা শান্ত থাকবে।ইহান অবাকের রেশ কাটিয়ে বলে,’ নাহ এখনও দেয়নি।আম্মুকে খাবার আনতে বলেছি।দেখি কিছু খাওয়াতে পারি কিনা।খাওয়ার পরেই মেডিসিন দিবো।’
‘ জোড় করে হলেও খাওয়াবি কিন্তু।রাখছি।’
‘ আরেহ কিন্তু শোন রুদ্রিক….!’

ইহান কিছু বলার আগেই রুদ্রিক ফোন কেটে দিলো।এদিকে ইহান আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।এই ছেলের মাথায় কি চলে তা ও ছাড়া বোধহয় কেউ জানবে নাহ।ইহান লম্বা শ্বাস ফেলে অথৈয়ের কাছে এগিয়ে গেল।ততোক্ষণে মিনহা বেগম একবাটি স্যুপ,গরম দুধ নিয়ে এসেছেন।তারপর মেয়ের কাছে এগিয়ে গেলেন।আজিজুর সাহেবকে বললেন অথৈকে খাইয়ে দিতে।আজিজুর সাহেব তাই করলেন।আর মিনহা বেগম বসে বসে অথৈয়ের মাথায় পানি ঢালতে লাগল।মিনিট বিশেক পর ওদের বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠল।ইহান অবাক হলো।ঘড়ির দিকে তাকালো।রাত তখন এগারোটা।এতো রাতে কে আসবে?হঠাৎই ওর মাথায় টনক নড়ল।সে একশ পার্সেন্ট নিশ্চিত এটা তার পাগল বন্ধু ছাড়া কেউ নাহ।ইহান দ্রুত পায়ে চলে গেল দরজা খুলতে।কিন্তু দরজা খুলতে সে অবাক হয়ে গেল।সে তো ভেবেছিল রুদ্রিক আসবে।অবশ্য সেটা সঠিক রুদ্রিকই এসেছে।তবে একা না সাথে আতিক মাহাবুব সাহেব,আরহাম সাহেব,আরিয়ান আর রোজাও এসেছে।ইহানকে এইভাবে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রুদ্রিক ভ্রু-কুচকে বলল,’ সরছিস না কেন?না কি বাসায় ঢুকতে দিবি নাহ?’

রুদ্রিকের কথায় ইহান তার সম্ভিত ফিরে পেল।দ্রুত দরজা থেকে সরে গিয়ে দাঁড়াল।এরপর সবাইকে সালাম জানিয়ে ভীতরে আসতে বলল।তারাও সালামের জবাব নিয়ে বাসায় প্রবেশ করলেন।এদিকে বসার ঘরে মানুষের কোলাহলপূর্ণ আওয়াজে আজিজুর সাহেব আর মিনহা বেগম না চাইতেও মেয়ের কাছ থেকে উঠে এলেন।এসেই মেয়ের শশুড় বাড়ি মানুষদের দেখে ভড়কে গেলেন।তারপর দ্রুত গিয়ে তাদের সালাম জানিয়ে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলেন।মিনহা বেগম দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে উদ্যুত হলেন।কিন্তু তার আগেই রোজা উনাকে থামিয়ে দিলেন,’ একদম না আন্টি।কোনোরকম কোনো আয়োজন করবেন নাহ।এসব আজ না অন্য একদিন।আজ আমরা বেড়াতে আসিনি।অথৈ অসুস্থ তাই তাকে দেখতে এসেছি।এখন এখানে আসুন।’

আতিক মাহাবুবও বলেন,’ হ্যা বড় নাতবউ একদম ঠিক বলছে।আপনার মেয়ে অসুস্থ আপনি তার কাছে যান।আজকে আমরা আমাদের বাড়ির বউ অসুস্থ তাই তাকে দেখতে এসেছি।’

আজিজুর সাহেব আর মিনহা বেগম আর কিছু বললেন না।শুধু মনে মনে আল্লাহ্’র কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন তার মেয়েকে এতো ভালো একটা পরিবারের বউ হওয়ার ভাগ্য দেওয়ার জন্যে।আজিজুর সাহেব আর মিনহা বেগম সবাইকে নিয়ে অথৈয়ের রুমে আসলেন।অথৈ তখন গায়ে দুটো ভারি লেপ আর কম্ব্ল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে।মুখশ্রী জ্বরের প্রকোপে লাল হয়ে আছে।জ্বরের কারনে তার হুশ নেই।মিনহা বেগমের মন চাইছে না অসুস্থ মেয়েকে ডেকে তুলতে।কিন্তু না ডেকেও তো পারছেন না মেয়ের শশুড়বাড়ির লোক এসেছে।তিনি অথৈকে ডাকতে গেলেই আরহাম সাহেব বলে উঠলেন,’ আপা বউমাকে ডাকবেন না।সে অসুস্থ।জ্বরে মেয়েটা কেমন করছে।আমরা তো মেয়েটাকে একটু দেখতে এসেছি।আসলে কি বলেন তো রুদ্রিকের মুখে যখন শুনলাম বউমা অসুস্থ তখন আর নিজেদের ধরে রাখতে পারিনি।ও তো আমার ছেলের বউ না। আমার মেয়ে।মেয়ে অসুস্থ হলে বাবা না এসে পারে?’

আজিজুর সাহেবের চোখের কোণে জল জমেছে।এতো সুন্দর কথা শুনে কেইবা না কেঁদে পারবে?এতো সুখের কান্না।সবাই এইভাবে টুকাটুকি কথা বলতে লাগল।এদিকে রুদ্রিক শুধু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।তবে দৃষ্টি তার অশান্ত।বুকের ভীতর বয়ে চলেছে তীব্র ঝড়।প্রিয়তমাকে এইভাবে মূর্ছা যাওয়া অবস্থা দেখে তার মনে হচ্ছে কেউ তার বুকে ধারালো ছু’ড়ি দিয়ে ক্রমাগত আঘা’ত করে চলেছে।অথৈয়ের ফ্যাকাশে মুখশ্রীটা বড্ড পিড়া দিচ্ছে ওকে।অথৈকে এইভাবে একদম দেখতে পারছে না রুদ্রিক।মেয়েটাকে মন চাচ্ছে এই মুহুর্তে বুকের মাঝে ঝাপ্টে নিতে।কিন্তু সবাই থাকায় তা করতে পারছে না।চোখ বন্ধ করে জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিলো রুদ্রিক।অশান্ত মনটাকে একটুখানি শান্ত করার প্রয়াস চালালো।কিন্তু তা সম্ভব হলে তো?অথৈ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত রুদ্রিকের শান্তি নেই।এদিকে রোজা এসে অথৈয়ের হাত পা মুছে দিচ্ছে।মাথায় পানি ঢালতে গেলে রুদ্রিক কাউকে পরোয়া না করে নিজেই এগিয়ে যায়।তারপর রোজাকে বলে,’ ভাবি তুমি সরো।আমি করছি।’

রোজা বিনাবাক্যে উঠে গেল।সে কিছুটা হলেও রুদ্রিকের অবস্থা বুঝতে পারছে।রুদ্রিকের লাল হয়ে আসা চোখ দুটোই সব বলে দিচ্ছে।রুদ্রিক অথৈয়ের মাথায় পানি ঢালল।সরিষার তেল গরম করে এনে দিলেন মিনহা বেগম।শাশুড়িকে বসতে বলে নিজেই অথৈয়ের হাতে পায়ে তেল মালিশ করতে শুরু করল।যা দেখে এখানে আর কেউ বসে থাকতে পারল না।রুদ্রিক আর অথৈকে একা ছেড়ে দিয়ে সবাই রুমের বাহিরে চলে গেলো।সবাইকে যেতে দেখে রুদ্রিক দ্রত বিছানা থেকে নেমে রুমের দরজা আটকে আবার বিছানায় ফিরে আসল।তারপর দ্রুত অথৈয়ের কম্বলগুলোর নিচে নিজে ঢুকে গেল।কাল বিলম্ব না করে অথৈয়ের তপ্ত দেহখানা নিজের শক্তপোক্ত বুকের মাঝে আঁকড়ে নিলো।শক্ত করে ধরল অথৈকে।এদিকে এতো শক্ত করে ধরায় অথৈ অস্পষ্ট স্বরে গুঙিয়ে উঠল।পর পর বহু কষ্টে চোখ পিটপিট করে তাকালো।ঝাপ্সা চোখে তাকিয়ে আবছাভাবে রুদ্রিককে দেখে নিলো।এরপর চোখ বন্ধ করে ফেলল।তার চোখ খুলে রাখতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।সে আবারও বিড়াল ছানার ন্যায় রুদ্রিকের বুকের উম পেয়ে রুদ্রিকের কাছে আরও গুটিয়ে গেল।দূর্বল কণ্ঠে থেমে থেমে বলে,’ আপ..আপনি এসেছেন?আ…আমি আপ…আপনাকে অনেক মিস করেছি।’

অথৈ ওকে মিস করেছে শুনে রুদ্রিকের হৃদয়ে শীতলতা ছেঁয়ে গেল।সে একটু সুযোগ নিল অসুস্থ অথৈয়ের।প্রশ্ন করল,’ তাই?’
‘হ…হুঁ!’
‘ কেন মিস করেছ?’

অথৈ ঠোঁট উলটে বলে,’ তা তো জানি নাহ।’
রুদ্রিক হাসল।অথৈয়ের এমন কান্ডে।ফের বলে,’ আচ্ছা তুমি আমার একটা কাজ করবে।আমি কিছু প্রশ্ন করব।প্রশ্নগুলোর সত্যি সত্যি জবাব দিবে।’

অথৈ কিছু বলল না।রুদ্রিক প্রশ্ন করল,
‘ তোমাকে আমার কেমন লাগে অথৈ?’

অথৈ সময় নিয়ে জবাব দেয়,’ অনেক ভালো।’
‘ কেমন ভালো।’
‘ তা জানি না তবে অনেক ভালো লাগে।আপনি দেখতে অনেক সুন্দর।’
‘ আমার দিকে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে?’
‘ হুঁ!’
‘ আমাকে দেখলে বুক ধুকপুক করে?’
‘ হুঁ!’
‘ আমি কাছে আসলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়?’
‘ হুঁ!’
‘ সারাদিন আমার সাথে কাটাতে ইচ্ছে করে?’
‘ অনেক।’
‘ ভালোবাসো আমাকে?’

এই পর্যায়ে আর অথৈয়ের জবাব এলো না।রুদ্রিক অথৈয়ের মাথাটা ওর বুক থেকে উঠিয়ে সামনে এনে দেখে অথৈ ঘুমিয়ে গিয়েছে।রুদ্রিক হাসল অথৈয়ের ঘুমন্ত মুখ দেখে।অথৈয়ের ভেজা চুলগুলো সুন্দরভাবে গুছিয়ে দিয়ে।ওর ওষ্ঠজোড়া স্পর্শ করল অথৈয়ের উত্তপ্ত কপালে।সময় নিয়ে সরে আসল।জ্বর কিছুটা কমেছে।এইভাবে প্রায় অনেকক্ষণ রইলো রুদ্রিক।হঠাৎ রোজার কণ্ঠ শুনতে পেল।রোজা ডাকছে ওকে।তাদের যেতে হবে।রুদ্রিক জানালো সে আসছে।রোজা চলে গেল।রুদ্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অথৈকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে বালিশে শুইয়ে দিল।তারপর অথৈয়ের দিকে ঝুকে শীতল কণ্ঠে বলে,
‘ বলেছিলাম আমি তোমার মনে যেদিন জায়গা নিতে পারব সেদিনই এই বাড়িতে পা রাখব।আর দেখো আমি তাই করেছি।তুমি মুখে স্বিকার না করলেও আমি জানি তুমি আমায় ভালোবাসো।তবে চিন্তার কারন নেই।তোমার মুখ থেকেও একদিন স্বিকার করিয়ে নিবো তুমি আমায় ভালোবাসো।এখন আমার যেতে হবে জান।মন তো চাচ্ছে না তবে যেতে হবে।ভালো থেকো জান।নিজের খেয়াল রেখো।’

এইবলে অথৈয়ের কপালে ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে রুদ্রিক রুম থেকে বের হয়ে গেল।আর তাকালো না পিছনে।কারন তাকালেই তার সর্বনাষ হয়ে যাবে।সে আর যেতে পারবে না তাহলে।এদিকে মির্জা বাড়ির সবাইকে অনেক জোড় করলেন আজিজুর সাহেব,মিনহা আর ইহান।কিন্তু তারা মানলেন না।অথৈ অসুস্থ এর মাঝে আর ঝামেলা করতে চাননা।তারা মির্জাদের কাছে হার মানতে বাধ্য হলেন।মধ্যরাতেই সবার থেকে বিদায় নিয়ে তারা চলে যান নিজেদের গন্তব্যে।

#চলবে___________
ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন। কেমন হয়েছে জানাবেন। আজ বিশাল বড়ো পর্ব দিয়েছি।এখন আপনারাও ঝটপট বিশাল বড়ো সুন্দর মন্তব্য করবেন কিন্তু।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here