মনসায়রী’ ৪.

‘মনসায়রী’

৪.
হতভম্বতা সামলে কোনোরকমে ব্যাপারটা হজম করলেও এর পরে যা ঘটলো তা কিছুতেই মিলাতে পারলো না দুপুর। সবাই চলে যাওয়ার পর দুপুর নিজেও চলে আসছিলো। মহিলাটির থেকে ঐ ছেলেটার টাকা দেয়ার কথা শুনে যথেষ্ট লজ্জাও পেয়েছিলো। ছেলেটা নিশ্চয়ই শুনেছে ওর টাকা কম আছে। তার উপরে ছেলেটার বয়সও নাকি দুপুরের থেকে কম। ছোট ছেলেটা এতো বড় উপকার করলো। অথচ, তাকে একটা ধন্যবাদও দেয়া হলো না। লজ্জা মাথা নত হয়ে গেছে একেবারে। পরের বার ভার্সিটি আসলে সবার প্রথমে ছেলেটার সাথে দেখা করে ধন্যবাদ দিবে এবং দুই হাজার টাকাও মিটিয়ে দিবে। অচেনা কারো থেকে টাকা নেয়াটা খুব বাজে লাগে দুপুরের। এসব ভেবে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। হঠাৎ-ই সামনে একজন ভিক্ষুক দেখতে পেয়ে নিজের ব্যাগটা খুললো। তখন ব্যাগ চেক করেনি কারণ ওর ব্যাগে পাঁচ দশ টাকার আর একটা বাটন ফোন ছাড়া তেমন কিছুই নেই।
খুচরা টাকাটা ভিক্ষুককে দেয়ার জন্য চেইন খুলে ব্যাগে হাত দিতেই চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। কী আশ্চর্য! ব্যাগে এতগুলো টাকা এলো কী করে! ভিক্ষুককে টাকা দিয়ে এক সাইডে গিয়ে টাকাগুলো গুনে দেখলো যতগুলো টাকা ঐ কাউন্টারের মহিলাকে জমা দিয়েছিলো ঠিক ততোগুলো টাকাই রাখা আছে বান্ডিল আকারে। আরেকদফা অজ্ঞান হতে হতে বাঁচল। নিজের মাথায় হাত রেখে একবার ঢোক গিলে ভাবলো আজ কী অবাক হওয়ার দিন?একের পর এক ঘটনায় শুধু অবাক হতেই থাকবে! কে রাখলো এতগুলো টাকা! ঐ ছেলেটাই! কিন্তু কেনো? এতগুলো উপকার করে সে কী প্রমাণ করতে চাইছে? বড় বড় শ্বাস ফেলে বাসায় ঢুকলো। সত্যিই হয়তো আজকে অবাক হওয়ার দিন। বাসায় ঢুকে দেখলো বাড়িওয়ালা মহিলা চিৎকার চেচামেচি করছে। যা ইচ্ছে তাই বলে যাচ্ছেন তিনি। তাঁকে একটা চমৎকার নাম ইতোমধ্যেই দিতিয়া দিয়ে ফেলেছে। বাসা ভাড়া দিতে পাঁচ ছয় দিন দেরি হলেই এসে আজেবাজে কথা বলেন। এজন্য দিতিয়া নাক মুখ কুঁচকে একদিন তার সামনেই চাপাটি মহিলা বলে ভেঙচি দিয়েছিলো। এতে তিনিও বেশ ক্ষেপে গিয়েছিলেন। দিতিয়ার মতে, তাদের স্কুলেও নাকি একজন মহিলা টিচার আছে যিনি কথায় কথায় গালি দেন। তাকে দিতিয়া মনে মনে ঘষেটি বেগম বলে ডাকে। তারই অনুরূপ বাড়িওয়ালিকে নাম দিয়েছে। এখনও বাড়িওয়ালি অনবরত বলে যাচ্ছেন,

‘ছোটোলোকের দল, যদি বাসা ভাড়াই দিতে পারোনা তাহলে দখল করে বসে আছো কেনো? আমি আবারও বলছি, যদি এই দুইমাসের টাকা পাঁচ তারিখের মধ্যে জমা দিতে না পারো তাহলে সবগুলোকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করবো এই আমি শাহারা বেগম বলে রাখলাম। ‘
মিরা ও ফারজানা দুইজনই তাঁকে থামিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু নিজের দাপটে কথা বলে যাচ্ছেন। শিপুও দীর্ঘ শ্বাস ফেলে একপাশে বসে আছে। নিজের এই অক্ষমতায় নিজেকে দোষারোপ করা ছাড়া কিছুই করার নেই তার। সামান্য একটা বাইক এক্সিডেন্ট তাঁর জীবনে ধ্বংসাত্মক প্রলয়ের মতো সব শেষ করে দিয়েছে। এখন সবকিছু চুপচাপ দেখে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। এখন শুধু একটা অন্ন ধ্বংসের যন্ত্র মনে হয়। যার কাজ গোগ্রাসে গিলতে থাকা। যার দ্বারা কোনো কাজই সম্ভব না। দুপুর সবার মাঝে এসে দাঁড়াতেই শাহারা ওর দিকে ফিরে আরো কিছু ক্ষোভ মেটানোর প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু সে গুড়ে বালি দিয়ে দুপুর দুই মাসের টাকা নগদ তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
‘আন্টি,সময় খারাপ। তাই যা ইচ্ছে বলুন৷ সবারই সময় আসে একদিন হয়তো আমাদেরও আসবে। টাকাটা ভালো করে ধরুন। পরের বার থেকে আর কষ্ট করতে হবেনা। আমি আপনার বাসায় গিয়ে টাকাটা দিয়ে আসবো। ‘
দুপুর ধুপধাপ পা ফেলে ঘরে ঢুকে গেলো। শাহারা বেগম মুখটা হা করে এখনো দাঁড়িয়ে আছেন। মিরা বেগম মেয়ের কান্ডে মুচকি হাসলেন। শিপুও হাসলো। দিতিয়া ঠোঁট চেপে হাসি আঁটকে শাহারা বেগমের পিছনে ফিসফিস করে বলল,
‘মুখটাও বন্ধ করে নিন আন্টি, মশা ঢুকে যাবে তো!’
বলেই এক দৌড়ে পগারপার হলো দিতিয়া৷ শাহারা বেগম ওর দিকে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে গজগজ করতে করতে বের হয়ে গেলেন।
ঘরে ঢুকে লম্বা একটা গোসল করে নিলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে মুছতে ভাবছিলো, আজকে টাকাটা ঠিক সময় থাকায় বাড়িওয়ালিকে যোগ্য জবাব দিতে পেরেছে। বেশ ভালো লাগছে এখন। কিন্তু, আসল টাকার মালিককে এগুলো ফিরিয়ে তো দিতে হবে ওর। মনে মনে ভাবলো চাকরিটা না হলে আরো দুইটা টিউশনি নিবে। তোয়ালেটা নিয়ে বারান্দায় ঝুলিয়ে টেবিলে বসলো। উদ্দেশ্য ছবি আঁকা শেষ করে তারপর অমিতকে পড়াতে যাবে। এরপর মাহিকে। পরপর অনেক গুলো টিউশনি আছে। আঁকা শেষ করে উঠে যেতে নিলেই ফোনটা বেজে উঠলো। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো একটা অপরিচিত নাম্বার। রিসিভ করবে নাকি করবেনা এই নিয়ে ভাবতে ভাবতেই রিসিভ করলো। হ্যালো বলার আগেই ওপাশ থেকে শুদ্ধ বাংলাভাষী মিষ্টি একটা মেয়েকন্ঠ ভেসে আসলো,
‘আপনি কী দুপুর মাহবুব বলছেন?’
দুপুর হ্যা বলতেই আবারও মেয়েটা বলল,
‘আমি ড্রিমস কোম্পানি থেকে বলছি। আপনাকে প্রথম পর্যায়ে সিলেক্ট করা হয়েছে। আজকে বিকেল পাঁচটায় দ্বিতীয় ইন্টারভিউ এর জন্য আসতে হবে।’
আনন্দে মুখ থেকে কথাই বের হলো না দুপুরের। এতগুলো ইন্টারভিউ দেয়ার পর এই প্রথম কোনো চাকরির জন্য ডাকা হলো। কল কেটে মোবাইল নিয়ে ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো দুপুর। হুট করেই একফালি আশা বুকে বাঁধছে। মনে হচ্ছে একের পর এক দরজা খুলে যাচ্ছে। প্রথমে ভার্সিটির টাকাগুলো। বাসা ভাড়া দেয়ার টাকাও জোগাড় হলো। এখন চাকরির ইন্টারভিউ এও কতো সহজে ডাক পেলো। আচ্ছা হঠাৎ করেই এসব কী করে হচ্ছে! সবটাই কী কাকতালীয়? হলে হোক। দুপুর এতেই খুশি। সুখ যদি এবার নিজ থেকেই ধরা দিতে চায় তাহলে দুই হাত আঁকড়ে ধরে রাখবে সে।

চোখ থেকে শসা সরিয়ে পিটপিট চোখে উঠে বসলেন জোবাইদা। মুখে তাঁর ফেসিয়াল মাস্ক। সাদা প্রলেপে হঠাৎ করে কেউ দেখলে ভয় পেয়ে যাবে। ইজি চেয়ার থেকে উঠে ভীষণ স্টাইলিশ ভঙ্গিতে পা ফেলতে ফেলতে বাহিরে এলেন। বয়স পয়তাল্লিশের কোঠা পাড় করলেও নিজেকে কুড়ি বছরের যুবতী ভাবতে তিনি ভালোবাসেন। কিছু মানুষ আছে যাদের বয়স বাড়লেও মনটা কিশোরীই থেকে যায়। জোবাইদা সেই ধাঁচের মানুষ। হেলেদুলে হেঁটে এসে স্বামীর পাশের চেয়ারটা টেনে বসতেই পাশ থেকে পলাশ দেওয়ান ‘ ভূত ভূত’ বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। জোবাইদা নিজেও ভয় পেয়ে ঠাস করে চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন। কোমড় ধরে কোঁকাতে কোঁকাতে বললেন,
‘ওগো স্বামী এটা আমি আমি!’
‘কে কে!’
‘আমি তোমার বউ’
পলাশ দেওয়ান এবার অযথা ভয় পাওয়ায় বোকা হেঁসে বললেন,
‘ওওহ, সরি সরি আমি ভাবলাম কোন পেত্নী এ.. ‘
জোবাইদা চোখ গরম করে খিটমিট করে তাকাতেই চুপ করে গেলেন তিনি। খুরিয়ে খুরিয়ে উঠে চেয়ারে বসলেন। কাজের মেয়ে সকিনা রেডিই ছিলো। ম্যাডাম হাত পাতার সাথে সাথেই সকিনা ছুরি আর কাটা চামচ এগিয়ে দিলো। অবশ্য তার নাম সকিনা নয়৷ আসল নাম সোহেলী। এই বাড়িতে আসার পর জোবাইদা তাকে সকিনা নাম দিয়েছে। তার মতে কাজের মেয়ের নাম থাকবে জরিনা, সকিনা, কমলা। কিন্তু তা না হয়ে এতো সুন্দর নাম কেন থাকবে! তিনি নিজেই নামকরণ করে দিলেন। সকিনা একের পর এক চার্ট অনুযায়ী খাবার এগিয়ে দিচ্ছে। আপাতত কিটো ডায়েট করছেন তিনি। ভাত খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ। খটখট শব্দ করে খাচ্ছেন। পাশে থেকে চেয়ার টেনে কেউ বসতেই জোবাইদা এক গাল হেঁসে বললেন,
‘তোমার না আজ ফ্রেন্ডদের সঙ্গে পার্টি ছিলো, কেমন কাটালে বাবু? এতো তাড়াতাড়ি কেনো এলে!’
ছেলেটা চোখ টিপে হেঁসে বলল,
‘তোমাকে ছাড়া এতক্ষণ থাকতে ইচ্ছে করছিলো না৷ এতো সুন্দর মাম্মা বাসায় রেখে কী বাহিরে থাকা যায়!’
ছেলের এহেন প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে তিনি আমোদিত হয়ে উঠলেন। তবুও মুখে বললেন,
‘ধ্যাৎ, আমার কী আর সেই বয়স আছে সায়ু?’
‘তুমি আমার এভার গ্রিন মাম্মা! ‘
‘দেখতে হবে না, আমি কার মাম্মা! ‘
সায়র মায়ের সাথে হাই ফাইভ করলো। এতক্ষণের নীরব পরিবেশ হাসিঠাট্টায় গমগম করে উঠলো। পলাশ দেওয়ান দুজনের দিকে তাকিয়ে একগাল হাসলেন। মনে মনে ভাবলেন, মাঝে মাঝে রক্তের সম্পর্কও মনের সম্পর্কের কাছে হার মানে। কেউ দেখলে কী আদৌও বুঝতে পারবে, এরা সম্পর্কে সৎ মা ছেলে হয়!

চলবে-
লেখায়-নাঈমা হোসেন রোদসী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here