ভাঙা চুড়ি পর্ব তিন

ভাঙা চুড়ি
পর্ব তিন
,
আমি রাশেদের কাছে গিয়ে বললাম,
— আমি কিছু দিনের জন্য বাবার কাছে গিয়ে থাকতে চাই?
রাশেদ আমার কথা শুনে চিৎকার করে বললো,
– তোমার যেখানে ইচ্ছে যেতে পারো আমি বাধা দেবো না যতোসব।
এই বলেই চলে গেলো। আমি হা হয়ে গেলাম ওর আচরণে। আসলে ও চাইছে কি? কেনো মুখ ফুটে বলছে না আমাকে ওর ভালো লাগে না।রাশেদের উপরে খুব অভিমান হলো। আমি আর কিছু না বলে চলে গেলাম। নিচে রাশেদ আমার জন্য অটো নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমি যেন গেলেই ও বেঁচে যায়। অটো চলতে শুরু করেছে একবার শুধু একবার পিছনে ফিরে রাশেদের মুখ টা দেখতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু অভিমান সব চোখের জল হয়ে আটকে দিলো।
,
আশফির মুখ থেকে অনেক কিছুই জানা হলো। কিন্তু রাশেদের কিছু জানা হলো না। এবার চলুন রাশেদের অনুভূতি গুলো আমরা জেনে নেই।
,
আশফি যেদিন বললো আমাকে ডিভোর্স দিবে একটু অবাক হলেও খুব খুশি হয়েছিলাম।এ যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টি। আমি ও চাইনা আশফির মতো একটা সেকেলে মেয়ে আমার বউ হয়ে থাকুক।
বেশ অনেক সময় হয়ে গেছে মেয়েটা চলে গেছে। মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে আছে আজ।রান্না ঘরে গিয়ে কফি বানালাম। পাক্কা পনেরো মিনিট লেগেছে চা চিনি খুঁজে পেতে। আসলে এ গুলো মেয়ে দের কাজ। ছেলেদের সম্ভব না। কফি আর সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসলাম। অনেক সময় এখানে বসে আছি। কিন্তু ভালো লাগাটা কমতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে কি যেন নেই।

,
নীরাকে খবর দিলে কেমন হয়। অনেক দিন ওর চুলের ঘ্রান নেওয়া হয় না। যদি ও মাঝে মাঝে হাত ধরা আর চোখে চোখ রাখা এই টুকুই।
বারান্দায় বসে ওকে ফোন করলাম। রিসিভ করেই ও বললো,
– কেমন আছো রাশেদ? মনে পড়লো আমার কথা?
-তোমাকে মিস করছি নীরা।
– ওমা তাই নাকি তোমার বউ কোথাও?
– বাবার বাড়িতে চলে গেছে।
– ও মাই গড! তোমাদের সত্যি ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে?
-উকিল আরো তিন মাস সময় দিলেন। নীরা একটু বাসায় আসবে ভিষণ বোর হচ্ছি।
– ঠিক আছে আমি দশ মিনিটের ভিতরে আসছি।
,
এই বলেই ফোন কেটে দিলো। আমি ও নিজেকে একটু ঘসে মেজে পরিপাটি করলাম। একটু পরেই নীরা এসে হাজির। আজ নীরাকে একটু অন্য রকম লাগছে। কড়া করে সাজগোজ। গাড়ো লিপস্টিক এ ঠোঁট রাঙানো। শরীরে মাদকতার ঢেউ। পাগল করা হাসি। আমাকে যেন চুম্বুকের মতো কাছে টানছে। শরীরে পাতলা শাড়ি দিয়ে ওর যৌবন উথলে পরছে। কোনো পুরুষের জন্য কষ্ট নিজেকে ধরে রাখা।
,
অনেক সময় বসে দুজন গল্প করলাম। আমার ইচ্ছে করছে নীরার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াতে। মেয়ে টা মনে হচ্ছে আমার অনুভূতি বুঝতে পেরেছে তাই নিজের আমার গা ঘেঁষে বসলো। ওর ঠোঁট আমার কাছে আসছে আস্তে আস্তে। আমি ও ওর কাছে চলে গেলাম। ওর গরম নিশ্বাস আমার মুখে আসছে। আমি ও এগিয়ে যাচ্ছি খুব কাছে যেতেই আমার আশফির মুখটা ভেসে উঠলো। ও আমাকে বলছে ছি রাশেদ তুমি এতো জঘন্য। তুমি আজ প্রমান করে দিলে আমি তোমার যোগ্য নাকি তুমি আমার যোগ্য। প্লিজ রাশেদ তুমি শুধু আমার, এই দেখো আমি তোমার অপেক্ষা করছি তুমি আসো আমার কাছে আসো।
,
আমি চমকে উঠলাম। নীরা কে ঠেলে দিয়ে উঠে বসলাম ছি ছি আমি একি করছি। আশফি কে আমি ঠকাচ্ছি। না না এটা সম্ভব না। নীরাকে বললাম,
– আমি পারবো না নীরা আশফি কে ঠকাতে। আসলে আমি কতোটুকু ভালো? অথচ দিনের পর দিন ওকে আমি কষ্ট দিয়েছি।

নীরা রেগে গিয়ে বললো,
– একি বলছো রাশু? আসো আমার কাছে আমি সব ভুলিয়ে দেবো?
– প্লিজ তুমি চলে যাও আমি পাপী স্বামী নামের কলংক। আশফি ঠিক করেছে চলে গেছে। আমি ওর যোগ্য না।
– তোমার বউ অন্য কাউকে ভালোবাসে তুমি কি ভুলে গেছো?
– আমি মানি না। আমি আশফিকে চাই। ওর কাছে আমি যাবো ওকে অনুরোধ করবো ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না।আমি ওকে কতোটা ভালোবাসি আগে বুঝিনি এখন বুঝতে পারছি।
– তোমার বউ না, তুমি সেকেলে একটা পুরুষ। আমার ই ভুল হয়ে গেছে তোমার কথা শুনে এখানে আসা।

,
এই বলেই নীরা চলে গেলো। আমি ওয়াশরুমে ঢুকে মুখ ধুতে লাগলাম। আমি একি করছিলাম।
,
ঘরে এসে একটার পর সিগারেট ধরাতে লাগলাম। সেই কাগজ কোথাও যেখানে আমাদের ডিভোর্স এর চুক্তি করা।তিন মাস পর আমাদের ডিভোর্স। ওটা খুঁজতে গিয়ে একটা ডায়েরি পেলাম। যেখানে লেখা আশফির অজানা কথা। ও গুলো পরে পাগলের মতো কাঁদতে লাগলাম। মেয়ে টাকে কতো কষ্ট দিয়েছি। কিভাবে ওকে ফিরে পাবো।
,

কিন্তু আশফি কি সত্যি কাউকে ভালোবাসে? এর আগে আমি কোনো দিন কাঁদিনি। কিন্তু পাগলিটার জন্য হাউমাউ করে কাঁদলাম। আমার চোখের পানিতে ওর লেখা গুলো ধুয়ে যেতে লাগলো।
,
আমি ঠিক করলাম আশফিকে আমি ফিরিয়ে আনবো।আমি ছাড়া ও আর কারো হতে পারবে না।

,
আমি পাগলের মতো ওকে ফোন করলাম। কিন্তু ওর ফোন বন্ধ কেনো? বুকের ভিতর ঝড় হতে লাগলো তাহলে কি আশফি আমার আর হবে না। কিন্তু ওকে ছাড়া আমি মরে যাবো।
,
তাড়াতাড়ি করে আমি তৈরি হয়ে আশফি দের বাড়িতে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি আশফি নেই। ওর বাবাকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম,,
– বাবা আশফি কোথায় ওকে একটু ডেকে দিবেন।
আশফির বাবা কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,

— কেনো তুমি জানোনা আশফি তোমাকে কিছু বলেনি?

— নাতো বাবা কি হয়েছে?
— তোমার ওখান থেকে এসেই আশফি সিলেট ওর ছোট খালার বাসায় গেছে। বললো কিছু দিন থাকবে।
,

কথাটা শুনে মনে হচ্ছিল কেউ আমার কানে গরম শিশা ঢেলে দিছে। আমি উঠে চলে আসতে লাগলাম পিছনে আশফির বাবা ডেকে যাচ্ছে রাশেদ কিছু খেয়ে যাও। এসেই চলে যাবে।

,

আমি রাস্তায় দাড়িয়ে আছি। আকাশে আজ বড়ো একটা চাঁদ উঠেছে কিন্তু কোনো মুগ্ধতা নেই। ঠান্ডা বাতাস বইছে কিন্তু কোনো অনুভূতি নেই। আশফি কেন দুরে চলে গেলে। একবার কেন আমার মুখোমুখি হলে না। আমি তোমাকে চাই শুধু তোমাকে। জানিনা কখন জামা ভিজে গেছে। আমি যাবো আশফি কে ফিরিয়ে আনতে। আমার তৈরি হতে হবে যেতে হবে সিলেট।।

,
চলবে
লেখা অধরা জেরিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here