#প্রেমোত্তাপ #মম_সাহা ১৮.

#প্রেমোত্তাপ
#মম_সাহা

১৮.

উত্তপ্ত গরম, ঘামে ভিজে একাকার চিত্রা। আজ কলেজ এসেছে এডমিট কার্ড নিতে। এইতো আর কিছুদিনের মাথায় তার পরীক্ষা শুরু হবে। এডমিট কার্ড নিতে এসে ভীড়ে সে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। মাথা ঘুরছে খালি। এত রোদও যে আজ কী মনে করে ওঠলো সে বুঝে পাচ্ছে না। কী বিরক্তকর!

এডমিট কার্ড নিয়ে চিত্রা কলেজ থেকে বেরুতেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। দমবন্ধ ভাবটা কিছুটা কম লাগছে। চিত্রা ডানে-বামে তাকালো। রিকশার খোঁজ করলো। কোনো রিকশা নেই আশেপাশে। যেদিন প্রয়োজন পরে সেদিনই রিকশা গুলো উধাও হয়ে যায়। কোথায় যায় কে জানে! চিত্রাকে বিরক্ত করতে বাহার ভাইয়ের পাশাপাশি প্রকৃতিও সচেষ্ট।

চিত্রা আশপাশ তাকাতেই তার ডান দিকের গলিটাতে বনফুলকে ছুটে যেতে দেখা গেল। চিত্রা কিছুটা বিস্মিত হলো। বনফুলের কলেজ এ রাস্তায় না। এতটা দূরে মেয়েটার একা আসারও কথা না। কিন্তু ও এখানে কী করতে এলো! বনফুল তত চতুর মেয়েও না যে একা একা এখানে চলে আসবে। তাহলে এখানে কেন এলো মেয়েটা! চিত্রার কপাল কুঁচকে গেলো চিন্তায়। সেও কিছুটা ছুটেই সে গলির দিকে গেলো। বনফুল ততক্ষণে অনেকটা দূরে৷ চিত্রা জোরে ডাক দিতে গিয়েও দিলো না। কি মনে করে যেন থেমে গেলো। বনফুলের হাবভাব তার স্বাভাবিক ঠেকছে না। মেয়েটা কেমন সাবধানী চোখে আশেপাশে তাকাচ্ছে। কিসের ভয় মেয়েটার? কিসের ভয়ে সে এমন করছে! চিত্রা পায়ের গতি আরও বাড়ালো। কিন্তু ভাগ্য খারাপ হলে যা হয়। দ্রুত ছুটতে গিয়ে চলন্ত এক মোটর সাইকেলের সাথে ভয়ঙ্কর এক ধাক্কা খেয়ে ছিটকে গিয়ে পড়ে সে পথের ধারে। মুখ থুবড়ে পড়ায় বা-হাতটা চিনচিন এক তীক্ষ্ণ ব্যাথা করে উঠলো। সেই ব্যাথায় ঘুরে ওঠলো চিত্রার মাথা। অসহ্যকর ব্যাথাটা সহ্য করতে না পেরে মেয়েটা গগন বিদারক চিৎকার দিয়ে ওঠে। মটর সাইকেলের ছেলেটা তৎক্ষণাৎ তার গাড়ি থামিয়ে ছুটে এলো। ছেলেটাকে ঝাপসা চোখে দেখে চিত্রা বিড়বিড় করে ওঠলো, ধীর স্বরে বলল,
“আমাকে বাঁচাও, বাঁচাও।”

তারপর মেয়েটা জ্ঞান হারালো। শূন্য মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়ে কেমন নিস্তেজ হয়ে গেলো।

_

অহি ভার্সিটি থেকে ফিরতেই অপ্রিয় মহিলার মুখমন্ডল দর্শন করে বিরক্ত হলো। বিরক্তি ছড়িয়ে পড়লো তার চোখ-মুখে। সে নিজেকে কিছুটা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করেই তার রুমের দিকে এগিয়ে যেতে উদ্যোত হলো কিন্তু শেষমেশ সে আর যেতে পারলো না, তার আগেই মহিলাটা হাসি মুখে কাছে এলেন, গদোগদো করে বললেন,
“আমার অহু কেমন আছে?”

অহি বিরক্ত চোখে তাকালো। ড্রয়িং রুমে তার বাবা, চাচা, বড়ো আব্বু, বড়ো আম্মু, মেঝো আম্মুসহ সবাই উপস্থিত। সাথে মহিলাটার স্বামীও এসেছেন বোধহয়! এত গুলো মানুষের সামনে বাজে ব্যবহার করতে বাঁধলো অহির। তাই কিছুটা তিতে কণ্ঠেই বলল,
“ভালো থাকারই তো কথা। ভালো থাকবো বলেই তো সবার এত আয়োজন। খারাপ থাকার সুযোগ নেই।”

অহির এমন আচরণেও মহিলাটার গদোগদো ভাব কমলো না বরং সে আহ্লাদ করে নিজের আঁচল দিয়ে মেয়েটার ঘাম মুছিয়ে দিতে নিলেন। কিন্তু এত আহ্লাদ বোধহয় সহ্য হলোনা অহির। তাই মহিলাটার হাত কিছুটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে অবনী বেগমের উদ্দেশ্যে চেচিয়ে বলল,
“আমি কলেজ থেকে এলে যে শরবত দিতে হয় সে-ই প্রথাও কী সবাই ভুলে গেছে? সবাই কী পেয়েছে, হ্যাঁ? যার যা মন চাইবে, সে আমার সাথে তা-ই করবে?”

“অহি!”

নিজের বাবা আমজাদের সাবধানী ডাক ভেসে এলো। বাবা বোধহয় তাকে শান্ত হওয়ার জন্য এই ডাকটা দিলেন। অহি বাবার দিকে তাকাল। তাচ্ছিল্য করে বলল,
“আপনি একটা মানুষই…”

অহির কথা সম্পন্ন হওয়ার আগেই অবনী বেগম রান্নাঘর থেকে শরবত নিয়ে এলেন। চোখ-মুখ তার ফুলে আছে। শরবতের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে আধভাঙা কণ্ঠে বললেন,
“আমি খেয়াল করিনি তুমি এসেছো। নেও।”

অহি শরবতের গ্লাসটা কিছুটা টেনেই নিলো। তন্মধ্যে আমজাদ সওদাগর স্ত্রীকে ধমকে বললেন,
“খেয়াল কোথায় থাকে তোমার? বাসায় করোটা কী তুমি?”

“কেন, আপনাদের খোশামোদ করে।”

বাবাকে উত্তরটা দিয়েই অবনী বেগমের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “আর হ্যাঁ আপনি, খেয়াল আর কবে করবেন? কে এলো, কে গেলো সব খেয়াল করুন। সংসারটা আপনার। চোখ ফুলিয়ে কাঁদলে আর কণ্ঠস্বর ভাঙলেই যদি জগতে সুখে থাকা যেত বা সবটা পাওয়া যেত তবে আমার সকল অশ্রু আমি বিসর্জন দিতাম।”

অহি কথা শেষ করেই ভদ্রমহিলার দিকে তাকালো। ভদ্র মহিলা বিমূঢ়। বিস্মিত নয়ন জোড়া মেলে বললেন, “অহু বড়ো হয়ে গেছিস!”

“বড়ো হয়ে গেছি কি-না জানিনা তবে সামলে নিয়েছি। এর জন্যই তো ছেড়ে গিয়েছিলেন, তাই না?”

মহিলা আর জবাব খুঁজে পেলেন না। তার সাথে আশা ভদ্র পুরুষটি তখন ওঠে দাঁড়াল। কিছুটা মিষ্টি হেসে এগিয়ে এসে অহির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল পিতৃ-স্নেহে। কোমল কণ্ঠে বললেন,
“তুমি বেশ বুদ্ধিমতী, মা। ভালো আছো?”

অহি চেয়েও লোকটার সাথে খারাপ ব্যবহার করে পারলো না। কিন্তু ধীর কণ্ঠে জবাব দিল,
“ভালো আছি। আপনারা আসছেন, বসুন, খাবেন তারপর চলে যাবেন। আমি আশা করবো এই ভদ্র মহিলা যেন এ বাড়িতে আর না আসেন।”

অহির তীক্ষ্ণ কথাতেও বিচলিত হতে দেখা গেল না লোকটাকে। সে শান্ত ভঙ্গিতেই বলল,
“তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ উনি তোমার….. ”

“সরি টু সে, উনি আমার কেউ না আঙ্কেল। আপনি ভুল কথা বলবেন না।”

অহির আচরণে ভদ্রমহিলার চোখের কোণে অশ্রু দেখা গেল। অশ্রু এলো অবনীর চোখের কোণে। মুখ তার ভীতিগ্রস্ত। নুরুল সওদাগর ওঠে এলেন, বিজ্ঞ কণ্ঠে মহিলার উদ্দেশ্যে বললেন,
“শিমুল, কেঁদে লাভ নেই। মেয়েটা তোমার আচরণে অনেক ব্যাথা পেয়েছে যার কারণে আজ সে পাথর। তুমি তোমার প্রাপ্য আচরণেই তার কাছ থেকে পাচ্ছো।”

শিমুল নামের মহিলাটি তার চোখের স্বচ্ছ গ্লাসটা খুললেন। চোখের অশ্রুখানি আলগোছে মুছে বললেন,
“আমাদের তোমাকে প্রয়োজন।”

“আমার আপনাকে প্রয়োজন নেই। আমার প্রয়োজনে যে আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে তাকে আমার চাই না।”

“অহি, তুমি ওর সাথেই যাবে। ওদের সাথেই থাকবে। আর কোনে কথা না।”

আমজাদ সওদাগর নিজের কথাটা বলেই হনহনিয়ে চলে গেলেন নিজের রুমে। অহি ফেটে পড়লো ক্রোধে। হাতের কাচের গ্লাসটা সর্ব শক্তি দিয়ে ফ্লোরে ছুঁড়ে মারলো। চিৎকার দিয়ে বলল,
“আপনারা কেউ আমাকে ভালোবাসেননি। সবসময় নিজেদের কথা ভেবেছেন। আপনারা তো নিজেদের কথা ভেবে সুখী হয়েছেন, আমাকে কেন ফেলেছেন বাতিলের খাতায়? একটা সন্তানকে যদি মা-বাবা হয়ে সুখই দিতে না পারেন তো জন্ম দিয়েছিলেন কেন? বাবা-মা হিসেবে আপনারা ব্যর্থ। মানুষ হিসেবে আপনারা ব্যর্থ। একটা মানুষের সুখ কেড়েছেন আপনারা। শৈশব থেকে কত মানুষের ঠাট্টার পাত্রী হয়েছি আমি। এসব আমি ভুলবো না। ভুলবো না। এ বাড়ি থেকে আমার লাশ বের হবে, আমি তো না-ই।”

কাচের গ্লাসের টুকরো গুলো পা দিয়ে মাড়িয়েই অহি নিজের রুমে ছুটে চলে গেলো। পেছনে ফেলে গেলো কিছু ব্যাথাতুর, অবাক দৃষ্টি। বিষাক্ত অতীত কখনো সুখের স্বাদ দিতে পারে না যে!

_

অফিসের কাজে ব্যস্ত হাত চাঁদনীর। চাকরিচ্যুত হওয়ার চিঠিটাও সে জমা দিয়ে ফেলেছে। জমে থাকা কাজ গুলো সম্পন্ন করে তুলে দিবে দায়িত্বরত সিনিয়র অফিসারের হাতে তারপর তার ছুটি, চির অবসাদ। ছুটি দিবে আপন মানুষ, ছুটি দিবে দেশ। তার মনের সাথে সাথে তার দেহ ভুগবে একাকীত্বে। তাও ভালো, কেউ তখন আর কাঁদাবে না তাকে, কেউ তাকে আর ঘটা করে হাসবে না। কেউ তখন তাকে পাওয়ার জন্য ‘বেয়াদব’ হতে চাইবে না। তাও ভালো, কেউ তখন আর জানবে না চাঁদ মেয়েটা মরছে রোজ।

এসব ভাবতেই হতাশার শ্বাস বেরিয়ে এলো চাঁদনীর ভেতর থেকে। তন্মধ্যেই তার কলিগ মামুন সাহেব উপস্থিত হলো কার কক্ষে। নিজের চকচকে দাঁত গুলো দেখিয়ে হেসে বলল,
“কী মেডাম, চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন শুনলাম?”

চাঁদনীর ব্যস্ত হাত থামলো। না চাইতেও মামুন সাহেবের দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম হাসি দিয়ে বলল,
“ঠিকই শুনেছেন।”

“চাকরি ছাড়বেন কেন? দোষ তো করেছেন আপনি, চাকরি তো না।”

মামুন সাহেবের ঠেস মারা কথায় কপাল কুঁচকালো চাঁদনী। কিছুটা অবুঝ হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“জি? বুঝিনি।”

মামুন সাহেব এগিয়ে এলেন। চাঁদনীর সামনের চেয়ারটাতে বসে পা ঝুলাতে ঝুলাতে কেমন বিদঘুটে হাসি দিয়ে বললেন,
“সাদা জামাতে বৃষ্টিতে ভিজে প্রেমিকের সাথে ছবি তো আপনি তুলেছেন। অফিস বা চাকরির দোষ কী?”

চাঁদনী ঘৃণাভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকালো। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এই লোকটার সাথে কথা বলতে তার রুচিতে বাঁধছে। এর মাঝেই তার ফোনে নোটিফিকেশন এলো। মৃন্ময়ের উনপঞ্চাশটা কল আর ছিয়ানব্বইটা ম্যাসেজ। সবশেষ মানে বর্তমান ম্যাসেজটা জ্বলজ্বল করছে ফোনের স্ক্রিনে। সেখানে ছোটো করে লিখা ‘আমি অফিসের নিচে ইন্দুবালা, তাড়াতাড়ি আসুন।’

চাঁদনীর মাথা গরম হলো ছেলেটা পেয়েছি কী তাকে? আজ এর একটা বিহিত সে করবেই। তার উপর মামুন সাহেবের গা জ্বালা হাসিতে সে অতিষ্ঠ হয়ে যেই না ওঠে চলে যেতে নিবে তখনই পেছন থেকে লোকটা বলে ওঠলো,
“ভিজে জামায় আপনাকে দারুণ লাগছিল।”

লোকটার ইঙ্গিত বুঝতে অসুবিধা হবে না কারো। চাঁদনীরও হয়নি। কিন্তু সে প্রকাশ করলো না তার ঘৃণা। বরং মুচকি হেসে বলল,
“আপনার আর সুইটির অন্তরঙ্গ কিছু ছবিও দারুণ। ভাবীকে দেখাবো, কী বলেন?”

মামুন সাহেবের মুখের হাসি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। চাঁদনী গা দুলাতে দুলাতে নেমে গেলো অফিস থেকে।

অফিসের বাহিরে আসতেই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মৃন্ময়কে তার চোখে পড়লো। রাগটা সাথে সাথে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠলো। সে কিছুটা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে এমন মাঝ রাস্তায় সশব্দে চ ড় বসিয়ে দিলো ছেলেটার গালে। ছেলেটা আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব। কেবল বিস্মিত কণ্ঠে বলল, “ইন্দুবালা…”

“আই হেইট ইউ, মৃন্ময়। তোমার বাচ্চামো আজ আমার চরিত্রে কলঙ্কের কালি লেপেছে। কখনো ক্ষমা করবো না তোমাকে। কখনো না।”

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here