প্রিয়দর্শিনী,পর্ব_২১,২২

#প্রিয়দর্শিনী,পর্ব_২১,২২
#সামান্তা_সিমি
#পর্ব_২১
🍁
নিশান যূথীকে নিয়ে রাত এগারোটার আগেই পৌঁছে গেল।ওরা বাড়ির ভেতর ঢুকে দেখতে পেল সকলে ড্রয়িংরুমে জটলা পাকিয়ে বসে আছে।ছোট বড় সবাই হাসি-ঠাট্টায় মত্ত।
নিশান এবং যূথীকে দেখতে পেয়ে থেমে গেল সবাই।যূথীর মনে অনেকটা সংকোচ কাজ করছে।বাড়ির সবাই কি তাঁর এবং নিশান ভাইয়ার ব্যপারটা জেনে ফেলেছে? এই লোক কি ঢোল পিটিয়ে সবাইকে বলে দিয়েছে নাকি?অবশ্য এসব নিয়ে সে মাথা ঘামাতে চাইছে না।ভালো যখন বেসেছে তখন সে সব সমস্যার সম্মুখীন হতে রাজি।সমস্যা না আসলে কি কাহিনীতে টুইস্ট আসে?মোটেই না।
নীলুফা চৌধুরী হাসিমুখে এগিয়ে এসে বললেন,

‘ কখন থেকে তোদের জন্য অপেক্ষা করছি।এত দেরি হলো যে?রাস্তায় জ্যাম ছিল নাকি?’

নিশান সিড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলল,

‘ এ আর নতুন কি! ‘

মনীষা বিদীষা দৌড়ে এসে জাপটে ধরল যূথীকে।ওদের ফর্সা চেহারা খুশিতে ঝলমল করছে।
মনীষা হেসে বলল,

‘ উই মিসড্ ইউ ডার্লিং।তোমাকে দেখে খুব ভালো লাগছে।কিন্তু তোমার সাথে আমার কিছু হিসাব-নিকাশ বাকি আছে।আগে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া-দাওয়া করো।তারপর ধরব। ‘

যূথী ঠোঁট চেপে হাসল।মনীষা কোন হিসাব-নিকাশের কথা বলছে তা সে বুঝে গেছে।
ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সকলের সাথে দুয়েকটা কথাবার্তা বলে সে নিজের কামরায় চলে গেল।বুক ভরে শ্বাস ফেলল সে।কতদিন পর এই সুন্দর ঝকঝকে রুমটায় পা রাখল সে।

.

রাতে ডিনার করার পর মনীষাদের রুমে উঁকি মারল যূথী।দুবোন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।যূথীকে দেখতে পেয়ে তেড়ে এসে বলতে লাগল,

‘ এসো তোমার বিচার শুরু হবে এখন।ফোন কেনো ধরছিলে না তুমি?একটাবার আমার কথা শুনলে তোমার কান কি নষ্ট হয়ে যেত?নিজেও কষ্ট পেয়েছো আর আমাদেরও টেনশনে রেখেছো।’

দুবোনের কপট রাগ দেখে হাসি পাচ্ছে যূথীর।কিন্তু ইনোসেন্ট চেহারা বানিয়ে বলল,

‘ ফোন রিসিভ করিনি এরজন্য আমি খুবই দুঃখিত।।কিন্তু কি এমন হয়েছিল যে আমাকে এতবার কল দিচ্ছিলে?’

‘ অনেক কিছু হয়েছে।তুমি জানো তুমি চলে যাওয়ার পর নিশান ভাইয়ার কি হাল হয়েছে?আমরা তো অবাক হয়ে গেছিলাম।হঠাৎ এমন পরিবর্তন কিভাবে আসল।সে তো তোমাকে প্রায় সহ্যই করতে পারত না।তুমি যাওয়ার পর এমন কি হলো সে ওইরকম ব্যবহার করছিল!আমাকে বলেছিল তোমাকে কল দিতে।সে নাকি জরুরি কোনো কথা বলবে তোমার সাথে।যখন দেখল তুমি ওর নাম শোনা মাত্রই কল কেটে দিয়েছো তখন থেকেই ভীষণ রাগারাগি শুরু করল।নিজের নাম্বার থেকেও কল দিচ্ছিল না।কারণ তুমি ওর নাম শুনতেই এমন রিয়্যাক্ট আর কল পেলে না জানি কি করতে।’

মনীষার কথা শুনে হতবাক হয়ে গেল যূথী।নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করা দায় হচ্ছে। তাঁর অনুপস্থিতি নিশানের এই অবস্থা করে ছেড়েছে?অথচ উনার সামনে গেলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত।

‘ ভাইয়ার এই রাগারাগির চক্করে বাড়ির সবাই সমস্ত ব্যপারটা জেনে গেল।এটা নিয়ে বাড়িতে রাতের বেলা সকলে মিলে সভা বসিয়েছিল।সেখানে নিশান ভাইয়া সাফ জানিয়ে দিয়েছিল বিয়ে করলে একমাত্র তোমাকেই করবে।এতে যদি কারো আপত্তি থাকে তাহলে এটা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই তাঁর।ভাবতে পারছো কতটা বুকের পাঠা ওর।তারপর সবাই মিলে মানতে বাধ্য হলো।সে সবার চোখের মণি কিনা।’

যূথী চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।এতকিছু ঘটে গেল অথচ সে কিছুই জানতো না।হঠাৎ মনে একটা প্রশ্ন উদয় হতেই জিজ্ঞেস করল,

‘ যার সাথে উনার বিয়ে ঠিক হয়েছিল সেটা?’

‘ বিয়ে ভেঙে দিয়েছে। ‘

বিয়ে ভাঙার কথা শুনে কিছুটা খারাপ লাগল যূথীর।ওই মেয়েটা কি খুব কষ্ট পেয়েছে?এমনও তো হতে পারে মেয়েটা নিশান ভাইয়াকে নিয়ে বিয়ের স্বপ্ন দেখছিল।সুন্দর একটা সংসার করার স্বপ্ন দেখছিল।

‘ এই যূথী! কোথায় হারিয়ে গেলে।এনি প্রবলেম?’

‘ নাহ্।আচ্ছা রুমে যাচ্ছি আমি।ঘুম পাচ্ছে। গুডনাইট গার্লস।’

যূথী শুকনো মুখে বেরিয়ে এল। করিডোর দিয়ে এলোমেলো ভাবে হাঁটতে লাগল।হঠাৎ খুব মন খারাপ হয়ে আছে তাঁর।এতক্ষণ ঘুমে চোখ ঢুলুমুলু করছিল কিন্তু এখন নেই।কে জানে আজ রাত হয়তোবা জেগেই কাটাতে হবে।
নিজের রুমে ঢুকতে যাবে এমন সময় আচমকা কেউ তাঁর হাত টেনে অন্য রুমে নিয়ে গেল।আতঙ্কে তাঁর মুখ সাদা হয়ে গেল।চিৎকার দিতে গিয়েও সামলে ফেলল নিজেকে।পিটপিট করে চোখ খুলে দেখতে পেল নিশান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে।

‘ কি এত ভাবতে ভাবতে হাঁটছিলে জানতে পারি?’

নিশানের প্রশ্নে যূথীর ভাসা ভাসা চোখদুটো আরো ভেসে উঠল।আস্তে করে বলল,

‘ কই কিছু না।আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেনো?’

‘ আগে পরে তোমার জায়গা তো এখানেই।’

‘ যখনেরটা তখন দেখা যাবে।এখন ছাড়ুন।কেউ যদি এইসময়ে আমাকে আপনার রুমে দেখে তাহলে খুবই লজ্জার ব্যাপার হবে।’

নিশান যূথীর দুদিকের দেয়ালে ভর দিয়ে ঝুঁকে বলল,

‘ আই ডোন্ট কেয়ার।’

‘ বাট আই কেয়ার।সরুন।রুমে যাব আমি।’

যূথী নিশানের বুকে দুহাত ঠেকিয়ে হালকা ধাক্কা দিল।মুচকি হেসে বলল,

‘ দুদিন আগেও তো আমাকে দেখলে চোখ গরম করে তাকাতেন আর এখন কি মিঠি মিঠি বাতে!আমার ভালোবাসা এত পরিবর্তন করে দিয়েছে আপনাকে।’

নিশান চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে রইল।যূথীর দিকে আরো কিছুটা ঝুঁকে আসতেই যূথী অবাক হয়ে বলে উঠল,

‘ ভারি শয়তান তো আপনি!মনে মনে কি মতলব আঁটছেন?দূরে গিয়ে দাঁড়ান।’

‘ বেশিদিন দূরে থাকতে দিচ্ছি না মিস যূথী।কাল তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।বি রেডি।’

বলেই নিশান টুপ করে যূথীর গালে একটা চুমু খেয়ে নিল।বেডের উপর সটান হয়ে শুয়ে বলল,

‘ এখনো দাঁড়িয়ে আছো যে?বিয়ের আগে এভাবে হুটহাট বরের রুমে আসলে সবাই কানাঘুষা করবে।মিনিমাম এই কমনসেন্স টুকুও নেই তোমার?’

নিশানের পাল্টি খাওয়া দেখে যূথীর কান দিয়ে ধোঁয়া বের হতে লাগল।তেড়ে এসে বলে উঠল,

‘ চিটার,মিথ্যুক! একটু আগে তো আপনিই আমাকে টানতে টানতে এখানে নিয়ে এলেন।চোখের পলকেই কি সুন্দর নিজের রঙ বদলে ফেললেন।আপনাকে না আমি হাড়ে হাড়ে চিনে ফেলেছি।আপনাকে বিয়ে করলে যে আমার জীবনটার বারটা বাজবে সেটা এখন থেকেই বুঝতে পারছি।’

‘ শুধু বার না।তের চৌদ্দও বাজতে পারে।আমাকে তোমার প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছো,ভালোবাসতে বাধ্য করেছো।তুমি কি এত সহজে ছাড়া পাবে?নাফিজ ইমতিয়াজ নিশানের বউ হবে আর তোমার জীবনের বারটা বাজবে না এটা আবার হয় নাকি।’

‘ আমি আপনাকে বিয়েই করব না।আপনার থেকে ভালো কোনো বাস ড্রাইভারকে বিয়ে করব।’

‘ বাস ড্রাইভার কেনো রিকশা ড্রাইভার ভ্যান ড্রাইভার কেউই তোমার মত এমন ঝগড়ুটে মেয়েকে বিয়ে করতে চাইবে না।সকলের রুচি বলতে একটা ব্যাপার আছে না?নেহাত আমি বিয়ে করছি বলে বেঁচে যাচ্ছো।কি ডেঞ্জারাস মেয়ে!বিয়ের আগেই হবু বরের সাথে কেমন কোমর বেঁধে ঝগড়া করছে।’

হাসতে হাসতে বলা নিশানের কথাগুলো যূথীর কানে তপ্ত গলিত লোহার মত প্রবেশ করতে লাগল।সে জানে নিশান তাঁকে রাগানোর চেষ্টায় আছে।আর এই কাজে নিশান সফল।যূথী রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,

‘ আপনাকে তো আমি দেখে নেব।শুধু সময় এবং সুযোগের অপেক্ষা। আপনি এখনো আমাকে চিনতে পারেননি।’

নিশান ঠৌঁট কামড়ে বলে উঠল,

‘ দূরে দূরে থাকলে চিনব কিভাবে। কাছে আসো।আমি নিজেই চিনে নিব।’

‘ অসভ্য লোক একটা।’

যূথী রাগে দিশাহারা হয়ে বেরিয়ে গেল।নিশান হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেল বিছানায়।কাউকে রাগানোয় এত আনন্দ পাওয়া সেটা এই প্রথম বুঝতে পারছে।

____________________________

পরেরদিন যূথী ঘুম থেকে উঠে নিচে যেতে দেখল সবার চেহারায় খুশি খুশি ভাব।অচেনা কিছু লোকজন ড্রয়িংরুম ফুল দিয়ে সাজাচ্ছে।সবাই এত ব্যস্ত যে কাউকে ডেকে যে কিছু জিজ্ঞেস করবে সেই সুযোগও পাচ্ছে না যূথী।তাই হতাশ হয়ে দোতলায় মনীষার রুমে হানা দিল।দুবোন সামনাসামনি বসে কিছু একটা আলোচনা করছিল।যূথীকে দেখতে পেয়ে হেসে বলল,

‘ আজকের দিনে এমন শুকনো মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছো কেনো?ভাইয়াকে দেখো গিয়ে।ওকে এমন উজ্জ্বল চেহারায় লাস্ট কবে দেখেছি মনে করতে পারছি না।’

যূথী মনীষার কথার অর্থ খুঁজে না পেয়ে গোলগোল করে তাকিয়ে রইল।ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,

‘ আজ কি কোনো অনুষ্ঠান আছে বাড়িতে?কারো বার্থডে?তোমাদের ভাইয়ার বার্থডে নাকি?’

‘ না।তোমার এবং ভাইয়ার এঙ্গেজমেন্ট আজ।’

মনীষা এবং বিদীষার চিল্লিয়ে বলা কথাটা শুনে যূথীর অবাকের সপ্তম চূড়ায় পৌঁছে গেল।নিশান এবং তাঁর এঙ্গেজমেন্ট আর সে কিছুই জানে না।তাহলে কাল যে নিশান ভাইয়া সারপ্রাইজের কথা বলছিল এটাই সেই সারপ্রাইজ। এতবড় একটা খবর না জানিয়ে কাল রাতে তাঁকে রাগিয়ে বোম্ব বানিয়ে দিয়েছিল।কত বড় বজ্জাত লোক!

‘ ভাইয়া তোমার জন্য সারপ্রাইজ রেখেছিল এটা।তাই আমরাও তোমাকে কিছু জানাই নি।কংগ্রাচুলেশন যূথী আপু।রেডি টু বি আওয়ার ভাবী।ইয়াহুউউউউউ।’

বিদীষা যূথীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।লাজুক হাসল যূথী।ভাবী নামটা শুনে তাঁর শরীরে অজানা শিহরণ বয়ে গেল।সবকিছু কেনো জানি স্বপ্নের মত লাগছে।

এমন সময় নিশান প্রবেশ করল রুমে।যূথী ভালোবাসা মাখানো চোখে তাকাল সেদিকে।ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে খুব টাইট করে জড়িয়ে ধরে এই লম্বুটাকে।
নিশান যূথীর চোখের ভাষা বুঝতে পেরে মুচকি হাসল।
মাথার সিল্কি চুলগুলোর উপর হাত বুলাতে বুলাতে বলল,

‘ ওকে ছাড় বিদীষা।এ তো এমনিতেই শুটকি। তুই এভাবে ধরে থাকলে দেখবি কখন যেন ভেঙে গুড়িয়ে গেছে।’

নিশানের খোঁচামার্কা কথা শুনে যূথীর মুখ ভার হয়ে গেল।কোথায় ভাবল একটু মিষ্টি করে কথা বলবে তা না এসেই পিন মারতে শুরু করে দিল।অসহ্য।
যূথী মুখ ভেঙচিয়ে বেডের উপর রাখা শপিং ব্যাগগুলো দেখতে লাগল।তাঁর অগোচরে সকলে কেনাকাটা পর্যন্ত করে ফেলেছে।ভাবা যায় এগুলো!
ব্যাগের ভেতর থেকে লেমন কালারের একটা ঝকমকে লেহেঙ্গা বের হয়ে আসতেই যূথীর চক্ষু চড়কগাছ।দেখতে এত সুন্দর এটার দাম না জানি কত বেশি।

মনীষা বলল,

‘ ভাইয়া নিজে পছন্দ করে তোমার জন্য লেহেঙ্গাটা কিনেছে তোমার জন্য। কেমন লেগেছে তোমার কাছে?’

যূথী আড়চোখে সোফায় বসে থাকা নিশানের দিকে তাকাল।তৃপ্তির সাথে হেসে বলল,

‘ ভীষণ সুন্দর! ‘

চলবে…

#প্রিয়দর্শিনী
#সামান্তা_সিমি
#পর্ব_২২
🍁
যূথী বসে আছে নিজের রুমে।বাম হাতের আঙ্গুলে জ্বলজ্বলে আংটিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে বারবার।অবশেষে সে নিশানের বাগদত্তা হয়ে গেল।ভাবতেই কেমন খুশি খুশি লাগছে।ঘুমের মধ্যে নানা রংবেরঙের স্বপ্নে ভাসে আজকাল।এমনকি যখন জেগে থাকে তখনও চোখের সামনে শুধু নিশানকেই দেখতে পায়।কি অদ্ভুত এক রোগে আক্রান্ত হয়েছে সে।এঙ্গেজমেন্টের অনুষ্ঠানের পর থেকেই এমন লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে নিশানের মনের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।লোকটাকে তো বাড়িতেই পাওয়া যায় না।ফোন দিলেও দু চার মিনিট কথা বলে কল কেটে দেয়।সে নাকি ইদানীং খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।লোকটা কি জানে তাঁর হবু বউ যে নিশান নামক রোগে আক্রান্ত হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছে!

বিকেলে মনীষা এসে জানিয়ে গেল সন্ধ্যার পর সকলে শপিংয়ে বের হবে।যূথী যেন তৈরি হয়ে থাকে।বিয়ের আর মাত্র সপ্তাহ খানেক বাকি।আজ থেকেই কেনাকাটা শুরু করতে হবে নাহলে পরে হুড়োহুড়ি লেগে যাবে।

সন্ধ্যা হতেই বাড়ির মহিলাসহ মেয়েদের দল গাড়ি নিয়ে শপিংয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।যূথীর দুপাশে মনীষা এবং বিদীষা বসে আছে।ওরা নানারকম হাসি ঠাট্টায় মগ্ন।যূথীর ইচ্ছে করছে নিশানকে একটাবার কল দিতে। কিন্তু ওদের জন্য পারছে না।কল দিতে দেখলেই আবার খোঁচানো শুরু করবে।মেয়ে দুটো নিশানের থেকেও বেশি বদ।যখন তখন এটা সেটা বলে লজ্জায় ফেলে দেয় তাঁকে।বড় ছোট কাউকেই তোয়াক্কা করে না।সেদিন তো নিশানের বাবার সামনেও ঠাট্টা-তামাশা করতে বসেছিল।

শপিংমলের সামনে গাড়ি থেকে নেমে নিশানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ অবাক হলো যূথী।বলা কওয়া ছাড়া এই লোক যেখানে সেখানে হাজির হয়ে যায় আজকাল।

যূথী গুটিগুটি পায়ে সকলের পেছন পেছন এগিয়ে চলল।বাকিরা নিশানকে দেখে কোনোরকম বিস্ময় প্রকাশ করল না।তারমানে সবাই জানত নিশান এখানে আসবে।তাহলে তাঁকে কেনো কেউই বলল না কথাটা?বেশ রাগ হলো তাঁর।

নিশান সকলকে ভেতরে যেতে বলে যূথীর কাছে চলে আসলো।নিজের হাতের ভেতর যূথীর হাত প্রবেশ করিয়ে বলল,

‘ চেহারা এমন পেঁচার মত করে রেখেছো কেনো?এনি প্রবলেম?’

যূথী মুখ ফুলিয়ে বলল,

‘ আমার প্রবলেম আপনি! সারাদিন শুধু কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন! আমার সাথে ভালো করে দুটো কথাও বলেন না!এখানে যে আসবেন এটা আমাকে একবারও বললেন না কেনো?’

নিশান যূথীকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

‘ আচ্ছা তাহলে এই হলো আপনার অভিযোগ।কি করা যায় বলো তো?’

‘ কিচ্ছু করতে হবে না।হাত ছাড়ুন আমার।আপনার ন্যাকামো টাইপের কথা শুনলে রাগ হয় আমার।’

যূথী হাত ছাড়ানোর জন্য মোচড়ামুচড়ি করা শুরু করল।কিন্তু ব্যর্থ হয়ে থেমে যেতে হলো।
নিশান হাসতে হাসতে বলল,

‘ এনার্জি শেষ?তাহলে কোনো শুধু শুধু লাগতে আসো আমার সাথে।এত মন খারাপ কিছু নেই তো।বিয়ে উপলক্ষে আমি কিন্তু পাক্কা পনেরদিনের ছুটি নিয়েছি।তোমাকে এখন সময় দিচ্ছি না তো কি হয়েছে পনেরদিনে সব পুষিয়ে দিব।’

বলেই নিশান শয়তানি হেসে চোখ মারল।যূথী তো পারে না লজ্জায় মাটিতে মিশে যায়।এই লোক উচ্চ লেভেলের বজ্জাত।চোখের তাকানোতেও মনে হয় বজ্জাতগিরি খেলা করে।
যূথী খুকখুক করে কেশে বলল,

‘ পাবলিক প্লেস তাই আপনার চুলগুলো বেঁচে গেল নাহলে দেখতেন কিভাবে টেনে টেনে আমি উঠিয়ে ফেলতাম।কথাবার্তার কি ছিড়ি!যাই হোক কয়েকদিন থেকে আপনাকে একটা প্রশ্ন করব বলে চিন্তা করছিলাম।কিন্তু সুযোগ হয়ে উঠছে না।’

‘ বলে ফেলো এখন।’

‘ আমাদের বিয়েটা আপনি আপনাদের বাড়িতেই কেনো আয়োজন করলেন।আমি তো ভেবে রেখেছিলাম আমি চলে যাব গ্রামে।আপনি বর সেজে নিতে যাবেন আমায়।কিন্তু মাঝপথে সব ভেস্তে দিলেন।কি দরকার ছিল একই বাড়িতে দুজনের বিয়ের আয়োজন করার?’

‘ দরকার ছিল।তোমাকে না দেখে এক মুহূর্তও থাকা সম্ভব নয় আমার।বিয়ের প্রত্যেকটা ইভেন্টে তুমি একেক রূপে সাজবে আমি সেটার সাক্ষী থাকতে চাই যূথী।এজন্যই এত কিছু করলাম।’

নিশানের কথার উত্তরে যূথী বলার মত কিছুই পেল না।মনের ভেতর সুখের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। সত্যিই এত আনন্দ তাঁর কপালে লেখা ছিল! কেউ তাঁকে এত ভালোবাসবে এই লোকটার সাথে দেখা না হলে সে কখনো জানতে পারতো না।

বিয়ের কেনাকাটা শেষ করতে করতে রাত প্রায় দশটা বেজে গেল।নিশানের দুইহাত ভর্তি ব্যাগ।ব্যাগের ভারে তাঁর নাজেহাল অবস্থা। মহিলাদের গ্রুপে সে একমাত্র পুরুষ হওয়ায় সবাই তাঁকে দিয়ে ফায়দা উঠাচ্ছে।

মল থেকে বেরিয়ে গাড়ির কাছে আসতে নিশান দাঁত খিচিয়ে মনীষাকে বলল,

‘ পুরো শপিং মলটা বোধ হয় ফাঁকা করে দিয়েছিস তোরা দুবোন।এত জামাকাপড় দিয়ে করবিটা কি?এখন তো দেখি তোদের শপিং ব্যাগ ক্যারি করার জন্য লোক ভাড়া করে রাখতে হবে।’

বিদীষা দাঁত কেলিয়ে বলল,

‘ চিল ব্রো।আমাদের বড় ভাইয়ার বিয়ে বলে কথা।একটু কেনাকাটা তো করতেই হবে তাই না।আর লোক ভাড়া করলে করতে পারো আমাদের কোনো সমস্যা নেই।তুমি এত কষ্ট করে ব্যাগগুলো ধরে আছো এটা দেখতে আমাদেরও ভালো লাগছে না।’

সকলে মুখে হাত দিয়ে হাসতে লাগল।বেচারা নিশানের অবস্থা দেখে যূথীও না হেসে থাকতে পারল না।

নিশান চোখ মুখ পাকিয়ে বলল,

‘ হাত ফাঁকা থাকলে দুবোনের গাল লাল হতে এক সেকেন্ডও লাগত না।আজ বেঁচে গেলি।আর এই যে আম্মু তুমিও ওদের দলে এখন।নিজের মাও ছেলের দুর্দশা দেখে মজা নিচ্ছে। কি আর করা।এখন দয়া করে সবগুলো ফটাফট গাড়িতে উঠে উদ্ধার করো আমায়।’

সকলে হৈহৈ করতে করতে গাড়িতে উঠল।
.

বাড়িতে পা রাখতেই কেউ একজন এসে হঠাৎ জাপটে ধরল নিশানকে।নিশানের হাত থেকে ব্যাগ গুলো মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল।
নিশান কিছুটা রেগে গিয়ে বলল,

‘ হোয়্যাট ইজ দিস মাহির?এত বড় হয়েছিস এখনো বাচ্চাদের মত আচরণ যায় নি।তুই কখন এসেছিস?’

মাহির নিশানের কলার ঠিক করে দিতে দিতে বলল,

‘ মাত্রই! কিন্তু আমাকে আর বাচ্চা বলার চান্স নেই ব্রো।বিগ ব্রোয়ের বিয়ে হচ্ছে এরপর তো আমার পালা আসবে নাকি?তাই যখন তখন বাচ্চা বলে ডেকে আমার ইজ্জতের ফালুদা বানিয়ো না তো।এখন সামনে থেকে সরো আগে ভাবীর সাথে কথা বলি।’

মাহির হাসিমুখে যূথীর সামনে এসে বলল,

‘ হ্যালো ডিয়ার ভাবী! আমি কিন্তু তোমাদের প্রেম কাহিনী সবটা জেনে গেছি।কি দুর্দান্ত ছক্কা মারলে তুমি।আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম ভাই এই জীবনে আর বিয়েই করবে না।চারদিকে এত সুন্দরী কিলবিল করে কাউকেই নাকি ওর পছন্দ না। কিন্তু আলটিমেটলি তোমার জালে সে ধরা দিল।হাহাহাহা!

যূথী অবাক হয়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে রইল।এতদিন এই ছেলেটার সাথে মোবাইলে কথা বলে এসেছে।তখনই বুঝেছিল ছেলেটা ছটফটে।কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে ছটফটে নয় সাথে অনেকটা খোলা মনের মানুষও।

যূথী আরো কিছুক্ষণ মাহিরের সাথে আলাপ করে উপরে চলে গেল।

____________________________

দেখতে দেখতে চলে এল নিশান এবং যূথীর বিয়ের দিন।পুরো বাড়ি মেতে আছে আনন্দের ঢেউয়ে।বিয়ের এক সপ্তাহ আগেই গ্রাম থেকে যূথীর চাচা চাচী চলে এসেছিল।বাড়িভর্তি মেহমান গিজগিজ করছে।চারদিকে বড় ছোট সকলে যার যার মনমতো হৈ হল্লায় মত্ত।

যূথীর রমে তাঁকে ঘিরে আছে দুজন পার্লারের মেয়ে।সাজ প্রায় কমপ্লিট।আয়নায় নিজের চেহারা দেখে নিজেকেই চিনতে পারছে না যূথী।বিয়ের সাজে তাঁকে কোনো পরীর মত লাগছে।এই সাজে সে কিভাবে নিশানের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে তা ভাবতে গেলেই বারবার লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠছে।আর মাত্র কিছুক্ষণ এরপরই তাঁর জীবনের সাথে জুড়ে যাবে নিশানের নাম।

.

নিশান বর বেশে ড্রয়িংরুমে বসে আছে।তাঁর চারপাশে তাঁর পুরো ফ্রেন্ড সার্কেল।ফ্রেন্ডদের মধ্যে বেশিরভাগই ম্যারিড।ব্যাচেলর যারা আছে ওরা বিয়ের জন্য হা-হুতাশ করতে ব্যস্ত।এসব দেখে ম্যারিড ছেলেগুলা মজা লুটছে।
বন্ধুদের মজা মাস্তিতে মন নেই নিশানের।সে অপেক্ষা করে আছে কখন সেই সময় আসবে।বসে থাকতে থাকতে তাঁর ধৈর্য্য প্রায় খতম।ইচ্ছে তো করছে ছুটে চলে যায় উপর তলায়।

নিশানের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে উপস্থিত হলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যূথী বধূবেশে সিড়ি দিয়ে নেমে আসছে।গর্জিয়াস লেহেঙ্গা এবং ভারী সাজে ঝলমল করছে যেন।নিশান পলকহীন ভাবে তাকিয়ে রইল।না চাইতেও এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল তাঁর ঠোঁটের কোনায়।ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে পাওয়ার আনন্দে সে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না।যদি কোনভাবে এই আনন্দটা সবাইকে দেখানো যেত!

বিয়ের কাজ সম্পন্ন হতেই যূথীকে নিশানের রুমে নিয়ে যাওয়া হলো।যতক্ষণ নিশানের সামনে ছিল ততক্ষণ লজ্জায় সে তাকাতেই পারে নি।নিশানকে বরের বেশে কেমন লাগছিল সেটা দেখার ভীষণ লোভ জেগেছিল তাঁর।কিন্তু লোভটাকে দমন করতে হয়েছিল যখন বুঝতে পেরেছে নিশানই তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল সারাটাক্ষন।
গোলাপ এবং রজনীগন্ধা ফুলে সজ্জিত তুলতুলে নরম বিছানায় বসতেই তাঁর শরীরে ক্লান্তিরা জেঁকে বসল।ফুলের মিষ্টি গন্ধে তাঁর ঘুমঘুম নেশা ধরে যাচ্ছে। কি করা যায় এখন! নিশানের রুমে আসতে হয়তোবা আরো দেরি হবে।এই ফাঁকে একটু রেস্ট নেওয়া যাক।

যূথী বালিশটা একটু উঁচু করে শরীর এলিয়ে দিল।আর এতেই বিশাল এক ঘুম দৈত্যাকার রূপ নিয়ে হানা দিল তাঁর চোখে।ফলাফলস্বরুপ পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here