প্রতিশোধ নাকি ভালোবাসা?,পর্বঃ ০১

প্রতিশোধ নাকি ভালোবাসা?,পর্বঃ ০১
জাহান আরা

হাতের তালুতে মেহেদী দিয়েছিলাম,তারই ছবি তুলতে গেছি,হঠাৎ ছোট বোন তার হাত আমার হাতের উপর দিয়ে রাখলো।

আমিঃ হাত সরাও অনু
অনুঃ তুমি আগে তোমার হাতের উপর আমার হাতের ছবি তোলো তারপর সরাবো।

কি আর করার বাধ্য হয়ে ছবি তুললাম।

বাছাই করে মেহেদীর ২ টা ছবি রেখে বাকিগুলো ডিলিট করতে গেলাম,সাথে আমার আর অনুর হাতের ছবিটি, অনু তাকিয়ে রইলো।
আমি ডিলিট অপশনে চাপ দিতে যাবো তখনি বলে উঠলো,”বুবু,তুমি আমার আর তোমার হাতের ছবিটি ডিলিট করে দিবা,রাখবা না তোমার ফোনে??”

ওর কথা শুনে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম,ওর আব্দার গুলো খুব ছোট ছোট।
ও জানে ওর বুবুর সেই সামর্থ্য নেই বড় বড় ইচ্ছে পূর্ণ করার,তাই হয়তো ছোট ছোট আব্দার।

বাবা মারা যাওয়ার পর আমিই হয়েছি বাড়ির বড় ছেলে।
আফসোস ছিলো না।
বাবাকে হারিয়েও এতো আঘাত পাই নি,কারণ আমি ভেঙে পড়লে মা আর অনুকে দেখবে কে??
প্রতিরাতে সবার আড়ালে আকাশের দিকে তাকিয়ে বাবার সাথে অভিমান করে গেছি কেনো এভাবে ছেড়ে চলে গেছে।

আস্তে আস্তে সবই ঠিক হয়ে আসছিলো,পড়ালেখার পাশাপাশি ছোট একটা চাকরি করতাম,বাবার রিটায়ারমেন্টের টাকা,গ্রামের জমি থেকে আয়,সব মিলিয়ে দিন কেটে যাচ্ছিলো।

কিন্তু এই সুখ স্থায়ী হলো না।
এক ঝড়ে সব ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো।
সেদিন অফিস থেকে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়,বাসায় এসেই শুনি অনু এখনো স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে নি।

এই কথা শুনেই আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।মানে কি??
অনু কোথায় যাবে??
দেশের যেই অবস্থা,শিশু থেকে বৃদ্ধা কেউই নিরাপদ না,সুযোগ পেলেই কিছু মানুষরুপি নরপশু তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। আমার বোনটার যদি এরকম কিছু হয় তাহলে আমি মরেই যাবো….
আমি জীবনেও নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না।

কোনোকিছু না ভেবে তখনি বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই,কই খুঁজবো আমি জানি না কিন্তু আমাকে যে অনুকে পেতে হবে।

বাড়ি থেকে বের হয়ে ওর স্কুলে গেলাম,স্কুল ঘর বন্ধ।
অন্ধকার চারদিক।
হটাৎ করেই আমার বুকের ভিতর কেমন চিনচিন করে উঠলো,আমি খুব ভালো করে বুঝতে পারছি আমার বোন আশে পাশে কোথাও আছে।

কোনদিকে যাবো,চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলাম।তারপর এক এক করে স্কুলের সব গুলো ঘর ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম।হঠাৎ একটা রুমের সামনে আসতেই আমি কেমন যেনো মিষ্টি খুব পরিচিত একটা ঘ্রাণ পেলাম।
এই ঘ্রাণ আমি সব সময় পাই,কোনো উৎস খুঁজে পাই না এই ঘ্রাণের।যখনি আমি একা হতাম বা বিপদে থাকতাম বা চিন্তায় বা ভয়ে থাকতাম এই ঘ্রাণ পেতাম আমি।

কিন্তু এখানে সেই ঘ্রাণ একটু বেশি তীব্র।
ওই ক্লাসের ভিতর থেকে যেনো আসছে ঘ্রাণ।
দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেছে।
কি অদ্ভুত পুরো ক্লাসরুম আলোয় আলোকিত অথচ বাহির থেকে কোনো আলোয় দেখা যায় নি।
একটা বেঞ্চের উপর অনু শুয়ে আছে। অনুর চারদিকে অনেক ফুল ছড়িয়ে আছে। একপাশে অনেকগুলো কামিনী ফুল।
কামিনী ফুল আমার সবচাইতে প্রিয় ফুল,কি ভেবে যেনো আমি ফুলগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াই,ফুলের ঘ্রাণ শুঁকি।
তখনি একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে।
সেই তীব্র ঘ্রাণ টা যেনো আমার দেহের ভিতর প্রবেশ করে আচমকা।

মুহূর্তের জন্য আমি বিমূঢ় হয়ে গেলাম।

তারপর আবার স্বাভাবিক হয়ে গেলাম।
দেখি অনু উঠে দাঁড়িয়েছে।

আমিঃ অনু,তুই এখানে কেনো, কেনো বাড়ি গেলি না??

অনুঃ বুবু স্কুল ছুটির পর বের হয়ে যাই তারপর স্কুলের বাহিরে যেতেই মনে পড়ে আমার হাতের ঘড়ি নাই,আমি ক্লাসে আমার ডেস্কে রাখছিলাম তখনি আমি ক্লাসে আসি ততক্ষণে সবাই বের হয়ে গেছে ক্লাস থেকে।

আমি ঘড়ি নিয়ে হাতে দিতেই দেখি ক্লাসের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে আমি যতো চিৎকার করার চেষ্টা করি কিছুই বলতে পারি না। তারপর আর মনে নেই ঘুমিয়ে পড়ি এখানে কিভাবে যেনো।

ঘুম থেকে উঠতেই তো তোমাকে দেখি।

অনুর কথা শুনে আমি কিছুটা হতবাক হলাম।
এটা কিভাবে সম্ভব!!!
অনু ভয় পাবে ভেবে আর কিছু বল্লাম না,অনুকে শিখিয়ে দিলাম বাসায় কেউ জিজ্ঞেস করলে যাতে বলে বান্ধুবীর বাসায় গেছে।

অনুকে নিয়ে বাড়ি ফিরছি কিন্ত পুরো রাস্তায় সেই মৃদু ঘ্রাণ পাচ্ছি।
আমিঃ অনু,তুই কোনো ঘ্রাণ পাচ্ছিস??
অনুঃ না তো,কিসের ঘ্রাণ বুবু??
আমিঃ কিছু না এমনিই।

বাড়িতে যাওয়ার পর মা অনুকে অনেক বকাঝকা করলো।
খাওয়া দাওয়া করে সবাই শুয়ে পড়লো আমি আমার রুমে বসে ফেসবুকিং করছিলাম হটাৎ করেই ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেলো খাটের নিচে।দেয়াল আর খাটের মাঝখানে ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে ফোন নিতে গেলাম।
ফোন যেখানে পড়েছে সেই বরাবর হাত দিতেই ঠান্ডা শিহরণ বয়ে গেলো।
হাত উঠিয়ে নিজে চমকে গেলাম।
কি হলো এটা??
কারো হাত মনে হচ্ছে কিন্তু কার হাত হবে??
এই মাঝরাতে কে??
এতো ঠান্ডা হাত!!

সেই আগের ভয়টা আবার ফিরে এলো মনে।
তবে কি সে এখনো রয়ে গেছে???
আমি কি মুক্তি পাবো না তার হাত থেকে???
আশেপাশে কোথাও সেই মিষ্টি ঘ্রাণ, তাহলে কি এটা সেই??

মাকে ডাকতে যাবো তখনি মনে হলো আমার মনের ভুল না তো??
হতেও পারে।সে তো অনেক আগেই ছেড়ে চলে গেছে। ঘ্রাণ হয়তো আমিই অকারণে পাচ্ছি।

আবার হাত দিতে যাবো ফোন তোলার জন্য এমন সময় খাটের অন্য পাশে তাকাতেই দেখি ফোন খাটের উপরে।কিন্তু ফোন তো আমি তুলি নি।
এবার আরো বেশী ভয় পেয়ে গেলাম।
আমি জানি এটা সে ছাড়া আর কেউ না।
মাকে ডাকতে যাবো কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না।

রুমের নীল আলোর ড্রীম লাইট টা হঠাৎ করেই নিভে গেলো,মাথার উপরের ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলো।
প্রচন্ড শীতে কাঁপছি আমি।মার্চের এই তীব্র গরমের মাঝে আমি শীতে কাঁপছি।
আমি জানি সে আসছে আবার আমার কাছে।

কিছুক্ষণ পরেই সব স্বাভাবিক হয়ে গেলো।

আমি উঠে মায়ের রুমে গিয়ে মায়ের সাথে ঘুমিয়ে পড়লাম।

আমার সহজ সাধারণ জীবনটা মনে হচ্ছে বড় কোনো বিপদে পড়বে এবার।
মা কে কিছু বলতে পারছি না মা ভয় পাবে বলে।

ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম।

ভোর হতেই সবকিছু স্বাভাবিক মনে হতে লাগলো আমার কাছে।
নিজের রুমে গেলাম,ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাড়াতেই আবার চমকে গেলাম,পুরো ড্রেসিং টেবিল ভর্তি হয়ে আছে কামিনী ফুল দিয়ে।

সবকিছু তবু স্বাভাবিক ভাবে নিলাম।

পরদিন অফিসে যেতেই সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে কেমন করে যেনো।

আমি কিছু বুঝতে না পেরে একজন (রুপা)কে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপার কি,এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো সবাই??

রুপাঃ তোমাকে আজকে অনেক বেশী সুন্দর লাগছে,বুঝতেছি না,কেনো লাগছে।

আমি উঠে ওয়াশরুমের দিকে গেলাম।
ওয়াশরুমের আয়নায় তাকিয়ে আমিও চমকে গেলাম!!!
কিভাবে সম্ভব!!

আমার চোখের নিচে কালো দাগ,ব্রণ ছিলো তা একেবারেই নেই।বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই আমার ঘুম হতো না,চিন্তায় থাকতাম। কিন্তু আজকে দেখি খুবই ফ্রেশ চেহারা আমার বাবা বেঁচে থাকতে যেমন ছিলো।

ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলাম।
কোনো কাজেই মন বসছে না আমার।
ভাবছি এসব কেনো হচ্ছে।

এমন সময় ফোন বেজে উঠলো।
দেখি মায়ের ফোন।

আমিঃ হ্যালো মা বলো।
মাঃ তোর কি আক্কেল হবে না জীবনে ও??
আমিঃ কি করছি আমি??
মাঃ এতো বাজার পাঠাতে বলছে কে তোরে একসাথে, টাকা কি বেশি হয়ে গেছে তোর??
সবকিছুই তো আছে বাসায়,অনুর স্কুলে যে পরীক্ষার ফি দেওয়া লাগবে বেতনের সাথে সেটা মনে নাই তোর,এখন বাজার পাঠিয়ে এতো টাকা নষ্ট করার কি আছে??

আমি মায়ের কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।
আমার কাছেই তো টাকা নেই বেশী,আমি নিজেই তো চিন্তা করছিলাম অনুর স্কুলের ফি,বেতন নিয়ে,আর আমি তো বাজারেই যাই নি,তাইলে কি হচ্ছে এসব??

মাঃ হইছে এখন চুপ করে থাকতে হবে না,আর শুন তোর কামিনী ফুলের মালাগুলো ফ্রিজে রেখে দিছি,মানুষের হয় গোলাপ ফুল প্রিয় আর তোর কি অদ্ভুত পছন্দ কামিনী ফুল,একসাথে এতো মালা নেয়ার কি ছিলো,এগুলা এতোগুলা কি খাবি নাকি তুই।
তাড়াতাড়ি চলে আসিস,এতো বাজার করলি যে সব তোরে খাওয়াবো রেঁধে।
বাড়ি আসলে বাকি কথা বলবো।

আমি কি করবো বুঝতেছি না।আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম এটা সে,কিন্তু কেনো এমন করে সে,আমাকে মুক্তি দেয় না কেনো??

বাড়ি ফিরতেই মা কে দেখে আরো বড় একটা ধাক্কা খেলাম।মায়ের পরনে নতুন শাড়ি, ঠিক সেই শাড়িটি যেটা আমি কিছুদিন আগে মার্কেটে দেখে আসছি,খুব পছন্দ হয়েছিলো আমার এই হালকা নীল শাড়িটি কিন্তু টাকা ছিলো না কেনার মতো।

আমিঃ শাড়ি…..

মাঃ হ্যাঁ,শখ করে কিনে পাঠিয়েছিস তাই ভাবছি পরেই ফেলি আজকে।

আমিঃ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে মা।

বলেই নিজের রুমে চলে গেলাম।
মাথায় কিছু ঢুকছে না কি হচ্ছে এসব।

অনু এসে রুমে ঢুকলো।

অনুঃ নাও,ধরো।

আমিঃ কি ধরবো??

অনুঃ ফি,বেতন দিতে গিয়ে তুমি আজ আমার সাথে দেখা করো নাই বুবু,আর রসিদ ফেলে এসেছো কেনো??
ম্যাডাম আমাকে ক্লাসে দিয়ে গেছে তুমি নাকি ভুলে রেখে গেছো।

আরেকটা ধাক্কা খেলাম। অনুকে বুঝতে দিলাম না তবু।

আমিঃ কাজ ছিলো তো তাই চলে এলাম তাড়াতাড়ি, ভুলে গেছি তাই হয়তো, তুই এখন যা রুম থেকে।

অনু চলে যেতেই আমি ভাবতে লাগলাম।
এসব কেনো করতেছে সে কি চায়??

হঠাৎ করেই কে দেন বলে উঠলো তোমাকে চাই।

আমি ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলাম।
আমার চিৎকার শুনে মা ছুটে এলো।

মাঃ কি হয়েছে??
আমিঃ কিছুনা মা,একটা তেলাপোকা উড়ে এসে গায়ে পড়েছিলো তাই।
মাঃ কই তেলাপোকা এখন??

বলতে না বলতেই দেখি ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় বসে আছে একটা তেলাপোকা।

আমি তো মা কে মিথ্যা বলেছিলাম তাহলে সত্যি সত্যি তেলাপোকা কই থেকে আসলো এখানে??
এসব কিছু তার কাজ।
আমি আর নিতে পারছি না এসব কিছু।
মা খেতে যেতে বললো।

হাত মুখ ধোয়ার জন্য ওয়াশরুমে যেতেই দেখি পুরো বেসিন কামিনী ফুল দিয়ে ভরা।আয়নার চারপাশে কামিনী ফুলের মালা।
হাতমুখ না ধুয়েই দৌড়ে ডাইনিং টেবিলে চলে গেলাম

মাঃ কি হয়েছে,দৌড় দিলি যে??

আমিঃ ক্ষিধে বেশি লেগেছে যে তাই।

আমার জন্য যে আরো অনেক চমক অপেক্ষা করছে তা তখনো আমি ভাবতেই পারি নি।

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here