পুনম,পর্বঃ২৮,২৯

পুনম,পর্বঃ২৮,২৯
আয়েশা_সিদ্দিকা
পর্বঃ২৮

নিকষ কালো রাতের শেষে একটা সুন্দর সোনালী সকাল।মিঠে রোদের পরশ চট্টগ্রাম টু ঢাকা বাসের জানালা গলে পুনমের মুখে ছড়িয়ে পড়ছে…
একটু পরই বাস ছাড়বে।যে যার মত আসন গ্রহণ করছে।পুনমের মাথায় ভোতা যন্ত্রণা হচ্ছে… চোখে মুখে ক্লান্তি!সারা রাত নির্ঘুম থাকার ফল এটা! পুনম আশায় আছে কখন বাস ছাড়বে আর কখন একটু দুচোখ বুজে ঘুমাতে পারবে। চারদিকের কোলাহল বিরক্ত লাগছে।বাড়ির সবার জন্য মন কেমন করছে!
বল্টু রিমি ন্যাকান্যাকা প্রেমালাপ করছে।নাহিদ বর্ষা আপাতত মৌনব্রত আছে।আর বরাবরের মত শশী শিমুল ঝগড়া করছে।ঝগড়ার বিষয়ে বস্তু হলো…শশী পানি পান করার সময় কারো ধাক্কায় বোতল থেকে পানি ছলকে শিমুলের প্যান্টে পড়েছে।এই নিয়ে তুমল কথা কাটাকাটি হচ্ছে…
—-অন্ধের মত কাজ করছিস আবার বড় বড় কথা বলছিস।চোরের মায়ের বড় গলা।হুহ!
—একদম মুখ সামলে কথা বলবি শিমুল তুলা।একবার স্যরি বলছিনা।
—তোর স্যরি তোর ক্রাশের মাথা ঢাল বান্দন্নী…আমার প্যান্ট আগে শুকাবি তারপর এখান থেকে লরবি…
—ঝামেলা করিস না শিমুল্যা…
—লুতুপুতু করার সময় ক্রাশ আর ঝামেলার সময় আমি, এসব আর হবে না…তুই প্যান্ট ঠিক করার ব্যবসথা কর শশী….
–একদম চুপ।আর একটা কথা তোরা দুজনে বলবি তো বাস থেকে ধাক্কা মেরে নামাইয়া দিবো…..চেঁচিয়ে বলে পুনম।
পুনমের ধমকে দুজনে চুপ হয়ে যায়। ধপ করে এসে সাকিব বসে পড়ে পুনমের পাশের সিটে।পুনম দেখেও চুপ হয়ে থাকে।আসলে ওর কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে না।কাল রাতের ব্যপারটা ওকে পুরোপুরি এলোমেলো করে দিয়েছে।
মস্তিষ্ক আর মনের যুদ্ধে ক্লান্ত শরীর! বাবার কোলে মাথা রাখতে পারলে শান্তি পাওয়া যেতো…।

লেমন রঙের গেঞ্জি ব্লু জিন্স পড়ে তানভীর বাসের ভিতরে প্রবেশ করে।চোখ দুটো রক্তবর্ণ,ঠোঁট রুক্ষ,শরীরের তাপমাত্রা একশো দুই,চুল গুলো এলোমেলো।গালে খোঁচা খোঁচা দাড়িতে ম্যানলি লাগছে। দেখতে আদুরে লাগছে।পুনম একপলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়।দেখতে চায় না ও এই মানুষটাকে!

তানভীরের পিছন পিছন রাজুও আসে।পুনমের পাশে সাকিবকে বসা দেখে মুহুর্তেই তানভীরের মেজাজ গরম হয়ে যায়।দাঁড়ানো অবস্থায় বাসের একটা সিট শক্ত করে চেপে ধরে…দু চোখের পাতা বন্ধ করে নিজের ক্রোধ সামলায় তানভীর… ওর বেশ বুঝা হয়ে গেছে….পুনম ওকে পুরোপুরি ভাবে নিঃশেষ করে দিতে চাইছে।তবে তাই হোক!

—-এই সাকিব ওঠ,ওটা তানভীর ভাইয়ের সিট।….পিছন থেকে বলে বল্টু।
তানভীর ভেবেছিলো কালকের ঘটনাটা পুনমকে বুঝিয়ে বলবে।তা আর হলো কই?নিজের রাগ চেপে বল্টুর সাথে হাত মিলিয়ে বলে,
—-তাহলে বল্টু তোমরা যাও…আমার তোমাদের সাথে যাওয়া হচ্ছে না।একটু কাজ আছে ভাই।
বল্টু কিছু বলতে নেয় কিন্তু সে কথা না শুনেই হনহনিয়ে হেঁটে বাস থেকে নেমে পড়ে তানভীর ।পুনম সবটা দেখার পরও চুপচাপ থাকে।বুকের ভিতর তীব্র ঝড়!কিন্তু পুনমের মুখে তার বিন্দুমাত্র আভাস নেই।অবচেতন মন জানতে চায়, তানভীরের অসুখ কতখানি? কিন্তু মুখ ফুটে বলে না।কালকের ঘটনাটা সব অনুভূতির উপর চাপ সৃষ্টি করে।

রাজু বোকার মত তার স্যারের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার বল্টুর দিকে তাকায়। বল্টু মাথা নেড়ে বুঝায় সে কিছুই জানে না।রাজু আর বল্টু চরম হতাশ! তারা ভেবে ছিল, এই ভ্রমণে তানভীর আর পুনমের সম্পর্ক সহজ হবে।কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তা আরো কঠিন হয়েছে।রাজুও নেমে পড়ে ধীরপায়ে।
বল্টু পুনমের দিকে তাকিয়ে দেখে পুনম চোখ মুখ শক্ত করে বসে আছে।ফোস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে বল্টু।এখন আর পুনমকে কিছু বলা যাবে না।

তানভীর বাস থেকে নেমে ব্যস্ত পায়ে হাঁটতে থাকে।রাজু পিছন পিছন দৌড়িয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। রাজু তানভীর স্যারের মুখ দেখে আঁতকে ওঠে।টেনে নিয়ে বসায় একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে।তানভীরের রাগে শরীর থরথর করে কাঁপছে। রাজু বেসামাল হয়ে পড়ে।তার স্যারের শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে এখনই মেডিসিন খাওয়ানো দরকার। রাজু আশেপাশে চোখ ঘুরিয়ে ফার্মেসি দেখতে পেয়ে, দৌড়ে ঔষধ আনে।
তানভীর একহাত কপালে আর একহাত কোমড়ে রেখে দোকানের সামনে অনবরত পায়চারি করে।তার আসলে ঐ সাকিবের মাথা ফাটাতে মন চাচ্ছে।
রাজু কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে,
—-স্যার দয়া করে ঔষধ খেয়ে নিন।আপনি যেকোন মুহুর্তে বেহুশ হবেন…আমি চোখে চোখে দেখতে পাচ্ছি।
—-রাজু এসব জ্বর ফর বাদ দাও।তোমার পুনম ম্যামকে কি শাস্তি দেয়া যায় তা ভাবো।তা না হলে আমার অসুখ কমবে না।কতবড় বেয়াদব মেয়ে…ঐ সাকিবের পাশে বসে আমাকে দেখানো হচ্ছে….
— ধরে বেধে নিয়ে আসি আপনার সামনে?
–না অন্য কিছু….
—দুই একটা চড় থাপ্পড় কি….
—হাধার মত কথা বলো না।
— ভয় টয় দেখানো যায়…
—না এসবে হবে না।
—-তবে হাত পা ভাঙা…
—-স্টপ রাজু!
—স্যার আপনি কি আদৌ পুনম ম্যামকে শাস্তি দিতে চান?
তানভীর অসহায় চোখ তাকায়। সেই চোখ দেখে রাজুর মায়া লাগে, ভীষণ মায়া!

***************
হারুনের সামনে আইনী নোটিশের কাগজ।হারুন হতভম্ব হয়ে বসে আছে কাগজটা হাতে নিয়ে। তার বিশ্বাস হচ্ছে না।সুমন তার বিরুদ্ধে আইনী নোটিশ পাঠিয়েছে সম্পত্তির জন্য!এতবড় অসম্ভব কাজ কি করে হলো?
হারুন গলা হাকিয়ে রুমাকে ডাকে।রুমা দ্রুতপায়ে রুম থেকে বেড়িয়ে আসে…. আজকাল তার হারুনকে ভয় লাগে।হারুনের কাছ থেকে সবমসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখে।
—-কি হয়েছে?
—কি হয়নি তা বলো?সুমন আইনী নোটিশ পাঠিয়েছে। সুমনের এত সাহস কোন কালেই ছিল না।আমি যদি জানতে পারি এর পিছনে তোমার বাপের বাড়ির কারো হাত আছে তবে তোমার চৌদ্দগুষ্ঠির খবর করে দিবো।
রুমা আঁতকে ওঠে,
—সে কি?
—-আমাকে কি বোকা ভেবেছে…যে এসব কলকাঠি নাড়ছে তাকে তো একদমই ছাড়বো না।এত আরাম ছেড়ে বাপের বাড়ি না যেতে চাইলে খবর নেও এর পিছনে কার হাত? আমার সন্দেহ তোমার বোন পুনমের উপর!

সুমন চোখ কচলাতে কচলাতে বের হয় রুম থেকে।চিল্লা পাল্লায় ঘুম ছুটে গেছে।মাথা ব্যথা করছে।
—ভাবি এককাপ চা দিতে বলবে বুয়াকে।
রুমা গোলগোল চোখে তাকায়।একবার হারুনের মুখে আর একবার সুমনের মুখের দিকে।
—কি হয়েছে ভাইজান?
—এসব কি সুমন?
সুমনের সামনে কাগজ ফেলে জিজ্ঞেস করে হারুন।হারুনের চোখ মুখ রাগে থইথই করছে।সুমন স্বাভাবিক স্বরে বলে,
—-তুমি যা দেখতে পাচ্ছো তাই।
—দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছি এতদিন।এখুনি বেড়িয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে…চেঁচিয়ে বলে হারুন।
সুমন মৃদু হাসে।শান্ত চোখ দুটো আরো শান্ত দেখায়।
—সময় আসলেই দেখা যাবে কে কালসাপ ভাইজান?….বলে রুমের দিকে হেঁটে চলে যায়।
হারুন ক্রোধে চেয়ারে লাথি মেরে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।

সুমন একটা ব্যাগে কাপড়চোপড় গুছিয়ে চলে যাচ্ছে। সে জানতো এমনই হবে তাই মেসে রুম ঠিক করে রেখেছিল। গেটের কাছে যেতেই দেখতে পায় ইষ্টি মিষ্টি কাঁদো কাঁদো মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
—-কি রে হানি বানি কি খবর?
—তুমি কি সত্যিই চলে যাচ্ছো চাচ্চু?
—হুম।কাঁদছিস কেন?
—-আমাদের ভীষণ কান্না পাচ্ছে চাচ্চু।তুমি যেও না।
—খুব শীঘ্রই চাচ্চু চলে আসবে।ততদিন কান্না কাটি করবি না।চাচ্চু হেটস টিয়ারস…

ইষ্টি মিষ্টি ছলছল চোখে দেখে তার চাচ্চু একটা রিকশা ডেকে তাতে বসে পড়েছে।আশ্চর্য! তাদের কাঁদতে বারণ করে চাচ্চু নিজেই কেন কাঁদছে?
**************
ঝুমা ঝরঝর করে কাঁদছে।জামাল নাক মুখ কুঁচকে সামনে বসে আছে।সে ভেবে পাচ্ছে না তার বউ কাঁদছে কেন? কাঁদার মত তো কিছুই হয় নি। ঝুমার চোখে পানি দেখে জামালের চোখেও পানি চলে আসে।সবাই তাকে বউ পাগল বলে, বলুক।বউ কাঁদবে আর সে বসে বসে দেখবে তা কখনো হবে না।সেও বউকে সঙ্গ দিতে সঙ্গে কাঁদবে।

মরিচা পাশ থেকে চিৎকার বলে,
—আমনেরা দুইজনে আসলেই আহাম্মক। কানতাছেন কে? আর ও মাইজা দুলাভাই কোতায় আমনে আরো আফার কান্দোন থামাইবেন উল্টো আমনেও সুর তুলছেন।

পাশ থেকে পুনমের মা বলে
—-ঝুমা এত ভালো সংবাদে কেউ কাঁদে?জামাই চাকরি পাইছে কোথায় তুই হাসবি। তা না… জামাল কান্না বন্ধ করো।
—থামে না তো আম্মা…
পাবনী লাবণ্য মুখটিপে হাসে।এই দুজনের কান্নাও কেন যেন আজ ভালো লাগছে।জামাল একটা ভালো কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে।পাবনী ভাবে, এবার পুনমের উপর থেকে একটু হলেও চাপ কমবে।

******************
তারুণ ইংলিশের একটা চাপ্টার অনেকক্ষণ ধরে লাবণ্যকে বুঝাচ্ছে।কিন্তু পড়া লাবণ্যের এক কান দিয়ে যাচ্ছে আর এক কান দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। লাবণ্য চরম হতাশ।এরকম কারো বন্ধু হয়….
তারুণ চোখ মুখ কুঁচকে বলে,
—এসব কি লাবণ্য? মনোযোগ দিচ্ছিস না কেন?
—ধুরো বাল…এসব ছাইপাস এত পড়তে পারবো না।
—হোয়াট ডু ইউ মিন বাল লাবণ্য? ল্যাঙ্গুয়েজের কি হাল।এবারো ফেল মারতে চাচ্ছিস?
—-আরে বস এত চাপ নিও না।জাষ্ট চিল….যা পড়ছি তাতে পাস হইবো…আমি তো আর টপ হইতে চাই না।
—-লাবণ্য এসব ঠিক না।পড়াশোনা লাইফে মোষ্ট ইম্পর্টেন্ট।এই রোদে বসে আমি তোকে এই কারণেই পড়াচ্ছি যাতে তোর রেজাল্ট কিছুটা ভালো হয়।
—-আচ্ছা পরবো নি…এখন একটা কোল্ড ড্রিংক খাওয়াও তারু বেবি।পড়তে পড়তে গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

তারুণ লাইফে পড়াচোর দেখেছে কিন্তু লাবণ্যের মত দেখেনি।এতক্ষণ বকবক করে পড়ালো ও আর সে তো একবারো মুখ খুলেনি তাতেই গলা ভিজানো লাগবে। সামনে পরিক্ষা এই মেয়েটা যে কি করবে আল্লাহ জানে?
লাবণ্য তারুণের কোঁকড়া চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলে,
—-এত চাপ নিও না মামা….এই লাবণ্য ঠিক পাস করবো।চাপের চোটে না আবার ঠুস কইরা ফুটুস হইয়া যাও।এখন উঠতো আমার কোক খেতে হবেই।
—প্লিজ লাবণ্য ভাষা ঠিক কর।তোর ভাষা শুনলে আমার ভাষার জন্য যারা যুদ্ধ করেছে তাদের জন্য দুঃখ লাগে।

লাবণ্য খিলখিল করে হাসে আর তারুণ কপাল কুঁচকে হাঁটে।লাবণ্য তারুণের হাত জরিয়ে ধরে বলে,
—-যা খাইয়া আইসা পড়বনি।এখনতো মুখের নকশা ঠিক কর তারু বেবি…..
তারুণ অবিশ্বাসের চোখে তাকায়।দেখা যাবে খাওয়ার পর এই মেয়ের আর এক বাহানা থাকবে।

***************
পাবনী বারান্দায় গিয়ে কল দেয় সুমনের নম্বরে। পাবনী ভেবে পাচ্ছে না,অযথা বুকের ভিতর ধুকপুক কেন করছে? এমনতো না যে সুমন ভাই বাহিরের কেউ।

সুমন মেসের ছাদে জ্বলন্ত সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে বসে আছে।সিগারেটের আগুনে যেন নিজেকে পোড়াচ্ছে! মাথায় এলোমেলো চিন্তার ভীর।পকেটে মোবাইল টোনের শব্দে চিন্তার সুতো কেটে বাস্তবে আসে।মোবাইল স্ক্রিনে অনাকাঙ্ক্ষিত নম্বরটি দেখে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকে সুমন।
—-হ্যালো!
—সুমন ভাই আমি পাবনী।ভালো আছেন?
—ভালো আছি কিনা জানি না তবে বেঁচে আছি।শূন্য পকেটে যতটা বেঁচে থাকা যায় ততটা বেঁচে আছি! তা তুমি কল করে ছো কেন?
—-আসলে সুমন ভাই…….ফোনের ওপাশে পাবনী ইতস্তত করে।
—তুমি নির্দ্বিধায় বলো।আমার কাছে এত সংশয় কিসের তোমার?
—-জ্বি?
—-ও কিছুনা তুমি বলো।
—বড় আপা এসব কি বলছে সুমন ভাই?আপনি কেন করলেন এমনটা?বড় আপা কল করে মায়ের সাথে চেঁচামেচি করছে।তার ধারণা আমরা আপনাকে উস্কে দিয়েছি।
—তুমি আর কিছু না বললে আমি ফোন রাখতাম!… সুমনের কন্ঠে রাগ!
—ইয়ে সুমন ভাই…ঝামেলা তো সব পরিবারেই হয়।একসাথে বসে মিটিয়ে নিন।এসব মামলার কি দরকার?
—পাবনী তুমি কি আসলেই পুনমের জমজ বোন?দুজনে এতটা তফাৎ কেন বলতে পারো?তুমি আমায় অন্যায় মুখ বুজে সইতে বলছো?
—আপনি আমায় ভুল বুঝবেন না সুমন ভাই।আমার যে ভাঙনের বড় ভয়!
সুমন আকুতি ভরা কন্ঠে বলে,
—-আর আমি যে ভাঙছি তারবেলা?আমি তোমায় পাশে চেয়েছিলাম পাবনী!কিন্তু আমি ভুল জায়গা আমার ভুল আরজি করেছি!

পাবনী দেখে সুমন এটুকু বলে কল কেঁটে দিয়েছে।পাবনী বারান্দার গ্রিলে মাথা রাখে….বিড়বিড় করে বলে,সুমন ভাই আপনিও আমায় ভুল বুঝলেন!
**********

পুনম বাস থেকে নেমেই দেখে বাবা বাস স্টান্ডে দাঁড়িয়ে আছে।বাবার হাসিমুখ দেখে সারাদিনের মন খারাপ নিমিষেই দূর হয়ে যায়।
—কেমন আছো বাবা?
—তোকে ছাড়া এ কটাদিন একদম ভালো ছিলাম না মা।এবার তুই এসেছিস,আমি ভালো আছি।
মিছে অভিমানে পুনম বলে,
—কেন তোমার আর মেয়েরাও তো ছিলো?
বাবা হাসে কোন জবাব দেয় না।বাবার হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে হুট করে তানভীরের মুখটা ভেসে ওঠে মানসপটে। পুনম কয়েক ঢোক গিলে…ওই মানুষটা কেন না চাইতেও তার ভাবনায় আসে? কেন? কেন?

–কিরে মা দাঁড়িয়ে পড়লি কেন?ওঠ…
পরক্ষণেই হাসি মুখে বাবার হাত জরিয়ে রিকশায় উঠে পুনম।পিছুটান চায় না কোন পুনম।দিনশেষে সব মরিচীকা!

চলবে,

#পুনম
#আয়েশা_সিদ্দিকা
পর্বঃ২৯

রুমা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঘামছে।মাথার উপর ফুল স্পিডে ফ্যান ঘুরছে….দক্ষিণা জানলাটা খুলা তারপরও এভাবে ঘামছে কেন?রুমা বিছানায় উঠে বসে।শাড়ির আঁচল গায়ে জরিয়ে বসে…ঘরিতে রাত তিনটা বাজে! কিন্তু রুমার চোখে ঘুম নেই!চোখের নিচে কালি পড়েছে।ধীরপায়ে হেটে ড্রয়িংরুমে দরজার কাছে দাঁড়ায় রুমা।
রুমার চোখে জল এসে যায়…. হারুন কারো সাথে ফোনে কথা বলছে।বাচনভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে খুবই রসরসে আলাপণ চলছে….রুমা ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।পুনরায় আবার এসে বিছানায় শরীর মেলে দেয়।হারুনের সাথে কোন উচ্চ বাচ্চ করে না।এই দেড় মাস ধরে এসব চলে আসছে….সারাদিন হারুন বাড়ি থাকে না…রাতে এসে দুটো খেয়ে মোবাইল নিয়ে রসায়ন চালায় কারো সাথে। রুমার দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।আর রুমা পুরো রাত নির্ঘুম কাটিয়ে সকাল হলে মিথ্যে সুখের অভিনয় করে।মেয়েদের সামনে, কাজের লোকদের সামনে, প্রতিবেশীর সামনে রুমা সর্বসুখী। কিন্তু এভাবে আর কতদিন?
যেদিন থেকে সুমনের সাথে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা বেজেছে সেদিন থেকে হারুন বেপরোয়া! হারুনের মতে এসবে রুমার বাবার বাড়ির হাত আছে।তাই এর শাস্তি পাচ্ছে রুমা।আসলেই কি তা?রুমার কখনো মনে হয় হারুন যা বলছে ঠিক।আবার কখনো মনে হয় রুমা নিজে কিসের শাস্তি পাচ্ছে?এসবে তো তার হাত নেই!উল্টো হারুনের জন্য বাসার সবার সাথে বাজে ব্যবহার করেছে রুমা। প্রথম যেদিন হারুনের এসব আচরণে প্রতিবাদ করলো রুমা….সেদিনই হারুন আবার তাকে চড় মেরেছে।তাই এখন আর কিচ্ছু বলে না।সমীকরণ কোথায় গিয়ে মিলবে সেই অপেক্ষায় আছে!
************
পুনম ভীরঠেলে বাসে উঠে বসে। শেষের দিকে একটা সিট ফাঁকা, সেখানে গিয়ে বসে পড়ে।কক্সবাজার থেকে এসেছে দুমাস হয়ে গেলো।পুনম আনমনেই ভাবে, সময় কত দ্রুত গড়ায়!
বাসের জানলা গলে পুনম বাহিরে তাকায়। কাঙ্ক্ষিত সেই মুখটা দেখার আশায়, কিন্ত না সেই কাঙ্ক্ষিত মুখের মানুষটা যেন ভোজবাজীর মত হাওয়া হয়ে গেছে।পুনমের কেন যেন মনে হয় তানভীর আশেপাশেই হয়তো আছে।আগের মত আড়ালে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে।হুট করেই একদিন সামনে এসে বলবে,”পুনমি এত নিষ্ঠুর কেন তুমি ? ”
সেদিন কি জবাব দেবে পুনম?
***********
তারুণের পরিক্ষা শেষ হয়েছে কিছুদিন হলো।হাতে অফুরন্ত সময়। কিন্তু তারুণের মত পড়ুয়া ছেলের কাছে এই সময় কিচ্ছু না।তারুণ পড়ছিল কিন্তু আজ পড়ায় ঠিকমত মন দিতে পারছে না। বার বার মনে হচ্ছে কিছু হিসেব মিলছেনা।
তারুণের স্বপ্ন বাকি স্টাডি লন্ডনে গিয়ে কম্পিলিট করার!কিন্তু বাবার জন্য পারছে না।
কাল রাতে বাবাকে বলায় বাবা তাকে একটা কথা বলে থামিয়ে দিয়েছে।
“আমি চাই না তারুণ তুমি আমার থেকে দূরে যাও।আমার আদরের সন্তান দূরে থাকুক এটা চাই না।দেশের কোন ভার্সিটিতে পড়তে চাও বলো, আমার এতটুকু ক্ষমতা আছে সেখানে তোমাকে পড়ানোর।”

তারুণ বাবার কথার পৃষ্ঠে কিছু বলেনি।সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে বাবা যখন এই কথা বলছিল তখন বাবার চোখে তারুণ কোন পিতাসুলভ মমতা দেখতে পায় নি!তারুণের কেন যেন মনে হয় বাবা আগের মত তাকে ভালোবাসছে না। তাছাড়া তারুণ ছোটবেলা বোডিং স্কুলে থেকে পড়েছে তাই তারুণ বাহিরের দেশে গেলে বাবার বেশি কষ্ট হওয়ার কথা না।তবে কি ভাই যা বলছে তা ঠিক? আমাদের বাবা সন্তানদের ভালোবাসতে জানে না।
তারুণ চুল খামচে ধরে, বাবাকে অবিশ্বাস করতে মনে চায় না।বাবাকে ভীষন ভালোবাসে যে!
হুট করেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে, কিছুদিন আগে বাবা মাকে প্রচন্ড জোরে থাপ্পড় মেরেছে।যা রুম ক্রোসের সময় তারুণ দেখে ফেলেছো।সেদিন থেকেই তারুণের চিন্তারা খাপছাড়া।বাবা তার অসুস্থ মাকে কেন মারলো?কেন?

তারুণ স্লিপার পায়ে দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। কিছু একটা ঠিক নেই?পাজল গুলো সরল অংকের মত গরল লাগছে! মাথা ঠিক করতে হলে এখন ভাইয়ের কাছে যাওয়া আবশ্যক! তারুণ ঠিক সেই মুহুর্তেই অনুধাবন করে তার ভাই আলাদা বাসায় থাকছে। বাবার সাথে ঝামেলা করে।কিন্তু ঝামেলাটা আসলে কি নিয়ে এটা এখনো তারুণ জানে না।আশ্চর্য!

************
পুনম দিনের টিউশনি গুলো বন্ধ করে দিয়েছে।টিউশনির জন্য ঠিকমত পড়ালেখা হচ্ছে না।সামনে মাস্টার্সের পরিক্ষা! এখন তার এই পরিক্ষায় মনোযোগ দেয়া উচিত। সকাল বেলাটা পড়াশোনা করে বিকেলের শিফটে একটা মোবাইল কোম্পানির রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করে।সন্ধ্যায় সেখান থেকে ফেরার সময় দুটো টিউশনি করে তারপর বাসায় ফিরে।কোচিং সেন্টারের থেকে এখানে ভালো টাকা দিচ্ছে তাই এই কাজটা নেয়া।কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই কাজটির জন্য বেশির ভাগ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
মেজ দুলাভাই চাকরি করছে তাই মেজ আপার টেনশন থেকে আপাতত মুক্ত পুনম। সংসারে যা খরচ তা এখন মোটামুটি সামলে উঠছে।
পুনম বল্টুর কাছে গিয়েছিল।ট্যুর থেকে আসার পর তানভীরের মত বল্টুও পুনমকে এড়িয়ে চলছে।তাই বন্ধুর রাগ ভাঙাতে গিয়ে লেট হয়ে গেছে….
বাসায় ঢুকেই বসার রুমে বড় আপাকে বসা দেখতে পায় পুনম। বাসার পরিবেশ থমথমে! সবাই গোমড়া মুখে বসে আছে। পুনম হাত ব্যাগটা চেয়ারে রেখে… টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি খেয়ে সবার সামনে যায়।
—-বাবা কি হয়েছে বাসায়? বড় আপা তুই কখন এসেছিস?
বড় আপা রক্তচক্ষু নিয়ে তাকায়।রাগে হিসহিসিয়ে বলে,
—-কেন এটা কি শুধু তোর বাপের বাড়ি?এখন এ বাসায় আসতে হলে তোর পারমিশন নিয়ে আসতে হবে?
পুনম শান্ত ভঙ্গিতে বলে,
—শুধু শুধু ঝামেলা করবেনা। আমি এ কথা কখন বললাম?
রুমা ক্ষীপ্র গতিতে উঠে এসে পুনমের গালে ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। পুনম আকস্মিক থাপ্পড়ে পড়ে যেতে নিলে পাবনী এসে পুনমকে জাপটে ধরে।বাবা দাঁড়ানো থেকে ধপ করে বসে পড়ে।এসব কি হচ্ছে তার পরিবারে?তার এক মেয়ে আর এক মেয়েকে মারছে?এ দৃশ্য দেখার আগে তার মৃত্যু হলো না কেন?
মা সোফায় বসে আঁচলে মুখ গুজে কেঁদে ওঠে। লাবণ্য মরিচা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। মেজ আপা পেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। জামালের উদ্দেশ্যে বলে, “বাবুর আব্বু আমাকে ধরো। আমার মাথা ঘুরাচ্ছে।”
ঝুমার অন্তস্বত্তার বয়স সাতমাসে পড়েছে…সে ইদানীং টেনশন একদম নিতে পারে না।জামাল শক্ত করে জরিয়ে ধরে স্ত্রীকে।

পুনম একদৃষ্টিতে তখনও তাকিয়ে আছে বড় আপার দিকে।বড় আপা তখনও হিংস্রতার সাথে বলতেছে,
—এখন সবার সামনে অবুঝ সাজবি না।তুই কখনো আমার ভালো থাকা সহ্য করতে পারতিস না।একদম এভাবে তাকাবি না…তুই কি ভেবেছিস আমি কিছু জানি না। তুই সারাদিন কষ্ট করিস বলে আমি কেন সুখে থাকবো?এই নিয়ে তোর হিংসার শেষ নেই।তাই তো তুই সুমনকে লেলিয়ে দিয়েছিস।আর আজ সে তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করছে আর প্রতিদান হিসেবে হারুন আমাকে শাস্তি দিচ্ছে। তুই কি ভেবেছিস আমাকে কষ্ট দিয়ে তুই শান্তি পাবি?কখনো না।আজ থেকে আমার কাছে তুই মৃত পুনম!তুই মৃত!

পাবনী আঁতকে ওঠে বলে,—এ তুই কি বলছিস বড় আপা?তোর কোথাও ভুল হচ্ছে….

বড় আপা সমানে চেঁচিয়ে বলে,—-তোদের সবার মনে হচ্ছে তো আমি ভুল আর পুনম ঠিক?তবে আজ থেকে তোরাও আমার সাথে যোগাযোগ রাখবি না।

পুনম এতক্ষণ পরে আস্তে করে বলে,—সেজ আপা আমাকে ছাড়।
পাবনী ছাড়ে না আরো শক্ত করে ধরে।পাবনীর ভয় হচ্ছে, পুনম নিজের সাথে কখনো অন্যায় মেনে নেয় না।এখন যদি বড় আপাকে উল্টা পাল্টা কিছু বলে দেয়….
পুনম ঝাড়া মেরে পাবনীর হাত ছাড়িয়ে দেয়।শান্ত ভঙ্গিতে বড় আপার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
—বড় আপা! এই যে তুই আমায় মারলি। এতে আমার কোন রাগ হলো না।কেন বলতো? বরং তোর জন্য মায়া লাগছে। কেন জানিস? যে চোখ থাকতে অন্ধ থাকতে পছন্দ করে তার জন্য কিন্তু করুণাও আসে না।তবে আমার তোর জন্য করুণা আসছে। বড় আপা তোর স্বভাব আকাশে চক্ষু নিয়ে চলা…তাই জমিনে কি হচ্ছে তা তুই জানতে চাস না।যেদিন মুখ থুবড়ে পড়বি সেদিন যদি তোর অন্ধত্ব ঘুচে!

বড় আপা পুনমের কথার বিপরীতে কিছু না বলে রাগ নিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়।যাওয়ার সময় টি টেবিলে রাখা পানির জগটা সশব্দে ফ্লোরে আছাড় মারে।
পুনম শান্ত পায়ে হেঁটে মেজ আপার কাছে বসে। তার ফোলা পেটের উপর হাত বুলিয়ে দেয়।মেজ আপার কোলে মাথা রাখতে রাখতে বলে,
—-মেজ দুলাভাই প্লিজ আপনি বড় আপার সাথে একটু যান।বড় আপার রাগ উঠলে মাথার ঠিক থাকে না।পথে যদি বিপদ হয়।একা তো!আপনি কুমিল্লা পৌঁছে দিয়ে তারপর আইসেন।আমি আছি মেজ আপার কাছে।

জামাল হতভম্ব মুখ নিয়েই ব্যস্ত পায়ে বেড়িয়ে পড়ে।বাসার প্রতিটি মানুষ আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে থাকে পুনমের দিকে।যে মানুষটা একটু আগে পুনমকে মারলো…এত কথা বললো…তার জন্য পুনম চিন্তা করছে! পাবনী তাকিয়ে দেখে বাবা অশ্রুসজল চোখে পুনমের দিকে তাকিয়ে আছে।

বোকা মেজ আপাও পুনমের মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদছে।মেয়েটার ফর্সাগালে পাঁচ আঙুলের দাগ পড়ে গেছে।
পুনম মৃদুস্বরে বলে,
—-মেজ আপা ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কাঁদিস না তো।বাবুর কষ্টু হবে।আচ্ছা মেজ আপা, পুচকুটা আসবে কবে বলতো?

মেজ আপার কান্না বন্ধ হয় না আরো বাড়তে থাকে।মরিচা লাবণ্যও কেঁদে দেয়।
পুনম মেজ আপার কোলেই মাথা রেখে বিড়বিড় করে বলে,
—বড় অঘটনা চাপা দিতে মানুষ ছোট ছোট ঘটনা ঘটায়!
যাতে ছোট অঘটনটা দ্বারা বড় অঘটনটা ঢেঁকে যায়! বড় আপা তুই এত বুদ্ধিমতী হয়েও বড় দুলাভাইর চাল বুঝলিনা? উল্টো আমায় দোষারোপ করলি…..তুই আমায় মৃত বললি…আমার যে বড় কষ্ট হচ্ছে বড় আপা!বড় কষ্ট!

**********
কলিং বেলের শব্দে তানভীরের রান্নার কাজে ব্যঘাত ঘটে। রাত বাজে নটা এখন আবার কে এলো? তানভীর বিরক্তি নিয়ে দরজার কাছে যায়।দরজা খুলে যে মানুষটাকে দেখে তাকে এইখানে এই মুহুর্তে আশা করে নি তানভীর!দরজার ওপারে দাঁড়ানো মানুষটা হাস্যজ্জোল মুখে বলে,
—-মে আই কাম ইন ভাই?
তানভীর জবাব দেয় না কোন।আস্তে করে দরজা ছেড়ে দাঁড়ায়। তারুণ রুমে প্রবেশ করে ভাইকে দেখে টাসকি খায়।একটা থ্রী কোয়াটার প্যান্ট,ঢোলাঢালা টিশার্ট পড়া।হাতে মসলা মাখা।কিছটা হলুদ মরিচ টিশার্টে লেগে আছে।নাকমুখ লাল। তারুণ ভীতি দৃষ্টিতে বলে,
—তোমার এ অবস্থা কেন ভাই?
–রান্নার এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম……. বলে তানভীর হেসে দেয়।বড় নির্মল হাসি।মা বলে তারুণের হাসি নাকি বেশি সুন্দর কিন্তু তারুণের মনে হয় মা ভুল বলে।তার ভাইয়ের মত এত সুন্দর করে কেউ হাসতে পারে না।কেউ না!

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here