পবিত্র_বন্ধন #পর্ব – ৪

#পবিত্র_বন্ধন
#পর্ব – ৪
#(কাজী সারা)

চোখ মেলে সামনে তাকাতে দেখি খ্যাত টা দাঁড়িয়ে আছে। ভয় পেয়ে গেলাম আমার আর মুগ্ধের সব কথা শুনে যায় নিতো!! কিছু জিজ্ঞাস করতেও সাহস পাচ্ছি না আর কি বা জিজ্ঞাস করার আছে, উনি তো আমার অতীত সম্পর্কে জানে না। জিজ্ঞাস করলে সত্যি টা বলে দিব আমার কিসের দায়!!

উনি পাশে এসে বলে,

—— আপনার আমাদের ফ্যামিলি তে কোন প্রব্লেম হচ্ছে নাতো??
মুখটা কেমন শুকনা লাগছে।।

উনার কথা শুনে বুঝলাম কিছু শুনেনি, কিছুটা ভয় কাটিয়ে বললাম,

—— এখানে সবাই অনেক আন্তরিক, সবাই আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমার কোন প্রব্লেম হচ্ছে না।

খ্যাত টা বলে,

——-আর আমি ??

——-জানিনা এত কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, আমার অনেক কাজ আছে।

এটা বলে কোনমতে এড়িয়ে বের হয়ে গেলাম। আমি মুগ্ধ ছাড়া আর কারো মুখে ভালোবাসার কথা শুনতে চাই না। আমি প্রথমে ভেবেছি মুগ্ধ আমাকে ঠকিয়েছে এখন আমি ভুল বুঝতে পেরেছি।

আমি ঠিক আমার ভালোবাসা দিয়ে ওকে বুঝিয়ে বলব। এত দিনের সম্পর্ক আমাদের এত সহজে ভেঙ্গে যেতে পারে না। বিয়ের সময় থেকে এখন পর্যন্ত হাসি কি আমি ভুলে গিয়েছিলাম। মুগ্ধের সাথে কথা আজ মনের আনন্দে প্রান খুলে হাসতে ইচ্ছা করছে…

আমার শাশুড়ীর ইচ্ছা বউ রা সবসময় সেজেগুজে থাকুক।
তাই উনার মন রাখার জন্য আজ হালকা বেগুনি শাড়ি পরেছি সাথে হালকা গহনা চোখে একটু কাজল দিয়েছি।

আমি শ্যামলা বলে সবাই বলত কাজল লাগালে নাকি খুব মায়াবী লাগে। মুগ্ধ সব সময় চোখের প্রশংসা করত।। ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে রুম থেকে বের হলাম মায়ের ঘরে যাওয়ার জন্য ঠিক তখন খ্যাত টার সাথে ধাক্কা খেলাম।।

রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে আসার আর টাইম পেল না, ইচ্ছে করছে বকের ঠোঁটের মত লম্বা নাকের উপর ঘুষি মেরে দি অসহ্য।।

রাগ ভিতরে চেপে রেখে বললাম,

—— চোখ কি হাতে নিয়ে হাঁটেন মানুষ দেখতে পান না।নাকি আমি অদৃশ্য মানব চোখে দেখা যায় না।।

তারে এত কথা বলার পরে ও জবাব না দিয়ে হাবলার মত তাকিয়ে আছে, দুনিয়াতে আল্লাহ কত আজব মানুষ বানাইছে।। এবার হাতে চিমটি কেটে বললাম এতক্ষন চোখে দেখতে পাননি এখন কি কানে ও শুনতে পারছেন না।

এবার উনি থতমত খেয়ে বলেন,

——-আপনাকে শাড়িতে খুব মায়াবী লাগছে ।।

উনার কথাতে লজ্জা পেয়ে পাশ কাটিয়ে মায়ের ঘরে চলে গেলাম।।

মা দেখে বলে,,

—— এইতো আমর মেঘলা মা কে সাজলে কত সুন্দর লাগে, সব সময় এভাবে সেজে গুজে থাকবে। নতুন বউ সেজেগুজে না থাকলে কি ভালো লাগে!!

তোকে মন মরা দেখতে আমার ভালো লাগেনা, রাশেদ কিছু বললে আমাকে বিচার দিবি কানটা টেনে মলে দিব।।আমার বউমাকে কিছু বললে ওকে ছেড়ে দিব না।

মনে মনে ভাবছি কত ভালো উনি, সব শাশুড়ীরা বউদের দোষ নিয়ে পড়ে থাকে আর উনি উল্টো।

—— না মা, আমাকে উনি কিছু বলেনি।।

—— সব ঠিক আছেতো তোদের মাঝে!! আমার সব আশা তোকে আর রাশেদ কে নিয়ে ও আমার প্রান ভ্রোমরা। তোরা সুখে আছিস এটা দেখে মরতে চাই।

ছেলেটা আমার অনেক চাপা।। কষ্ট পেলেও কাওকে কিছু বলতে চায় না, এটা বলে মা চোখের পানি ছেড়ে দিলেন।। এ কথা গুলো শুনে নিজেকে খুব অপরাধী লাগছে আমি না বুঝে পুরা পরিবার টা কে ঠকালাম, সব জানার পর সবাই আমাকে ক্ষমা করবেতো!

এসব ভেবে বুক টা ধরপর করছে অল্প দিনে এরা আমাকে অনেক আপন করে নিয়েছে কখনো পরিবারের অভাব বুঝতে দেয়নি, কেমন জানি দিন দিন মায়াজালে আটকা পড়ছি।।

রাতে ঘুমাতে এসে দেখি একটা গিফট বক্স খাটের উপর রাখা কৌতুহল নিয়ে খুলে দেখি একটা নীল শাড়ি সাথে একটা চিরকুট!! খ্যাত টা চিঠি ও লিখিতে জানে বাহ!! লিখা আছে, আপনাকে শাড়িতে এত সুন্দর লাগে যে শাড়ি টা গিফট না দিয়ে পারলাম না।

কখনো কিনি নাই জানিনা কেমন হয়েছে শুধু এটাই জানি শাড়িটা পরলে আপনাকে খুব সুন্দর লাগবে।। উনি অনেক আশা নিয়ে শাড়ি টা দিয়েছেন কিন্তু আমি তো জানি এ শাড়ি টা আমার পরা হবে না।

আমি কিছুদন পরে খেত টাকে ডিভোর্স দিয়ে মুগ্ধের কাছে চলে যাব।। তখন মনে পড়ল মুগ্ধ কে কল দিয়ে ভুল টা ভাঙ্গাতে হবে।। কল দিচ্ছি রিসিভ করছে না কয়েক টা কল দেয়ার পর রিসিভ করল।

– মুগ্ধ শুনতে পাচ্ছ??

– আমি মুগ্ধ না ওর বন্ধু শিহাব বলছি।।

– ও আচ্ছা মুগ্ধ কোথায়??

– ও পাশের রুমে একটা ইম্পরট্যান্ট কাজে আছে!!

– প্লিস মুগ্ধ কে ডেকে দিন ওকে আমার খুব দরকার, ওর সাথে কথা বলতে না পারলে আমার অনেক প্রব্লেম হবে।।

– আচ্ছা আপনি হোল্ড করুন আমি ডেকে দিচ্ছি।।

– কি ব্যাপার মেঘলা এত কল কিসের!!

– প্লিজ মুগ্ধ আমার কথা টা একটু শুনো আমি সত্যি নিরুপায় হয়ে বিয়ে করেছি।।
আমার আর রাশেদ এর মাঝে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক নেই।

– কি বলছ এসব সত্যি!!

– হুম আমি শুধু তোমাকে ভালোবসি আর তোমার আছি মুগ্ধ!!

– আমিও তোমাকে ভালোবাসি মেঘলা।।

আমাদের মাঝে সব ভুল বুঝাবুঝি শেষ আমার খুব খুশি লাগছে। সবাই আমাকে খুশি দেখে কিছু টা অবাক হচ্ছে! কারণ বিয়ের পর থেকে আমার সব কিছুতে বিরক্ত লাগতো।।

খেত টাও কেন জানি আজকাল এড়িয়ে চলে বুঝিনা, আগে তো আমার পিছনে লেগে থাকতো। উনার এমন আচরণে আমার কষ্ট লাগছে, আজিব আমার তো কষ্ট পাওয়ার কথা না।

আসলে আমরা অদ্ভুত, কেউ পিছনে ঘুরলে তারে বিরক্ত লাগে আবার হঠাৎ করে সে মানুষ এড়িয়ে চললে খারাপ লাগে।।

মাঝরাতে বাজে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেল সোফার দিকে তাকিয়ে দেখলাম খ্যাত টা ঘুমাচ্ছে। চাঁদের আবছায়া আলোতে অনেক নিশ্বাপ লাগছে।

আসলে যারা নিয়মিত নামায পড়ে তাদের চেহেরাতে একটা নূরানি ভাব থাকে।। নিজেকে খুব অপরাধী লাগছে আমার জন্য উনার জীবন টা নষ্ট হয়ে গেল।।

বুঝতে পারছিনা আমি উনাকে ডিভোর্সের কথা কিভাবে বলব!! যত আমি উনাকে অপছন্দ করি উনার তো কোন দোষ নেই। এত ভালো মানুষের বউ হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার!!

আমার চেয়ে অনেক ভালো কেউ উনার জীবনে আসার কথা কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! সব শুনলে আর কেউ না বুঝুক খ্যাত টা আমাকে ঠিক বুঝবে এটা বিশ্বাস আমার…..

যতদিন যাচ্ছে এ পরিবারের প্রতি মায়া টা বেড়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে এ মানুষ গুলা আমার বড্ড আপন, এদের ছেড়ে যেতে সত্যি আমার কষ্ট হবে।।

ওরা কেউ আমাকে কষ্ট দিয়ে একটা কথা বলেনি সব সময় আমাকে খুশি রাখতে ব্যাস্ত ছিল, মা তো এক কথায় অসাধারণ!!

এমন একটা শুশুর বাড়ি সব মেয়ের স্বপ্ন থাকে। আগে পাঁচ ওয়াক্ত নামায সময় মত পড়তে পারতাম না কিন্তু এখানে আমার নামায মিস যায় না বললে চলে।

এ ১ মাসে আমার জীবনের রং অনেক খানি বদলে গেছে। খেত টা সত্যি খুব ভালো মনের মানুষ। আসলে মানুষের ভিতরে না ডুকলে বুঝা যায় না কার ভিতর কত সুন্দর একটা মন আছে।।

হঠাৎ করে খ্যাত টা এসে রুমের দরজা বন্ধ করে দিছে, কি ব্যাপার দরজা বন্ধ করলেন কেন?? আমি দরজা খুলতে যে যাচ্ছি উনি আমার হাত টা ধরে টান দিয়ে বুকের মাঝে টেনে নিলেন…..

…..চলবে……

#(কাজী সারা)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here