নীলচে_তারার_আলো,পর্ব_২১

নীলচে_তারার_আলো,পর্ব_২১
নবনী_নীলা

শুভ্রের মনে দুষ্ট একটা ইচ্ছে জাগতেই শুভ্র হিয়ার কোমড়ে থেকে হাতটা হালকা সরিয়ে আনলো হিয়া ব্যালেন্স হারিয়ে আরো সামনে ঝুঁকে আসতেই শুভ্রের সাথে হিয়ার ঠোঁট মিলে গেলো। হিয়ার কাছে পুরো বিষয়টা অপ্রত্যাশিত হলেও শুভ্রের কাছে এটাই প্রত্যাশিত ছিল। কয়েক মুহূর্তের জন্যে হিয়া থমকে গেলো, শুভ্রের চোখে চোখে পড়তেই পরক্ষণে সে শুভ্রের কাধ থেকে দুহাত সরিয়ে নিজেও সরে এলো।হিয়া লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। এটা কি হলো একটু আগে। যতবার চিন্তা করছে ততোবার যেনো নতুন করে সবটা অনুভব করছে সে।

এইসবের মাঝে শুভ্র নির্বিকার দৃষ্টিতে হিয়ার লজ্জায় রক্তিম চেহারাটা উপভোগ করছে। হিয়া অনেক কষ্টে নিজেকে বুঝিয়ে শান্ত করলো যে এইটা একটা অ্যাকসিডেন্ট, শুধু অ্যাকসিডেন্ট। তার মধ্যেই শুভ্র হটাৎ হিয়ার কোমড় জড়িয়ে টেবিল থেকে নীচে নামিয়ে দিতেই আবারো কেপে উঠলো হিয়া। নিচে নামতেই কোমড় থেকে শুভ্রের হাত সরিয়ে অনেকটা দূরে সরে দাঁড়ালো সে। কি করবে,কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না হিয়া। মাথাই কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে তার। শুভ্র নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বললো,” লাফালাফি একটু কম করতে পারো না।”

হিয়া লজ্জায় আরো লাল হয়ে গেল। এখন তার সত্যি মনে হচ্ছে এইটা তার ভুল। কি করে এমন একটা ভুল করলো সে? শুভ্রকে নিজের মুখ আর কোনোদিন দেখাবে না সে। ইস কি লজ্জা !

🦋
শুভ্র পকেটে দুই হাত ভরে হাঁটছে। হিয়া তার কিছুটা সামনে জড়সড় হয়ে হাঁটছে। হাত দুটো সামনে এনে মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে। নিজেকে অদৃশ্য চাদরে মুড়িয়ে যদি লুকিয়ে ফেলা যেত, খুব ভালো হতো।

সবাই রীতিমত ব্যাস্ত হয়ে ওদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। রায়হান তখন থেকে ছুটছে। হিয়াকে দেখে হাপাতে হাপাতে এগিয়ে এলো রায়হান তারপর সামনে এসে থামলো। দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে হাপাতে হাপাতে বলল,” কোথায় গিয়েছিলে তুমি?”

হিয়া চোখ পিট পিট করে তাকালো। হিয়া কিছু বুঝে উঠার আগেই পিছন থেকে শুভ্র বললো,” আমার সাথে ছিলো।”

হিয়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে শুভ্রের দিকে তাকালো। লোকটা কি আজ তাকে বদনাম করে ছাড়বে?

রায়হান ভ্রু কুঁচকে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। শুভ্রের কথাটা কেমন যেনো লাগলো তার কাছে। শুভ্র এগিয়ে এসে হিয়ার পাশে দাড়ালো। রায়হান হিয়ার দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করলো,” কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?”

হিয়ার প্রচন্ড অসস্তি হলো কি শুরু করেছে এরা! শুভ্রের কাছাকাছি থাকতেও তার লজ্জা লাগছে। হিয়া কোনো কথা না বলে হনহনিয়ে সামনে হেঁটে দিবার কাছে চলে এলো।

শুভ্র আর রায়হান একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। রায়হান তৃতীয়বারের মত প্রস্ন করলো,” কোথায় ছিলি তোরা?”

” দ্যাটস নান অফ ইউর বিজনেস।”, ভ্রু কুঁচকে বললো শুভ্র। চোখে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।

রায়হান শুভ্রের এমন ব্যাবহারে রীতিমত অবাক হয়ে বললো,” হোয়াট ননসেন্স? অ্যাম গোয়িং টু ম্যারি হার। আর তুই আমাকে বলিস এইটা আমার বিষয় না। তুই এইভাবে কথা বলছিস কেন?”

শুভ্র তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হাসলো তারপর বললো,” এভাবে কেনো বলছি সেটা খুব তাড়াতাড়ি তুই বুঝতে পারবি।” বলেই শুভ্র রায়হানকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।

শুভ্রের এমন ব্যাবহারের কারণ রায়হান ঠিক ধরতে পারছে না। খুব অদ্ভুত লাগছে সত্যি কিন্তু রাগও হচ্ছে প্রচুর। রায়হানের মনে ক্ষীণ এক সন্দেহ জাগলো।

তার মা যখন হিয়াকে বিয়ের কথা বলেছিল রায়হান সময় চেয়েছে কিছুদিন। কারণ হিয়াকে সে নিজের মনের কথা বলতে চায় কিন্তু তার আগে হিয়ার মনের কথাও তার জানা দরকার।

রায়হান বাড়ি ফিরে সোজা নিজের মায়ের ঘরে গিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ের আয়োজন করতে বললো।

এতো রাতে ছেলের মুখে বিয়ের কথা শুনে তিনি কিছুটা চমকালেন। এতকাল বিয়ে করতে চায় নি হটাৎ এতোই বিয়ে করতে ইচ্ছে হলো যে এত রাতে এসে বলছে তাড়াতাড়ি বিয়ের আয়োজন করতে।

সকালে উঠে রবীউল সাহেব এমন একটা পরিস্থিতির স্বীকার হবেন ভাবতে পারেন নি। হটাৎ করেই তার বোন উঠে পড়ে লেগেছে বিয়ের আয়োজন করতে। হিয়ার মামাকে ফোন করাতে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছেন। হিয়ার মামা এমন একটা খবর শুনলে কি মনে করবে সেটা ভেবেই রবীউল সাহেব কিছু বলছেন না। নিজের বোনকে ম্যানেজ করছেন নানা রকমে।

হিয়া আর শুভ্রের বিয়ের কথাটা জানানো বাকি। বোনকে শান্ত করতে কথাটা বলেই দিলো রবীউল সাহেব।

হিয়া আর শুভ্রের বিয়ে হয়েছে কথাটা শুনে ঘণ্টা খানেক চুপ থেকে আবার রেগে উঠে বললেন,” বিয়ে কিসের বিয়ে? আলাদা আলাদা থাকে এইটা কোনো বিয়ে হলো নাকি? কবে না কবে ডিভোর্স হবে ততদিন অপেক্ষা করবে আমার ছেলে? শোন তুই জলদি লয়ার সাথে কথা বল। দুদিনেই ডিভোর্সের ব্যাবস্থা হবে, যত টাকা লাগে আমি দিবো।”

সবক্ষেত্রেই তার বোনের এমন বাড়াবাড়ি। তবে মনটা খারাপ না তার বোনের, হিয়াকে যত্নেই রাখবে যদি হিয়া তার বউ হয়। এ বাড়ির মানুষগুলোর মতন ওকে হেলাফেলা করবে না। নিজের বলা কথায় নিজেই এতো বাজে ভাবে ফেঁসে যাবেন রবীউল সাহেব চিন্তাও করতে পারেন নি। কি বলে হিয়ার মামাকে বুঝ দিবেন। সেই লোকটাকে মুখ দেখাবেন বা কি করে?

সাহারা খাতুন ভেবেই রেখেছেন। এই নাটক তিনি বেশিদিন চলতে দিবেন না। তার ছেলের সংসার তিনি ভাঙতে দিবেন না। রাবেয়া আক্তার বেশি বাড়াবাড়ি করলে কাজী ডেকে দরকার প্রয়োজনে হিয়া আর শুভ্রের আবার বিয়ে দিয়ে দিবেন। তখন এই বিয়ে সবাইকে মানতে হবে। লোকে শুনলে কি বলবে এইটা কি সিনেমা? সিনেমাতেও এতো নাটক হয় না। আর এরা ভাই বোন যা শুরু করেছে।

যাকে নিয়ে এতো কিছু সে গালে হাত দিয়ে কলেজে ধর্ম স্যারের কথা শুনছে। ক্লাস শেষের বেল পড়তেই হাসান স্যার চলে গেলো। দিবা হিয়ার এমন হাল দেখে বললো,” কি রে কি হয়েছে তোর?”

হিয়ার ভীষন লজ্জা লাগছে। কালকের ঘটনা তো হলোই সকালে শুভ্রকে স্বপ্নে দেখছে সে। সেই স্বপ্ন কাউকে বলার মতন না। লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে হিয়ার।

কালকে হটাৎ কোথায় হারিয়ে গেছে জানতে চাইলে হিয়া অনেক কিছু বলে সবাইকে বুঝ দিয়েছে। কিন্তু সত্যিটা দিবা থেকে আর লুকিয়ে রাখতে পারলো না সে। নিচু স্বরে আস্তে আস্তে দিবার কানে কানে বলতেই দিবা রসগোল্লার মতন চোখ করে বললো,” কি? তুই আর শুভ্র ভাইয়া…..! এই তুই আমাকে আগে বলবি না আমি একটা ছবি তুলে আমার বোনটাকে দেখতাম।”

হিয়া আড় চোখে তাকিয়ে বললো,” আগে বলবো মানে? আমি কি ইচ্ছে করে করেছি নাকি?”

দিবা কান্নার ভান করে বললো,” আমার বিয়ে হবে কবে? একটা জামাই পেলে আমিও রোমান্স করতে পারতাম। ওই চশমিশ বিলাইটা তো আমাকে দেখলেই উল্টো দিকে হাটা দেয়। ভাল্লাগে না।”

” তুই এখনো ওই বিলাইয়ের পিছনে আছিস?”,হিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।

” হ্যা, ওই চশমিশ বিলাই ইভানকে তো আমি ছাড়ছি
না।”,মুখ বাঁকিয়ে বললো দিবা।

হিয়ার এবার সত্যি মনে হচ্ছে দিবার জন্যে একটা বর খুঁজতে হবে। বরের শোকে মেয়েটা দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। বলেই হিয়া মনে মনে হাসলো।

ছুটির পর হিয়া নাচতে নাচতে বের হলো।আজ বাড়ি গিয়ে ম্যারিকে সাথে নিয়ে গোসল করবে। ম্যারি এতো কিউট। হিয়ার ইচ্ছে করে কলেজে তাকে সঙ্গে করে আনে। কিন্তু দারোয়ান তো ঢুকতেই দিবে না আর প্রিন্সিপাল তো আছেই। হিয়া বের হয়ে গাড়ির সামনে এসে দেখে শুভ্র দাড়িয়ে আছে।

হিয়া ঘন ঘন দুবার পলক ফেললো। কি যে হয়েছে তার? স্বপ্নেও শুভ্রকে দেখে ঠিক আছে তাই বলে যেখানে সেখানে দেখবে? ঠিক আছে যেহেতু এইটা তার হেলসিনেশন তাহলে লোকটাকে গিয়ে কিছু কথা শুনিয়ে দেই। বাস্তবে তো বলতে পারি না সপ্নে তো আরো পারি না। হেলসিনেশনে পারতেই হবে। হিয়া হনহনিয়ে এগিয়ে এলো। ভ্রু কুঁচকে শুভ্রের সামনে কোমরে দুই হাত দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।

শুভ্র হটাৎ হিয়ার এমন আচরণ দেখে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকালো। হিয়া ভ্রু তুলে আবার নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো,” কি?…. কি সমস্যা আপনার? যেখানে যাই সেইখানে আপনি। বাড়িতে আপনি, ঘুমাতে গেলে স্বপ্নেও আপনি, কলেজে এসেছি এইখানেও আপনি। আর কত জ্বালাবেন আপনি আমাকে?”

শুভ্র হিয়ার এমন আচরণে শুভ্র এদিক সেদিক তাকালো। লোকজন তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।

” মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে তোমার? রাস্তায় কি শুরু করেছো?”,একটা ভ্রু তুলে বললো শুভ্র।

হিয়ার রীতিমত হা করে তাকিয়ে আছে। এর আগেও হেলোসিনেশনের সাথে সে ঝগড়া করেছে কিন্তু কখনো জবাব পায় নি। কিন্তু একি আজ দেখি কথাও বলছে। হিয়া শুভ্রের সামনে ঘন ঘন হাত নাড়লো। শুভ্র রাগী চোখে হিয়ার দিকে তাকালো। তারপর চারপাশে তাকালো। কলেজের ছেলে মেয়েরা রীতিমত হাসাহাসি করছে। শুভ্র হিয়ার হাতটা ধরে নামিয়ে রাখতেই হিয়া চোখ ছানাবড়া করে ফেললো।

তার মানে কি? তার সামনে শুভ্র দাড়িয়ে আছে। হিয়া দুবার চোখের পাতা ফেলে একটা ঢোক গিলে বললো,” তারমানে আপনি সত্যি…। হে হে আমি তো বুঝিই নাই।”

শুভ্র নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হিয়ার হাত ধরে টেনে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে বললো,” হুম, আমি সত্যি। তোমার কোনো হেলোসিনেশন না কিংবা তোমার রাতের বেলার স্বপ্ন না।” শেষের কথাটা শুনেই হিয়ার গা শিউরে উঠলো। হিয়া বিষয়টাকে কিভাবে ঢাকা দিবে সেটা মনে মনে সাজাতে লাগলো। এর মাঝে সিটবেল্ট লাগাতে গিয়ে শুভ্র আরেকটু কাছে এসে হিয়ার চোখের দিকে তাকাতেই মাথায় সাজানো সব কথা ভুলে গেলো সাথে হার্ট বিট অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেলো তার। শুভ্রের শীতল চাহনিতে ছটফট হিয়া একদম শান্ত হয়ে গেল।

শুভ্র সেই দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে নীচের ঠোঁট কামড়ে বললো,” রাতের বেলায় আমাকে নিয়ে কি স্বপ্ন দেখো তুমি?”

হিয়া শুভ্রের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে তাকালো। কিছু যে বলবে গলা দিয়ে আওয়াজ পর্যন্ত বের হচ্ছে না তার। শুভ্র দৃষ্টি সরিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি রেখে বেড়িয়ে এসে ড্রাইভিং সিটে বসলো।

[ #চলবে ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here