নতুন শহরে,1

নতুন শহরে,1
কুরআতুল_আয়েন

টিকিট মিলিয়ে নিজের সিটে বসে পড়লো ইসু।একটু পরেই ট্রেনের হুইশেল ভেজে উঠতেই ইসুর চোখ দুটো ঝাপসা হতে শুরু করে দিলো।ট্রেন যতো এগোচ্ছে ততই ইসুর চোখ পানিতে টুইটুম্বুর।যেকোনো সময় টুপ করে গড়িয়ে পড়ে যাবে।অদূরে,দাঁড়িয়ে থাকা মোফাজ্জল আলমেরও চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে আসছে।ইসু মনে হয় দূর থেকে স্পষ্ট দেখতে পারছে তার বাবার চোখের পানি।ট্রেন যখন তার বাবাকে ক্রস করে অনেকটা দূরে চলে গিয়েছে তখনই ইসুর ছটফটানি মনে হয় দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে।বারবার,ট্রেনের জানালা দিয়ে পিছনে তাকাচ্ছে শুধুমাত্র একটি বার তার বাবাকে চোখের দেখা দেখার জন্য।মা মারা যাওয়ার পর বাবাই তো তার সব।কিন্তু,বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে ইসুকে তার চেনা গ্রাম পাড়ি দিয়ে নতুন শহরের দিকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে।ট্রেনের সিটেই মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে ইসু।চোখের সামনে বারংবার তার বাবার চেহারা টা ভেসে উঠছে।

মোফাজ্জল আলম মেয়েকে বিদায় দিয়ে হাতে বৈঠা নিয়ে নদীর দিকে এগিয়ে গেলেন।দ্রুত গতিতে পা বাড়ালেন।খালি পা’য়ে রেললাইনের মোজাইক করা ফ্লোরটা ফেলে দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলেন।চোখে উনার পানি কিন্তু,মুখে মিষ্টি হাসি।হাঁটছেন আর বিরবির করে বলছেন,

‘আমার বিশ্বাস,আমার মা’য়ে আমার স্বপ্ন পূরণ কইরাই আইবো।আহারে!আমার মা’য়ে কাঁইন্দা গেছে।মা’য়ের কাঁন্দন দেইক্কা আমারও পরাণডা জ্বইলা যাইতাছে।’

মিনিট পাঁচেক পর মোফাজ্জল আলম স্টেশন থেকে বেরিয়ে নদীর দিকে এগিয়ে গেলেন।নদীতে হয়তোবা মানুষ জড়ো হয়ে গিয়েছে।নদীর যাত্রীরা মনে হয় ভাবছেন,নৌকা আছে তবে মাঝি কই?’
কিন্তু,তাঁরা তো আর জানেন না মাঝির আজকের দিনটা যে বড্ড আনন্দের দিন।একটু পরেই বাতাসের গতিতে মনে হয় সারাগ্রাম ছড়িয়ে যাবে,মোফাজ্জল মাঝির মেয়ে ইসু শহরে পড়তে গিয়েছে।গ্রামবাসীর কাছে মোফাজ্জল আলম আর ইসু যেনো বলতে গেলে প্রাণ।মা মরা ইসুর কোনো কিছু অভাব হয় নি।এমনকি বই,খাতা,জামা-কাপড়েরও মনে হয় টানাপোড়া হয় নি।ইসুর খালা আছিয়া বেগমের চোখের মণি যে ইসু।ভালোবেসে ডাকেন ইসুমালা।

ইসুর পাশে বসা মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা টার গা’য়ে বেশ নামীদামী একটি থ্রিপিস জড়ানো।তিন খিলি পান একসাথে মুখে দিয়ে নিজের স্বাদমতো চিবিয়ে বেশ খানিকটা পানের ফিক জমা করে নিলেন।ইসু শুধু চেয়ে চেয়ে উনার মতিগতি পর্যবেক্ষণ করছে।বলতে গেলে তার পর্যবেক্ষণ করতে বেশ ভালোই লাগছে।মন খারাপের রেশ টা ক্রমশই কমে আসছে।মহিলা টি সিট থেকে উঠে দাঁড়ালেন।কোমড়ের দিকটায় অতিরিক্ত মাংস হওয়ায় জামাটা যেনো কোমড়ের ভাঁজে গিয়ে ঢুকে পড়েছে।যার ফলে,জামাটা অনেকটাই উঁচুতে উঠে গিয়েছে।মহিলাটি জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থু মেরে পানের ফিকটা ফেলেছেন।কিন্তু,পানের ফিকটা ফালানোর সাথে সাথেই সুন্দর করে বাতাসের ঝাপটার সাথে বাড়ি খেয়ে ইসুর হাতে,থুঁতনীতে গিয়ে পড়লো।ইসু বিষাদে চোখ,মুখ কুঁচকে ফেলেছে।মহিলা টি নিজের কাজে নিজেই বেকুব হয়ে গিয়েছেন।ইসু অসহায় চোখে তাকালেন মহিলাটির দিকে।মহিলাটি কিছু না বলে ভ্যাবলার মতো কিছুক্ষণ হেসে নিজের জায়গায় বসে পড়লেন।ইসু একবার ট্রেনের আশেপাশে তাকিয়ে দেখে নিলো,কেউ দেখেছে কিনা তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি।মানুষের মতিগতি বুঝতে না পেরে ইসু সিট থেকে উঠে দাঁড়ালো।ব্যাগ থেকে পানির ২ লিটারের বোতলটা বের করে ট্রেনের দরজার সামনে এগিয়ে গেলো।ট্রেনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সুন্দর করে মুখ আর থুঁতনীটা ধুয়ে আসবে।ট্রেনের জানালায় মুখ বের করেও ধুতে পারতো কিন্তু ইসু তা করবে না।যদি আবার পানের ফিকের মতো পানিও গিয়ে কারোর শরীর পড়ে!তাই ইসু,একেবারে দরজার সামনে চলে এসেছে।

ইস্পাত ট্রেনের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।মা’য়ের ফোন দেখে ইস্পাত সিট থেকে উঠে চলে এসেছে।এতো মানুষের মধ্যে ইস্পাত কথা বলতে একদম নারাজ।যার সাথেই ফোনে কথা বলুক না কেন নিরবে তার কথা না বললে মেজাজ ভালো থাকে না।তাই,যেই ভাবা সেই কাজ ইস্পাত মা’য়ের ফোন পেয়েও সিট থেকে উঠে পড়লো।

ইসু বোতলের ছিপি খুলে নিজের হাত দুটো কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নিলো।কতোক্ষণ নিজের ডান হাত টা দিয়ে ঢলে ঢলে মুখ টাও ধুয়ে নিলো।মুখ ধোয়া শেষ করে কুলকুচি করার জন্য মুখভর্তি পানি নিয়ে কুলকুচি করতে লাগলো।ইসু অনেকক্ষণ সময় নিয়ে ভেবেছে মুখে থাকা পানিটা মুখে রাখবে নাকি গিলে ফেলবে।একটু পরেই ইসুর বিরবির করে বলতে লাগলো,আরে আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম এইটা তো নদীর পানি।খাওয়া যাবে না,ফেলে দিতে হবে।
আর একটু সময় ব্যয় করে ইসু কুলকুচি করে মুখ বাড়িয়ে পানিটা ফেলে দিলো।যেই লাউ সেই কদু!আগের মতো বাতাসের সাথে ঝাপটা খেয়ে পানি ফিরে এসে ট্রেনের দরজার ভিতরে গিয়ে পড়লো।তবে,ইসু সাথে সাথেই সরে গিয়েছে বলে পানিটা তার গা’য়ে লাগে নি।এমনভাবে আরো কিছুক্ষণ কুলকুচি করে পানি ফেলে ট্রেনের দরজা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের সিটের দিকে হাঁটা ধরতেই সামনে তাকিয়ে ইসু ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেলো।বোতলটাকে আঁকড়ে ধরে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ইস্পাত কটমট চোখে ইসুর দিকে তাকিয়ে আছে।ইস্পাত একজায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলতে পারে না।তাই হেঁটে হেঁটে কথা বলছিলো।কিন্তু,নিজের মুখে পানি পড়ায় ইস্পাত কিছুটা ভঁড়কে যায়।কতক্ষণ ঠায় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।পরক্ষণেই সামনে একটি মেয়েকে কুলকুচি করতে দেখে ইস্পাতের বুঝতে আর বাকি রইলো না,যে এই মেয়েটির মুখের পানিই যে তার মুখে এসে পড়েছে।ইস্পাত আচমকাই ফোন কেটে দিয়ে বুকে হাত গুজে ইসুর দিকে এগিয়ে গেলো।

ইসু এখনো আগের মতোই জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ভয়ে বারংবার ঢোক গিলছে।মনে হচ্ছে,গলাটা যেনো শুকিয়ে গিয়েছে।ইসু মনে মনে আওড়াতে লাগলো,এতোক্ষণ সময় নিয়ে কুলকুচি করেও গলাটা কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে।

ইস্পাত রেগেমেগে শেষ।তার উপর আরো রেগে আছে ইসুর সঙের দাঁড়িয়ে থাকা দেখে।দেখে মনে হবে,সে কিছুই করে নি।এইমাত্র পৃথিবীতে এসেছে।এতে যেনো ইস্পাতের রাগ আরো দ্বিগুণ না না দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ,তিনগুন থেকে চারগুণ,একসময় গুটিগুটি পা’য়ে চারগুন থেকে একশোগুনে গিয়ে পরিনত হবে।এখন বাসায় থাকলে হয়তোবা ইস্পাত মাথায় বরফ নিয়ে বসে থাকতো।কিন্তু,লাভের লাভ কিছুই হতো না একটু পরেই বরফ গলে পানি হয়ে ইস্পাতের চওড়া কাঁধ বেয়ে বেয়ে গড়িয়ে ফ্লোরে পড়ে সেখান থেকে আবার গড়িয়ে কই যেতো তা ইস্পাতের অজানা।

ইসুর নাক অনেক সুড়সুড় করছে।বড়সড় একটা হাঁচি আসতে চলেছে।অতিরিক্ত ভয় পেলে এমনেই হয়।কোথা থেকে যেনো হাঁচিরা তার নাকে এসে বাসা বাঁধে।কিন্তু,ইস্পাতের সামনে ইসু কিছুটা দ্বিধা বোধ করছে।শেষে না পেরে ইসু মুখ হাত দিয়ে ঢেকে শব্দ করে’হাইচ্চু’বলে একটা হাঁচি দিয়েই দিলো।ফলে হাতা থাকা পানিটা ধপাস করে নিচে পড়ে গেলো।ইসু তাড়াহুড়ো করে পানির বোতল টা হাতে নিয়ে পুনরায় চোখ মিটমিট করে তাকালো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তার থেকে দুইহাত লম্বা ছেলেটির দিকে।

ইসুর হাঁচি দেখে ইস্পাত কয়েক কদম পিছিয়ে যায়।এমনেই রাগে তার মাথা তালগাছে উঠে আছে।তার উপর আবার ইসুর এমন কাজ দেখে ইস্পাত আরো রেগে গিয়ে তেজে উঠে বললো,

‘এই মেয়ে!ইস্পাত কে চিনো তুমি?’

ইসু কিছুটা চমকে উঠলো।বোতলটা নিজের সাথে চেপে ধরে কিছুক্ষণ ভাবনার জগতে ডুব দিলো।পরমুহূর্তেই চিল্লিয়ে বললো,

‘জ্বি চিনি আমি!ইস্পাত হচ্ছে লোহা ও কার্বনের একটি সংকর ধাতু।আরো জানি,ইস্পাত সাধারণত দু’প্রকার।এক.প্লেইন কার্বন স্টীল,আর দুই.অ্যালয় স্টীল।
আবার প্লেইন কার্বন স্টীলকেও আরো কয়েকভাগে ভাগ করা যায়।সেগুলো হলো–

ইসু থামতে বাধ্য হয় ইস্পাতের জোর গলার চিল্লানোতে।ভয়ে আরো একটু পিছিয়ে গেলো ইসু।ইস্পাতের চোখ লাল হয়ে গেছে।লাল হবেই না কেন,নিজের নাম নিয়ে এইসব শুনলে কার মাথাই বা ঠিক থাকে।সে তো মেয়েটিকে প্রশ্ন করেছিলো তাকে ভয় দেখানোর জন্য,হয় না সিনেমাতে নাম শুনলেই ভয় পেয়ে যায় ঠিক সেইরকম।কিন্তু,এখন সে নিজেই ভ্যাঁবাচেকা খেয়ে গিয়েছে।আর কিছু না বলেই ইস্পাত ইসুর হাতে থাকা বোতল টা টান মেরে নিয়ে নিলো।বোতলের ছিপি খুলে গটগট করে বোতলের অর্ধেক পানি সাবাড় করে দিলো।ইসু এবার বেশ চিন্তায় আছে।কারণ,এইটা তো নদীর পানি।কতো ছেলেমেয়েরা গোসল করার সময় প্রসাব করে দেয়।এমনকি,বাঁশবাগানের আঁড়ালে মল ত্যাগ করে না ধুয়েই নদীতে নেমে যায়।দিব্বি ভালো,পরিষ্কার মানুষের মতো গোসল করে বাড়ি চলে যায়।

ইস্পাত পানি খেয়েই মুখটাকে কুঁচকিয়ে ফেলেছে।বোতল টা চোখের সামনে এনে কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বললো,

‘এই মেয়ে!এইটা কিসের পানি বলো তো।কেমন একটা স্বাদ যেনো।নরমাল পানি মনে হচ্ছে।’

ইসু হাসি মুখে বললো,

‘ঠিক ধরেছেন আপনি।এইটা সাধারণ পানি না।এইটা হচ্ছে নদীর পানি।এইজন্য অন্যরকম স্বাদ।তার উপর গ্রামের ছেলেমেয়েরা কতো প্রসাব,মল ত্যাগ করেছে এই পানিতে।সেইজন্যই মনে হয় অন্যরকম স্বাদ লাগছে।’

ইসুর কথা শুনে ইস্পাত আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।এখন মনে হচ্ছে,মেয়েটাকে একদম থাপড়িয়ে শেষ করে দিতে।কোনো সুস্থ মন মানসিকতার মানুষ কখনো এইসব কাজ করবে না।মেয়েটা নিশ্চয় অসুস্থ।না হলে কি খাবার পানির পরিবর্তে নদীর পানি নিয়ে আসতো।তাই,ইস্পাত আর কথা না বাড়িয়ে হনহন করে রকেটের বেগে চলে গেলো।যাওয়ার আগে ইসুর দিকে কিছুক্ষণ কটকট চোখে তাকিয়ে ইসুর হাতে বোতলটা না দিয়ে বাহিরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।

ইসু মায়াময় দৃষ্টি নিয়ে বোতলটার পড়ে যাওয়া দেখে মুখটাকে কাঁদো কাঁদো করে ফেলেছে।কিছুক্ষণ ইস্পাতের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো।মনে মনে ভাবতে লাগলো,কি এমন হলো উনার।যাতে,বোতল টাই একদম ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি।কি এমন দোষ করেছিলো বোতল টা।একটু দয়া করে তার ভিতরে শুধু নদীর পানিটুকুকে আশ্রয় দিয়েছলো।কিন্তু,উনি মায়াদয়াহীন ভাবে বোতল টা ফেলে দিলেন।আর তাছাড়াও মনে হয়েছে উনি খুব রেগে আছেন।যেভাবে তাকিয়ে গেলেন আমার দিকে।মনে হলো চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিবেন।

ইসু চুপ মেরে নিজের সিটে বসে রইলো।পাশের ভদ্র মহিলাটি এখন নাক ডেকে ঘুমোচ্ছেন।মহিলাটির নাক ডাকার পর গলার কণ্ঠনালি থেকে কেমন একটা খড়খড় আওয়াজ ভেসে আসছে।যাতে করে ইসুর কান অনেকটাই ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে।তাও,চুপ করে ভালো মেয়ের মতোন বসে আছে।আশেপাশে মার্বেলের মতো চোখগুলো দিয়ে বারবার বুলিয়ে দেখছে।আশেপাশে তেমন কিছু দেখতে না পেয়ে ইসু বাহিরেই তাকিয়ে রইলো।দূরের,গাছপালা,বাড়িঘর ফেলে দিয়ে উঁচু উঁচু দালানকোঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ট্রেনটি।ইসু,কয়েকবারেই শহরে এসেছে।তার আছিয়া খালা নিয়ে এসেছিলেন।কয়েকদিনের জন্য নিজের কাছে রেখেছিলেন।আছিয়া খালারও এক মেয়ে আছে।ইসুর সমবয়সী।ইসু তো সেখানে গিয়েই উঠবে।

চোয়াল শক্ত করে বসে আছে ইস্পাত।একটু আগের কাহিনী টা মনে পড়তেই ইস্পাতের যেনো রাগে মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম।তাও বন্ধুমহলের সামনে কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে রেখেছে।আসল কাহিনী শুনলে এতোক্ষণে তার বন্ধুমহলের বন্ধুগুলো তাকে নাকানিচুাবানী খাওয়াতো।তাই তো ইস্পাত চেপে আছে।তাও,তার টি-শার্ট ভিজে যাওয়া নিয়ে সবাই প্রশ্ন করেছিলো তাকে,টি-শার্ট কীভাবে ভিজে গিয়েছে।সে শুধু ইনিয়েবিনিয়ে মহারাজ্য পাড়ি দিয়ে উত্তরে বলেছিলো,পানি খেতে গিয়ে ভিজিয়ে ফেলেছি।সবাই কতোক্ষণ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেও পরে তারা নিজেই এইটা থেকে চেপে যায়।

ইস্পাতের পাশে বসা পাপ্পু হাতে থাকা গিটার টা এগিয়ে দিলো ইস্পাতের দিকে।ইস্পাতের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,

‘এই নে ইস্পাত!এখন তোর সুর তোলার পালা।’

ইস্পাত নির্বিকার ভঙিমা করে বললো,

‘ইচ্ছা করছে না আমার।তোরা বাজা।’

পাপ্পু আড়চোখে হয়ে তাকালো ইস্পাতের দিকে।ইস্পাতকে নির্বিকার ভাবে বসে থাকতে দেখে পাপ্পু সামনে বসা আরিফের দিকে তাকালো।পাপ্পু আর আরিফ তারা নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি শেষ করে,আরিফ ইস্পাতের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘কি হয়েছে তোর?তোর গিটারে সুর তুলতে ইচ্ছা করছে না?বিশ্বাস হচ্ছে না!তুই তো এমন না।গিটার তো তোর শখের জিনিস।’

ইস্পাত রাগে পাপ্পুর হাত থেকে গিটার টা নিয়ে নিলো, শক্তমক্ত মুখ করে তাকালো দু’জনের দিকে।দু’জনে,ক্যাবলার মতো তাকিয়ে আছে ইস্পাতের দিকে।এমতাবস্থায় ইস্পাত গিটারে সুর তুললো।

ইসু বাহিরে তাকিয়ে ছিলো।আচমকাই কানে গিটারের মিষ্টি একটি সুর ভেসে আসতেই গলাটা উঁচু করে সামনে তাকালো।সামনে তাকিয়ে ইস্পাতের হাতে গিটার দেখে ইসু খানিকটা ভঁড়কে যায়।ইসু টুপ করে মাথা টা নিচু করে ফেললো।দেখে ফেললে তাকেও যদি বোতলের মতো বাহিরে ফেলে দেয়।

ইস্পাত ইসুর উপর সমস্ত রাগ টা গিটারের উপর দেখাচ্ছে।একসময়,ইস্পাতের রাগের প্রকোপে গিটারের একটা তার টুং করে ছিড়ে যায়।পাপ্পু আর আরিফ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে গিটারের তার টার দিকে।কিন্তু এতে ইস্পাতের কোনো ভাবান্তর নেই।একটা গিটার কিনতে তার এতো হিমশিম খেতে হবে না।আসল কথা হলো তার রাগ টা তো কমেছে।গিটার টা পাপ্পুর হাতে দিয়ে চোখ বন্ধ করে মাথা এলিয়ে দিলো ট্রেনের সিটে।
——
বিকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা হতে চললো।কিন্তু,ইসুর ঘুম থেকে উঠার কোনো নামগন্ধ নেই।চারদিকে গোধূলির শেষ আলো ছেঁয়ে পড়ছে।পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যটা নিভু নিভু করছে।মনে হচ্ছে,এই ডুবে যাবে।ইসু ঘুম থেকে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো।দুপুরের দিকে এসেছিলো তার খালা আছিয়া বেগমের বাসায়।মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে যাওয়ায় না খেয়েই ঘুম দিয়েছিলো।এলোমেলো পা’য়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো ইসু।হাত,মুখ ধুয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।বারান্দার সাদা রঙের গ্রিলটা হাত দুটো দিয়ে চেপে ধরে বাহিরে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে।বাহিরের কিছুই দেখতে পারছে না ইসু।১৪ তলায় তার খালা আছিয়া বেগম থাকেন।এপার্টমেন্ট টা ২০ তলা।তাই,মাথা নিচু করে দেখতে গেলেই বারান্দার গ্রিলের সাথে মাথায় বড়সড় একটা বাড়ি খায়।তোহা যখন আগে এসেছিলো তখন তার খালা আছিয়া বেগম এতো বড়ো ডিপার্টমেন্টে থাকতেন না।ছোটখাটো দু’তলা একটা বাসায় থাকতেন।কিন্তু,এখন উনি ইচ্ছা করেই এতো বড় ডিপার্টমেন্টে বাসা নিয়েছেন।তার কারণ হলো একটাই,টাকা থাকা সত্ত্বেও উনি আর কিপটামো করবেন না।তাই,সামনের মাসেই এই বড়ো ডিপার্টমেন্টে উঠেন।

রাতের ঘুমানোর সময় বাজলো আরেক বিপত্তি।ইসু কিছুতেই এই গরমে ঘুমোতে পারছে না।শুধু ছটফট করছে।হাহুতাশ করতে করতে ইসু বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।সোজা ওয়াশরুমে গিয়ে পানির কল ছেড়ে দিয়ে পাগলের মতো মগ দিয়ে নিজের মাথায় পানি ঢালতে লাগলো।তাও কেন জানি শান্তি মিলছে না।ইসু মাথায় পানি ঢালছে আর বিরবির করে বলছে,

‘কবরের মতো লাগছে আমার কাছে এই বাসাটা।আমি বাড়ি যাবো।এইখানে একমুহূর্তেও থাকা চলবে না।’

দু’বালতি পানি ঢেলেও ইসুর ভিতর ঠান্ডা হয় নি।গুটিগুটি পা’য়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো ইসু।ঘুমোনোর চেষ্টা করতে লাগলো।
—-
সকালে তাড়াতাড়িই ঘুম ভেঙে যায় ইসুর।রুম থেকে বেরিয়ে আছিয়া বেগমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।আছিয়া বেগম তখন রান্নায় ব্যস্ত।ইসুকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,

‘কিরে তুই এইভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?রাতে ঘুম হয়েছে তো ঠিক মতো।’

ইসু মিনমিনে গলায় বললো,

‘খালামনি!আমি এইখানে থাকবো না।তোমাদের এই বাসাটা আমার কাছে বন্দী বন্দী মনে হচ্ছে।আব্বাকে ফোন করে বলে দাও তো আমাকে নিয়ে যেতে।’

আছিয়া বেগম হেসে বললেন,

‘আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।তোর যেহেতু ভালোই লাগছে না তাহলে একটা কাজ কর ইসু,ছাঁদ থেকে একটু ঘুরে আয় সাথে ওয়াশরুম থেকে কাপড়ের বালতিটাও একটু নিয়ে যা।রোদে দিয়ে আসবি।’

ইসু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝালো।ওয়াশরুম থেকে বালতিটা নিয়ে মেইন দরজা খুলে চলে গেলো লিফটের সামনে।কিন্তু,বিপত্তি বাজলো লিফট কীভাবে চালু করতে হয় তা সে জানেই না।বালতি হাতে নিয়ে অনেক গবেষণা করলো লিফটের বাটনগুলোর দিকে তাকিয়ে কিন্তু কিছুই বুঝলো না।সিঁড়ি বেয়ে এতো উঁচুতে উঠা ইসুর পক্ষে সম্ভব না।ইসু ক্যাবলার মতো দাঁড়িয়েই আছেই।পাশের ফ্ল্যাটের একজন লোক এসে লিফটের বাটনে চাপ দিলেন।ইসুর দিকে একবার তাকিয়ে আর তাকালেন না।ইসু ভাবছে,লিফটের দরজা টা খুললে সেও ঢুকে যাবে।লোকটি মনে হয় ছাঁদেই যাবেন।যেইভাবা সেই কাজ লিফটের দরজা খুলতেই লোকটির সাথে ইসুও ঢুকে পড়লো।কিছুক্ষণ পর লিফট থামতেই লোকটি আর ইসু একসাথে লিফট থেকে বেরিয়ে পড়লো।কিন্তু,লিফট থেকে বেরিয়ে ইসু একদম বেক্কল হয়ে গিয়েছে।সে তো একদম নিচে চলে এসেছে।এখন!এখন কি করবে সে।ইসুর খুব ইচ্ছা করছে হাত-পা ছড়িয়ে কান্না করতে।আগের মতোই সেইভাবে দাঁড়িয়ে রইলো ইসু।আবারও কয়েকজন মহিলা এসে লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে বাটন প্রেস করলো।মহিলা গুলো ইসুর দিকে বারবার তাকাচ্ছেন।ইসু বালতি হাতে নিয়েই একটু নড়েচড়ে উঠলো।আবারও লিফটের দরজা খুলতেই ইসু মহিলাগুলোর সাথে ঢুকে পড়লো।ঠিক একই ভাবে লিফট চলতে শুরু করলো।মহিলাগুলো ৯ তলায় নেমে গিয়েছে,কিন্তু ইসু কিছুতেই বুঝতে পারছে না সে কত তলায় আছে।অনেক খুঁজে খুঁজে যখন লাল বাতির মতো ইংরেজিতে নাইন লিখা ভেসে উঠেছে তখনি ইসু বুঝে নিয়েছে সে এখন ৯ তলায় আছে।মহিলা গুলো নেমে যেতেই ৯ তলা থেকে একটি মহিলা উঠলেন।ঠিক ইসুর মতোই হাতে লাল কালারের বালতি।ইসু বুঝে নিয়েছে তাঁর মানে উনি ছাঁদে যাবেন।মনে মনে ইসু একটু শান্তি পেলো।ইসু ঘুরেফিরে শুধু লিফটের দেয়ালে ভেসে উঠা নিজের প্রতিচ্ছবিটা দেখছে।লিফট চলে আবারও কিছুটা উপরে থেমে যায়।লিফটের দরজা খুলতেই সামনে তাকিয়ে ইসু পিলে চমকে উঠলো।শুকনো কয়েকটা ঢোক গিললো।ইসু,বিরবির করে বলতে লাগলো,উনি এইখানে কিভাবে?ট্রেনে যা রাগ দেখিয়েছিলো আমার উপর।এখন যদি কিছু করে বসে।

ইস্পাত লিফটের কোণায় ইসুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই নিমিষেই চোখ,মুখ অন্ধকার করে ফেললো।হাতে থাকা সেলফোনটা মুঠো করে নিয়ে লিফটে ঢুকে পড়লো।এককোণায় দাঁড়িয়ে ভাবছে,এই অসুস্থ মেয়েটা এইখানে কি করছে।ইস্পাত ছাঁদে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছিলো।কিন্তু,সকাল সকাল ইসুকে দেখে বেচারা ইস্পাত অনেকটাই চটে আছে।দু’জন দু কোণায় দাঁড়িয়ে আছে।একজন ভয়ে জমে যাচ্ছে তো আরেকজন রাগে ফেটে যাচ্ছে।যেকোনো সময় ভস্ম হয়ে যেতে পারে।মাঝখানে,দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা টি ইস্পাতের দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘কেমন আছো ইস্পাত বাবা!টুম্পা কি ভার্সিটিতে উশৃংখল ভাবে চলাফেরা করে?কি বলো তো,আমি জানি আমার মেয়ে টুম্পা এইসব করবে না।তাও বলছি তুমি তো ওর ক্লাসের ক্লাস টিচার তাই।’

ইস্পাত গলা পরিষ্কার করে বললো,

‘আসলে আন্টি!আমার কাজ হলো স্টুডেন্টদের কে পড়ানো।ওদের পড়ালেখার সমস্যা গুলো সমাধান করে দেওয়া।কে কি ভাবে চললো,এইটা আমার দেখার বিষয় না।আর জানেন এই তো,ভার্সিটি লাইফে প্রত্যেকটি ছেলেমেয়ে নিজেদের স্বাধীনতা মতো চলে।এমনকি আমিও চলেছি।তবে তা সীমিতর মধ্যে।’

মহিলা টি কিছু না বলে থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন বালতি হাতে নিয়ে।উনি তো ভেবেছিলেন ইস্পাত তাঁর মেয়ে টুম্পাকে পছন্দ করে।টুম্পা তো ভার্সিটি থেকে এসে তাই বলে,আজকে নাকি ইস্পাত ওর দিকে এইভাবে তাকিয়ে ছিলো,ওইভাবে তাকিয়ে ছিলো।উনার মেয়ে টুম্পার কথার উপর ভিত্তি করেই তো উনি ইস্পাতকে এই কথাগুলো বলেছেন।

ইসু এতোক্ষণ কান খাড়া করে তাঁদের কথা গুলো মনোযোগ সহকারে শুনেছে।যখন মহিলাটির মুখে ইস্পাত নামটি শুনলো তখনি ইসু তার হাত দুটো মাথায় দিয়ে দিয়েছে।মনে মনে আওড়াতে লাগলো,উনার নাম ইস্পাত তাহলে!এইজন্য কি উনি আমাকে কাল বলেছিলেন ইস্পাত কে চেনো তুমি।
ইসু কিছুক্ষণ মুখ ভোঁতা করে আগের মতো মনে মনে বিরবির করে বলতে লাগলো,আমি জানতাম নাকি উনার নাম ইস্পাত।আর,ইস্পাত কি কারোর নাম হয় নাকি।আচ্ছা!উনার কোনো ভাই থাকলে কি তার নাম লোহা হবে??

লিফট থামতেই মহিলাটি তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে গেলেন।ইসুও তাড়াহুড়ো করে বেরোতে যাবে ঠিক সেইসময়ে ইস্পাতের সাথে খেলো এক ধাক্কা।ইস্পাত নাক ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে,আর ইসু ভয়ার্ত চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে ইস্পাতের দিকে।লিফটের দরজা বন্ধ হতে নিলেই ইস্পাত পা দিয়ে থামিয়ে দিলো।পুনরায় দরজা খোলতেই ইস্পাত চেঁচিয়ে বললো,

‘যাও’

ইসু ভয়ে বালতি হাতে নিয়ে দিলো এক দৌড়।এমনকি দৌড়েই সিঁড়ি বেয়ে উঠেছে।একদম ছাঁদে গিয়ে থামলো।

চলবে..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here