ধূসর পাহাড়,পর্ব_১৭

ধূসর পাহাড়,পর্ব_১৭
লেখিকা আমিশা নূর

কথাটি মাঠিতে পড়তে না পড়তেই ঠাসস করে শব্দ হলো।যার অর্থ রৌদ্রময় সীয়ামাকে চড় মেরেছে।অরণ্য সেটি দেখতে পায়নি কারণ তারা অনেক দূর এগিয়ে গেছে।কিন্তু অধ্রী আর কানন ঠিকই দেখতে পেলো।

“রৌদ্রময় ও কে মারছিস কেনো?”

উত্তর না দিয়ে রৌদ্রময় অগ্নি দৃষ্টিতে অধ্রীর দিকে তাকালো।রৌদ্রময়ের চেহেরা দেখে অধ্রী নিজেই ঢোক গিললো।কোনো কথা না বলে রৌদ্রময় সীয়ামার হাত টেনে নিয়ে গেলো।

“কানন,এইটা রৌদ্রময়ের কোন রুপ?”
“হুহ।”

অধ্রী কাননের দিকে তাকিয়ে দেখলো চিপস খেতে মগ্ন।কাননের দিকে তাকিয়ে অধ্রী নাক চিটকালো।


“আরে আজব,হাত ছাড়ুন আমার।”

পাশের একটি বড় গাছের সাথে সীয়ামাকে চেপে ধরে বললো,
“প্রবলেম কী তোমার?মরতে চাও কেনো?এখানে আসার পর থেকে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছো আর আমি তোমাকে টাচ করলেই মরতে ইচ্ছে করে?জাহাজে আমার কোনো কথার আন্সার কেনো দিলে না?টেল মি ডেম ইট।”

বাম হাতকে মুষ্টি করে গাছে আঘাত করলো।সীয়ামা ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো।
“আ..আমাকে যেতে দিন।”
কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বাক্যটি শেষ করতেই রৌদ্রময় দিকে তাকালো।মুখটা পুরা লাল হয়েছে।চোখের দিকে তাকানোই যাচ্ছে না।এ কেমন রাগ?তবে এই মুহূর্তে সীয়ামা এই জায়গা থেকে পালাতেই পারলেই বাঁচে।গাছ থেকে রৌদ্রময় হাত সরিয়ে ফেললে সীয়ামা দৌড় দিলো।রৌদ্রময় স্পষ্ট দেখছে সীয়ামা দু’হাতে চোখের জল মুচে দৌড়ছে।রৌদ্রময়ের রাগ কিছুটা কমে এলে সে হতাশ হয়।এ ক’দিনে মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে।তাই তো সীয়ামা মরার কথা বলতেই রৌদ্রময়ের সব রাগ একসাথে জড়ো হয়।

“তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে,ফটোগ্রাফার না হয়ে আর্টিস্ট হলেও বেশি ভালো হতো।”
“হাহা,কী হতো তাহলে?”
“একজনের পেন্টিন করতাম সারাদিন।তারপর যখন ইচ্ছে ওর প্রতিচ্ছবিটা দেখতে পেতাম।”
“ওহ।”

কুয়াশার চেহেরায় খুশির জলক দেখা গেলো।কেনো জানে না কুয়াশা’র মনে হচ্ছে সে একজনটা সে নিজে!কিন্তু কিছুসময় পর এর বিপরীতটা মনে হতেই আনন্দের পাখিটা পাখা ঝাপড়িয়ে উড়ে গেলো।

রাতে ওরা সবাই ‘বিচ পয়েন্ট’ নামের রেস্তোরাঁয় খেতে গেলো।রেস্তোরাঁটি’তে সাউন্ড বক্সে নিরব গান বাজাচ্ছে।তাবে এখন “বুকের বা’পাশে” গানটি বাজাচ্ছে।

“দোস্ত আমারে একটু বলবি এই ছ্যাকা খাওয়া গান গুলা শুনে আমাদের লাভ?”

খেতে খেতে অধ্রী প্রশ্নটা অরণ্যের দিকে ছুড়ে দিলো।বিপরীতে অরণ্য উল্টো প্রশ্ন করলো,

“কে বললো তোকে এইটা ছ্যাকা গান?”
“তুই কী বয়রা?শুনছিস না কেমন নিরব গান।আর নিরব গান মানেই তো ছ্যাকা মার্কা।”
“নাহ।মোটেও এমনটা নই।নিরব গান মানে,মনের অনুভূতি!মানুষ যখন নিজে নিজে দুঃখী বা খুশি হয় আর সেই খুশি বা দুঃখ কারো সাথে ভাগাভাগি করতে পারে না তখন নিরব গান তার সাথে থাকে।নিজের অনুভূতিটাকে গানের সাথে মিল করে।বুঝেছিস কান কাটা কুকুর?”
“কীহ?তুই আমাকে কান কাটা কুকুর বললি?
“দেখছিস তুই আবারও শুনতে পাসনি।”
“তাই বলে আমি মোটেও কান কাটা কুকুর নই।”

অধ্রী দাঁড়িয়ে কোমরে হাত রেখে বড় করে বললো,

“আমি হলাম ‘কান কাটা কুত্তী’।ফিমেল ভার্সন।”
“বাহ বাহ!”
“হাহাহাহাহা”
“লিসেন লিসেন আমি ‘কান কাটা কুত্তী’ হলে আমার এই তিন বন্ধু “কান কাটা কুকুর”।যেহেতু আমরা একই গুহায় বাস করি।”

অধ্রীর কথা শুনে পুরা রেস্তোরাঁয় কিছুক্ষণ হাসাহাসি হলো।কুয়াশাও বেশ মজা পেলো ওর কথায়।কিন্তু ওর মাথায় অরণ্যের বলা কথাগুলাই ঘুরছে।আজ অবধি সে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়িয়েছে যে,”নিরব গান এতো ভালোলাগে কেনো তার?”।আর তার উত্তর আজ পেয়ে গেলো।


মাঝরাতে হঠাৎ সীয়ামা উঠে বসলো।খুব বাজে স্বপ্ন দেখেছে।হাতের কাছে মোবাইল পেয়ে টাইম দেখলো, “৩:৩৪.”। সীয়ামার বাজে অভ্যাস আছে একটা।মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আর কিছুতেই ঘুম আসে না।এখন এই অচেনা জায়গায় তো একদম ঘুম আসবে না।পাশে তাকিয়ে দেখলো অধ্রী আর কুয়াশা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।আর কোনো উপায় না পেয়ে সীয়ামা অনলাইনে ঢুকলো।তখনি দেখলো রৌদ্রময়ের আইডি থেকে অনেকগুলো মেসেজ আসলো।আর রৌদ্রময় এখনো এক্টিভ।তখনি সে মেসেজ দিলো,

” আপনি ঘুমিয়ে পড়েছেন?”

মেসেজটা দিয়ে সীয়ামা মিনিট-পাঁচেক অপেক্ষা করলো।আর তখনি ওপাশ থেকে রিপ্লে এলো,

“বাইরে এসো।”

মেসেজটি পেয়ে সীয়ামা নির্দ্বিধায় বের হয়ে এলো।

“আপনি এখনো ঘুমাননি?”
“নতুন জায়গা,তাই ঘুম আস্তে চায়,না।তুমি?”
“খারাপ স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেলো।”
“ওহ।”

কিছুক্ষণ নিরব থাকার পর রৌদ্রময় বলতে লাগলো,
“সীয়ামা আমাদের রিলেশন ব্রেকআপ হয়েছিলো কারণ আমি মনে করেছিলাম বাকি সব মেয়েদের মতো তোমার জন্যও হয়তো আমার কোনো ফিলিংস নেই।যার ফলে প্রথমে তুমি যাতে কষ্ঠ না পাও তাই তোমার প্রপোজাল এক্সেপ্ট করি।আর রিলেশনে যাওয়ার পর তোমায় ইগনোর করি যাতে তুমি নিজ থেকে আমাকে রিজেক্ট করো।আমি যেমন ভাবি তেমনটাই হয় বাট সত্যি জানতাম না তুমি আমাকে এতোটা ভালোবাসো।অরণ্য যখন বলছিলো তোমার সাথে কারো রিলেশন ছিলো আর ব্রেকআপ হওয়ার পর তুমি অনেক ভেঙ্গে পড়ো।খাওয়া-দাওয়া,আড্ডা, পড়াশোনা,কলেজ সব কিছু ছেড়ে দিয়ে শুধু আমার কথা ভাবো।তখন আমি নিজের মধ্যে কেমন যেনো শূন্যতা অনুভব করি।তাই ঠিক করি তোমার পাশে সবসময় থাকবো।কিন্তু সাথে সেদিন সকালে কথা বলার পর আমি যখন তোমার কলেজে যাই তখন আমি দেখি তুমি একদম ঠিক আছো।তোমাকে কতোটা কেয়ার করে তোমার বন্ধু ‘ইয়েন’।তখন আমি আবারো সরে আসি কারণ তোমাকে সামলানোর লোক তো আছেই।কেনো জানিনা সেদিন খুব কষ্ট পায়।তারপর কক্সবাজার এসে রিয়েলাইজ করি যে,” আই লাভ ইউ”।সব “কেনো জানিনা” র উত্তর এই তিনটি ম্যাজিকেল ওয়ার্ডে আছে।সীয়ামা আমি বলবো না আমি তোমাকে ভালোবাসি।আমি তো চাই তোমাকে নিজের রানী করতে।সীয়ামা “উইল ইউ মেরি” মি?”

সীয়ামার চোখ দিয়ে অজরে জল পড়ছে।এতো কষ্ট পাওয়ার পর আজ তার ভালোবাসা স্বার্থক।সীয়ামা রৌদ্রময়ের বুকে উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।রৌদ্রময় আলতো করে সীয়ামার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।আর সীয়ামা কেঁদে কেঁদে রৌদ্রময়ের শার্ট ভিজেয়ে ফেলছে।রৌদ্রময় সীয়ামাকে থামাচ্ছে না কারণ এতো আনন্দের কান্না!এতো দিন মেয়েটা কষ্ট পেয়ে কেঁদেছে শুধু তার জন্য আজ নাহয় আবারও তার কারণেই আনন্দে কাঁদোক।
অধ্রী মুচকি হেসে রুমে চলে গেলো।অবশেষে সীয়ামার ভালোবাসা এই কঠিন বরফকে গলাতে পারলো।কিন্তু অরণ্য-কুয়াশা?ওদের কী হবে?ওদের তো ধর্ম আলাদা!

২০.
বালি,পাথর আর পানি মিশ্রিত সেন্টমার্টিন ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য একদম পারফেক্ট জায়গা। জেলি ফিশ,হরেক রকমের মাছ বাস করছে সেন্টমার্টিনের স্বচ্ছ পানিতে।১৭ বর্গ কিলোমিটারের এই সেন্টমার্টিনে চারদিকে শুধু পানি আর পানি।বন্ধুমহল আজ সেন্টমার্টিনের দোকান থেকে কেনাকাটা করে বিচে যাবে।দোকানে গিয়ে অধ্রী প্রথমে একটি বল কিনলো।উদ্দেশ্য পানিতে ফুটবল খেলা।

“ইয়াহু।রৌদ্রময় দেখিস দোস্ত আজকে কতো ছেলে তোর এই বান্ধবীর খেলা দেখে শিস দিবে আর বলবে,” আই লাভ ইউ অধ্রী।”
“হ্যা বলবে তবে সেটা মেয়েরা।”

বাংলার পাঁচের মতো চেহেরা করে অধ্রী রৌদ্রময়ের দিকে তাকালো।বাকিরা সবাই হেসে উঠলো।অবশেষে তারা বিচে পৌঁছালো।বিচে কিছুক্ষণ হাঁটাহাটি করে সীয়ামা আর কুয়াশা পাশের টং-এ চা খেতে গেলো।আর বাকিরা ফুটবল খেলতে সমুদ্রে নেমে গেলো।

“দি তুমি খেলো না ফুটবল?”
“নাহ।ফুটবল খেলতে পারি না।”
“ওহ।আমি খেলতে পারি শুধু দাদার কাছেই হেরে যাই।”

দুজনে একসাথে হেসে দিলো। চা খেতে খেতে ওরা দুজন ফুটবল খেলা দেখছে।শুধু ওরা চারজন না আরো কয়েকটা ছেলেও খেলছে।অধ্রী-কানন আর অরণ্য-রৌদ্রময় দু”দল।সমুদ্রের পাড়টাকে খেলার মাঠ করেছে।তবে মাঝে মাঝে খুব বড় ঢেউ এসে ওদের ভিজিয়ে দিচ্ছে।তাতে কারো কোনো আপত্তি নেই।মন দিয়ে খেলছে সবাই।হঠাৎ অরণ্য অধ্রীদের গোল দে।যার ফলে অধ্রী মনে মনে জিতার জন্য অন্য একটা প্ল্যান করে।অাবারো অরণ্য গোল দিতে আসলে অধ্রী ফিসফিস করে বলে,

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here