দহন #রিয়া_জান্নাত #পর্ব_০৪

#দহন
#রিয়া_জান্নাত
#পর্ব_০৪

” আপনি আকাশের ওয়াইফ নয়। তাহলে আকাশের সঙ্গে এক বেডে থাকেন। একসঙ্গে ঘোড়েন। ফাজলামি করেন আমার সাথে। ”

” ফাজলামি করতেছি না নীলা। আমার মনে হলো আপনাকে সত্যি টা বলে দেওয়া উচিত। সত্যি টা বলতে আপনার কাছে এসেছি। ”

” কিসের সত্যি! আপনার সাথে কথা বলতে আমি মোটেও প্রস্তুত নই। ”

” আপনাকে শুনতে হবে। ”

” আচ্ছা বলুন! নীলা মনে মনে বললো শয়তান বেডি মানুষ অন্যের ঘরের বাচ্চা নিয়ে আমার আকাশের মাথা খাচ্ছে। এখন আমার সাথে এসেছে পীরিতের কথা বলতে। ”

” কিছু ভাবছেন নীলা। ”

” ভ্রু কুঁচকে নীলা বললো কিছু ভাবছি না। আপনার যা বলার আছে তা বলতে থাকুন। আমি আবার বেশিক্ষণ থার্ড পার্সন মানুষকে আমার রুমে অ্যালাও করি না। ”

কথাটা শুনে বৃষ্টি অনেক কষ্ট পেলো। মুখের থুথুর ঢোক গিলে বৃষ্টি বললো __

” নীলা আপনি সজীবকে চিনেন। আকাশের বন্ধু সজীব। ”

” সজীব ভাইকে না চিনার কি আছে? হঠাৎ ওনার কথা কেনো বলছেন? ”

” কারণ আছে নীলা। আমার গল্পটা বলতে অনেক সময় লাগবে। দয়া করে আপনি মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করবেন। অধৈর্য হবেন না। ”

” আচ্ছা বলুন শুনতেছি। ”

” সজীব আর আমি একে অপরকে ভালোবাসতাম। ”

” হ্যা সজীব ভাইয়ার কাছে শুনেছিলাম তার গালফ্রেন্ড আছে? সে নাকি সজীব ভাইয়াকে পাত্তাই দিতোনা। আমি সেই মেয়েকে দেখার খুব ইচ্ছুক ছিলাম সজীব ভাইয়াকে পাত্তা দিচ্ছেনা । বড়লোকি ব্যাপার! আপনি সেই গালফ্রেন্ড ছিলেন? ”

” হুম! ” আমি ছোটবেলা থেকে অনাথ ছিলাম নীলা। কে আমার বাবা-মা আমি এখনো জানিনা। কারণ জন্মের পর নাকি আমাকে একটা ডাস্টবিনে পাওয়া গেছে। সেই ডাস্টবিন থেকে আমাকে এক সংস্থা নিয়ে যায়। সেই সংস্থার লোক আমাকে এতিমখানায় রেখে আসে। এতিমখানায় আমার বেড়ে উঠা। শৈশব,কৈশোর, যুবতী সময় পার করেছি এতিম খানায়। ”

” কি বলছেন আপনি। বাবা-মারা এমন হয়। ”

” আমি জানিনা নীলা, তবে আমার বাবা _ মা এরকম জঘন্য কাজ করেছে। ”

” আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া। যে আপনি এখনো বেঁচ আছেন। সেইদিন যদি আপনি সংস্থার লোকের কাছে না পড়তেন। এই শহরের কুকুর শিয়াল আপনাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতো। ”

” সেইদিন যদি আমি মরে যেতাম ভালো হতো নীলা। আমার কারণে চারটি জীবন নষ্ট হয়ে গেলো। ”

” কিভাবে! কার জীবন নষ্ট করলেন। ”

” আপনি তো জানেন সজীব ছিলো চৌধুরী গ্রুপের একমাত্র মালিকের ছিলো। ”

” ছিলো মানে! এখন নেই। এভাবে কথা বলছেন কেনো। আর সজীব ভাইয়াকে যতদূর চিনি ওনি কাউকে ছেড়ে যাওয়ার লোক না। আপনাকে যেহেতু ভালোবাসে সেহেতু আপনি ওনার কাছে সুখী থাকতেন। তাহলে কি এমন হলো যার জন্য আকাশের কাছে আসতে হলো? ”

” আমি আপনাকে আমার জীবনের কিছু অংশ বলতে এসেছি। দোয়া করে শুনবেন। সবটা বলছি। ”

” বলেন ”

সজীবের সাথে আমার দেখা হয় চৌধুরী শপিং প্লাজাতে। সেইদিন আমি এতিমখানার বাচ্চাদের জন্য নতুন কাপড় চোপড় কিনতে গেছিলাম। সেইখান থেকে সজীবের সাথে আমার পরিচয়। সেইদিন দেখা না হলে অনেক ভালো হতো। সেই দেখায় সজীব আমাকে বারবার ডিস্টার্ব করতো। প্রতিদিন এতিমখানায় আসতো। সজীবের আশা যাওয়া মোটেও ভালো চোখে দেখে নাই এতিমখানার ম্যানেজার। একদিন এতিমখানার ম্যানেজার সজীবকে যেয়ে চোখ রাঙায়। এভাবে সে কেনো এতিমখানার সামনে বসে থাকে। সজীব সোজাসাপটা উত্তর দেয় সে নাকি আমাকে ভালোবাসে। আমার জন্য এখানে আসে। ম্যানেজার সজীবকে বুঝায় আপনি এখান থেকে চলে যান, কারণ সে ইয়াতিম কন্যা, বয়সে আপনার থেকে দুইবছরের বড়। বাবা মায়ের পরিচয় নেই ঠিকমতো তার সাথে আপনার ভালোবাসা আপনার পরিবার ও সমাজ মেনে নিতে পারবেনা। কিন্তু সজীব ছিলো নাছোড়বান্দা সোজাসাপ্টা উত্তর দেয় ভালোবাসার মানুষকে সমাজের জন্য ছাড়ার লোক সজীব নয়। ম্যানেজার তখন বাধ্য হয়ে সজীবকে বলে, আপনি এক্ষুণি বৃষ্টিকে বিয়ে করতে পারবেন। সজীব খুশিতে গদগদ হয়ে বলে পারবো। ম্যানেজার তখন আমাকে এসে সবটা বলে। আমি অবাক হয়ে যাই, সজীব এটা ঠিক করছে না এই ভেবে।
আকাশ ভাইয়া ও ম্যানেজার ছিলো আমাদের বিয়ের সাক্ষী। সজীব বাড়ির কাউকে না জানিয়ে আমাকে বিয়ে করে চৌধুরী ম্যানশনে নিয়ে যায়। কিন্তু পরিচয়হীন এক মেয়েকে কোনো বাবা-মা চাইবে না তার ছেলের বউ হিসাবে মেনে নিতে? তাও আবার বয়সে বড় ? সজীবের বাবা-মা ঠিক তাই করলো। সজীবকে সেইদিন তার বাবা তেজ্যপুত্র করে দেয়। সজীবকে বাইরে বের করে দেয়। সজীব আমাকে নিয়ে একটা ফ্ল্যাটে উঠে। আকাশ সেখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিছিলো। খুব সুখেও মাসখানেক কেটে গেলো আমাদের। এরমধ্যে সজীবকে তার বাড়ি থেকে কেউ ফোন দেয় নাই। আমরা ফোন দিলে তাড়া ধরেনা। কিন্তু মাসখানেক যাওয়ার পর আমি অসুস্থ হয়ে যাই। সজীবের ভালোবাসা আমার পেটে জন্ম নেয়। সজীব অনেক খুশি ছিলো সেইদিন। কিন্তু এই খুশির খবরে সজীবের মাথায় দুঃচিন্তা ভর করে। সজীবের কাছে যত জমানো টাকা ছিলো শেষ হওয়ার পথে। সজীবের বাবা সজীবের কার্ড ডিজেবল করে দেয়। সজীব বেকার ছিলো। সজীবের মাথায় আমার ও আমাদের বাচ্চার খাওয়ার চিন্তা আসে। টাকা না থাকলে আমাদের কিভাবে খাওয়াবে, ও পড়াবে। সেইদিন থেকে সজীব বিভিন্ন কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দেয়। কিন্তু সজীবের বাবা আগে থেকে সব কোম্পানিকে বলে সজীব যাতে চাকরি না পায় সেই ব্যবস্থা করে দেয়। সজীব লজ্জায় পড়ে আকাশকে এসব বলে নাই। কোনো উপায় না পেয়ে সজীব ড্রাইভিং এর চাকরি নেয়। কারন এ ছাড়া সজীবের সামনে কোনো পথ ছিলোনা। কোনো কিছু চিন্তা না করে সজীব ড্রাইভিং এর চাকরি নেয়। প্রথম প্রথম সজীবের খারাপ লাগলেও পরে পরিস্থিতির চাপে সব মেনে নেয়। বেশ ভালোই দিন যাচ্ছিলো। সজীবের ভালোবাসা আমার পেটে বেড়ে উঠছিলো। এই নিয়ে প্রতি রাতে আমরা খুনশুটিতে মেতে থাকতাম। আমার প্রসব পেইন উঠে। বাড়িতে সজীব ছিলোনা। ব্যাথা সহ্য করতে পারছিলাম না। বাড়ির মালকিন সেইদিন আমার রুমে আসে। আমাকে ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখে। দ্রুত হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। আমি ব্যাথায় বিলীন তখন সজীবকে ফোন করে বলি আমি পারছিনা সজীব আমাকে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছে দ্রুত আসো। বলেই ফোন কেটে দিই। হসপিটালে যেয়ে আমি অজ্ঞান হয়ে ছিলাম। আমার সাথে কি ঘটেছে আমি নিজেও জানিনা। জ্ঞান ফিরে শুনতে পাই আমার মেয়ে হয়েছে। মেয়ে আমার পাশেই ছিলো, কিন্তু সজীব পাশে ছিলোনা। সজীবকে না দেখে আমি ব্যাকুল হয়ে যাই। হঠাৎ আকাশ আমার রুমে এসে আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে বলে আজ থেকে আমি এর বাবা।

” আকাশ সজীব কোথায়? ও কি আমার বাবুকে দেখেছে! ”

” বৃষ্টি চিন্তা করিয়ো না সজীব যেখানে আছে ভালো আছে। ”

এই কথা শুনে আমি ম্লান হয়ে যাই।

” সজীব আসে নাই এখানে। আমারতো পেইন উঠার সাথে সাথে ওকে বলেছিলাম তবুও ও আসলো না! ”

” সজীব এসেছে বাবুকে দেখে চলে গেছে। অনেক টাকার ব্যাপার বৃষ্টি। তোমার সিজার হয়েছে সাথে বাবুর অনেক খরচ ওকে তো কাজ করতে হবে প্রচুর তাই ও চলে গেছে। ”

” আমার মুখটা মলিন হয়ে যায়। সজীব দেখতে না পেয়ে ছটফট করতে থাকি। আমার ছটফট সহ্য করতে না পেরে আকাশ বলে দেয়। সজীব তোমার ফোন পেয়ে দ্রুত হসপিটালে আসতেছিলো। কিন্তু আসার পথে সজীবের গাড়িকে একটি ট্রাক পিষে চলে যায়। সজীব সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। সজীব ইস ডেইট। এই কথা শোনার পর আমি অস্থিরতা করতে থাকি। আমার সেলাই ছুটে যায় আমার দাপাদাপি তে। একটা সময়ের পর অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফিরে দেখি স্যালাইন লাগানো। আমি স্যালাইন টেনে ছিড়ে বাইরে ছুটি। আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না সজীব মারা গেছে। কিন্তু আজিমপুর কবরস্থানে যেয়ে দেখি সজীবের দাফনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সজীবের ছিন্নভিন্ন শরীর দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারি নাই। অজ্ঞান হয়ে যাই। আমার জ্ঞান ফিরে ২ দিন পর। এরই মধ্যে সজীবের বাবা-মা নাকি আমার প্রাণ নিতে চেয়েছিলো। কিন্তু আকাশের জন্য পারে নাই। আমি ট্রোমার পেসেন্ট হয়ে যাই। আজকে আমি বেঁচে আছি শুধুমাত্র আকাশের জন্য। আকাশ আমাকে এই ট্রোমা থেকে বের করছে।

বৃষ্টির কথা শুনে নীলার চোখের পানিতে কাপড় ভিজে গেছে। সজীব যে এভাবে মারা যাবে কল্পনাও করে নাই। এই সজীব ছিলো জীবন নামক পাতার অধ্যায় তাদের জীবনে। আজকে নাকি শুনছে সজীব মারা গেছে।

চলবে,,,,

[ রিচেক হয় নাই, পার্টটি ছোট হওয়ার জন্য দুঃখিত। এখন লিখে দিলাম। গতকাল ডক্টরের কাছে গিয়েছিলাম তো তাই রাতে লেখার সময় পাই নাই ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here