তোমার প্রণয় নগরে,পর্ব- ১৭,১৮

তোমার প্রণয় নগরে,পর্ব- ১৭,১৮
উর্মি প্রেমা (সাজিয়ানা মুনীর)
পর্ব- ১৭

বাড়ি ফিরে রেগে ফোঁসফোঁস শ্বাস ফেলছে সায়রা। সারা শরীর ভিজে একাকার। আরসালের উপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে তার। যদি আধো পথেই নামানোর ছিল, তবে ভার্সিটি থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসলো কেন? সায়রা তো বলেনি! এসব ভাবনার মাঝেই ফোনটা আবার বেজে উঠল। সায়রা রিসিভ না করে কেটে দিলো। তারপর সুইচঅফ। এই রগচটা বদমেজাজি লোকটার সাথে কথা বলবে না সে। একদম কথা বলবেনা!

পরদিন থেকে দুজনের মধ্যে অদৃশ্য এক যুদ্ধ শুরু হলো। একজন আরেকজনকে এড়িয়ে চলার যুদ্ধ। সেইদিনের পর সায়রাকে আর ফোন দেয়নি আরসাল। না নিজের থেকে কথা বলার চেষ্টা করেছে। কখনো মুখোমুখি হলে সায়রাকে বরাবরের মত এড়িয়ে গেছে। এতে সায়রা বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে চললেও ভেতরে ভেতরে সেও কষ্ট পাচ্ছে।

আজ ছুটির দিন। সকাল থেকে মন খারাপ সায়রার। ফজরের নামায আদায় করে বিছানায় নিস্তেজ হয়ে পরে আছে সে। চোখের পাতায় কিছুতেই ঘুম নামছে না। গত রাতেও ভালো ঘুম হয়নি তার। মন বড্ড অশান্ত, অস্থির। গতকাল যখন থেকে শুনেছে আজ রহিতাদের বাড়ি থেকে আরসালদের বাড়িতে বিয়ের কথাবার্তা বলতে লোকজন আসছে। সম্ভব হলে আজই আংটি বদল হবে, সেই থেকেই মন অশান্ত সায়রার। লাখ বুঝিয়েও নিজেকে শান্ত করতে পারছেনা সে। অথচ সে নিজেই চেয়েছিল রহিতার সাথে আরসালের বিয়েটা হোক। এখন যখন সবটা সুন্দর ভাবে হচ্ছে তার কেন এমন অস্বস্তি লাগছে? কেন এই ঈর্ষান্বিত যন্ত্রণা? নিজেকে নিজে বারবার প্রশ্ন করে যাচ্ছে সায়রা। প্রত্যুত্তরে মন থেকে কোন আওয়াজ এলো। মনটাও বুঝি মস্তিষ্কের মতই বিভ্রান্ত। সারা সকাল বিছানায় শুয়েই কাটল। সকাল পেরিয়ে দুপুরে যেয়ে থামল। মায়ের ডাকাডাকিতে বিছানা ছেড়ে উঠল সায়রা। শরীর নিশ্চল, ভারী হয়ে আছে। হাত পা চলছে না তার। নিজের ঝিম ধরা হাত পা নিয়ে সায়রা কোনরকম গোসল সেরে নামায আদায় করে চুল শুকাতে বারান্দায় চলে যায়। নরম তপ্ত রোদে চুল শুকাচ্ছিল সে। চোখ বুজে বসে আছে তার। সারাদিন পর নরম রোদের ছোঁয়া ভীষণ ভালো লাগছে। পাখির ডাকে চিন্তন ভাঙল তার।

–” দেখো আপু, আরসাল ভাইদের বাড়ির সামনে কত গুলা গাড়ি। রহিতা আপুরা কত বড়লোক। আর রহিতা আপুকে দেখো কি সুন্দর। কি সিল্কি চুল! রোদে ঝলঝল করছে। একদম নায়িকাদের মত লাগছে! তাই না আপু!”

পাখির কথায় বিরক্ত হলো সায়রা। রহিতা বা তাদের গাড়ি দেখার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই তার। তেতো মুখ করে বলল,

–” টাকা থাকলে সৌন্দর্যও কেনা যায়। এতে এত হায় হুতাশের কিছু নেই পাখি।”

কপাল কুঁচকে ঘরে চলে গেল সায়রা। দুপুরে আর খাওয়া হলো না তার। বিকালে বারান্দায় শুকনা কাপড় তুলতে গিয়ে দেখল- আরসালের বারান্দায় আরসাল আর রহিতা। সায়রা থেমে গেল, ধীর গতিতে কাপড় তুলছে। আড়চোখে আরসালের বারান্দার দিকে তাকাল সে। আরসালের পরনে ডার্ক ব্লু পাঞ্জাবি। ‘স্টুডেন্ট অফ দ্যা ইয়ারে’ মুভির রাঁধা গানে সিদ্ধার্থ মালহোত্রা যেই পাঞ্জাবিটা পরেছিল অনেকটা সেই রকম। চুল গুলা সুন্দর করে সেট করা। ঠোঁটে চমৎকার হাসি। অদ্ভুত সুন্দর চোখজোড়া দূর আকাশে স্থির। পাশেই রহিতা হেসে হেসে কথা বলছে। কি সুন্দর সেজেছে সে! গায়ে ভারী কারুকাজের পিংক নেটের শাড়ী। তার সিল্কি চুল গুলো দিনের শেষভাগের কোমল রোদে চিকচিক করছে। পাখি ঠিক বলেছে, রহিতা দেখতে কোন নায়িকা বা মডেল থেকে কম নয়। দুজনকে এক সাথে কি সুন্দর মানিয়েছে! দুজন এত সাজগোজ করেছে নিশ্চয় আজ তাদের আংটি বদল! আরসাল কি রাজি? রাজি না হবার তো কোন কারণ নেই। রহিতা দেখতে কত সুন্দর, ভদ্র নম্র। কত সুন্দর চুল তার। কই সায়রার তো এত সুন্দর চুল নেই। না সে রহিতার মত এত স্মার্ট! আরসাল রহিতাকে ছেড়ে তাকে পছন্দ করবে কেন?
সায়রা তপ্ত নিশ্বাস ছাড়ল। মাথা উঁচু করে টলটল দৃষ্টিতে একবার আরসালের দিকে তাকাল। আরসাল আগে থেকেই তার দিকে তাকিয়ে ছিল। দুজনের চোখাচোখি হলো। সায়রার মলিন মুখ। দুজন দুজনের দিকে অপলক তাকিয়ে। এই দৃষ্টিতে লুকিয়ে আছে অজস্র না বলা কথা। আরসালের দিকে আরো কিছুক্ষণ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে, দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সায়রা। ঘরে এসে বিছানায় সটান শুয়ে পড়ল। চোখ বেয়ে আনমনে নোনাজল পড়ছে। এত যন্ত্রণা হচ্ছে কেন! মনে হচ্ছে এখনি বুঝি নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। অসহ্য যন্ত্রণা! নিজের প্রতি প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে তার। রাগে হাত কচলাচ্ছে সে। নিজের শরীরে খামচে ঘা করে ফেলছে। হাত চিঁড়ে রক্ত পড়ছে। সেই দিকে কোন খেয়াল নেই সায়রার। ভেতরের যন্ত্রণাকে চেপে রাখতে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছে সে। সারা ঘর জুড়ে ফোঁপানোর আওয়াজ।
সন্ধ্যা নেমেছে। ঘরের টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনতে পিয়াসকে নিয়ে বাহিরে বেরিয়েছিলেন সিন্থিয়া। মাত্রই বাড়ি ফিরেছে। বিকালে বের হওয়ার আগে টেবিলের উপর সায়রার জন্য খাবার রেখে গিয়েছিলেন তিনি। সায়রা খায়নি। সেই খাবার টেবিলের উপর তেমনি ভাবে ঢাকা যেমন ভাবে রেখে গেছে। সকাল থেকে কেমন জানো নেতিয়ে আছে সায়রা। খাওয়া দাওয়া করছে না, কারো সাথে কথা বলছে না। ভীষণ চিন্তিত হলেন তিনি। হ্ঠাৎ মেয়েটার হলো কি? চিন্তায় রাশভারী মুখ নিয়ে সায়রার ঘরের দিকে পা বাড়ালেন তিনি। অন্ধকার ঘর। সন্ধ্যা বাতি জ্বালানো হয়নি। ভেতর থেকে ঘন ঘন ফোঁপানোর আওয়াজ ভেসে আসছে। সিন্থিয়ার বুক কেঁপে উঠল। কাঁদছে কেন সায়রা? হঠাৎ কি হলো তার? দ্রুত পায়ে ভিতরে গেলেন তিনি । ঘরের বাতি জ্বালাতেই। আঁতকে উঠলেন- পুরো ঘর অগোছালো, বিছানার চাদর মাটি ছুঁই ছুঁই। বিছানার মাঝ বরাবর উপুড় হয়ে শুয়ে, কাঁদছে সায়রা। সিন্থিয়া মেয়ের কাছে ছুটে গেল। বুকে জড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

–” কি হয়েছে সায়রা? শরীর অসুস্থ লাগছে?”

সায়রা উত্তর দিলো না। মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ফোঁপানো কান্না বুক চিঁড়া চিৎকার হয়ে বেরিয়ে এলো। মায়ের বুকে মাথা রেখে অনবরত কাঁদছে সায়রা। সিন্থিয়া মেয়ের চুলে আদুরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আস্তে আস্তে কান্নার আওয়াজ কমে আসে। সায়রা চোখ মুখ শক্ত ভাবে চেপে ধরে আছে। সিন্থিয়া পূর্বের ন্যায় চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে,

–” কি হয়েছে তোর? মাথা ব্যথা? মাথায় কি খুব যন্ত্রণা হচ্ছে! ডক্টর ডাকবো!”

সায়রার ধরে আসা কন্ঠের ফিসফিস আওয়াজ ভেসে এলো,

–” প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে মা। প্রচণ্ড! এই যন্ত্রণা ডক্টর সারাতে পারবেনা। আমার শান্তি চাই। আমাকে একটু একা থাকতে দেও। প্লিজ!”

সিন্থিয়া বেগম চলে গেলেন। খানিক বাদে খাবার প্লেট হাতে নিয়ে ফিরে এলেন। সায়রা খাবেনা বলে নাকচ করল। শুনলেন না তিনি। নিজের হাতে জোর করে খায়িয়ে দিলেন। মেডিসিন দিয়ে। মাথা চিপে দিতে লাগলেন। আস্তে আস্তে সায়রার চোখের পাতায় নিদ্রা ভর করল। ধীরেধীরে ঘুম রাজ্যের অতলে ডুবে যেতে লাগল সে।

রাত দুইটা ত্রিশ। ফোনটা বেজে উঠল সায়রার। বিছানা হাতিয়ে ফোন বের করল। ঘুম ঘুম চোখে রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে শীতল আওয়াজ ভেসে এলো,

–” তোদের ছাদে আয়! এক্ষুনি!”

চোখ থেকে ঘুম পালাল সায়রার। ধপ করে উঠে বসল। অপর পাশের মানুষটার আওয়াজে বুকটা ধুকধুক করছে। নিশ্বাস থেমে আসছে বার বার। বিকালে রহিতার সাথে আংটি বদল করে এখন তার আছে কি চাই? অভিমান হলো সায়রার। চোখ ভরে এলো তার। দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করল সায়রা। মনকে দৃঢ় করল। যেই ‘ আসতে পারবো না’ বলতে যাবে অমনি ফোনটা কেটে গেল। সায়রাও আর ফোন করল না। বিছানায় শুয়ে পড়ল আবার। দু চোখে ঘুম নেই। মন বিচলিত।
রাত তিনটা চল্লিশে ফোনটা আবারো বেজে উঠল। রিসিভ না করে, কেটে দিলো সায়রা। আরো কয়েকবার বাজার পর মেসেজ এলো,

–” ঝামেলা না চাইলে, ভালোয় ভালোয় ছাদে আয়।”

ভয়ে গলা শুকাচ্ছে সায়রার। দুটানায় পড়েছে সে। আরসালকে দিয়ে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই, দেখা যাবে সত্যি সত্যি কোন ঝামেলা শুরু করেছে। এসব ভাবনা চিন্তার মাঝেই আবারো মেসেজ এলো,

” অপেক্ষা করছি!”

চলবে……..

ভুল ত্রুটি ক্ষমাত দৃষ্টিতে দেখবেন। প্লিজ সবাই সবার মতামত জানাবেন।

তোমার প্রণয় নগরে
উর্মি প্রেমা (সাজিয়ানা মুনীর)
পর্ব- ১৮

আলতো পায়ে ছাদের দিকে পা বাড়াল সায়রা। ছাদের দরজা পেরিয়ে কয়েক কদম সামনে যেতেই আচমকা পেছন থেকে কেউ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। ভয়ে হাত থেকে টর্চ লাইটা নিচে পড়ে যায় সায়রার। কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সে। বুকে প্রচণ্ড বেগে ঝড় চলছে তার। নিশ্বাসের উঠানামা ক্রমশ বাড়ছে। চারিদিক ঘন কুয়াশায় ঘেরা। রাতের সাথে পাল্লা ধরে শীতের প্রবণতাও বাড়ছে। চোখ মুখ বেশ শক্ত ভাবে বুজে নিয়েছে সায়রা। ভয়, অনুভূতি, জড়তায় জমে গেছে সে। পেছনের মানুষটার ঘন ঘন তপ্ত নিশ্বাস তার পিঠে পড়ছে। নিশ্বাস আটকে আসছে, অস্থিরতা বাড়ছে তার। পেছনের মানুষটা আরো ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িয়ে ধরল সায়রাকে। সায়রার পিঠ তার বুকে যেয়ে ঠেকেছে। মানুষটার বরফ শীতল হাত জোড়া সায়রার কোমরে আবদ্ধ। মানুষটা তার মেঘঘন লতানো চুলে আবেশে মুখ গুজলো। থরথর করে কাঁপছে সায়রা। তার নাকে সেই চিরচেনা কড়া সুগন্ধ আটকাল। এই ঘ্রাণের সাথে অতিপরিচীত সে। চোখ বুজে দ্বিধাহীন বলতে পারছে মানুষটা ‘আরসাল’, যার কারণে বিকেল থেকে সারা সন্ধ্যা কেঁদে কেটে একাকার করছে সে। অতি অভিমানে, চোখ বুজেই কোমর থেকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল সায়রা। পারল না! আরসাল গভীর ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। সায়রার কানে ফিসফিস আওয়াজ ভেসে এলো,

–” ভালোবাসি, ভালোবাসি , ভালোবাসি!”

ধপ করে চোখ খুলল সায়রা। কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে ঠাই দাঁড়িয়ে থাকল। সারা শরীর জুড়ে এক শীতল হাওয়া বয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য সব থেমে গেল। কিরূপ প্রতিক্রিয়া করবে সে? খুশি হবে নাকি দুঃখী ? সব কিছু তো শেষ! আজ বিকালেই তো রহিতার সাথে উনার আংটি বদল হয়েছে। এখন সায়রাকে এসব বলার মানে কি? কি চায় উনি? সায়রা ছটফট করে মরুক? কেন কষ্ট বাড়াতে এসেছে তিনি? এসব ভেবে সায়রার চোখ ভরে এলো। অনেকটা সময় নিয়ে বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করল সে। কণ্ঠে গম্ভীরতা এঁটে বলল,

–” এসব আবোলতাবোল কি বলছেন আরসাল ভাই? ভুলে গেছেন আপনি এখন কারো বাগদত্তা!”

–” ভুলিনি। নিজের বাগদত্তার কাছেই এসেছি।”

সায়রার কাঠখোট্টা আওয়াজ,

–” আমাদের সম্পর্কটা অনেক আগেই ভেঙে গেছে আরসাল ভাই!”

রাগে কোমর খামচে ধরল আরসাল। অফুটন্ত স্বরে আর্তনাদ করে উঠল সায়রা। চোখ ভিজে এলো তার। কোমরটা বুঝি ছিঁড়ে গেল! কিছু বলল না সে। পেছন থেকে আরসালের তেজী আওয়াজ ভেসে এলো,

–” তোর একার সিদ্ধান্তেই সব শেষ হবে? কি ভেবেছিস? তুই চাইলেই সম্পর্ক হবে, তুই চাইলেই ভেঙে যাবে? সম্পর্ক ভাঙাগড়ার সিদ্ধান্ত তোর একার? আমার অনুভূতি ভালোবাসার কোন দাম নেই?”

নরম স্বরে জবাব দিলো সায়রা,
–” সম্পর্ক ভাঙার এতদিন পর এসব কথা উঠছে কেন আরসাল ভাই? সবার সামনেই তো সবটা শেষ হয়েছে! আর ভালোবাসা? কোন ভালোবাসার কথা বলছেন আপনি? আমার জানামতে আপনি আমাকে চরম ঘৃণা করেন। স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, আপনি আমার চেহারাও দেখতে চান না!”

সায়রা ধারাল কথায় আরসাল ক্ষিপ্ত হলো। হিংস্র সিংহের মত রাগে ফোঁসফোঁস করছে। সায়রার হাত প্যাঁচিয়ে একটানে সায়রাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে বুকের সাথে মিলিয়ে নেয়। কপালের সাথে কপাল মিলিয়ে চোখ বুজে নেয়, ঘোর লাগা স্বরে বলে,

–” আমিও তাই ভাবতাম! ভাবতাম এই দুনিয়ায় বুঝি তুই একমাত্র ব্যক্তি যাকে আমি প্রচণ্ড ঘৃণা করি। কিন্তু সত্যি তো এটাই যে ঘৃণা না প্রচণ্ড ভালোবাসি তোকে। ঠিক কবে থেকে ভালোবাসতে শুরু করেছি তার উত্তর খুঁজতে যেয়ে পাই, আমি তো কোনদিনই তোকে ভালোবাসা বন্ধ করিনি। পাঁচ বছর বয়সে হসপিটালে যখন ছোট মা নবজাত শিশু আমার কলে দিয়ে বলল, ‘তোর সাথে খেলতে তোর ছোট একটা বোন এসেছে আরসাল!’ সেদিন কেন জানো শিশুটাকে বোন মানতে পারিনি। তার আয়নার মত স্বচ্ছ চোখ জোড়ায় গভীর ভাবে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। পিটপিট সুন্দর পুতুল চোখ তার। ছোট মায়ের জবাবে কড়া গলায় বলেছিলাম, ‘ ও আমার বোন না, পুতুল বউ। আমার পুতুল বউকে আমি কাউকে দিবো না!” সেইদিন আমার কথায় সবাই হেসেছিল।কিন্তু আমার প্রত্যেকটা কথা ছিল সত্য আর মনের গভীর থেকে বলা! সেদিন থেকেই তোকে নিজের মানতে শুরু করেছি। কাউকে কখনো তোর কাছে ভিড়তে দেইনি। কারো সাথে খেলতে দেই, তোর বন্ধু বান্ধব সবটাই ছিল আমার পছন্দ অনুযায়ী। কারণ আমার ভয় ছিল কেউ আমার পুতুল বউকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে না নেয়! সময়ের সাথে সাথে আমার অনুভূতি গুলো গাঢ় হলো। নিজের অজান্তেই ছোট বেলার সেই অধিকারবোধটা ভালোবাসায় পরিণত হলো। নিজের এলোমেলো অনুভূতি গুলোকে লুকাতে নিজেকে কঠিন আবরণে ডেকে ফেললাম। তোর সাথে কাঠখোট্টা আচরণ করতে শুরু করলাম। কিন্তু কানাডা যাবার আগে এমন এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটল যে আমার অনুভূতি গুলো রাগ জেদে পরিণত হলো। বিনা দোষে আমার উপর চরিত্রহীনের তোকমা লাগল। যা আমার সেল্ফরেস্পেক্টকে প্রচণ্ড আঘাত করল। রাগে জিদে মিছেমিছি ঘৃণা করতে শুরু করলাম তোকে। তোর নাম শুনতেই রাগ হতো সেই রাগটাকেই ঘৃণা মানতে লাগলাম আমি। কানাডা থাকাকালীন সেই চারবছর তোকে ভুলার অনেক চেষ্টা করেছি, প্রখর ভাবে নিজের মনকে অন্যকোথাও অন্যকারো মাঝে আটকাতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু প্রত্যেকবার আমি বিফল হয়েছি। ঘুরেফিরে তোর কাছেই ফিরে এসেছে মন। প্রতিদিন একবারের জন্য হলেও তোর ছবিতে চোখ বুলাতাম। রিদ্ধি সায়ন থেকে কৌশলে তোর খোঁজ খবর নিতাম। কেন এমন করতাম তা নিজেও জানতাম না। ধীরেধীরে তুই আমার এডিকশন হয়ে উঠলি। আমার ভেতরের অস্থিরতা কমাতে, অশান্ত মনকে শান্ত করতে একমাত্র বিকল্প ছিলি তুই। দেশে ফিরে বাড়ি এসে যখন তোকে নিজের বিছানায় এলোমেলো গুটিসুটি শুয়ে থাকতে দেখলাম। অগোছালো হয়ে গেছিলাম আমি। জাস্ট পাগল হচ্ছিলাম। ভেতরের অগোছালো অনুভূতি গুলো উপচে আসছিল আমার। নিভৃত ভাবে তোকে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে নিজের বক্ষপিঞ্জরের অশান্ত অনল কে শান্ত করতে তৃষ্ণা জেগেছিল। ভয়ংকর কোন অপরাধ করতে স্বাদ জেগেছিল। নিজের ভেতরের তৃষার্ত ঐ ভয়ংকর মানুষটাকে শান্ত করতে রুক্ষ আচরণ করে দুরদুর করে তোকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেই। সম্পর্কটাকে একটা সুযোগ দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু ভেতরের ইগোটা বারবারই বাঁধা দিচ্ছিল। চারবছর আগে সেই রাতের সব ঘটনা অপমান বারবার আমার রাগ জেদে মাথা চেপে ধরেছিল। হাজার চেষ্টাও নিজেকে শান্ত রাখতে পারছিলাম না। না সহ্য করতে পারছিলাম তোর আর তুর্জয়ের কাছাকাছি থাকা, হাসি ঠাট্টা! রিদ্ধির হলুদের রাতে আমার ভেতরের ফ্রাস্টেশন রাগ হয়ে তোর উপর ঝরে। না চাইতেও অকথ্য ভাষায় কথা শুনিয়ে দেই তোকে। যার জন্য আমি আজও অনুতপ্ত! সেই দিন সম্পর্ক ভাঙার পর বুঝেছি আমি ঠিক কতটা চাই তোকে! প্রথমবার অনুভব করেছি আমি তোকে ভালোবাসি। সোনালি ভোরের দ্যুতি রূপে আমার তোকে প্রয়োজন, গহীন নিকষ আঁধার কালো রাতের আঁধার কাটাতে আমার তোকে প্রয়োজন।”

আরসাল থামল। সায়রা থমকে আছে। বিস্মিত দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে আরসালকে দেখছে। আরসালের চোখ তখনো বন্ধ। সায়রার কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে নাকের সাথে নাক ঘষছে সে। সায়রার অশ্রুস্নাত আঁখি। এই অল্পভাষী গম্ভীর রগচটা রাগী মানুষটা যে এত কথা বলতে পারে জানা ছিল না সায়রার। এই মানুষটার ভেতর ভেতর সায়রার প্রতি এত অনুভূতির ছড়াছড়ি, অথচ এতবছরে একবার জন্যও টের পেল না সায়রা। বুক ফেটে কান্না আসছে সায়রার। আরসালের অনুভূতি গুলো কেন জানল সে। না জানাই ভালো ছিল। এখন শুধু শুধু কষ্টের বোজা বাড়বে! নিজেকে এখন কি করে সামলাবে সায়রা।
ইচ্ছে করছে আরসালকে বুকে পড়ে ঝাঁপটে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে বলুক, ” এসব কথা আরো আগে কেন বলেননি ? সবশেষ করে এখন কেন এসেছেন? কেন আমাকে এভাবে ভেঙে গুড়িয়ে দিচ্ছেন বারবার! ”
সায়রা নিজের চোখের জলকে আটকে আরসাল থেকে দূরে সরে ওড়না দিয়ে নিজেকে ভালো করে ডেকে নিলো। আরসাল নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে সায়রাকে দেখছে। এদিকওদিক তাকিয়ে খানিক সময় নিয়ে নিজেকে সামলে কঠোর মুখভঙ্গি করে বলে,

–” এখন এসব কেন বলছেন আরসাল ভাই? যা হয়েছে সব ভুলে যান! এখন আপনি অন্যকারো বাগদত্তা!”

আরসাল সায়রার দিকে শান্ত দৃষ্টি মেলে কয়েক পলক চেয়ে থাকল। গম্ভীর স্বরে আওড়াল,

–” কার বাগদত্তা? কোন বাগদান হয়নি! আমি বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি।”

সায়রা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে আরসালকে দেখছে। বিস্ময়ে সারা শরীর থরথর কাঁপছে তার। বলছে কি এই লোক! বাগদান হয়নি! বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে?
প্রথমে আরসালের এতবছরের চাপা সুপ্ত ভালোবাসার স্বীকারোক্তি আর এখন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার ব্যাপারটা। সব শুনে সায়রা হতভম্ব! একত্রে এত কিছু হজম হচ্ছে না তার। আজ বুঝি বিস্ময়ে হার্ট এটাক করবে সে। সায়রা হিম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অতি বিস্ময়ে জমে গেছে সে। আরসাল সায়রার হাত টেনে নিজের কাছে আনল। সায়রার গালে আদুরে হাতে রেখে নিভৃত স্বরে বলল,

–” আমি জানতাম না আজ রহিতার ফ্যামিলি এনগেজমেন্টের জন্য আসছে। আমাকে বলা হয়েছিল ফ্যামিলি গেটটুগেদার। ছোট ফুপির শ্বশুর বাড়ীর আত্মীয় হওয়ায় তেমন ঘামাইনি। চাচা ফুপিরা সবাই রহিতার সাথে এনগেজমেন্টের জন্য ফোর্স করছিল তাই বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি।”

সায়রা পিটপিট চোখ মেলে অভিযোগের স্বরে প্রশ্ন করল,

–” রহিতা আপুর সাজসজ্জা দেখেও বুঝেননি এনগেজমেন্টের জন্য এসেছে?”

–” সেভাবে তাকাইনি!”

–” ইশ বললেই হলো! বিকালে দেখলাম ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছেন!

সায়রা নাক ফুলিয়ে বলল। আরসাল ঠোঁট মেলে চওড়া হাসল,

–” তুই কি জেলাস সায়রা?”

সায়রা এদিক ওদিক তাকিয়ে আড়ষ্ট স্বরে বলল,

–” নাহ, না তো! আমি কেন জেলাস হবো।”

আরসাল এবার ফিক করে হেসে দিলো। সায়রা মুগ্ধ নয়নে আরসালকে দেখছে। নিকষ কালো রাত কাটিয়ে মাত্রই ভোরের আলো ফুটছে। অরূ তখনো মেঘে ডাকা। অরুর দ্যুতিতে পূর্ব দিকের মেঘ গুলো রক্তিম। রক্তিম আলো আরসালের মুখ ছুঁয়ে দিচ্ছে। গায়ে এখনো গতকালের সেই সেই পাঞ্জাবি তার। ফর্সা মুখশ্রী হাসি উজ্জ্বল। গভীর সুন্দর চোখজোড়া নির্ঘুমে রক্তিম । কাটা কাটা নাক। মসৃণ ঠোঁট জোড়া শীতের প্রবণতায় ফ্যাকাসে হয়ে আছে। ঠোঁটের নিচে সুন্দর তিলটা ফর্সা মুখশ্রীতে স্পষ্ট ফুটে! সুরূপ দেহ, পাঞ্জাবীর বোতাম খোলা হওয়ায় ফর্সা বুকটা স্পষ্ট ভেসে। লজ্জায় মাথা নুয়ে নিলো সায়রা। এত সুন্দর কেন মানুষটা? একটু কম সুন্দর হলে কি এমন ক্ষতি হতো, হু? আনমনে ভাবছে সায়রা।
সায়রাকে গভীর ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঘোর লেগে যায় আরসালের। আচমকা হাত টেনে কাছে এনে সামনের এলোমেলো চুল গুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলে,

–” আমি পুরোটাই তোর। নির্দ্বিধায়, সংকোচহীন দেখতে পারিস।”

সায়রা লজ্জায় ছটফট করছ। নিশ্বাসের উঠানামা দ্রুত বাড়ছে। আরসাল সায়রার আরো কাছে এলো। সায়রার হাত তখনো আরসালের হাতে। গভীর দৃষ্টিতে সায়রাকে দেখছে সে। আলতো স্বরে বলল,

–” ভালোবাসি পুতুল বউ! ”

সায়রার যেন নিশ্বাস থেমে গেছে। নার্ভাসনেসে শক্ত ভাবে আরসালের হাত চেপে ধরেছে সে। এই সুযোগে সায়রার অনামিকা আঙ্গুলে এনগেজমেন্টের সেই ফিরিয়ে দেওয়া আংটিটা পড়িয়ে দিলো আরসাল। ফিসফিসিয়ে বলল,

–” প্রত্যেক জিনিস তার নিজ স্থানে সুন্দর! এই আংটির উপর একমাত্র অধিকার তোর!”

সায়রা চুপ। তার বিচলিত চোখ এদিকওদিক দেখছে। আরসাল বলল,

–” এখনি উত্তর চাইছিনা! সময় নে , নিজেকে সময় দে! তোর জবাবের অপেক্ষায় থাকবো।”

সায়রা মনে মনে বলল, ‘অনেক কাঁদিয়েন আপনি। এত সহজে তো আমি হ্যাঁ বলবো না আরসাল ভাই। তাছাড়া আমি না বললেই কি আপনি শুনবেন ? জোর করে হলেও নিজের করবেনই। আমি জানি যা আপনার চাই তা চাই- ই! ‘

সিড়ির দিক থেকে কারো পায়ের আওয়াজ শুনে সায়রার ঘোর কাটে। বিচলিত হয়ে পড়ল সে। প্রতিদিন ভোরে দাদী ছাদে হাঁটতে আসে। উনি নয় তো? দাদী জানলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। আরসাল সায়রা দুজন দুজনার দিকে চেয়ে। সায়রার মুখশ্রী চিন্তায় ভারী! ভয়ে গলা শুকাচ্ছে। এখন কি করবে সে!

চলবে………

ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। প্লিজ সবাই সবার মতামত জানাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here