তোমাকে,পর্ব 19.1,20.1

তোমাকে,পর্ব 19.1,20.1
অনিমা হাসান
পর্ব 19.1

অনিমাদের কেনাকাটা শেষ হতে বেশি সময় লাগলো না I অনিমা একটা অফ হোয়াইট এর উপর লাল ব্রাইডাল জামদানি নিল I সোনালী আর কাল কাজ করা I মুনিরের খুব ইচ্ছা ছিল ওকে একটা হীরের আংটি কিনে দেয়ার কিন্তু অনিমা রাজি হলো না I ও একটা খুব সাধারণ সোনার আংটি কিনলো I দোকান থেকে বেরোনোর সময় অনিমা জিজ্ঞেস করল
– তোমার জন্য কিছু কিনবে না ?
– আমার অনেক পাঞ্জাবি আছে ওখান থেকে একটা পড়লেই হবে
অনিমা থমকে দাঁড়িয়ে গেল তারপর বলল
– তোমার কি ধারনা আমার কোন শাড়ি নেই ? বিয়েটা তো আমি একা করছি না I
মুনির আমতা আমতা করে বলল
– আমি আসলে ঠিক পছন্দ করে কিনতে পারিনা
– সমস্যা নেই আমি পছন্দ করে দিচ্ছি

অনিমা মুনিরের জন্য একটা অফ হোয়াইট পাঞ্জাবি কিনলো I গলার কাছে কালো আর লাল সুতার কাজ করা I শাড়িটার সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে দারুণ মানিয়ে গেল পাঞ্জাবিটা I কেনাকাটা শেষ করে বেরোনোর সময়ে অনিমা বলল
– যদি সময়ের সমস্যা না থাকে তাহলে আমি সেঁজুতির জন্য একটা ড্রেস কিনতে চাই
– তোমার ইচ্ছা হলে অবশ্যই কিনবে তবে যদি আজকের কথা ভেবে কিনতে চাইছ তাকে বলে রাখি ওর ড্রেস কেন হয়ে গেছে I
-কখন ?
– অনেক আগেই I বাচ্চারা সবাই একই রকম ড্রেস পড়বে তাই ওদের ড্রেস আগে কেনা হয়েছে I সেঁজুতি জানে I ওর পছন্দের কেনা হয়েছে I

অনিমা এবার আর অন্য সময়ের মতো অবাক হলো না I বলল
– আচ্ছা ঠিক আছে I চলো তাহলে যাওয়া যাক
গাড়িতে উঠে মুনির লক্ষ্য করলো অনিমা কোন কথা বলছে না I মাথা নিচু করে বসে আছে I কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারল অনিমা আসলে কাঁদছে I
– কি হয়েছে অনিমা ? আমাকে বল
অনিমা কিছু বলল না শুধু মাথা নাড়লো I
-তাহলে কাঁদছো কেন ?
– তোমার কি সত্যিই কিছু হয়েছে ?
– না
– সত্যি ?
– আমি তোমার কাছে কখনো মিথ্যা বলি না I এই জীবনে শুধু দুবার ই তোমাকে মিথ্যা বলেছিলাম
– সেটা কখন ? অনিমা অবাক হয়ে জানতে চাইল
– তোমার বাসা ভাড়া নেয়াটা কোন কাকতালীয় ঘটনা ছিল না
-আর অন্যটা
– সেটা অনেক বছর আগের কথা Iঅন্য দিন বলব

গাড়ি ততক্ষণে ইউনিভার্সিটি পাড়ায় ঢুকে গেছে I মুনির ফুলার রোডে একপাশে গাড়ি দাঁড় করালো I তারপর বলল
– এই জায়গাটা তোমার মনে হচ্ছে ?
অনিমা চোখ মুছে সামনে তাকালো I এখানে একবার কালভার্টের উপর ওরা দুজনে বসেছিল I সেদিন অনিমার খুব জ্বর এসেছিল I অনিমা কোনদিনও ভুলবে না সেদিনের কথা I
-হ্যাঁ মনে আছে
-তোমার আমার মধ্যে একটা কানেকশন ছিল I আমি আমাদের বন্ধুত্বটা খুব মিস করি I আমি আমার পুরনো বন্ধুকে ফেরত চাই অনিমা I কি পাব তো ?

মুনির ভেবেছিলো অনিমা হয়তো এখনো অন্য কিছু শোনার জন্য তৈরী নয় i হয়তো এখনও ও ওর স্বামীর স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছে I তাই ওকে সহজ করার জন্য কথাটা বলেছিল I অনিমা জবাব দিল না কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল I তবে অনিমা বুঝল মুনির ওকে কখনো ভালোবাসেনি আজও ভালবাসে না শুধু নিজের নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য বিয়ে করছে I ও মনে মনে বলল তুমি আমার বন্ধুত্ব চাইছ তো তুমি শুধু সেটাই পাবে এর বেশি আর কিছুই না I তারপর একটু হেসে বলল
– হ্যাঁ পাবে I

*******
কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই বাদ মাগরিব বিয়েটা সম্পন্ন হয়ে গেল I এই বিয়েতে যে দুজন সবচাইতে বেশি আনন্দ করলো তারা হল সেঁজুতি আর তনু I ওদের দেখে বোঝার উপায় নেই যে আজ ওদের বাবা মায়ের বিয়ে হচ্ছে I সবচাইতে ব্যস্ততায় দিন কেটেছে নাজমার I এরমধ্যে ও কয়েক দফায় মাসুদের সঙ্গে ঝগড়া করে ফেলেছে I মাসুদ ওদের সবচাইতে ছোট ভাই I সকালে যখন ওকে ফোন করে আসতে বল হল ও বলল
– ভাইয়া তুমি একটু এসে দাওয়াত দিলে ভালো হয় I তা না হলে রেশমির আব্বা আসবেন না
– আচ্ছা আমি দেখছি
নাজমা মুনিরের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে বলল
-তোর শ্বশুরের মত তোরও একটু আত্মসম্মানবোধ থাকা উচিত ছিল I ঘর জামাই হয়ে বসে আছিস আবার শশুরের সম্মান নিয়ে কত চিন্তা I তোর মোটা শ্বশুরের না আসলেও চলবে আমার ভাইয়ের বিয়েতে I
– আহা নাজমা কি শুরু করলি I ফোনটা দে আমাকে
– না ভাইয়া I শোন তোর না আসলেও চলবে I আজতো শুক্রবার I গিয়ে তোর শ্বশুরের পায়ে তেল মালিশ কর I ভাইয়ের বিয়েতে এসে সময় নষ্ট করবি কেন ?
বাধ্য হয়ে মুনিরকে ফোনটা টেনে নিতে হলো I মাসুদ ততক্ষণে ফোন কেটে দিয়েছে I মুনির কোনমতে বুঝিয়ে সুজিয়ে ওকে আসতে রাজি করালো I নাইলে মা খুব কষ্ট পাবে I যদিও আসার পরেও দুজনের আবার বেধে গেল I

বিয়ে পড়ানোর পর নাজমা অনিমা কে মুনিরের ঘরে বসিয়ে রেখে গেল I অনিমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে I এইভাবে সেজেগুজে বিছানায় বসে থাকতে I যদিও অনিমা খুব একটা সাজেনি I একটা টিপ পর্যন্ত দেয়নি I তবুও ওকে দেখতে অন্যরকম সুন্দর লাগছে I মনির একবার এসে দেখে গেল একজনের সঙ্গে কথা বলার অজুহাতেI আগত অতিথীরা অনেকেই বিদায় নিয়ে চলে গেছে I আবরার আর সোহানা এসেছিল I মনির কে একটা অনেক দামি ঘড়ি আর অনিমাকে একটা সোনার ব্রেসলেট উপহার দিয়ে গেছে I অনিমার যদিও ইচ্ছে ছিল না ওদের থেকে কোন উপহার নেয়ার কিন্তু বাধ্য হয়েই নিতে হলো I
অনিমা অনেকক্ষণ ধরে একা একা বসে আছে I ওর একবার খুব মুনিরকে দেখতে ইচ্ছা করছে I খুবই নির্লজ্জ ধরনের ইচ্ছা I ওদের বিয়ে হয়ে গেছে I কিছুক্ষণ পর মুনির এমনি এখানে আসবে I তবু কেন এখনই দেখতে ইচ্ছা করছে I একজনকে সঙ্গে নিয়ে মুনির ঘরে ঢুকলো I অনিমা মাথা নীচু করে বসে ছিল I ওদের ঢুকতে দেখে উঠে দাঁড়ালো I মুনির বলল
– অনিমা উনি আমাদের পাশের কোয়াটারে থাকেন I মালেক স্যার I আমাকে খুবই স্নেহ করেন I
অনিমা সালাম দিল I মালেক স্যার কিছুক্ষণ কথা বলে বিদায় নিলেন I অনিমা মুগ্ধ হয়ে দেখল মনির হাসতে হাসতে উনাকে বিদায় জানাচ্ছে I মনে হলো অনেক বছর পর এই হাসিটা দেখল অনিমা I একসময় এই হাসিটা দেখলে ওর সারারাত ঘুম হতো না I

রাত প্রায় বারোটার কাছাকাছি বাজে I অতিথিরা প্রায় সবাই চলে গেছে I নাজমা আজকে থাকবে I কিছুক্ষণ আগে বাচ্চারা সহ এসেছিল I অনিমাকে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে ও যেন সেজুতিকে নিয়ে চিন্তা না করে I ওরাও বিদায় নিয়ে চলে গেছে অনেকক্ষণ I মনির এল আরো কিছুক্ষণ পর I অনিমা তখন ও ওই ভাবেই বসেছিল I অনিমাকে ওইভাবে দেখে মনির একটু অবাক হল I তবে খুশি হল খুব I ওর খুব ইচ্ছে করছিল অনিমার চিবুক টা ধরে ওর মুখটা একটু দেখতে কিন্তু সাহস হলো না পাছে অনিমা রাগ করে I
মুনির ঘরে ঢুকে বলল
– অনিমা তুমি চেঞ্জ করে নাও I তোমার উপর অনেক ধকল গেছে I চেঞ্জ করে শুয়ে পড়ো I
অনিমা বুঝল না ওর উপর কি এমন ধকল গেলো I তবে ও কথা বাড়ালো না I শাড়ি নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল I বের হয়ে মনিরকে কোথায় দেখলো না I

অনিমা একটা হালকা কমলা সুতির শাড়ি পরেছে I চুল ছেড়ে দিয়েছে I চুল বেঁধে ও ঘুমাতে পারে না I অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করেও ওর ঘুম এলো না I হয়তো নতুন জায়গা বলে I অনিমা আস্তে করে উঠে বারান্দায় গেল I মুনির সোফায় বসে মোবাইলে আজকের ছবিগুলি দেখছিল I অনিমাকে দেখে অবাক হল I অনিমা একটু ইতস্তত করে বলল
– ঘুম আসছে না একটু বসি ?
– হ্যাঁ বস I আজকের ছবি গুলো দেখছিলাম I দেখো বাচ্চাদেরকে কি সুন্দর লাগছে
অনিমা একটু এগিয়ে এসে বসলো I বাচ্চারা সবাই একই রঙের ড্রেস পড়েছে I ভারী সুন্দর লাগছে সবাইকে I দুজনে অনেকক্ষণ ধরে ছবিগুলো দেখল I রাত তখন গভীর হয়েছে I চারিদিক সুনসান I মনির একসময় বলল
– তুমি কি আমার উপর রেগে আছো অনিমা ?
অনিমা জবাব দিল না I কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মনির বলল
– একটা গান শোনাবে ?
অনিমা এবারেও কিছু বলল না I তবে ও খুব আস্তে করে ওর মাথাটা মনিরের কাঁধে রাখল I মুনির একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল I যাক অনিমা তাহলে সহজ হয়ে এসেছে I অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর ও যখন অনিমা গান শুরু করল না মুনির তখন পাশ ফিরে তাকিয়ে হেসে ফেললো I অনিমা ঘুমিয়ে পড়েছে I মুনির একটা হাত দিয়ে ওকে আগলে নিল তারপর অন্য হাতে ওর চুলগুলো মুখ থেকে সরিয়ে দিতে দিতে বলল
– তুমি একেবারে আগের মতই আছো I তবে আমি তোমাকে এখন আগের চাইতে ও অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি I

পর্ব 19. 2

অনিমা যখন ক্যাম্পাসে পৌঁছালো তখন আটটার বেশি বাজে I কাল সারারাত উত্তেজনায় ও ঘুমাতে পারিনি I সারারাত এপাশ-ওপাশ করে কেটেছে I বারবার শুধু মনে হচ্ছিল ও মুনিরকে কি বলবে, ও কিভাবে রিঅ্যাক্ট করবে I আচ্ছা, এমন যদি হয় মনির ওকে ভালোই বাসেনা সবটা অনিমার মনের ভুল I তখন? থাক না I নাইবা ভালবাসলো I অনিমা তো কিছু চাইছে না ওর কাছে শুধু নিজের মনের কথাটাই বলছে I এভাবে কিছু না বলে থাকলে ও দম বন্ধ হয়ে মরে যাবে I তার চেয়ে এই ভালো সবটা বলে নিজের কাছে হালকা হয়ে যাওয়া I ও কাউকে ভালোবাসে বলে তারও ওকে পাল্টা ভালবাসতে হবে এমন তো কোন কথা নেই I কিন্তু কি করে বলবে ? অনেক ভেবে চিন্তে অনিমা একটা পথ বের করেছে I মুনির বলেছিল ও বই পড়তে ভালবাসে I অনিমা ওর সবচাইতে প্রিয় বই এর প্রথম পাতায় একটা গান লিখল I বই এবং গান দুটোরই নাম ’’ তোমাকে’’I এই গানটা ও যতবার শুনেছে মনে হয়েছে কেউ ওর মনের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্যই লিখেছে I অনিমা গোটা গোটা হরফে লিখল

তুমি হাসলে আমার ঠোঁটে হাসি,
তুমি আসলে জোনাকি রাশি রাশি
রাখি আগলে তোমায় অনুরাগে
বলো কিভাবে বোঝাই ভালোবাসি?
সব চিঠি সব কল্পনা জুড়ে
রং মিশে যায় রুক্ষ দুপুরে
সেই রং দিয়ে তোমাকেই আঁকি
আর কিভাবে বোঝাই ভালোবাসি।

প্রাণ দিতে চাই, মন দিতে চাই
সবটুকু ধ্যান সারাক্ষন দিতে চাই তোমাকে ।

স্বপ্ন সাজাই, নিজেকে হারাই
দুটি নিয়নে রোজ নিয়ে শুতে যাই তোমাকে ।

জেনেও তোমার আঁখি চুপ করে থাকে
রোজ দুইফোঁটা যেন আরও ভালো লাগে
গানে, অভিসারে, চাই শুধু বারেবারে তোমাকে

পরের অংশটুকু আর লিখতে পারলো না I খুব লজ্জা করল I অনিমা ঠিক করল যদি মুনির ও কোন দিন ওকে ভালোবাসে তবে এই গানটা ওকে গেয়ে শোনাবে I তবে অনিমার এই ইচ্ছাটা পূর্ণ হতে যে দীর্ঘ 13 বছর কেটে যাবে এটা ও সেদিন কল্পনাও করতে পারেনি I

বিদ্যুৎ কান্তি স্যার এর ক্লাস শুরু হয়ে গেছে I এই ক্লাসে দেরি করে ঢোকার কোন মানেই হয়না I ক্লাসভর্তি ছেলে মেয়ের সামনে স্যার ধমক দেবেন I আচ্ছা , মুনির ও নিশ্চয়ই ক্লাস করছে I ওর সামনে আজ এরকম অপ্রস্তুত হওয়া যাবে না I অনিমা চট করে সাইন্স লাইব্রেরীতে ঢুকে গেল I উত্তেজনায় ওর বুক কাঁপছে I দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে কারো সঙ্গে ধাক্কা খেলো I হাত থেকে ছিটকে বইটা পড়ে গেল I অনিমা পেছন ফিরে দেখল বইটা সিঁড়ির কয়েক ধাপ নিচে গিয়ে পড়েছে I অনিমা তুলতে যাওয়ার আগেই কেউ একজন ওর পাশ কাটিয়ে নেমে গেল I বইটা তুলে ওর হাতে নিতেই অনিমা বিস্ময় হতবাক হয়ে বলল
– তুমি ? ক্লাস করছ না ?
মুনির হেসে ফেলল তারপর অপরাধীর ভঙ্গিতে বলল
– দেরি করে ফেলেছি তাই আর ঢুকলাম নাI কিন্তু তোমার কি খবর ? তুমি কেমন আছো ? তুমি তো বলেছিলে আসবে ? জ্বর হয়েছিল অনিমা ? মুনিরের কন্ঠে উদ্বেগ ঝরে পড়ল I
ভালো লাগলো অনিমার I প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে অনিমা বলল
– তোমাকে কিছু বলার ছিল মুনির I আমরা কি কোথাও বসতে পারি ?
– হ্যাঁ বল I এখানে বসতে চাও ?
– না I এখনই ক্লাস শেষে সবাই বের হয়ে আসবে I
– তাহলে? কার্জন হলের দিকে যেতে চাও ?
– এরপর তো ল্যাব শুরু হবে সবাই ওখানে যাবে
– তাহলে বরং টিএসসি যাই চলো
– আচ্ছা I অনিমা রাজি হয়ে গেল I

অনিমা আজ গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে I শেষ পর্যন্ত আজ কি হবে ও জানে না I তাই গাড়িটা রাখেনি I যেটাই হোক না কেন ও কিছুক্ষণ একা থাকতে চায় I
ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই ওরা দুজন একটা রিক্সা নিয়ে টিএসসির দিকে চলে গেল I

চলবে….
লেখনীতে
অনিমা হাসান
তোমাকে
পর্ব 20.1

অনিমার যখন ঘুম ভাঙলো তখন সবে ভোরের আলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে I জানালার ফাক গলে ভোরের নরম আলো ঘরের ভেতর এসে পড়ছে I চারিদিকে আবছা অন্ধকার I অনিমা চোখ খুলে মনে করার চেষ্টা করল ও কোথায় I সহসা কিছু মনে করতে পারলো না I অচেনা ঘর ,অচেনা জানালার পর্দা সব মিলিয়ে কেমন নতুন অনুভূতি I অনিমা মনে করতে পারল না ও এখানে কি করে এসেছে I যতদূর মনে পড়ছে ও বারান্দায় বসে ছিল I মুনির ওকে বিয়ের ছবি দেখাচ্ছিলো I তবে কি ওই ওকে এখানে নিয়ে এসেছে ? এসব কি হচ্ছে ওর সাথে ? অনিমা ভয়ে ভয়ে পাশ ফিরে তাকালো I হাতের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে মুনির I মনে হচ্ছে কেবলই ঘুমিয়েছে I ওকি সত্যিই ঘুমাতে পারে না? কি অদ্ভুত I কেন ? হঠাৎ করে ওর ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে বহু বছর আগের কথা মনে পড়ে গেল অনিমার I একবার ওকে দেখার জন্য ভোরবেলা ক্যাম্পাসে ছুটে যেত অনিমা I কি সব পাগলামিতে ভরা ছিল সেসব দিনগুলো I একদিন ওকে না দেখলে মনে হতো দম বন্ধ হয়ে আসছে I কি তীব্রভাবে চেয়েছিল ও মুনিরকে অথচ মুনির ওকে কোনদিনও ভালোবাসেনি I অনিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাট থেকে নেমে গেল I

অনিমার শাশুড়ি মা ওকে একটা লাল পাড় হলুদ শাড়ি দিয়েছেন I বলেছেন আজ সকালে এটা পড়তে , কয়েকজন দেখা করতে আসবে I অনিমা স্নান সেরে ,শাড়ি বদলে ঘর থেকে বের হল I রেহানা বেগম তখন পরোটার জন্য আটা মাখছিলেন I অনিমা কে দেখে হাসলেন I অনিমা কাছে গিয়ে বলল

– আমি কিছু করব ?
– না, সব তো করাই আছে I আমি শুধু পরোটা গুলা বেলবো , নাজমা ভেজে দেবে I তুমি একটু বাচ্চাদের দেখে এসো , কি যে মজা করে ঘুমাচ্ছে I

অনিমা ঘরে ঢুকে হতবাক হয়ে গেল I চারজন খাটে গাদাগাদি করে শুয়ে আছে I ইফতি আর তনু , সেজুতিকে দুদিক থেকে জড়িয়ে ধরে আছে I ইস্তি জায়গা না পেয়ে ওর পা জড়িয়ে ধরে গুটিসুটি মেরে পরে আছে I অনিমার চোখে জল এসে গেল I ওর মেয়েটার ভাগ্যে এত ভালোবাসা ছিল I ও নিজে কখনো ওকে এসব দিতে পারত না I
– দেখলে ভাবি এক দিনেই কেমন ভাব হয়ে গেছে এদের
অনিমা চোখ মুছে হাসলো
-তোমার মেয়েটা ভারী মিষ্টি I চলো খাবে I ভাইয়ার একটা মিটিং আছে I এখনই বের হবে I
– মুনিরের মিটিং আছে ? বলেনি তো কিছু
– আমাকে এইমাত্র বললো I তোমাকে খুঁজছিল
– আচ্ছা আমি দেখছি

ঘরে ঢুকে অনিমা হেসে ফেলল I মুনির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই এর সাথে যুদ্ধ করছে I
– তুমি টাই বাধতে পারোনা ?
– টাই বাধা আমার কাছে পৃথিবীর কঠিনতম কাজ
– দাও আমি করে দিচ্ছি
মুনির খুব অবাক হয়ে গেল I অনিমা খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে , এত কাছে যে ওর শরীরের উত্তাপ টের পাওয়া যাচ্ছে I আচ্ছা , অনিমা এভাবে কাকে টাই বেঁধে দিত ?
– তুমি টাই বাধা কার কাছে শিখেছ অনিমা ?
– বাবার কাছে I আমি সবসময় বাবাকে টাই বাধে দিতাম I তবে এভাবে কখনো বাধিনি I সবসময় নিজের গলায় পড়ে বেঁধে দিতাম I তাই এখন একটু সময় লাগছে I
মুনির মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল I তারপর বলল
– থ্যাঙ্ক ইউ অনিমা
– এই সামান্য একটা টাই এর জন্য ?
– না
– তাহলে ?
– ফর এভরিথিং
অনিমা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল I কাটা কাটা গলায় বলল
– SHOULD I SAY THANKS TOO ? OR I SHOULD SAY I’M GRATEFUL TO YOU .

মুনিরের হঠাৎ মনটা খারাপ হয়ে গেল I এই মেয়েটা কে ও এত বেশি ভালোবাসে অথচ ও কি সারা জীবন ওকে ভুল বুঝেই যাবে ? মুনির আর কিছু বলল না , ফাইল নিয়ে বেরিয়ে গেল I

মুনির যখন ফিরল তখন প্রায় দুপুর হয়ে এসেছে I অনিমা ওর জামা কাপড় গুলো আলমারিতে গুছিয়ে রাখছিল I সুটকেস এর ভেতর থেকে শঙ্খ আর অনিমার বইটা বের হলো I মুনিরের স্মৃতি বলতে ওর কাছে এই দুটো জিনিসই আছে I এ দুটো ও কখনো নিজের থেকে আলাদা করে না I অনিমা ভেবেছিল মুনিরের সাথে আর কোনদিন দেখা হবে না I তাই এদুটো সঙ্গে নিয়ে এসেছিল I অনিমা শঙ্খটা যত্ন করে ভেতর রেখে বইটা খুলে দেখছিল I তখনই মুনির ঘরে ঢুকলো I অনিমার হাতে বইটা দেখে চমকে গেল I এটা ও এখানেও নিয়ে এসেছে ? এত স্পেশাল এটা ওর কাছে ? অনিমা প্রথম পাতায় গানের লাইনগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেছিল I কি প্রচণ্ড রকম ভালোবাসতো ও মুনিরকে অথচ সেটা ওকে কোনদিন বলতেই পারল না I
– এই বইটা তোমাকে কে দিয়েছে অনিমা ?
অনিমা চমকে উঠল I মুনির কি তবে এই বইটা দেখেছে ? হয়তো ওর বইয়ের আলমারিতে দেখেছো কোনদিন I
– কে দিয়েছে ? মুনির আবারো জানতে চাইলো
– কেউ দেয়নি I এটা আমার বই I আমি কিনেছিলাম I
– আর ওই লেখাটা ?
অনিমা বেশ অবাক হল I মুনির লেখাটা ও পড়েছে ? আশ্চর্য তো
– ওটা আমারই লেখা
– তোমার ? তোমার লেখা ?
– হ্যাঁ I তুমি বোধহয় আমার বাংলা হ্যান্ড রাইটিং দেখনি তাই চিনতে পারোনি I

মুনির হতভম্ব হয়ে গেল I তার মানে কি অনিমা এটা অন্য কাউকে দিতে চেয়েছিল I আরো কি কেউ ছিল ওর জীবনে ? কি সব নাম যেন বলতো হাসির , তাদের মধ্যে কেউ ? মুনির আর ভাবতে পারছে না I দম বন্ধ হয়ে আসছে I সবকিছু ছাপিয়ে যে চিন্তাটা মাথায় আসছে সেটা আরো ভয়ঙ্কর I ইচ্ছা করছে বইটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতে I মুনির ঘর থেকে বেরিয়ে গেল I

-ভাবি আসবো ?
– হ্যাঁ নাজমা এসো
– ভাইয়ার জন্য এই শরবতটা এনেছিলাম
– কোথায় ও ?
– মনে হয় উঠানে
-আচ্ছা আমি দিয়ে আসছি

উঠানে এসে অনিমার মনটা ভাল হয়ে গেল I এত সুন্দর একটা উঠান I গাছ লাগালে খুব সুন্দর লাগতো I মুনির বাইরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল I অনিমা ওর হাতে গ্লাসটা দিয়ে বলল

– তোমাদের এত সুন্দর উঠান I গাছ লাগাওনা কেন ?
– তুমি লাগিও I
– এখানে একটা বাগান বিলাস হলে খুব সুন্দর হতো আর ওই পাশে একটা শিউলি I আচ্ছা , ডিপার্টমেন্টে একটা শিউলি ফুলের গাছ ছিল না ? তোমার মনে হচ্ছে একবার তুমি ………
অনিমা চুপ করে গেল I কথা শেষ করল না I

মুনির একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অনিমার দিকে I সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস রুম থেকে ওই গাছটা দেখা যায়I মুনির যখনই সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস নেয় ওই গাছটা দেখে আর অনিমাকে মনে করে I কি ভীষণ খুশি হয়েছিল ও সেদিন I ওর সব কিছু মনে আছে ? তাহলে ও কেন নিজেকে এত দূরে সরিয়ে রাখে ?

তোমাকে
পর্ব 20.2

ওরা যখন টিএসসি পৌঁছলো তখনো টিএসসি জমে উঠেনি I একটা আবৃত্তি দল গোল হয়ে বারান্দার কোনায় বসে আছে I বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু ছেলে মেয়েরা আড্ডা দিচ্ছে I মুনির আর অনিমা সামনের করিডোরের কাছে বসলো ঘাসের উপর পা ছড়িয়ে I অনিমা কিছু বলছে না I মাথা নিচু করে বসে আছে I কাধের ব্যাগটা নামিয়ে পাশে রেখেছে I কোলের উপর এখনো ও বইটা রাখা I মুনির আড়চোখে একবার অনিমাকে দেখল I এই মেয়েটার ব্যাপার-স্যাপার কিছুই বোঝা যাচ্ছে না I তিন দিন ধরে উধাও হয়ে ছিল I এই তিন দিনে মুনির এক ফোঁটা ঘুমাতে পারেনি এক মুহুর্ত স্বস্তি পায়নি I শুধু মনে হয়েছে অনিমা ঠিক আছে কি না I গতকাল একটা ক্লাস টেস্ট ছিল, ভেবেছিলো তখন হয়তো অনিমা আসবে I বারবার গেটের দিকে তাকাচ্ছিলো এই হয়তো অনিমা ঢুকবে I লেখায় এতোটুকু ও মনোযোগ দিতে পারছিল না I শেষে খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে গেছে I স্যার খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন
– মুনির তোমার লেখা শেষ হয়ে গেল ?
– স্যার আমার প্রিপারেশন ভালো নেই
একথা বলে মুনির আর দাঁড়ায়নি I সারাদিন উদভ্রান্তের মত ঘুরেছে I ক্লাসের কয়েকটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করেও অনিমার ফোন নাম্বার পায়নি I একবার মনে হল নিলার কাছ থেকে নেয়া যায় কিন্তু পরমুহুর্তেই মনে হল না থাক I হাসিব থাকলে অবশ্য কোন সমস্যা হতো না I কিন্তু ও ঢাকার বাইরে গেছে I ওর কাজিনের বিয়ে I অনিমার বাসা অবশ্য ও চেনে I কিন্তু বাসায় যাওয়াটা বোধ হয় ভালো দেখাবে না I মুনিরের নিজের ও কিছু বলার আছে অনিমাকে I আর দুদিন পর রেজাল্ট দেবে I মুনির ভেবেছিল ঐদিন ওকে শাড়িটা আর চিঠিটা দেবে I কিন্তু অনিমা কি বলতে চায় সেটা আগে শোনা দরকার I

অনিমা মাথা নিচু করে বসে আছে I মুনিরের কেন জানিনা মনে হল মেয়েটার খুব মন খারাপ I কিছু একটা নিয়ে ও খুব অস্থিরতার মধ্যে আছে I মুনির নরম গলায় বলল
– অনিমা তুমি কিছু বলবে বলছিলে
অনিমা ওর গভীর কালো চোখ দুটো তুলে তাকালো I মুনিরের মনে হলো এই চোখের দিকে তাকিয়ে একটা জীবন অনায়াসে পার করে দেয়া যায় I মুনির ঘোরলাগা কন্ঠে বলল
– বল , আমি শুনছি
– আমি, আমি আসলে……
– মুনির ভাই
-সজল তুই ?
– সুমন ভাই ফোন দিসে I বলছে আর্জেন্ট

মুনির একটু বিরক্ত হল I সুমনের সাথে আজ সকালেই কথা হয়েছে I এরমধ্যে এমনকি আর্জেন্ট ইসু থাকতে পারে ? মুনির ফোন দিয়ে উঠে গেল I
– আপা স্লামালিকুম
– ওয়ালাইকুম আসসালাম I কি ব্যাপার সজল ক্লাস করছ না ?
– না আপা I সকালের ক্লাসটা ক্যান্সেল হইছে
– ও আচ্ছা
অনিমা আর কথা বাড়ালো না I দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মুনিরকে লক্ষ করতে লাগলো I মনে হয় কোন সমস্যা হয়েছে I মুনির ভুরু কুঁচকে কথা বলছে I দুমিনিটের মধ্যেই মুনির কথা বলা শেষ করে ফোনটা সজলকে ফিরিয়ে দিল I সজল সালাম দিয়ে চলে গেল I
-কোন সমস্যা মুনির? অনিমা জানতে চাইল
– হ্যাঁ I চেয়ারম্যান স্যার আমাকে দেখা করতে বলেছেন I এখনই I
– ও I তাহলে তো তোমার যাওয়া উচিত I অনিমা বিষন্ন কন্ঠে বলল
– চলো তাহলে ডিপার্টমেন্টে যাই I যেতে যেতে কথা বলি
– না তুমি যাও I আমি বাসায় চলে যাব I আমার আর ক্লাস করতে ইচ্ছা করছে না I
-চলো তোমাকে রিক্সায় তুলে দেই
– না ঠিক আছে I আমি চলে যাব I অনিমা উঠে দাঁড়ালো তারপর পেছন ফিরে হাঁটতে আরম্ভ করলো
– অনিমা দাঁড়াও
মুনির দৌড়ে গিয়ে ওকে আটকালো
– তোমার বইটা
– ও আচ্ছা I থ্যাংকস
– আমারও তোমাকে কিছু বলার ছিল I আমি কি তোমাকে ফোন করতে পারি ? যদি তোমার ফোন নাম্বারটা দিতে I
অনিমা ফোন নাম্বার দিল I
– আমি চারটার সময় ফোন করবো
– আচ্ছা I আমি অপেক্ষা করবো
– চলো তোমাকে রিক্সায় তুলে দিয়ে আমি যাই
– আচ্ছা চলো

মুনির অনিমার হাত ধরলো I ওর মনটা ভীষণ খারাপ লাগছে I অনিমাকে একা ছাড়তে ইচ্ছা করছে না I অনিমা কিছু বলতে চেয়েছিল I ওকে খুবই বিষন্ন দেখাচ্ছে I অনিমা একটা ঘোরের মধ্যে হাঁটছে I ওর মনে হল ওদের আশপাশে কেউ নেই I সমস্ত চরাচর শূন্য I এই পৃথিবীতে একমাত্র ওরাই দুজন মানব মানবী I অনিমা মনে মনে বলল, মুনির আমার হাতটা কোনদিনও ছেড়ে দিওনা I

চলবে….

লেখনীতে
অনিমা হাসান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here