ঝগড়া,পর্ব_৬

ঝগড়া,পর্ব_৬
বিন্দু মালীনি

কিভাবে রণ আম্মুকে বশে আনলো।
আর কি হয়েছিলো সেদিন আমি অজ্ঞান হয়ে যাবার পর,
যে রণ আমাকে খুব সহজেই ওর সাথে করে আমাকে বাসে করে নিয়ে আসতে পারলো।

আমি আম্মুকে বাইরে নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলাম,

_আম্মু,
_হুম বল।
_আম্মু এই বিয়েটাতে তোমরা রাজি হলে কিভাবে?আর রণকে সেদিন আমাকে নিয়ে আসতে দিলে কেন?আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলার পর কি হয়েছিলো সেদিন?

_তেমন কিছুনা।যা হয়েছে হয়েছে।তুই ওসব ভুলে যা।আর নতুন করে আবার স্বপ্ন সাজা।
রণকে নিয়ে সুখী হ।

_সব ঠিক আছে,
তবে আমি জানতে চাই কি এমন হয়েছিলো সেদিন,যার কারণে আমাকে বিয়ের আসর থেকে রণর সাথে আসতে দিয়েছো।

_তবে শোন,

সেদিন যখন রণ তোকে থাপ্পড় দেয় আর তুই অজ্ঞান হয়ে যাস,
তখন সবাই আমাকে ডাকে।
আর আমি এসে দেখি তুই অজ্ঞান হয়ে গেছিস।

আমি এসে রণকে বললাম,

_কি করেছো তুমি আমার মেয়েকে?
ও এভাবে পড়ে আছে কেন?

রণ তখন সোজা আমার হাত ধরে ফেলে।
আর বলে,

_আম্মু,আপনি যেহেতু বিন্দুর আম্মু,সেহেতু আমারো আম্মু,
তাই আমি আপনাকে আম্মু বলেই ডাকলাম।

আম্মু আমি বিন্দুকে ভালবাসি।
শুধু ভালবাসি বললে ভুল হবে,আমি ওকে অনেক ভালবাসি।

আমি ওকে ছাড়া বাঁচবোনা,এ কথা আমি বলবোনা।কারণ মানুষ প্রিয় মানুষকে হারানোর পর ঠিকই বাঁচে।কিন্তু সেই বাঁচা কে বাঁচা বলেনা।

আমি ওকে ছাড়া বেঁচে থাকবো ঠিকই।তবে জিন্দা লাশ হয়ে।

প্লিজ আম্মু,আমাকে জিন্দা লাশ করে দিবেন না।
আমি কথা দিচ্ছি,আমি ওকে ভালো রাখবো।

_কিন্তু একটু পরই যে ওর..

_আম্মু দোহায় লাগে আমাকে না করবেন না।
আপনার না ছেলে নেই?
আমাকে একটা বার আপনার ছেলে হয়ে থাকার সুযোগ দিন।

আমি আপনার মেয়ের জামাই না।আমি সারাজীবন আপনার ছেলে হয়ে থাকবো।
কোন দিন ছেলের অভাব বুঝতে দিবোনা।

আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না আম্মু।

জানিস বিন্দু,
রণ যখন কথা গুলো বলছিলো ওর চোখ থেকে টুপটুপ করে বৃষ্টির ন্যায় পানি পড়ছিলো।

আমার হাত দুটো ওর দু হাত ধরে ওর নাকের সামনে ধরে কাঁদতে লাগলো।

তারপর আমি আমার ছেলেটার হাত থেকে আমার হাত সরিয়ে নিয়ে ওকে বুকে জড়িয়ে নিলাম।

আমি সেদিন পারিনি আমার ছেলের চোখের জল দেখতে।

সেদিন মনে হচ্ছিলো সত্যি সত্যি আমার ছেলের অভাব পূরণ হয়ে গেলো আজ।

আমি যেন সেদিন কোন ছেলের মা হয়ে গেলাম।

আম্মু কথা গুলো বলছিলো আর আম্মুর চোখের পানি গুলো মুছছিলো।

আমার হাসি ভরা ঠোঁটের সাথে চোখ ভরে গেলো জলে।

আমার রণ আমার আম্মুর ছেলের অভাব পূরণ করে দিয়েছে।

_তারপর আমি ওকে বললাম,আমার ছেলেকে আমি এভাবে কাঁদতে দিবো?
সেটা কি করে ভাবলি?

যা নিয়ে যা তোর বউকে।
এই মেয়ের জন্য আমি আমার ছেলেকে হারাতে পারবোনা।

রণও আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো।
আমার কপালে একটা চুমু খেয়ে বেলার দিকে তাকিয়ে বল্লো,

আমি আমার বউ নিয়ে গেলাম।
আর আমার আরেক মাকে রেখে গেলাম,

মাকে দেখে রেখো।

আমি অতি শীঘ্র তোমাদের নিতে আসবো।
রেডি থেকো।

_আপুনি আপনার বউ,আম্মু আপনার আম্মু,আমি আপনার কি হলাম তাহলে?

_হা হা হা,তুমি আমার বোন।

বিন্দু বলেছিলো,তুমি নাকি ভাই নেই বলে মাঝে মাঝে মন খারাপ করো?
আজ থেকে আর মন খারাপ করতে হবেনা।

আজ থেকে আমি তোমার ভাই।
মনে থাকবে?

বেলাও রণকে জড়িয়ে ধরে ভাইয়া বলে কেঁদে দিলো।

তারপর আমাকে আর বেলাকে রেখে তোকে কোলে তুলে নিয়ে রণ চলে এলো।

তোর চাচারা ঝামেলা করেছিলো যদিও,
আমি বলেছি,আমার মেয়েকে আমি সুখী দেখতে চাই।
আর আমি আজ বুঝে গেছি,আমার মেয়ের সুখ কোথায় এবং কার কাছে।

রণ তোকে নিয়ে চলে আসে।
আর একটু পরই ওই ছেলে পক্ষ আসে।
আমি তাদের কাছে হাত জোর করে ক্ষমা চেয়ে নেই।

আর বাকিটা তো তুই জানিস ই।

_আর আব্বু?আব্বুকে কিভাবে ম্যানেজ করলে?

_সব কিছু খুলে বললাম,খুব রাগারাগি করলো।
কথা বলেনি আর আমার সাথে।

তারপর রণ ফোন করে বোঝায়।
আর তোর আর রণর মুখের দিকে চেয়ে তার রাগও মাটি হয়ে যায়।

এই হলো কাহিনী।

রণ খুব ভালোরে,ওকে আগলে রাখিস।
এমন ছেলে আর হয়না।
ও তোকে খুব ভালবাসে।

আমি আম্মুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম।

আম্মুও কাঁদতে লাগলো।
সাথে বেলাও।

হঠাৎ রণ এসে হাজির।

_কি ব্যাপার?এখানে এত কান্নাকাটি কিসের?

আমি কি একবারে নিয়ে এসেছি নাকি তোমাকে যে তুমি কাঁদছো,আর আমার আম্মু আর বোনকেও কাঁদাচ্ছ।
নিজে কাঁদো মন ভরে কাঁদো কোন সমস্যা নাই।

আমার বোন আর আম্মুকে কাঁদাবে না একদম।

আমি এবার আম্মুকে ছেড়ে রণকে জড়িয়ে ধরলাম।

সরি রণ সরি,আই লাভ ইউ কলিজা।
আই লাভ ইউ ভেরি মাচ।

_হা হা হা,পাগলি একটা।
আই লাভ ইউ টু।

রণও আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।

কিছু ক্ষণ পর আমাকে সরিয়ে দিতে দিতে বল্লো,

দেখেছেন আম্মু?
এই মেয়ের কান্ড?
লজ্জা শরম কিচ্ছু নাই,
কিভাবে আমার আম্মু আর বোনের সামনে আমাকে জড়িয়ে ধরে,

আমি গেলাম রেগে।
আর একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে চলে আসলাম ভেতরে,

আর বলে আসলাম,

আমার লজ্জা শরম নাই না?
দেখিস আজ থেকে,লজ্জা কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি সব এক সাথে দেখাবো।

মা আর আম্মু দুপুরে রান্নাবাড়া করলেন।
সবাই খেয়েই আমরা যার যার মত রেস্ট নিতে চলে গেলাম।

আমি রুমে যেতেই রণও এসে হাজির।

গিয়েই আমাকে জড়িয়ে ধরে।

_খাবার টেবিলে বসে একটা বারের জন্যও আমার দিকে তাকাওনি তুমি।

কেন?হুম?

আর আমার প্লেটে কিচ্ছুটি বেড়েও দিলেনা।

তুমি না আমার বউ হ্যাঁ?এখন থেকে তো আমাকে দেখে শুনে খাওয়াবে তুমিই।

তা না,নিজেই খেয়ে দেয়ে উঠে চলে এলেন।

এইভাবে কারো দিকে না তাকিয়ে পেট পুড়ে খান বলেই এমন নাদুসনুদুস হচ্ছেন।

আমি জানি রণ আমাকে রাগাতেই কথা গুলো বলছে।
আর আমিও বা কম কিসে,তখন আম্মু আর বেলার সামনে বলেছে না আমার লজ্জা নেই।এবার আমি লজ্জা কাকে বলে বুঝাবো।

_ছাড়ুন,ছাড়ুন,কি করছেন আপনি?
এভাবে জড়িয়ে ধরেছেন কেন?
সবে মাত্র বিয়ে হয়েছে।দু দিনও হয়নি।দু দিনেই লজ্জা ভেঙে যাবে?মিনিমাম ছয় মাস লাগবে আমার লজ্জা ভাঙতে।জানেন কত লজ্জাবতী আমি?

আর আপনি কিনা এখনই আমাকে এইভাবে জাপটে ধরবেন?

আমি আমার শাড়ীর আঁচল টা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে বললাম,
স্বুয়ামি,আপনি আমাকে এই ভাবে জড়িয়ে ধরবেন নাগো।
আমার লজ্জা করে।হি হি।

আর রণকে ধাক্কা দিয়ে খাটের উপর ফেলে দিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে এলাম।

বেচারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আর আমি বাইরে এসে হাসতে লাগলাম,

ডিয়ার বর,
আজ থেকে তুমি দেখবে আমার লজ্জা।

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here