জেদ,পার্ট২৮,২৯

#জেদ,পার্ট২৮,২৯
(A Conditional LoveStory)
#আফরিন_ইনায়াত_কায়া
পার্ট২৮
.
.
সংসার নারীদের জীবনের একটা অমোঘ সত্য।একবার সংসারের বাধাজালে আটকা পরলে সেখান থেকে মুক্তির উপায় হয়তো খুব কম নারীই জানেন।বেশির ভাগ মেয়ের জীবন কেটে যায় সংসারের ঘানি টানতে টানতে। নিজেকে নিয়ে ভাবার,নিজেকে ভালোবাসার সময় টুকু ফুরিয়ে যায় তাদের জীবন থেকে।আমার বেলায় হয়তো সেই নিয়মটাই প্রযোজ্য হচ্ছে।
আজকে আমার আর আরাজের বিয়ের ৩ মাস প্রায়।বিয়ের সপ্তাহ খানেক পরেই আরাজের বড় বোন মুনতাহা আপু তার শ্বশুর বাড়িতে চলে যান।নিশিতা আছে ভার্সিটিতে। মাস দুয়েক থেকে আরাজের মায়ের বুক ব্যাথাটা বেশ বেড়ে গিয়েছে।তাই সংসারের সবটুকুন দায়িত্ব এসে পড়েছে আমার ঘাড়ে।রান্না থেকে শুরু করে ঘর মোছা পর্যন্ত আমাকেই দেখতে হয়। সুন্দর একটা সাজানো গোছানো সংসার।দম ফেলবার সময়টুকু যেন নেই।ঠিক এইটাই চাওয়া ছিল আমার বাবা মায়ের।।তাদের স্বপ্ন পূরন হয়েছে।হয়তো তাদের চেহারায় প্রশান্তির হাসি চওড়া হয়েছে।আর বেড়েছে আমার দীর্ঘ নিশ্বাসের স্থায়িত্ব।
মাস দুয়েক পার হয়ে যাচ্ছে।আরদ্ধর কোন খোজ নেই।ছেলেটা বেচে আছে কি মরে গেছে তাও জানি না।আরদ্ধর কথা ভাবলেই কেমন যেন দম বন্ধ লাগে নিজেকে।যে মানুষ্টার সাথে জীবনের প্রতিটা মুহুর্ত কাটাব বলে ভেবেছিলাম সে মানুষটা আমার কাছ থেকে অনন্ত কালের জন্যে দূরে সরে গিয়েছে।
.
.
রান্নাঘর গুছিয়ে মাত্র রুমে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছি।শরীরটা বড্ড নিস্তেজ লাগছে৷চোখ বুঝে মাত্র ঘুমের সাগড়ে পারি জমিয়েছি তখনই কানের মধ্যে আওয়াজ ভেসে এল
-ইনায়াত…!কোথায় গেলে?একটু এদিকে এসো তো।আই ইনায়াত।
ও ঘর থেকে আরাজের মা ডাকছেন। আমি আধঘুম জড়ানো গলায় জবাব দিলাম
-আসছি।
রুম গিয়ে দরজা নক করতেই আরাজের মা বলে উঠলেন
-পা দুটো বড্ড ব্যাথা করছে ইনায়াত। একটু চেপে দেওনা।
মাথার বাম পাশটা প্রচন্ড কিনকিন ব্যাথা করছে। ঠিকভাবে চোখ খুলতে পারছিনা। যেকোন মুহুর্তেই বমি করে ভাসিয়ে দিতে পারি। আমি কোন রকমে নিজেকে সামলে বললাম
-আন্টি আমি পারব না এখন।আমার প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করছে।
কথাটা বলেই রুমে চলে আসলাম।পেট গোলাচ্ছে প্রচন্ড ভাবে।কোনরকমে বাথরুমে পৌছে পেটে যা ছিল সব উগলে দিলাম।মাথাটা পুরাই ফাকা ফাকা লাগছে।মুখে পানি ছিটিয়ে রুমে এসে বিছানায় লুটিয়ে পরলাম।
চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে।নিজেকে ধরে রাখতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে।নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে হারিয়ে গেলাম ঘুমের অতল সমুদ্রে।
.
.
গভীর একটা জংগলের মাঝামাঝি জায়গায় বসে আছি আমি।চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।দূরে কোথাও শেয়াল কুকুরের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।আমি একমগ্নে সামনের পানে তাকিয়ে আছি।ছোট একটা ঝিল।ঝিলের কালো পানিতে জোছনার আলো পরে চকচক করছে।চারদিকে পাতার খসখস শব্দ হচ্ছে।ধীরে ধীরে বেড়েই চলছে সে শব্দ।কিছুক্ষনের মধ্যেই হাত দশেক দূরে জ্বলজ্বল করে উঠল বেশ কতগুলো লাল চোখ।ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে বুনো নেকড়ের দল।টপ টপ করে লালা ঝরছে তাদের জ্বিহ্বা বেয়ে।দু একজন ইতিমধ্যেই এগিয়ে এসেছে আমার কাছে।আচড় বসিয়েছে আমার দু হাতে বাহুতে।আমি যেন তবুও নিস্তেজ ভাবে বসে আছি।নড়ার শক্তি টুকু নেই। একে একে সবাই এসে ঘিরে ধরল আমাকে। ছিড়ে খেতে লাগল আমাকে।বোধোদয় হতে শুরু করল আমার।এতক্ষন শান্ত থাকলেও হঠাত করে তীব্র ভয় গ্রাস করে নিল আমাকে।আমি চারদিক তাকিয়ে গগন বিদারী একটা চিতকার দিলাম।
মুহুর্তেই সবাই যেন সরে গেল দূরে।দূর থেকে ক্ষীন একটা আলো এসে চোখে লাগল।ধীরে ধীরে আলোটা এগিয়ে আসছে আমার কাছে।আরও কিছু টা আগাতেই সব কিছু যেন স্পষ্ট হয়ে এল।আলোতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আরদ্ধর মায়াবী মুখটা। আমার কাছে এসেই একটা ভুবন ভুলানো হাসি দিল সে।আরদ্ধর হাসির পানে চেয়ে আমি সব কষ্ট ভুলে গেলাম।আরদ্ধ আলতো করে এসে আমার গাল ছুয়ে দিল। ঠোটে ঠোট ডুবিয়ে চুমু একে দিল।আমি চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে অনুভব কর‍তে লাগলাম তাকে।আরদ্ধ আমাকে দুহাতে আমাকে আগলে নিল। পরম যত্নে আমার মাথাটা গুজে নিল তার বুকের মধ্যে।আমি পরম শান্তিতে বুক ভরে দম নিলাম।ঠিক তখনি একটা হিংস্র আওয়াজ শুনে বুক কেপে উঠল।চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি একটা বড় মাপের নেকড়ে দাত বের করে তাকিয়ে আছে আরদ্ধের দিকে।অন্যগুলোর তুলনায় তার চোখ যেন বেশি লাল আর বেশি উজ্জ্বল।ভয়ে কাপছি আমি। আমাকে কাপতে দেখে আরদ্ধ ফিরে তাকাল।ঠিক তখনি একটা হিংস্র থাবা বসালো নেকড়েটা। আতকে উঠলাম আমি।ঘুম ভেংগে গেল একটা চিতকার দিয়ে।
.
.
চোখ খুলে দেখি বিছানায় বসে আছি আমি। দরদর করে ঘামছে পুরো শরীর।মাথাটা এখনো ভারী হয়ে আছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত ১০ টা বাজে।পুরোটা সন্ধ্যা আমি মরার মত পরে ছিলাম।বিছানা থেকে নামতে যাব তখনি ওয়াশরুম থেকে আরাজ বের হল।
আরাজ আমাকে কোন কথা না বলে ল্যাপটপ নিয়ে বসল।আমি ফ্রেশ হয়ে চুলগুলো খোপায় গুজে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াব তখনি আরাজ বলে উঠল
-আমরা খেয়ে এসেছি বাইরে থেকে।রান্না করার দরকার নেই।
আমি পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলাম
– আংকেল আন্টি?
-তুমি ঘুমাচ্ছিলেন।রান্না করনি৷ বাবা মায়ের সুগার লো হয়ে গিয়েছিল তাই আমি উনাদেরকে নিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি।ওহ আচ্ছা।
আরাজের কথা শুনে আমি চুপচাপ সোফায় গিয়ে বসলাম।আরাজ কিছুক্ষন থেমে বলে উঠল
-মা নাকি তোমার কাছে মেডিসিন চেয়েছিল তুমি দেওনি।
আরাজের কথা শুনে চমকে উঠলাম আমি।বিষ্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম
-মেডিসিন? কখন?
আরাজ হালকা বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল
-আজকে দুপুরে।
আমি দ্বিতীয়বার অবাক হয়ে বললাম
-দুপুরে?না তো। দুপুরে তো উনি পা টিপে চেয়েছিলেন। আমার প্রচন্ড মাথাব্যথা করছিল।তাই বলেছিলাম যে এখন পারব না পরে দিব।
-ইনা মিথ্যা কথা বলার দরকার নাই কোন।
-আজব তো আমি মিথ্যা কথা বলব কেন!
-তো তুমি কি বলতে চাচ্ছ আমার মা মিথ্যা কথা বলতেছে?জাস্ট একটা মেডিসিন এ তো চেয়েছিল ইনা।কি এমন কাজে ব্যস্ত ছিলে যে আমার মাকে ওষুধ পর্যন্ত দেওয়ার সময় টুকু হয় নি তোমার!
-আজব আরাজ আমি….
-প্লিজ ইনায়াত।আমাদের মধ্যে কি আছে নেই সেটা অন্য হিসেব। বাট এসবের মধ্যে আমার প্যারেন্টস কে টানবা না নাহলে এর পরিনতি ভালো হবে না।
কথাটা বলেই রুম থেকে বের হয়ে গেল আরাজ। আমাকে কথা বলার সুযোগ টুকু দিল না।আমার অস্বীকার করার পরেও আরাজ আমার একটা কথাও শুনার প্রয়োজন বোধ করল না।এটা প্রথম বার নয়।আরাজের মা আর বোন আমাকে খুব একটা পছন্দ করে না।কেন করেনা কে জানে!হয়তো আমার আর আরদ্ধের সম্পর্কের জন্যে।হয়তো বা অন্যকোন কারনে।আমার সব কিছুই যেন তাদের অপছন্দের।আমার হাটা-চলা,উঠা-বসা এমনকি খাওয়াতেও সমস্যা তাদের।আমাকে কোন কথা বলার সুযোগ দেয় না তারা।আমার অস্তিত্বই যেন তাদের কাছে অপছন্দের।মাকে ফোন দিয়ে বার দুয়েক জানিয়েছিলাম সব।কিন্তু বরাবরের মত তার একটাই জবাব
-সংসারে ওসব মানিয়ে নিতে হবে একটু আধটু।শ্বশুর বাড়িতে এসব হয়ই।স্বামির মন যুগিয়ে চল তাইলেই দেখবি সব ঠিক থাকবে।
মায়ের কথার কোন জবাব থাকেনা আমার কাছে।শুধু ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে ফোন কেটে দেই আমি।
.
.
আরাজের বড় বোন মুনতাহা আপু প্রেগন্যান্ট।৫মাস চলছে প্রায়।আরাজের ফ্যামিলি থেকে স্বাদ খাওয়ানোর আয়োজন করা হয়েছে।রান্নাবান্নার দায়িত্ব এসে পরেছে আমার ঘাড়ে।মুরগীর রোস্ট,মাছের ভাজি,পোলাও,গরুর মাংসের কালা ভুনা,সালাদ,বোরহানি,রেজালা,ইলিশ মাছের মুড়ি ঘন্ট আরও দুই তিন রকমের আইটেম।আরাজকে বলেছিলাম যেন অর্ধেক খাবার বাইরে থেকে অর্ডার দেয়। কিন্তু আরাজের মা স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন
-তার বড় মেয়ে যা খেতে চেয়েছে সব যেন বাসায় বানানো হয় ।বাইরের খাবার খেলে বাচ্চার ক্ষতি হবে ।
অগ্যতা সব কাজ আমাকে নিজে হাতেই করতে হল।মুনতাহা আপুর শ্বশুর বাড়ির লোকজন আরাজের কিছু ফ্রেন্ড আর আমার বাবা মাকে লাঞ্চে ইনভাইট করা হয়েছে।আরাজের ফ্যামিলির ইচ্ছা ছিল বড় করে পার্টি করার কিন্তু লকডাউনের জন্যে আপাতত তা সম্ভব হচ্ছে না ।সব পরিকল্পনা তাই আকিকার জন্যে বরাদ্দ করা হচ্ছে।
রান্নাবানা শেষ করে আমি ঘরে এলাম ফ্রেশ হবার জন্যে ।তখনি আরাজ এসে ডাক দিল।ইনায়াত সবাই চলে এসেছে।
-দুই মিনিট ।আমি ফ্রশ হয়ে আসছি।
আমি হাত মুখ ধুয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে নিলাম।ড্রয়িং রুমে এসে দেখ বাবা আরাজের বাবার সাথে গল্প করছেন ।পাশে মা বসে আছেন।অনেক দিন বাবা মাকে দেখে বেশ খুশি লাগছে।মনটা যেন শান্ত হয়ে গেল তাদেরকে দেখে।কথা বলতে যাব তখনি আরাজের মা বলে উঠলেন
-ইনায়াত সবাই বসে আছে।যাও টেবিল রেডি কর।সবাই অপেক্ষা করছে।
আমি মায়ের দিকে তাকাতেই উনি আমাকে ইশারা করে বললেন যেতে ।আমি বাধ্য হয়ে সেখান থেকে চলে এলাম।………

চলবে

#জেদ(A Conditional LoveStory)
#পার্ট২৯
#আফরিন_ইনায়াত_কায়া
.
.
.
.
.
খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে সবাই গল্প করতে ব্যস্ত ।সারাদিন কাজ করে আমার পেটে হাতি ঘোরা দৌড়ানোর উপক্রম ।আমি এক ফাকে রান্না ঘরে এসে প্লেটে খাবার বাড়তে লাগলাম।তখনি আরাজ এর গলা শোনা গেল
-ইনায়াত।
আমি প্লেট রেখে এগিয়ে গেলাম ডায়নিং এর দিকে ।আরাজ আমাকে দেখে এগিয়ে এসে আমার কোমড় জড়িয়ে নিল।আমি ভ্রু কুটি করে আরাজের দিকে তাকালাম ।কিন্তু আরাজের সেদিকে কোন মনযোগ নেই।সে তার বন্ধুদের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে ব্যস্ত ।পরিচয় পর্ব শেষ হতেই আমি বলে উঠুলাম
-আমার কিছু কাজ আছে।আমি আসছি।
কথাটা বলে পিছন ফিরে চলে আসতে যাব তখনি আরাজের একজন ফ্রেন্ড বলে উঠল
-আচ্ছা আরাজ তোর ওয়াইফের না বিয়ের আগে এক জনের সাথে এফেয়ার ছিল !এখনো কথা হয় নাকি!
তার কথা শেষ না হতেই আরেকজন বলে উঠল
-আরে ধুর এগ্লা হল গোল্ড ডিগার ।বোয়াল মাছ জালে ফাসলে পুটি মাছ কে ঘুরে তাকায় না ।
আমি কথাটা শুনে খানিকক্ষন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।ভেবেছিলাম আরাজ কিছু হলেও বলবে। কিন্তু না আরাজ টু শব্দটুকুও করল না।বরং তাদের সাথে হেসে উড়িয়ে দিল।আমি ফিরে গিয়ে আগের জায়গায় দাড়ালাম।হাসি মুখে বললাম
-আসলে জানেন কি ভাইয়া আমার মতে যেকোন সম্পর্ক শুরুই হয় সম্মান আর বন্ধুত্ব দিয়ে।আর আমি আমার প্রাক্তনকে জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত সম্মান করে যাব। কারন সে আমার সব চেয়ে ভালো বন্ধু।সুতরাং আমার বিয়ে হোক বা আমি মরে যাই তার সাথে আমার সম্পর্ক আজীবন থাকবে।যোগাযোগ হোক বা না হোক দূরত্ব কখনো সম্পর্কের পবিত্রতা নষ্ট করতে পারে না। গোল্ড ডিগিং এর ব্যাপারটাতে এইখানে একটু মিস করে গেছেন ভাইয়া।আপনি যে কোম্পানিতে ম্যানেজার হিসেবে জব করেন সে কোম্পানির ৫০% শেয়ার হোল্ডার সে।আর থাকল আমার কথা।আমি একজন সার্টিফাইড পোস্ট গ্রাজুয়েট ।বিয়ের সপ্তাহ খানেক আগ পর্যন্ত একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো এমাউন্ট এ জব করছিলাম।সুতরাং গোল্ড ডিগিং কথাটা কতটুকু মানান্সই আরেকবার বিবেচনা করে নিয়েন ।ওকে?আর হ্যা পায়েস রেধেছি ।খেয়ে যাবেন ।তাতে যদি আপনাদের ভাষা একটু মিষ্টি হয় ।
হাসিমুখে কথাগুলো বলে সেখান থেকে চলে এলাম আমি।আরাজ আমার কথাগুলো ভালোভাবে নেয় নি।যাদের সামনে কথাগুলো বলেছিলাম তারা নিতান্তই আরাজের খুব কাছের বন্ধু ছিল।নিজের এত কাছের মানুষের সামনে এত বড় অপমান আরাজ হজম করতে পারবে বলে মনে হয় না।
.
.
আমার ধারনাকে সত্যি প্রমানিত করে সবাই যেতে না যেতেই আরাজ রুমে এসে গর্জে উঠল
-সমস্যা কি তোমার হ্যা?Whats your problem?নিজেকে কি মনে কর তুমি?
-আমি ইনায়াত ।এর বেশি নিজেকে কিছু মনে করার বোধ বা শক্তি কোণটাই নেই আমার এই মুহুর্তে।
ব্যালকনি থেকে শুকনো কাপড়গুলো এনে গোছাচ্ছি মাত্র ।তখনি আরাজের তর্জন গর্জন শোনা গেল।
-Oh really!নিজেকে খুব বড় কিছু ভাবো তাই না?কি দরকার ছিল আমার বন্ধুদের সামনে অইভাবে কথা বলার?
-ভুল কিছু বলেছি কি?তোমার সামনে তোমার ওয়াইফকে অপমান করা হচ্ছে তার ক্যারেক্টার তুলে কথা বলা হচ্ছে অথচ তুমি চুপ করে সব শুনছ ।কিছুই বলছ না ।বাট সরি আমার সামনে আমার ভালোবাসার মানুষকে কিছু বলা হলে আমি সেটা সহ্য করব না।আমি আরদ্ধকে যতটা ভালোবাসি ঠিক তার চেয়ে অনেক বেশি রেস্পেক্ট করি।আমার জন্য তার সম্মানে আঘাত লাগুক এটা আমি কখনোই চাইব না।তাছাড়া তোমার মান নষ্ট হয় এমন কোন কথাও বলিনি আমি ।
-তোমার বলা প্রতিটা কথাই আমার সম্মান নষ্ট করেছে।জাস্ট ইমাজিন আমার ওয়াইফ এখনো তার প্রাক্তনের প্রতি আসক্ত ।মানুষ কি ভাববে!সবাই তো আমার উপর প্রশ্ন তুলবে ।
আরাজের কথা শুনে কিছুটা হলেও অবাক হচ্ছি আমি।
-দেখ আরাজ তোমাকে আমিও আগেও বলেছি আমি আরদ্ধ……।
-এনাফ ইনায়াত ।তুমি এখন আরদ্ধর না আমার ওয়াইফ।আমাদের স্বামি স্ত্রীর মাঝে যা আছে বা নাই তা এই চার দেওয়ালের মাঝেই থাকবে।ইন ফিউচার এর বাইরে যাতে কোন কিছু না যায় ।নাহলে আমার খারাপ রুপটা দেখাতে বাধ্য হব ।
কথাগুলো বলে আরাজ ওয়াশরুমে চলে গেল।আমি আর কোন কথা বললাম না।কাপড়গুলো আলমারিতে তুলে রেখে চুপচাপ শুয়ে পরলাম ।
.
.
সপ্তাহ খানেক পার হয়ে গেছে।আরাজ এই কয়দিনে আমার সাথে ঠিক তেমন ভাবে কথা বলে নি ।বাসার সবার সাথে দূরত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে।জানি না এভাবে কতদিন চলবে ।ঠিক কতদিন এভাবে নিজেকে ধরে রাখতে পারব।দুপুরের দিকে আরাজ বেশ হাসিখুশি মুডে বাসায় এল।ঘন্টা খানেক ধরে সেজে গুজে বের হয়ে যাওয়ার সময় বলল
-আমার এক ফ্রেন্ড এর বিয়ে নেক্সট উইকে।ওর ব্যাচেলার পার্টিতে যাচ্ছি।ফিরতে রাত হবে।বাবা মাকে বলিও যাতে আমার জন্যে অপেক্ষা না করে ।
কথাটা বলে আরাজ আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই বের হয়ে চলে গেল।
বেল পরল ঠিক রাত ১২:৩৫ মিনিটে.আমি তখন বসে গল্পের বই পরছি ।আওয়াজ শুনে আমি গিয়ে দরজা খুলে দিলাম ।আরাজ আমাকে দেখেই খুশিতে গলা জড়িয়ে ধরল
-Oh my darling wife.missed me?
আরাজ কাছে আসতেই কেমন একটা উটকো গন্ধ ভেসে এল মুখ থেকে ।তারমানে আরাজ ড্রিংক করেছে।আমি কিছু না বলে চুপচাপ আরাজকে নিয়ে ঘরে আসলাম।আরাজ আধো আধো বলে কিছু উলটা পালটা কথা বলেই যাচ্ছে।আমি পাত্তা না দিয়ে আরাজকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর জুতা মুজা খুলতে লাগলাম।উঠে এসে আলমারি খুলতেই হঠাত কেউ যেন পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল আমাকে।
-আরাজ কি করছ?ছাড়ো আমাকে।
-উহু ।ছাড়ব না
আরাজ আমাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।আমি আবার আরাজকে ছাড়ানোর চেস্টা করে বলতে লাগলাম
-দেখো আরাজ তুমি ড্রিংক করেছ ।তোমার মাথা ঠিক নাই ।ছাড়ো আমাকে।
-ঠিক বলেছ।তোমার মত এত সুন্দর আর হট একটা বউ বাসায় থাকলে কি মাথা ঠিক থাকে!Come on Ina.একটা রাতেরই তো ব্যাপার ।lets do it.We are husband and wife now.
আরাজের কথা শুনে প্রচন্ড মেজাজ বিগড়ে গেল আমার ।আরাজকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলাম।আরাজ আচমকা আঘাতে নিজেকে সামলাতে পারল না ।ছিটকে গিয়ে পরল বিছানায় ।
-স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটা শুধু শারীরিক না ।সম্পর্ক গড়ে উঠে বিশ্বাস আর সম্মানে ।যেদিন আমাকে সম্মান আর বিশ্বাস করতে আসবে সেদিন আসিও স্বামীর অধিকার নিয়ে তার আগে না।
আমার কথা শুনে আরাজ তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল
-Huh.Dont tell me just because of বিশ্বাস আর রেস্পেক্ট এর জোরে আরদ্ধর সাথে রাত কাটিয়েছ।আরদ্ধ করতে পারলে আমি কি দোষ করেছি?I’m your husband.Come on Ina আজকের রাতটাই তো প্লিজ ।
কথাগুলো বলেই আরাজ আমাকে জড়িয়ে ধরে কিস করার চেস্টা করতে লাগল ।দম আটকে আসছে আমার ।কোন রকমে নিজেকে সামলে বলে উঠলাম
-আরাজ তুমি ড্রিংক করেছ।তোমার মাথা ঠিক নেই ।উলটা পালটা কথা বলছ ।আরদ্ধর সাথে আমার তেমন কিছু ছিল না ।ঘুমাও সকালে কথা হবে ।
-সত্যি কথা বুঝি গায়ে লাগছে!
-দেখো আরাজ না জেনে কোন কিছু কে সত্যিপ্রমান করার চেস্টা করোনা ।আরদ্ধ আমাকে ভালোবাসত আমাকে সম্মান করত ।সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে আমাকে কখনো পারমিশন ছাড়া ছোয় নি । তোমার মত জোর করে সে কখনো আমাকে কাছে পাওয়ার চেস্টাও করেনি ।ছাড়ো আমাকে প্লিজ।
আমার কথা শুনে আরাজ আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল।আমি ছিটকে গিয়ে ধাক্কা খেলাম টেবিলের সাথে ।কপাল ফেটে গেছে আমার ।গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে।আরাজ তেড়ে এসে আমার চুলের মুঠি টেনে ধরে চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরল।দাতে দাত চিপে বলে উঠল
-আরদ্ধ আরদ্ধ আরদ্ধ ।সারাদিন যে এত আরদ্ধ আরদ্ধ কর কই তোমার আরদ্ধ হ্যা?তোমার আরদ্ধ ভেজা শিয়ালের মত লেজ গুটিয়ে চলে গিয়েছে।যদি তোমার আরদ্ধ তোমাকে অতটাই ভালোবাসত ,তার যদি অতটাই সাহস থাকত তাহলে যেকরে হোক তোমাকে বিয়ে করত ।বাট সে তোমাকে মাঝ রাস্তায় ছাড়ে চলে গেছে ।সে তার নিজের রাস্তা মেপে নিয়েছে।তোমার জন্যে বেটার হবে আরদ্ধকে ভুলে আমার মত চলো ।নাহলে পরিনতি ভালো হবে না।
আরাজ আমাকে ছেড়ে দিয়ে টলতে টলতে বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দিল।আমি কোন রকমে উঠে ব্যালকনিতে গিয়ে ব্যালকনির দরজা লাগিয়ে দিলাম ।আজকে আকাশ অনেক অন্ধকার ।দূরের কোন তারাও দেখা যাচ্ছে না। অমাবশ্যার তীব্রতা বেশ প্রকট হয়ে আছে চারদিকে।আমি আকাশ পানে চেয়ে প্রহর গুনতে লাগলাম নতুন সকালের।……

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here