জুনিয়র_পদ্ম পর্ব-০৪,০৫

#জুনিয়র_পদ্ম
পর্ব-০৪,০৫
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
০৪

তিন বছর পর,,

আপনি এখানে কি করছেন?আচ্ছা তো আপনার প্রাক্তন স্বামী ছেড়ে দিয়েছে বুঝি?আর সেই কারণে এখন কোন উপায়ন্তর না পেয়ে সু্যোগ বুঝে আমার গলায় ঝুলে গেলেন! আমার মতো আমার সহজ সরল আম্মু কে ও নিজের রুপের এবংকি গুনের মায়াজালে ইমপ্রেস করে নিলেন।আপনার বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারছি না।

উচ্চ কন্ঠে কথা গুলো বলে চলেছে জায়ান।পদ্ম কিভাবে জায়ানের ভুল গুলো শুধরুবে বুঝতে পারছে না,ইনফেক্ট কোথা থেকে শুরু করবে তা-ই মাথায় আসছে না!জায়ানের উচ্চ কন্ঠস্বর শুনে এর‌ই মধ্যে বুকে প্রচন্ড ধুকপুক ধুকপুক করছে। সেই ছোট্ট বেলা থেকেই পদ্ম উচ্চ কন্ঠস্বর শুনতে পারে না, একধরনের ভয় কাজ করে! কখনো সখনো চোখের পানি চলে আসে।
কিছুক্ষণ আগের ঘটনা,
পদ্ম বসে আছে বাসর ঘরে আর তাকে ঘিরে জায়ানের সব কাজিনমহল। সবাই পদ্ম কে জায়ানের কথা বলে লজ্জা দিতে ব্যাস্ত তখনি জায়ানের ছোট বোন অনিতার মাথায় দুষ্টুমি ভর করে।পদ্ম কে বলে জায়ানের ফোনে কল দিতে! সাথে অন্যান্য কাজিনরাও সায় দেয়।উপায়ন্তর না পেয়ে পদ্ম কল দেয়।আর সবাই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে কি হয় দেখার জন্য।
জায়ান মাত্র‌ই তার রুমে প্রবেশ করে এর মধ্যে ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে “ঘুমবাবু”! এতো গুলো দিন পর অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটার কলে চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে জায়ানের। এদিকে পদ্ম কে ঘিরে থাকা মেয়ে গুলো অট্টহাসিতে মেতে ওঠে।জায়ানের নজর সেই দিকে অগ্রসর হয়।পদ্মর কানে এখনো ফোন ধরে রাখা, একটা মেয়ে বলে উঠলো পদ্ম ভাবি ভাইয়া তো তোমার থেকে চোখ ই সরাতে পারছে না হা হা হা.. সবাই আবার উল্লাসধ্বনি দিয়ে উঠলো।জায়ানের এবার সব কিছু শুনে বোধগম্য হলো, তার সামনে বসে থাকা মেয়েটি আর কেউ নয় বরং মেয়েটি ঘুমবাবু!
লজ্জায় পদ্মর মাথা নত হয়ে আসে, মনে মনে মেয়ে গুলো কে বকে চলে। সেই মুহূর্তে জায়ান বলে সবাই রুমের বাহিরে যাও। আমার উনার সাথে কিছু কথা আছে!জায়ানের কাজিন বিন্দু বলে ‘ভাইয়ার দেখছি আর তরস‌ইছে না। সবাই হেসে উঠতেই ধমকে ওঠে জায়ান!জায়ানের হঠাৎ এরকম আচরণে হতবাক সবাই। কি এমন ঘটলো যার জন্য এত রাগ? অনিতা কিছুটা আন্দাজ করতে পারলো,তাই সবাই কে নিয়ে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। পদ্ম ভয়ে চুপসে যায়, নিজেকে গুটিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকে।জায়ান বিকট আওয়াজে দরজা বন্ধ করে এগিয়ে আসে পদ্মর কাছে। পদ্ম নিজেকে আরো শক্ত করে গুটিয়ে বসে। আকস্মিক জায়ান পদ্মর হাত ধরে টেনে বিছানা থেকে নামিয়ে আনলে। হতভম্ব হয়ে তাকায় পদ্ম! তারপর ই নিজের রাগ গুলো প্রকাশ করে জায়ান।
________

পদ্ম কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
–“আপনি শান্ত হয়ে,আমার কথা শুনুন। প্লিজ চেঁচামেচি করবেন না, সবাই শুনতে পাবে।
জায়ান দ্বিগুণ রাগ নিয়ে বলল,
–“শুনুক সবাই।এই সুন্দর মুখশ্রীর আড়ালে লুকায়িত অর্থ সম্পদ অনুসন্ধানি মানুষটার মুখোশ উন্মোচন-ই তো আমি চাই! সবাই জানুক কতটা লোভি একটা মেয়ে আপনি।

ছলছল নয়নে তাকায় পদ্ম। পদ্মর এই চাহনি কিছুতেই জায়ানের মন শীতল করতে পারছে না, যেন দ্বিগুন ছাড়িয়ে তিনগুণে বেড়ে চলেছে। ছলনাময়ী ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছে না পদ্ম কে।পারে তো চোখ দিয়েই ভষ্ম করে দেয়।
পদ্ম মুখ ফুটে বাক্য‌উচ্চারন করবে তার সময় টুকুও যেন জায়ানের হাতে নেই,পদ্মর হাত ধরে টেনে নিয়ে রুমের বাহিরে বের করে দিল। ইতিহাসের পাতায় এরকম ঘটনা দুটি আছে কিনা সন্দেহ। বিয়ের রাতে বর বউ কে রুমের বাহিরে বের করে দিয়েছে!ভাবা যায়? প্রেসের লোক গুলো যদি এই মুহূর্তে থাকতো, তাহলে তারা একটা জব্বর নিউজ তৈরি করতে পারতো।
দরজা বন্ধ করার আওয়াজে কেঁপে ওঠে পদ্ম, এদিক সেদিক তাকাতেই ড্রিম লাইটের আলোয় দেখে ঘর ভর্তি মেহমান। কেউ সোফায় শুয়ে আছে আর কেউ ফ্লুরিং করে শুয়েছে। কেউ যদি ঘুনাক্ষরেও টের পায় কিছুক্ষণ পূর্বের ঘটনা তাহলে কি বাজে পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তা ভেবেই শিউরে ওঠে পদ্ম।

_________

চারিদিকে লোকজনের সমাগম। সকালের নাস্তা খাওয়া শেষে দুপুরের খাবারের জন্য রান্নার আয়োজন চলছে।বেলা সাড়ে এগারোটা বাজে, মাত্র‌ই সকাল হলো জায়ানের!ফ্রেস হয়ে রুমের বাহিরে পা রাখতেই চোখে পড়লো পদ্ম কে।ড্রয়িং রুমের ডান দিকে কিচেনে,দৌড়ে দৌড়ে শ্বাশুড়ি মাকে সাহায্য করে চলেছে,এ বাড়ির প্রত্যেকটা ইট কাঠ থেকে শুরু করে মানুষ গুলোও যেন কতো জন্মের পরিচিত আপনজন। তাকে দেখে কেউ বিন্দুমাত্র ও বলবে না সে সদ্য বিয়ে করে গতকাল এবাড়িতে বউ হয়ে এসেছে।ভ্যাবসা গরমে প্রচুর ঘেমে একাকার, একটু পর পর শাড়ির আঁচল টেনে মুছে নিচ্ছে নিজের মুখমন্ডল। পদ্মর পানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে বাহিরের দিকে অগ্রসর হতেই পিছন থেকে জান্নাত ডেকে ওঠে ছেলেকে।জায়ান ঘুরে তাকাতেই হাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকা জান্নাত কে দেখে,জোরপূর্বক নিজেও মুচকি হাসে।
জান্নাত এগিয়ে এসে বললো,
–“নাস্তা না করে কোথায় যাচ্ছিস?
–“আম্মু আমি এখন কিছু খাব না।
–“সেকি খাবি না কেন? মেয়েটা তোর জন্য অপেক্ষা করে এখনো অবধি কিছু খায়নি।চল দুজনে একসাথে খেয়ে নিবি।

জায়ান কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জান্নাত ছেলে কে টেনে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিল। তারপর পদ্ম’কে ও পাশে বসিয়ে দেয়।
অনিতা এক‌ই প্লেটে দুজনের খাবার নিয়ে আসে।জায়ান কাঠ কাঠ গলায় বললো,
–“বাসায় কি প্লেটের অভাব পরেছে?
–“নবদম্পতিরা একসাথে একই প্লেটে খাবার খেলে ভালোবাসা বারে! এটা আমার কথা নয় জ্ঞানিজনদের বানী।আর তাদের বানী চিরন্তন সত্য কিন্তু।

অনিতা সয়তানি হাসি দিয়ে এখান থেকে প্রস্থান করে, এখানে যতবেশি সময় থাকবে তার বিপদ সংকেত তত নিকটে।তাই আর বিলম্ব না করে পালায়।
সেই সকালে নাস্তা তৈরি করা হয়েছে,এতোক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গেছে বলে জান্নাত ওভেন থেকে সেমাই গরম করে নিয়ে আসে। এসে দেখে দুজনের একজন ও খাওয়া শুরু করেনি।জান্নাত পিঠা হাতে নিয়ে পদ্মর মুখে তুলে দেয়। তারপর জায়ান’কে।আর বলে পদ্ম’মা আমার ছেলেটা এখনো বড় হয়নি বুঝলি। এখনো তাকে একবেলা হলেও খাইয়ে দিতে হয়। এখন থেকে তুই খাইয়ে দিবি বুঝলি?
জায়ান বিষ্ময় নিয়ে বললো,
–“আম্মু এই তোমার পদ্মমা!যার নাম পদ্ম?
–“আরে গাধা আমি তো ওকে ভালোবেসে নামের শেষে “মা”বলি পদ্ম’মা।
–“তাহলে আব্বু যে বলতো?
–“তোর আব্বু ও হয়তো ভালোবেসে বলে।
–“অ মাই গড!আর আমি কিনা

প্রশ্নবিদ্ধ চোখে পদ্ম বললো,
–“আপনি কিনা?

জায়ান রাগ কন্ট্রোল করতে ডাইনিং ছেড়ে বেরিয়ে যায়।জান্নাত বলে ওঠে না খেয়ে চলে যাচ্ছিস কেন?পদ্মর দিকে তাকিয়ে বললো,
–“ছেলেটার হঠাৎ কি হলো বলতো?

অনিতা এসে বলল,
–“আম্মু বুঝ নাই?ভাবিকে তুমি পদ্ম’মা বলে ডাকতে বলে, তোমার ছেলে আগে চিনতে পারে নাই সেই জন্য এখন মেজাজ দেখাচ্ছে।

জান্নাত পদ্মর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
–“ছেলেটা এবার তোকে বুঝলেই বাঁচি।
–“আম্মু তুমি শুধু আমার জন্য দো’আ করো। ইনশা আল্লাহ আমি উনাকে ঠিক বুঝিয়ে বলবো সবকিছু।

অনিতা গ্লাসে পানি নিতে নিতে বললো,
–“আম্মু তোমার আদরের বাঁদর ছেলে গতকাল রাতে যেটা করলো!এরপর মনে হয় না ও এতো সহজে সব কিছু মেনে নিতে পারবে।যদি একবার বড় ফুপ্পি ব্যাপার টা জানতে পারতো তাহলে তো লঙ্কা কাণ্ড বাঁধিয়ে ফেলতো!

পদ্ম জান্নাতে’র কোমর জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল,
–“আম্মু এবংকি তোমরা সবাই আমার পাশে থাকলে আমি ঠিক উনাকে বোঝাতে পারবো।
–“আমরা সব সময় তোর পাশে আছি পদ্ম’মা।
–“হ্যা ভাবিমনি আমরা তোমার পাশে আছে, তুমি শুধু এগিয়ে যাও ঐ বাঁদর কে মানাতে হা হা হা।

গতকাল রাতের ঘটনা,
পদ্ম এই রাতের বেলা কোথায় যাবে? কি করবে?
দিকহারা হয়ে পড়ে।অনিতার রুমে যে যাবে তার ও উপায় নেই,জায়ানের সব কাজিনরা শুয়েছে। ঠিক তখন জান্নাত দুশ্চিন্তার চাদর সরিয়ে দেয়।জায়ানের আব্বু কে অন্য রুমে পাঠিয়ে নিজের রুমে এনে পরম মমতায় ঘুম পাড়িয়ে দেয় পদ্ম কে।জায়ান এরকম কিছু করতে পারে তার আভাস আগেই পেয়েছিল জান্নাত।”একজন জননীর গুন তো এতেই নিহিত”তাই তো সময় মত পদ্ম কে নিজের আঁচলে আশ্রয় দিতে পারলো।

_______

পা টিপে টিপে পদ্ম এগিয়ে যাচ্ছে। আজকে আবার জায়ান কি কান্ড করে বসে আল্লাহ পাক জানেন। সারাদিন এটা ওটা করে বাহিরে কাটালেও রাতে তো আর রুমে না গিয়ে উপায় নেই। হাজারো চিন্তাভাবনা করতে করতে দরজার কাছে থমকে দাঁড়ায় পদ্ম। ভিতরে পা ফেলতে যেন ভয় করছে। তখন জায়ান এসে বললো,
–“ওয়েলকাম ওয়েলকাম! আপনার জন্য‌ই অপেক্ষা করে চলেছি ঘুমবাবু।

পদ্মর চক্ষু বিস্ফোরিত হয়ে বললো,
–“আ আমার জন্য!কে কেন বলুন তো?

জায়ানের চোখে মুখে শয়তানি হাসি! হাসির রেশ নিয়েই বললো,
–“আমার দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র ব‌উ, আমার একটা মাত্র রুমে আসবে। আমার একটা মাত্র ব‌উ এর একটা মাত্র স্বামী হয়ে তার জন্য অপেক্ষা করবো না?সেকি হয় বলুন? আসুন আসুন আমার একটা মাত্র ব‌উ একটা মাত্র রুমে এসে আপনার একটা মাত্র স্বামী কে ধন্য করুন,সে যে আপনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

হঠাৎ কি হলো জায়ানের?পদ্ম কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।সব চিন্তা বাদ দিয়ে দৌড় দিতে নিলে,খপ করে হাত ধরে নেয় জায়ান। দরজার সাথে চেপে ধরে বললো,
–“কোথায় পালাচ্ছেন?
–“এসব কি অসভ্যতামি করছেন? যেকোনো সময় কেউ চলে আসবে।
–“আই ডোন্ট কেয়ার।
তো এবার বলুন আপনার প্রাক্তন স্বামী ডিবোর্স দিল নাকি আপনি দিলেন?

আস্তাগফিরুল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহ! এই মাইয়ার আগেও একবার বিয়া অ‌ইছে?আয়হায় রে আমার জায়ান বাবার জীবনডা নষ্ট হ‌ইয়া গেল রে….

বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ কোথা থেকে যেন এসে, খোরশেদা মানে জায়ানের বড় ফুফি মরা কান্না জুড়ে দেয়। এখন দেখার পালা পদ্ম বেচারির কি হয়…

#চলবে.. ইনশা আল্লাহ।

#জুনিয়র_পদ্ম
#পর্ব–০৫
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখনীতে)

জমিতে সদ্য ধান গাছ রোপণ করা পানিতে কোলা ব্যাঙ মশাইদের ঘ্যাঙ ডাকে মুখরিত চারিদিক। গ্রাম অঞ্চলে যাকে বৃষ্টি আসার পূর্বাভাস বলে।তার সাথে প্রকৃতি ও নতুন রুপে সতেজ হয়ে উঠবে। যেখানে পা রাখবে সেখানেই সবুজের স্পর্শে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভালো লাগার ভেলায় ভাসবে।এর‌ই মধ্যে বাতাস ব‌ইতে শুরু হয়েছে। রান্নাঘরের জানালা টা বন্ধ করা হয়নি মনে পড়তেই, রুম থেকে বেরিয়ে আসে জান্নাত। শেষের সিঁড়িতে পা ফেলতেই খোরশেদার বিলাপ শুনতে পায়। রান্না ঘরে আর না গিয়ে খোরশেদার বিলাপ অনুসরণ করে জায়ানের রুমের কাছে এসে কিছুই বুঝতে পারলো না।তাই জিজ্ঞাসা করলো,
–“আপা কি হয়েছে?
–“এই মাইয়ার আগেও একটা বিয়া অ‌ইছে! তুমি জানতা না? কোন খোঁজ খবর না নিয়া কেমনে পারলা জায়ানের গলায় ঝুলায় দিতে?
–“আপা আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে পদ্ম,,

মুখের কথা কেরে নিয়ে,তেজ দেখিয়ে মোরশেদা বললো,
–“আমি নিজের কানে হুনছি জায়ান নিজে ক‌ইছে এই কতা।এর পরে তোমার কোন ছাফাই হুনুম না আমি। এই মাইয়ারে কাইল‌ই বিদায় করুম আমি!

পদ্মর চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট,জায়ান কে ছেড়ে যেতে হবে! কথাটা যেন তীরের মত আঘাত করলো।জায়ান পদ্মর কাছাকাছি থাকায় খামচে ধরল জায়ানের হাত। ছোট ছোট নখ গুলো ভুতা দায়ের মতো করে বিঁধছে। তবে সহজে চামড়া ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় নেই।ভুতা দা যেরকম চামরা ভেদ করে ভিতরে ঢুকতে সময় নেয়, তেমনি পদ্মর আঙুলের নখ গুলো।
জায়ান পদ্মর মুখপানে তাকিয়ে খোরশেদা কে বললো,
–“ফুপ্পি উনি এখন আমার বউ। এখন এটাই উনার একমাত্র পরিচয়,আগে কি হয়েছে না হয়েছে তা নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই আমার।তাই আমি চাই না তুমি বা অন্য কেউ এ নিয়ে দ্বিতীয় বার কোন কথা বলো।আর যদি বলো তাহলে আমাকে আর এবাড়িতে দেখতে পাবে না।

ছেলের এরকম মন মানসিকতার পরিচয় এবং স্ত্রী পরায়নতা দেখে জান্নাতে’র চোখে পানি চলে এলো। কিন্তু খোরশেদা সন্তুষ্ট হতে পারলো না, রাগে দুঃখে গটগট পায়ে নিজের রুমে চলে গেল।জান্নাত এগিয়ে এসে ছেলের কপালে চুমু এঁকে দিয়ে পদ্মর কপালে চুমু এঁকে দিল। তারপর শুভ রাত্রি বলে,জান্নাত চলে যেতেই জায়ান রুমে এসে গান ছেড়ে বারান্দায় চলে গেল। বারান্দার গ্রিলে হাত রাখতেই চোখে পড়লো, ইংরেজি লেটার ইউর মতো করে হাতে দাগ বসে আছে পাঁচটি। আনমনে নিজ হাতে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দেয় জায়ান।

রুমে শিল্পী নচিকেতার গান বাজছে:-

আনমনে তারি‌ই ছবি এঁকেছি,
তার স্বপ্নের স্রোতে ভেসেছি।
সে আমার হৃদয়ের স্পন্দন,
তার চোখে আকাশ কে দেখেছি।

আনমনে তারি‌ই ছবি এঁকেছি,
তার স্বপ্নের স্রোতে ভেসেছি।
সে আমার হৃদয়ের স্পন্দন,
তার চোখে আকাশ কে দেখেছি।

ঝর্নার জল যেন হায়না,
তার ছবি তাকে খুঁজে পাই না।
ঝর্নার জল যেন হায়না,
তার ছবি তাকে খুঁজে পাই না।

বাতাসেতে সূর বাজে ভিসাধে,
ভালোবাসা হারিয়েছে আকাশে।
ভাঙ্গা ঘরা খেলা খেলে,
তার আসা চলে যাওয়া।
আলো হয়ে ছায়া হয়ে,
লোকুচুরি খেলে যাওয়া।
দাঁড়িয়ে আমি যে শুধু দেখেছি।

পদ্ম জানে আজ থেকেই তার জীবনে গান নামক অত্যাচার শুরু!এর কারণ কি? কারণ জায়ানের গান প্রচুর পছন্দ।আর গান সবচেয়ে বিরক্তিকর পদ্মর কাছে। কয়েক বছর আগে যখন জায়ানের সাথে কথা হতো,তখন অনেক বুঝিয়ে ও গান ছাড়াতে ব্যার্থ হয় পদ্ম। তবে জায়ান বলেছিল,ঘুমবাবু আপনাকে পেলে গান শুনা ছেড়ে দিব আমি! সেই সময় পদ্মর উওর ছিল”তা হ‌ওয়ার নয়”।

এর‌ই মধ্যে একটু আধটু করে জুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। জায়ান এখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। পদ্ম কিছুক্ষণ কানে হাত দিয়ে পায়চারি করে এগিয়ে যায় বারান্দায়।

–“গান শুনার সাথে সাথে রাত জেগে থাকতে প্রস্তুত তো আপনি?

পদ্ম বারান্দায় যেতেই কথাটা বলল জায়ান। এতে পদ্মর মোখের ভাবভঙ্গি একটুও পাল্টালো না! বরং পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
–“অভ্যাস টা কি পাল্টানো যায় না?
–“যাকে ঘিরে পাল্টাবো ভেবেছিলাম সেই তো ছেড়ে চলে গেল!

দীর্ঘশ্বাস ফেলে,পদ্ম বলল,
–“বৃষ্টির ছিটেফোঁটায় তো ভিজে যাচ্ছেন, ভিতরে চলুন?
খুব শান্ত কন্ঠে জায়ান বলল,
–“সেই আগের মতই কথা ঘুরিয়ে পালাতে চাইছেন!কেন এমন করেন? এখন যখন নিজের ইচ্ছায় আমাতে ধরা দিয়েছেন তাহলে একটা ট্রেইলার হয়ে যাক!
–“মা’মানে?
–“শিষষ!,,,

পদ্ম কে পাঁজা কোলে করে এগিয়ে গেল জায়ান। পদ্ম বেচারি ছোটাছুটি করে চলেছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা?এক পা এক পা করে সিঁড়ির ধাপ পার করছে জায়ান। পদ্মর মাথায় কিছু ডুকছে না,কি করতে চলেছে জায়ান। খুব সাবধান অবলম্বন করে পদ্ম কে ধরে রেখেই এক হাতে জায়ান ছাদের দরজা খুলল। তারপর এগিয়ে গেল ছাদের মধ্যখানটাতে,পদ্ম কে নামিয়ে প্রান ভরে দম নিয়ে পদ্মর এক হাত নিজের কাঁধে রেখে অন্য হাত মোলায়েম ভাবে নিজের হাতে রাখলো।আর নিজের বাম হাত টা পদ্মর শাড়ি ভেদ করে কোমড়ে জায়গা করে নিলো। হঠাৎ কোমড়ে আলতো স্পর্শে কেঁপে ওঠে ভরকালো, বিদ্যুৎপৃষ্টের ন্যায় কেঁপে উঠলো পদ্ম!এর‌ই মধ্যে কাক ভেজা হয়ে গেছে দু’জনে,সে দিকে খেয়াল নেই কারো। পদ্ম ও যেন অজানা এক ঘোরের মধ্যে চলে গেছে।
বৃষ্টি তার গতিতেই ঝরে পড়ছে, চারিদিকে অন্ধকারে ডুবে আছে।এক প্রহর এক প্রহর করে রাত বেড়ে চলেছে।দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে আছে ঠিকই কিন্তু কারো মুখোমন্ডল স্পষ্ট নয়, তবে অবয়ব অবলোকন করা যাচ্ছে।

কাঁপল ডান্স শুরু করে জায়ান! সাথে পদ্ম কেও। এই মুহূর্তে সফট মিউজিক প্লে করলে বেশ জমতো বটে কিন্তু সিনেমা হলে সম্ভব ছিল, বাস্তব বলে সে আশায় বালি।

–“আমার ভালোবাসা আপনার মতো ঠুনকো নয় যে আপনার মতো আমিও আপনাকে ছেড়ে দিব! তবে আগের মতো করে ভালোবাসতে পারবো কিনা জানিনা।
–“আমার ভালোবাসা ঠুনকো?
–“ঠুনকো নয় বলছেন?
–“আপনাকে আমার অনেক কথা জানানোর আছে। শুনবেন?
–“ছলনাময়ীর কথা শুনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই আমার!

জায়ানের কথার আঘাতে হাত পা থেমে গেল পদ্মর।জায়ান কে ছেড়ে চলে যেতে নিলে, শক্ত পোক্ত ভাবে আটকে রাখে জায়ান।

–“এখানে আমার ইচ্ছায় এসেছেন আপনি,তাই আমার ইচ্ছাতেই ফিরে যাবেন।
–“আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ভিজতে।
–“যান মুক্ত করে দিলাম, চলে যান।

পদ্ম কে ছেড়ে দিয়ে রেলিং গেসে দাঁড়িয়ে রইলো জায়ান। পিছন থেকে পদ্ম বললো,
–“আপনি ও চলুন প্লিজ? এভাবে ভিজলে আল্লাহ না করুক ভালো মন্দ কিছু হয়ে যাবে।
–“তাতে আপনার কি?
পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে মোলায়েম সুরে পদ্ম বলল,
–“প্লিজ নিচে চলুন মিষ্টার নির্ঘুম?

দীর্ঘ তিন বছর পর পদ্মর মুখে মি.নির্ঘুম! ডাক শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে জায়ান।তাই আর অবাধ্য হতে পারলো না।

________

বাহিরে উঠুনে ডেকোরেশন করা হয়েছে, এখানেই বৌ-ভাতের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সবকিছু পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে,দাওয়াতি লোকজন আসতে শুরু করেছে। বাড়ির মেয়ে ব‌উরা সাজগোজে ব্যাস্ত,পদ্ম কে সাজানো সদ্য শেষ করে মেয়েদের সাজানো শুরু করেছে পার্লার থেকে আনা মেয়ে দুটো।দাওয়াতি মহিলারা নব বধূকে দেখতে ভিড় জমাচ্ছে। পদ্ম সবাই কে সালাম দিয়ে কদমবুসী করতে ব্যাস্ত। তবে পুরুষ মানুষদের নব বধূর রুমে প্রবেশ নিষেধ। ভুল ক্রমেও যেন পুরুষ মানুষ ডুকে না যায় সে কারণে দরজার সামনে পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত আছে আলি।যে কিনা জায়ান’দের ফরমায়েশ খাটে।আলি সহজ সরল খুব ভালো ছেলে বটে।জায়ানদের পাশের গ্রামেই তার বাড়ি। বিয়ের জন্য পাত্রী খোঁজে চলেছে কিন্তু এখনো কোনো সুপাত্রির খোঁজ মিলেনি।বলা বাহুল্য জায়ানের শ্বশুর বাড়িতে একজন কে তার বড্ড মনে ধরেছে! অনুসন্ধান করে তার নাম জানা গেছে সীমা।আহা কি সুন্দর নাম সীমা সীমা সীমা তার সীমান্তে বন্দি হতে চায় আলি।দেখা যাক সেই সীমা কে নিজের করে পায় কিনা আলি।

বেশ কিছুক্ষণ রুমের বাহিরে পায়চারি করছে জায়ান। মহিলাদের জন্য ভিতরে ঢুকতে পাচ্ছে না।তার মন পদ্ম কে দেখার জন্য আকুল হয়ে আছে। আজকে নিশ্চ‌ই গর্জিয়াস ভাবে সাজিয়েছে পদ্ম কে। পদ্ম কে সব রকম সাজেই দারুন সুন্দর লাগে জায়ানের কাছে। আগে যখন কথা হতো পদ্মর সাথে তখন জায়ান এক বছরের মতো ছবি চেয়ে গ্যাংগ্যাং করতে করতে একটা ছবি দেখতে পেত! তবে করা নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল।জায়ান যেন কোন মতেই পদ্মর ছবি ডাউনলোড করে না রাখে।এ ব্যাপারে খুবই কঠিন ছিল পদ্ম। ছবি দিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার ডিলেট করে দিত।জায়ান ও বাধ্য ছেলের মত মেনে নিত। কি আর করা মেনে না নিয়ে, অন্তত একবার হলেও পদ্ম কে দেখার সুযোগ তো হতো।
বর্তমান,
উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখা যাচ্ছে পদ্মর রুমে আপাতত কেউ নেই। এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া না করে রুমের দিকে এগিয়ে যায় জায়ান। দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে নিলে,আলি বাধা দিয়ে বলল,
–“পুরুষ মাইনষের ডুকা নিষেধ!
–“এক থাপ্পর মারবো তখন বুঝবি হাদারাম কোথাকার।
জায়ানের ধমকে চুপসে গিয়ে আলি বলল,
–“ভাইজান চরি চরি।

মুচকি হেসে ভিতরে ঢুকে জায়ান, গিয়ে পদ্মর সামনে দাঁড়ায়। মেরুন রঙের টিস্যু শাড়ি পড়ানো হয়েছে পদ্ম কে। চুল গুলো খোঁপা করে বেলি ফুলের গাঁজরা সেট করা। মাথা থেকে শরীরে দু-পাট্টা ঝরানো। গলায় গোল্ডের কন্ঠ হারের সাথে গোল্ডপ্লেটের শীতাহার সাথে গর্জিয়াস সাজ এতে খুব আময়িক সুন্দর লাগছে পদ্ম কে ঠিক যেন ফুটন্ত পদ্ম ফুল।

পদ্ম হাতের চুড়ি গুলো নেড়েচেড়ে দেখছিল।
জায়ান এক ধ্যানে তাকিয়েই আছে। পদ্ম বুঝতে পেরে লজ্জায় পড়ে যায়।যে কেউ যদি বেশি নয় দুমিনিট ধরে তাকিয়ে থাকে সেখানেই একটা লজ্জার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।আর এখানে তো জায়ান তাকিয়ে। পদ্ম নিজেকে ধাতস্থ করে জিজ্ঞাসা করে,
–“কিছু বলবেন?
–“দিনকে দিন আপনার সুন্দর্যো বেড়েই চলেছে”জুনিয়র পদ্ম”।
–“আপনার মাথা।
–“হুম,সবিই আমার মাথা।
দুজুনেই মন ভরে হেসে দেয়, ঠিক আগের মতো!

জান্নাত এসে দেখে ছেলে ব‌উ দুজনের মুখে হাসি,যা দেখে প্রান ভরে গেল। এগিয়ে এসে বললো,
–“মা শা আল্লাহ! আমার ছেলে মেয়ে দুটো কে খুব সুন্দর লাগছে, কারো নজর না লাগুক।
জান্নাত’কে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে জায়ান বললো,
–“আমার মা জননী কম কিসে? আব্বু দেখলে তো মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।হা হা হা
–“তাই না? বাঁদর ছেলে মায়ের সাথে মজা করা হচ্ছে।
জান্নাত আর দাঁড়াল না বেড়িয়ে গেল মেহমানদের আপ্যায়ন করতে।জায়ান কাবার্ড খুলে কিছু করছিল, তখন অনিতা এসে বললো,
–“ভাইয়া দেক কে এসেছে?

হোয়াট এ প্রেসেন্ট সারপ্রাইজ!
–“জেসি তুমি?
–“কেমন দিলাম বলো?
–“আমি কিন্তু খুব সারপ্রাইজড।
–“হা হা হা,,সে জন্যই তোমায় না বলে চলে এসেছি।

কি গায়ে পরা মেয়েরে বাবা! অনিতা কে এই নেকার ষষ্টি? ফিসফিস করে বলল পদ্ম। আসলে জেসি নামের মেয়েটি পড়েছে তো একিই ওয়েস্টান ড্রেস তার উপর,আসা অবধি জায়ানের সাথে লেপ্টে আছে।কে এই জেসি??

#চলবে,, ইনশা আল্লাহ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here