গল্পটা তোমারই,পর্বঃ01

গল্পটা তোমারই,পর্বঃ01
Writer:Mst Meghla Akter Mim

১.

” The COVID – 19 Test Result of Mou Akter SRF ID *********** Is Positive. TEST RESULT……….”

রাত দশ টায় ঘুমাতে গিয়ে হঠাৎ এসএমএস এর সাউন্ড শুনে মিস্টার নিল এসএমএস টা ওপেন করতেই চোখের সামনে নিজের স্ত্রীর করোনা পজিটিভ রিপোর্ট দেখে হাত উনার কাঁপতে থাকে। পাশে উনার স্ত্রী মৌ এর মাত্র ঘুম ঘুম ভাব হয়েছে। ফোন এর দিকে তাকিয়ে এই এসএমএস টা পড়া শেষ হতে না হতে আরেকটা এসএমএস আসলো–

” MOU AKTER, your COVID – 19 test result was positive. If you are in home Isolation & and you have any fever, cough or difficulty in breathing : immediately call COVID – 19 helpline number – *********.
From :Government of West Bengal.”

চোখে যেনো অন্ধকার দেখছেন মিস্টার নিল। এসএমএস টা পড়বেন সেইরকম অবস্থা আর নেই। অনবরত আরো এসএমএস আসতেছে। উনি কি করবেন কিছুই যেনো বুঝতে পারছেন না।

.
বাংলাদেশ থেকে উনার শ্বশুর মিস্টার মোজাম্মেল হক এর চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়া তে এসেছেন উনি, উনার স্ত্রী মৌ, শাশুড়ি জোৎস্না বেগম আর অসুস্থ শ্বশুর মোঃ মোজাম্মেল হক। মোজাম্মেল সাহেব এর মেজো মেয়ে মৌ, আর সবচেয়ে আদরের। মৌ আর নিল এর দুই ছেলে-মেয়ে। মেয়েটার বয়স আঠারো পেরিয়েছে নাম – মোছাঃ মেঘলা আকতার মিম, আর ছেলেটার বয়স তেরো নাম – মাহবুব ইসলাম মাহি।
.

এসএমএস গুলোর শব্দে মৌ এর কাচা ঘুম ভেঙ্গে গেলো।নিল উনার স্ত্রী কে ডেকে বললেন,

“এই মিম এর আম্মু ঘুমিয়ে পড়েছো? উঠোতো একটু।”

-কি হয়েছে আবার? মাত্র ঘুম আসতে নিয়েছি ডাকছো কেনো? আর কে এতো এসএমএস দেয় তোমায় বিদেশে এসেও? (মৌ ঘুম ঘুম চোখে)

“করোনা টেস্ট এর এসএমএস আসছে।” – নিল কথাটা বলতেই মৌ তাড়াহুড়ো করে উঠে বললো,

“কি রিপোর্ট এসেছে? আব্বা তো অসুস্থ মানুষ উনার কি করোনা পজিটিভ এসেছে?”

নিল চুপ করে আছেন কিছুই যেনো বলতে পারছেন না। চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি ঝরে পড়ছে উনার। মৌ উনার হাত ধরে ঝাঁকিয়ে আবারো বললেন,

“মিম এর আব্বু কথা বলছো না কেনো? কার রিপোর্ট খারাপ এসেছে? মার রিপোর্ট কি খারাপ এসেছে? বলো না? ”

নিচের দিকে তাকিয়ে মিস্টার নিল বললেন, “তোমার করোনা পজিটিভ এসেছে মৌ!”

কথাটা শুনা মাত্র মৌ যেনো বোবা হয়ে গেলো। তার চোখ থেকে অঝরে পানি পড়ছে। তৎক্ষণাৎ মৌ খাট থেকে নেমে ঘরের এক কোণায় গিয়ে বসে পড়লো। নিল তা দেখে মৌ এর দিকে এগিয়ে যেতে নিলেন কিন্তু মৌ কাঁদতে কাঁদতে বললো,

“আমার কাছে এসো না তুমি, তাহলে তোমারও করোনা হবে। এই আমার না খুব ভয় করছে। আমাকে হাসপাতাল এ নিয়ে যাবে তাইনা? আমাকে হাসপাতাল এ যেতে দিও না প্লিজ।”

“তুমি ভয় পেয়ো না মৌ কিছু হবে না। আর তোমার তো কোনো সিন্টম নেই করোনা এর। এইখানেই থাকতে পারবে তুমি।”–নিজের মনের মধ্যে ভয় থাকলেও মৌ কে বুঝানোর জন্য বললেন নীল।

-না হোস্টেল এইটা এইখানে যদি না থাকতে দেয়?(মৌ)

-তুমি শান্ত হও একটু। কি করা যায় একটু ভাবতে দাও।(নিল)

মৌ কেঁদেই চলেছে। উনার মনে পড়ছে উনার ছেলে মেয়ের কথা।

“আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমার মেয়েটার কি হবে? ওরা জানতে পারলে মরেই যাবে তো। আল্লাহ্‌ এ কি হলো আমার। যদি আমাকে isolation এ নেয় hospital এ তাহলে তো এমনিতেই মনের জোর হারিয়ে ফেলবো। “-মৌ এইসব ভাবছেন আর কাঁদছে।

মৌ এর কান্নার শব্দে জ্যোৎস্না বেগমের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। মোজাম্মেল সাহেব ঘুমিয়ে পড়েছে, পুরো একদিন journey করায় আরো ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। জ্যোৎস্না বেগম উনার মেয়েকে বললেন,

” কি হয়েছে মা? তোর কি মেরুদন্ডে আবার ব্যাথা হচ্ছে?
.
মৌ এর মেরুদণ্ডে প্রবলেম এর জন্য কয়েক বছর ধরে ইন্ডিয়া তে চিকিৎসা করছে। বিগত এক বছর করোনা এর জন্য India আসতে পারেন নি। কয়েকদিন আগে লক ডাউন শেষ হওয়ায় বছরের প্রথম দিনেই ইন্ডিয়া তে এসেছে।
.
মায়ের কথা শুনে মৌ আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। জোরে জোরে কেঁদে উঠে বললো,” মা আমার করোনা পজিটিভ এসেছে।”

জ্যোৎস্না বেগম কথাটা শুনে আৎকে উঠলেন। আর বললেন,”কি হলো এইটা? এইদিকে এক অসুস্থ মানুষকে নিয়ে এসে আবারো কি বিপদ হলো আমাদের।”

উনি কান্না করছেন। নিজের মেয়ের করোনা পজিটিভ এইটা মানতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। কোনো ভরসা নেই মৌ সুস্থ হবে কি হবে না তার।

মায়ের কান্না দেখে মৌ আরো কান্না করছে আর বলছে,”আমি হাসপাতাল এ যাবো না। আমার ছেলে মেয়ে যদি জানে আমার করোনা হয়েছে ভেঙ্গে পড়বে মা।”

মিস্টার নিল এর দিকে হয়ে মৌ বললেন,”আমাকে তুমি লুকিয়ে দেশে নিয়ে চল। আমি এইখানে আর থাকবো না। আমার ছেলে মেয়ের কাছে যাবো।”

-করোনা নেগেটিভ না হলে বর্ডার ক্রস করা যাবে না তা তো তুমিও জানো। (নিল)

জ্যোৎস্না বেগম মেয়েকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বললেন,”তোর তো কিছুই হচ্ছে না। রিপোর্ট ভুল হয়েছে দেখিস। ”

মৌ যেনো পাগলের মতো হয়ে গেছে। খুব কান্না করছে আর বললেন,”ঠিক বলেছো তুমি মা। কাল কে করোনা টেস্ট এ নেগেটিভ এসে আজকেই কিভাবে আবার পজিটিভ হয়।”

মিস্টার নিল যেনো দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিদেশে গিয়ে এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে অসহায় লাগছে উনার। উনি তবুও মৌ আর উনার শাশুড়ি কে শান্ত হতে বললেন। নিজেকে সামলে নিয়ে মৌ কে বললেন,

” তুমি আর কান্না করোনা, কান্না করলে তোমার আরো প্রবলেম হবে। প্লিজ নিজের মনের জোর রাখো, তোমার ছেলে মেয়ের কথা ভেবে অন্তত নিজেকে শক্ত রাখো।”

-মিম, মাহির কথায় আমার মনে পড়ছে যে। আমার যদি কিছু হয়ে যায়….

মিস্টার নিল মৌ কে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “কিছু হবে না। মনের জোর রাখো।”

উনার কথা শেষ না হতেই করোনা স্বাস্থ্য দফতর থেকে উনার ফোন এ কল আসলো।

-আমরা স্বাস্থ্য দফতর থেকে বলছি। আজকে পরীক্ষিত করোনা রিপোর্ট এ মৌ আকতার এর করোনা পজিটিভ এসেছে। উনার কি কোনো সিন্টম আছে যেমন – সর্দি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট জনিত?

-না উনার কোনো সিন্টম দেখা দেয় নি। একদিন journey করেছে, আর বমি হয়েছিল খুব সেজন্য একটু উইক শরীর। এর বাহিরে কোনো প্রবলেম নেই উনার।উনাকে কি হাসপাতাল এ isolation এ রাখতে হবে? মানে উনি একটু ভয় করছেন, যদি এইখানেই রাখা যেতো…

-যেহেতু উনার কোনো প্রবলেম হচ্ছে না তাই হাসপাতাল এ রাখতে হবে না। একটা রুম এ একা থাকলেই হবে। আমাদের প্রতিদিন আপডেট দিতে থাকবেন।

-ধন্যবাদ।

-রোগী কোন হোস্টেল এ আছেন সব ডিটেইল গুলো আমাদের জানাতে হবে।

মিস্টার নিল সব কিছু ঠিক ভাবে বললেন।
.
এতক্ষণ মৌ আর উনার মা খুব ভয় পাচ্ছিল না জানি হাসপাতাল এ নিয়ে যেতে বলে কি না সেজন্য। মিস্টার নিল কথা শেষ করে বললেন,

“তোমাকে এইখানেই অন্য একটা রুম এ থাকলেই হবে। শুধু নিজেকে শক্ত রাখো সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি হোস্টেল ম্যানেজার এর সাথে কথা বলে একটা রুম বুক করি।”

হাসপাতাল এ থাকতে হবে না জেনে একটু হালকা হলো মৌ। কিন্তু সে বাঁচবে কি মারা যাবে তা সে জানে না সেই ভয় তো থাকবেই। উনি আরো ভয় পাচ্ছে কারণ নিজের দেশে নেই।
.
মিস্টার নিল ম্যানেজার কে সবকিছু বললেন। ম্যানেজার টা খুব ভালো ছিলেন উনি বলেন,” কাল সকালেই আপনাদের পাশের রুম টা তে শিফট করে দিবেন। আজকে রাত টা একটু ম্যানেজ করে নিন ডাবল বেড রুম তো আপনাদের।”

-ঠিক আছে।(নিল)

__________________________

মিম কে বিরক্ত করছে মাহি বারবার ফোন নেয়ার জন্য। কিন্তু মিম কেনো যেনো মাহির সাথে খুব রাগ করছে।

-আপু তোমার আজ কি হয়েছে বলতো? এতো রাগ করছো কেনো?(মাহি)

-কিছু হয়নি। আমার ভালো লাগছে না তুমি যাও তো।(মিম)

” কেনো তোমার ভালো লাগছে না কেনো?” – মাহি মিম কে টানাটানি করছে আর বললো।

-এমনিতেই, ছোট মানুষ এতো কথা বলো কেনো যাও আর এইতো ফোন। আর বিরক্ত করবে না।(মিম)

মাহি ফোন নিয়ে চলে গেলো। মিম একা একা শুয়ে ভাবছে, “আম্মু প্রতিবার ইন্ডিয়া গিয়ে আমাদের সাথে কথা বলে কিন্তু এইবার বললো না। মা বাবা সাথে আছে দেখে আমাদের ভুলেই গেছে মনে হয়। একটুও ভালো লাগছে না। আজ ইন্ডিয়া গিয়েছে কিন্তু তার আগের কয়েকদিনও উনার সাথে ঠিকভাবে কথায় হয়নি।”

মিম ঘুমানোর চেষ্টা করছে কিন্তু ওর বারবার ওর মায়ের কথা মনে পড়ছে। কেনো যেনো বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে মৌ এর মুখ টা। এইটাই বোধহয় মা মেয়ের নাড়ির টান তাই কিছু না জেনেও মিম এর মন অশান্ত হয়ে আছে।

চলবে……??

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here