কোকিলারা,৫ম শেষ পর্ব

কোকিলারা,৫ম শেষ পর্ব
মোর্শেদা হোসেন রুবি

হুড়োহুড়ির একপর্যায়ে প্রবল চড়ে ভূপাতিত হবার সময়ও আমি বুঝিনি যে ওটা রাজিবের দেয়া আঘাত ছিল। সেই রাজিব যে কলেজ চত্বরে আমাকে নিজের বুক দিয়ে আগলে রাখত। যার কারণে কলেজের বাকি ক্যাডাররা সাহস পেতো না আমাকে টিজ বা প্রোপোজ করতে। যার কারণে আমি রেগিং এর নোংরামি থেকে বেঁচে গিয়েছি। যে রাজিব আমাকে আমার বিয়ের পরেও আপন করে নিতে চেয়েছিল। সেই রাজিবের আজ এমন রূপ দেখব কস্মিনকালেও আশা করিনি আমি। প্রবল ইচ্ছে হলো ছুটে গিয়ে ওর কলার ধরে ঝাঁকি দিয়ে বলি যে কতটা বিশ্বাস করতাম আমি ওকে। কিন্তু পারলাম না। একটু আগে ওর করা চড়ের আঘাতটা মরিটবাটার মত জ্বলুনি তুলেছে আমার গাল আর কান জুড়ে। অপমানের জ্বলুনি তো আলাদা। ততক্ষণে রাজিব রওনা দিয়েছে প্রিয়তার হাত ধরে। চলে যাবার আগে আমাকে উদ্দেশ্য করে মুনকে বলেছে, ” তোর বান্ধবীরে বলে দে, আমাকে ঘাঁটালে ফল ভাল হবেনা। পরে ওকেই পস্তাতে হবে। খামোকা ঝামেলা যেন না করে। ও ঝামেলা করলে আমিও ঝামেলা করব। নয়ত আজকেই সব দা ইন্ড।” বাঁকা হাসি দিয়ে শেষবারের মত আমার দিকে তাকাল রাজিব।
-” আর ওর টাকা, যেটা তুই নিছোস ওর থেকে ? ” মুনও ছাড়ার পাত্রী না। সেও সরাসরি প্রশ্ন করে বসল। তবে মুনের এই প্রশ্নে রাজিব মোটেও ঘাবড়ালো না। সে তীব্র তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে আমাকে একবার দেখে নিয়ে বলল,” ওর কাছ থেকে কোন টাকা নেইনি আমি। তারপরেও তোর বান্ধবী যদি এটা প্রমান করতে পারে যে ওর কাছ থেকে একআনা পয়সাও নিয়েছি। তাহলে যা, কেস করে দে। কোর্টে গিয়ে প্রমান কর যে আনার কাছ থেকে টাকা নিয়েছি আমি। তখন সেটা ফেস করব। এর আগে টাকা নিয়ে একটা কথাও শুনব না আমি। উল্টো ওর কাছে পাই আমি। এখন যা, প্রমান নিতে কোর্টে যা। থানা পুলিশ কর। দুই চার জোড়া জুতা ক্ষয় কর তারপর টাকা চাইতে আসিস।” রাজিবের চেহারায় এক অন্যরকম দৃঢ়তা। প্রিয়তা এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার সেও তার নেশাতুর কণ্ঠে বলে উঠল, ” আমার তো মনে হয় রাজিবই অনেক টাকা নষ্ট করেছে আনার পেছনে। এবং এটা পুরো কলেজ জানে। কী মনে হয়, মুন ?এটা কী মিথ্যে ? ” মুন তাতিয়ে উঠে জবাব দিতে শুরু করলেও আমি সরে এলাম দৃশ্যপট থেকে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের তর্ক শোনার আগ্রহ মরে গেছে আমার। ইতোমধ্যে রাজিবের চড়ের কারণে কানের ঝাঁ ঝাঁ শব্দটা এখন ভোঁ ভোঁ তে রূপান্তরিত হয়েছে। কানটা ভেতরে ব্যথা করছে বলেও মনে হলো। দ্রুত পায়ে সরে বেরিয়ে এলাম ওখান থেকে। আজ নিজেকে রুনার চেয়েও বেশি অপমানিত মনে হচ্ছে আমার। রুনাকে যেভাবে শারিরীকভাবে অপদস্থ করা হয়েছে তেমন করেই যেন আজ আমাকেও অপদস্থ করা হলো আর্থিক আর মানসিকভাবে। আমাকে এলোমেলো পায়ে বেরিয়ে যেতে দেখে মুন দৌড়ে আমার পিছু নিলো। আমি ততক্ষণে মার্কেটের বাইরে। অনেকেই তাকিয়ে দেখছে আমাকে। একটু আগের ঘটনায় ছোটখাট জটলা পাকিয়ে যাওয়ায় লোকজনের কৌতুহল কেন্দ্রবিন্দু এখন আমি। ঠিক লজ্জায় না হলেও রাজিবের দ্বারা আরো বেশী অপদস্থ না হবার মানসেই সরে আসা।
রাস্তায় ফুটপাতে নামার পরই মুনকে পাশে পেলাম। ও রেগে আছে আমার উপর।
” তুই চলে এলি কেন ? হারামিটাকে একটা উচিত শিক্ষা দেবার দরকার ছিল।”
আমি ঝাপসা চোখে তাকিয়ে কোনমতে বললাম , ” নিজের শিক্ষাটাই আগে হজম করি। ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে তেমন একটা লাভ হতো না মুন। রাজিব আমাকে আরো বেশি অপমান করার সুযোগ পেত। ”
” আর তোর টাকাগুলো ? ছেড়ে দিবি ? অতগুলো টাকা ? ”
” আড়াইলাখ। ” শান্ত ভঙ্গিতে কথাটা বলেই চারিদিক তাকিয়ে রিক্সা খুঁজলাম আমি। যেন শব্দটা আড়াইশ ছিল। মুন হতভম্ব হয়ে আমাকে দেখল বারকয়েক। বলল,” শালা, তোর বয়ফ্রেন্ডের কী কপাল। এরচে আমাকেই দিতি। ”
ক্লান্ত স্বরে বললাম,” প্লিজ, এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে একদম ভাল লাগছে না। টাকার চেয়ে বেশি যেটা গেছে সেটার দাম আরো বেশি। তুই আমাকে বাড়ি নিয়ে চল মুন, প্লিজ। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।”
মুন আমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে আর কোন তর্কে গেল না। আমাকে আইল্যান্ডে দাঁড় করিয়ে সে রাস্তায় নামল রিক্সার খোঁজে। আর আমি চোখ কুঁচকে জনস্রোতের দিকে তাকিয়ে রইলাম ভেজা চোখে। আমার সমগ্র জীবনে এরচে লাঞ্ছিত আর অপমানিত বোধ করিনি কোনদিন। ভাবতে চেষ্টা করলাম, দোষটা আসলে কার ?
বাড়ি ফেরার পথে মুন একাই কতক্ষণ বকবক করে গেলো। আমি পুরোটা পথ নিরব রইলাম। ভেবে কোন কিনারা পাচ্ছিলাম না। জানিনা এর পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেব। এক মন প্রবল আক্রোশে হুঙ্কার দিয়ে উঠছে আর বলছে রাজিবকে এভাবে ছেড়ে দেয়া উচিত হবেনা। অপর মন ক্ষীণ স্বরে বলছে, কাউকে ডোবাতে হলেও নিজেকে কোমর জল অবধি নামতে হয়। বাড়িতে বাপির যা অবস্থা। তার উপর রুনার সাথে ঘটে যাওয়া ঝামেলার এখনও কোন সুরাহা হয়নি। আমি নিজেও শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত। যদিও ব্যপারটা এখনও ধামাচাপা পর্যায়ে আছে কিন্তু খালিদ নিশ্চয়ই বেশিদিন চুপ করে থাকবেনা। সে নিশ্চয়ই বিষয়টা সামনে আনবে বা আনতে বাধ্য হবে। তখন যে পরিস্থিতিটা তৈরী হবে সেটা সামাল দেয়া আমার জন্য সহজ হবেনা। অজান্তেই বড়সড় দীর্ঘশ্বাস পড়ল আমার। নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও মনকে বোঝাতে বাধ্য হলাম, আমার এখন কোনরকম বাড়াবাড়ি না করাই উচিত হবে। আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত চুপ থাকাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু মুনকে শান্ত করে কে। সে বকবক করতেই লাগল।
” শালারা, এভাবেই আমাদের রক্ত চুষে খায়। আমরাই ওদের সুযোগ করে দেই। কত্তগুলো টাকা। আমার নিজেরই তো আফসোস লাগছে।” আমি কোন জবাব দিলাম না।
মুন আমার দিকে তাকিয়ে বলল,” মাথায় ঘোমটা দে। গলা ঢাক। তোর বয়ফ্রেন্ডের ভালবাসার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। আন্টি জিজ্ঞেস করলে কী জবাব দিবি ? ”
কোন কথা না বলে ত্রস্তে আঁচলটা দিয়ে নিজেকে ভালভাবে ঢেকে ফেললাম। ভুলেই গিয়েছিলাম চড়ের দাগটার কথা। যে হারে জ্বলছে দাগ ফুটে ওঠাই স্বাভাবিক। হঠাৎ আবছা ভাবেই মনে হলো এই চড়টা খালিদ মারলে সেটা হতো ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স। বয়ফ্রেন্ডরা মারলে সেটা কী স্ট্রিট ভায়োলেন্স নাকি ফরেন ভায়োলেন্স ? যদি ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে এত কথার খই তাহলে ফ্রেন্ড নামের বয়দের আর বস নামের অধিপতিদের বাটপারি নিয়ে সুশীল সমাজের রা নেই কেন বুঝলাম না। এটার চর্চাও তো কম নয়।

বাড়ি ফিরে দেখলাম খালিদ এসে বসে আছে। সাথে আমার শ্বাশুড়ি। মনে মনে দারুণ চমকে গেলেও মুখটাকে স্বাভাবিক রাখলাম। লোকটা আমাকে একটা ফোন দিয়ে জানাতে পারতো কথাটা কিন্তু জানায়নি। হয়ত সেও বিচ্ছেদের প্রস্তুতিই নিচ্ছে। আবারও চাপা দীর্ঘশ্বাস। তবে এই দীর্ঘশ্বাসের মর্মার্থ জানিনা। ঘরে ঢুকে শ্বাশুড়িকে দেখে চোরামুখে সালাম ঠুকে কোনোরকম সৌজন্যালাপ সারলাম। তারপর ফ্রেশ হবার কথা বলে ভেতরে চলে এলাম। খালিদ একনজর আমাকে দেখল শুধু তারপরই মুখ নামিয়ে নিলো। নিজের কাছেই খারাপ লাগল ব্যপারটা। গত দুই সপ্তাহেও এই পরিবারটার সাথে একাত্ম হতে পারিনি কেবল রাজিবের কারণে। আজ রাজিব না থাকলে হয়ত সবকিছু অন্যরকম হতো। হয়ত এর জন্যেও আমি নিজেই দায়ী।

প্রবল ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে শরীর। হাত মুখ ধোব ভেবেও গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লাম। চোখটা লেগে আসছিল প্রায়। অমনিই টের পেলাম আমার রুমের দরজায় টোকা দিচ্ছে কেউ। মন বলল ওটা খালিদ। দ্রুত বিছানা ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে পর্দা সরালাম,” ওহ্, আপনি ? ভেবেছিলাম আজও ওখান থেকেই বিদায় নেবেন। আসুন, ভেতরে আসুন। ”
গত কয়েকদিন ধরে গেস্টরুমটা আমি একাই ব্যবহার করছি। রুনার অসুস্থতার কারণে ঐ রুমে আম্মুকে রাতে থাকতে হচ্ছে বলে এই ব্যবস্থা। খালিদ ঘরে ঢুকেই স্থির দাঁড়িয়ে পড়ল। তার দৃষ্টি আমার কান আর গালে স্থির। মনে পড়ল আমি এখনও বাইরের পোশাকেই আছি। শোবার সময় ঘোমটা সরিয়ে ফেলেছিলাম। তার উপর শখ করে আজ শাড়ি পরেছিলাম রাজিবকে সারপ্রাইজ দেবার জন্য। ইচ্ছে ছিল কেনাকাটা করে রাজিবকে কল দিয়ে আনাব। তার আগেই রাজিবের সারপ্রাইজ আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। মুনের বলা কথাটা মনে পড়ায় দ্রুত আঁচল টেনে নিজেকে আড়াল করলাম। খালিদ আমাকে আপাদমস্তক দেখে তিক্ত স্বরে বলল, ” বাইরে কী বেড়াতে গিয়েছিলে নাকি ? ”
” না, ঠিক বেড়াতে না। ” মুখ ফিরিয়ে নিলাম। তবে এবার রাগ বা অহংকার থেকে নয়, সংকোচ থেকে। খালিদ ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,” ভাল। তা এত সুন্দর শাড়ি পড়ে সেজেগুজে তার কাছে গেলে। এর পারিশ্রমিক কী ঐ দাগগুলো ? ”
” কী করব। মেয়েদের ভাগ্যটাই যে এরকম করে গড়েছেন ভাগ্যবিধাতা।”
” হম, ঠিক। ভাগ্যবিধাতাকে দোষ দিলে মনের একটু আরাম হয় বৈকী। তার বিধানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে চলবে আর যাবতীয় আকামের দোষ বিধাতার ঘাড়ে দেবে। তিনি নারীকে যে প্রকৃতিতে গড়েছেন সেই নিয়মেই তার রক্ষণাবেক্ষণ করতে বলেছেন। আর তোমরা সব ছিঁড়েফুঁড়ে দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে বলবে এটা এমন কেন আর ওটা অমন কেন। এখনও তো এটাই জানলে না নারীর ক্ষমতাটা কোথায়। এখন সব দোষ বিধাতার, যত্তসব। যাক্, এসব কথায় কাজ নেই। বরং তুমি তো আমার চেয়ে বেশিই বোঝো। যেটা বলতে এলাম সেটাই বলি। শাহিন মানে আমার আইনজীবী বন্ধুটা আমাদের ডিভোর্সের এফিডেবিট তৈরী করে ফেলেছে। চাইলে কপিটা পড়ে দেখতে পারো। আমি সাথেই এনেছি। সেখানে তোমাকে কোন ব্লেইম দেয়া হয়নি এ্যাজ আই টোল্ড। তোমাকে হিট না করেও পুরো নিয়ম মেনেই কাজটা করেছি। হয়ত আজই তোমার সাথে আমার শেষ দেখা। কারণ এরপরে আর তোমাদের বাড়িতে আসা হবেনা আমার। আর হ্যাঁ, আমাদের ধর্মে একসাথে তিনতালাক দেয়া হারাম তাই আমি একটাই…! ” বলে থেমে গেল খালিদ। ওর চেহারায় বেদনার ছাপ স্পষ্ট। আমিও প্রবল অস্বস্তিভরে মুখ নামিয়ে নিলাম। অজ্ঞাতসারেই মুখটা শুকিয়ে গেল আমার। কিন্তু উপায় নেই। এই পরিস্থিতি আমার নিজেরই তৈরী। যথেষ্ট শক্তি ব্যয় করতে হলো দীর্ঘশ্বাসটুকু গোপন করতে। খালিদ এবার বলে উঠল, ” তোমার মোহরানার অর্ধেক টাকা স্ট্যান্ডবাই আগেই শোধ করে দিয়েছিলাম। মনে আছে তো ? তবে যেহেতু আমাদের মাঝে স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্ক তৈরী হয়নি সেহেতু পুরো মোহরানার দাবীটা এখানে অাসবেনা, অর্ধেক মোহরানার দাবিদার তুমি। যেটা অলরেডি দেয়া হয়ে গেছে। তারপরেও আমি তোমার ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ সহ পুরো খরচটাই শাহিনের কাছে জমা দিয়েছি। জোর সম্ভবনা আছে কালকের মধ্যেই সেগুলো তোমার হাতে চলে আসবে। নিয়মানুযায়ী সিটি কর্পোরেশন থেকে তিনবার ডাকা হবে তোমাকে মিউচুয়্যালের জন্য। ওটা এড়িয়ে গেলেই চলবে। থার্ড মান্থে আমাদের ডিভোর্স কমপ্লিট হয়ে যাবে। এই হলো প্রসেস।” বলে একটু থামল খালিদ। আমি মুখ নামিয়ে রেখেছি। কোনরকম অনুভূতিই হচ্ছেনা আমার। না রাগ না দুঃখ। আজকের দিনটাই বুঝি আমার জন্য সব হারাবার দিন। নইলে মাত্র একদিনেই আড়াই লাখ টাকার সাথে রাজিব আর খালিদ একসাথে আমার জীবন থেকে চলে যাবে কেন। খালিদকে বিদায় দেবার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। মৃদু স্বরে বললাম,” আপনার অনেক কষ্ট হলো। অনেকগুলো টাকা নষ্ট হলো। সামাজিকভাবে অপদস্থ হলেন আমার জন্য। কীভাবে ক্ষমা চাইবো বুঝতে পারছি না তবু বলব, ক্ষমা করে দেবেন।” আমার কথায় ফিরে তাকাল খালিদ।
” তোমার এহেন বোধোদয়ের জন্য শুকরিয়া। আমি কাউকে ঋণী রাখতে পছন্দ করিনা। ক্ষমা করেছি বললে যদি তোমার মন হালকা হয় তবে দিলাম ক্ষমা করে। তবে শেষ একটা অনুরোধ করতে চাই। এভাবে নিজেকে নষ্ট করে ফেলো না। মেয়েদের এভাবে চলা উচিত না। তারা শিশুর মতই কোমল আর অরক্ষিত। একে দুর্বলতা বলে যারা তোমাদের মাথা খারাপ করে দিয়েছে তারা নিজেরা যথেষ্ট সুরক্ষিত অবস্থানে থেকে কথাগুলো বলছে। সহজ জিনিসটা কেন বোঝোনা বুঝিনা। যাই হোক, আমি আসি। ভাল থেকো। ” বলেই খালিদ আর দাঁড়াল না। খালিদ চলে যাবার পরও আমি পোশাক না বদলেই চুপ করে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। অনুভূতিরা সব বিবশ হয়ে আছে। কারো কোন রা নেই। নিজেকে মানুষ কম পাথর মনে হচ্ছে বেশি। এখনও চোখের সামনে রাজিব প্রিয়তা আর মার্কেটের ফ্লোরে গড়াগড়ি খাওয়া আনা নামের মেয়েটার অপমানিত মুখটা ভাসছে। রাতে শুতে যাবার আগে বাপির ঘরে এলাম। আম্মুর কাছেই শুনলাম বাপির অসুস্থতা আরো বেড়েছে। আজও তার প্রেসার হাই ছিল। এবার যেন তার অসুস্থতা যাবার নামই নিচ্ছেনা। জানিনা, আমার বিচ্ছেদের খবরে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে। বাপির ঘরে ঢুকে দেখলাম তার চোঁখ বন্ধ। ঘুমুচ্ছেন কিনা বোঝা গেল না। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখে আম্মু চাপা স্বরে বললেন, ” তোর বাপিকে কিছু জানাইনি আমি। কাজেই ওসব বলে লোকটার মনটা ভেঙে দিসনা। একজন তো শয্যাশায়ী করেছে এবার তুই লোকটাকে মেরে ফেলিস না। তোদের আল্লাহর দোহাই লাগে। ” বলতে গিয়ে চাপা স্বরে গুঙিয়ে উঠলেন আম্মু।

পরদিন সকাল থেকেই শুরু হলো খালিদের পাঠানো তালাকনামা আসার অপেক্ষা। তবে এটাকে অপেক্ষা বলাটা বোধহয় ভুল হবে। কাগজটা আসবে জানি বলেই এমন প্রতীক্ষা। কারণ আমি চাই না আমার আগে কারো হাতে ওটা পড়ুক। সেকারণেই দরজার দিকে চোখ কান সব বিছিয়ে রাখা। বলা যায় প্রেমপত্রের মত করেই বিচ্ছেদনামার আসার ক্ষণ গুনছি। তার আগেই ঘটল এক দুর্ঘটনা।
নাস্তা সেরে রুমে এসে বসতেই রুনা ছুটে এলো আমার কাছে। ওর উদভ্রান্তের মত চেহারা দেখে ভয়ই পেলাম। ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালাম,” কী রে কী হয়েছে ? ”
” আপি….আপি…রাজন আমার ছবিগুলো নেটে ভাইরাল করে দিয়েছে রে আপি। এই দ্যাখ।” বলে আমার হাতে মোবাইল ধরিয়ে দিয়েই দু হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল রুনা।
আমি মোবাইলের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সমস্ত শরীরে গা গোলানো একটা অনুভূতি। ঝট করে রুনার দিকে তাকালাম।
” রাজন হঠাৎ এসব কেন করল ? ”
” জানিনা। ” রুনা চোখ সরিয়ে নিলো।
” জানিস না নাকি বলবি না। ” রুনার কাঁধ চেপে ধরে বললাম, ” মিথ্যে বলবি না। সে কী বলেছে বল। প্রয়োজনে পুলিশকে জানাব আমি। এটা অবশ্যই একটা সাইবার ক্রাইম। ওকে জেলের ভাত খাওয়াব আমি।”
আমার কণ্ঠের দৃঢ়তা রুনাকে স্পর্শ করল। বয়স কম বলেই হোক বা অপরিপক্ক মানসিকতা থেকে সে নিজের দুর্বলতার কথা প্রকাশ করে দিলো আমাকে। জানালো সে রাজনকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে বলে বাথরুমেই মোবাইল নিয়ে যেত আর নিজের সেলফি পাঠাত। রাজনের ফরমায়েশ মোতাবেক। কথাটা শোনার পর নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না যে একটা মেয়ে কী করে এতোটা বোকা হতে পারে ? পরক্ষণেই মনে হলো, না এটাকে পুরোপুরি বোকামী বলা যাবেনা। এটাকে অবদমিত প্রেষণার বহিঃপ্রকাশও বলা যেতে পারে। যার হাতেখড়ি একটা ছোট্ট চটি গল্প দিয়েই শুরু হয়। আমি নিজেও নারীপুরুষের একান্ত মুহূর্তের উন্মুক্ত ছবিটা চটি গল্পের শব্দগুলো দিয়েই সাজাতে শিখেছি। যার হাতে দামী এন্ড্রয়েড নেই সেও বাটন সেটে গল্প পড়তে পারে। পর্ণসাইটগুলো যদি ভালগারিটির কলেজ হয়ে থাকে তাহলে চটি গল্প এটার প্রাইমারী স্কুল। উত্তেজনার হাতেখড়ি এসব গল্প থেকেই পায় অপরিণত মনের কিশোর কিশোরীর দল। তারপর একটু একটু করে আগাতে থাকে নীল ছবির দিকে। কিন্তু বুঝটা পরে এলেও আর শোধরানোর উপায় থাকেনা। যেমন আজ আমার নেই। জীবনের পাঁচটা বছর নষ্ট করেছি এসবের পেছনে। ক্লাস সেভেন থেকে গল্প পড়ার অভ্যাস। নাইনে এসে মুনের সাথে পরিচয়। ক্লাস টেনের গোড়ার দিকে ঘনিষ্টতা বাড়লে মুন আমাকে সন্ধান দিয়েছিল এক অন্যরকম গল্পের। ওগুলো পড়ার পর সাধারণ গল্পগুলো বিস্বাদ ঠেকতো। কলেজে উঠেই প্রেমে পড়ে গেলাম রাজিবের। দুটো বছর ওর পেছনে সময় দিয়ে আজ সময় আমার প্রতিকূলে। প্রতিবারের মত এবারও প্রশ্ন জাগল, এর জন্য দায়ী কে ? রাষ্ট্র , সমাজ, স্কুল নাকি আমি নিজে ? প্রবল আক্রোশে রুনাকে কিছু বলতে যাবো তার আগেই হন্তদন্ত হয়ে আম্মু এলেন আমাদের কাছে। অস্থির ভঙ্গিতে ডাকলেন আমাকে।
” এ্যাই আনা, একটু এদিকে আয় তো ? ”
” কী হয়েছে ? ”
” তোর ইয়াজউদ্দিন চাচা এসব কী বলছে ? তোর বাবাকে উল্টাপাল্টা কথা শোনাচ্ছে আর এ মাসের মধ্যেই বাড়ি ছাড়তে বলছে। ”
দ্রুত পায়ে আম্মুর ঘরে চলে এলাম। কথা সত্যি। আব্বুর সামনেই উত্তেজিত স্বরে কথা শোনাচ্ছেন আমাদের বাড়ীওয়ালা ইয়াজইদ্দিন চাচা। তার মুখে একটা কথাই বারবার শোনা গেল, ” আমাদেরও তো মানসম্মান আছে। ” তার একটু পরেই চাচীও এলেন আমাদের বাসায়। তিনি এর আগেও মাঝেমধ্যেই ভাড়া নিতে আসতেন। এমনিতে চাচী সবসময়ই হাসিখুশি মেজাজের। আজ তার মুখ বেশ গম্ভীর। চাচি এবার সরাসরি আম্মুর সামনে একটা মোবাইল ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ” এসব কী আপা ? আপনিই বলেন এসব কোন ভদ্র মেয়েরা করে ? ”
আম্মু প্রথমটায় বুঝতে না পেরে ভাল করে দেখার চেষ্টা করতেই আমি ছোঁ মেরে মোবাইলটা তার হাত থেকে নিয়ে নিলাম। চাচীকে কিছু বলতে যাবার আগেই ধুপ শব্দে তাকিয়ে দেখলাম আম্মু মাটিতে পড়ে গেছে। চাচিকে আর কিছু বলা হলো না কারণ আম্মু অজ্ঞান হয়ে গেছে। এর ঠিক এক ঘন্টার মাথায় বাপি স্ট্রোক করলেন। মাথায় বাজ পড়ার অনুভূতি হলো আমাদের তিনবোনের। বাপিকে হাসপাতালে নেবার সুযোগও পেলাম না তার আগেই স্থানীয় ডাক্তার জানালেন, “বাপি নেই।” পাড়ার অতি উৎসাহি ছেলেরা তবু বাপিকে স্থানীয় মেডিকেল থেকে চেকাপ করিয়ে আনল তার ডেথ কনফার্ম করার জন্য। দুপুরের মধ্যেই পুরো বাড়ি ভরে গেল আত্মীয় স্বজনে।
কারো জীবনে যেন এত খারাপ পরিস্থিতি না আসে। প্রেতাত্মার মত পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছি আর সবার বিষ মাখানো কথাবার্তা শুনছি। ওদের কথার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল আমি ওখানে উপস্থিত নেই। এতোটাই নির্বিকার তারা। সারা দুপুর ভরে শুনতে লাগলাম, যে বাবা তার কন্যাদের সঠিক পথে চালাতে না পারে সে বাবা জাহান্নামী। আমার বাবা তার নিজের জন্য তিনটা জাহান্নাম রচনা করে গেছেন। অথচ একটি কন্যা সন্তান থাকা মানে একটি জান্নাতের মালিক হওয়া। তথ্যটা আমার জন্য নতুন। এরপর সবাই মিলে রুনাকে গণহারে মন্দ বলার প্রতিযোগিতায় নামল। ওসব দেখে রুনা সেই যে ওর ঘরের খিল দিয়েছে আর খোলার নাম নেই। তবে মন্দের ভালো হিসেবে আমাকে সবাই এর বাইরে রাখলো। উপস্থিত লোকজন উল্টো আমাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। তাদের সান্ত্বনা বাক্যে একটা কথাই বারবার উঠে আসছিল, ” তুমি হলে বড়। বলতে গেলে তুমিই এবার ওদের মা। তুমি তো এখনকার সময়টাকে জানো। এবার ছোট বোনটাকে সামলাও। মেজটা তো বরবাদির লাইনে চলেই গেছে। ছোটটা যেন না যায় সেদিকে খেয়াল রেখো। শুনলাম, তোমার শ্বশুরবাড়ি নাকি খুবই ভালো। যাক্, তবু তো তোমার একটা ভাল গতি করে যেতে পেরেছে তোমার বাবা। আহারে, মেজ মেয়ের এসব অপকর্ম লোকটা সহ্য করতে পারলো না। দেখো, তোমার শ্বশুরবাড়িতে আবার কী বলে। এসব দেখলে তো তারাও তোমাকে রাখবে বলে মনে হয় না। ”
পাথরের মত চেহারা নিয়ে নিরবে সবটাই শুনলাম। কোন উত্তর করলাম না। কথাগুলো শুনতে শুনতেই খালিদকে দেখতে পেলাম। সবাই সসম্মানে ওকে আমার দিকে আসার জায়গা করে দিলো। তাদের মুখে চাপা গুঞ্জন, ‘ নতুন জামাই আসছে। এটা ওদের নতুন জামাই। গতমাসেই তো বিয়ে হলো। দ্যাখ, কোন্দিন লাত্থি মেরে বিদায় করে দেয়। যে কান্ড বোনটা ঘটালো এরপর কী আর বড় বোনকে রাখবে ! ”
আমার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় ভেতরের ঘরে ডাকল খালিদ। বুকটা ছাঁৎ করে উঠল আমার। সেও কী আজই সবার সামনে আমাকে তালাকনামা ধরিয়ে দিতে এসেছে ? আড়াল হতেই তাকে ফ্যাঁসফেসে কণ্ঠে বললাম, “একটা অনুরোধ রাখবেন? কাগজটা আজই দেবেন না প্লিজ। আমি চাই না আজই সবাই এখনই জানুক। ডিভোর্স তো দেবেনই বা দিয়েছেনও। দুদিন পরে হলে তো ক্ষতি নেই, তাই না ? ”
খালিদ কোন জবাব দিলো না । নিঃশব্দে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ” নাহ্, ক্ষতি কী। আমি ফোনে বাপির সংবাদটা পেয়ে না এসে থাকতে পারলাম না। লোকটা এখনও আমার শ্বশুর। এটা তার হক যে আমি তার জানাযায় শরীক হবো। ”
এরপরে আর কথা এগোলো না। তবে পরবর্তী কার্যক্রমগুলো একটার পর একটা ঘটে যেতে লাগল। ঘরের ভেতরে বসেই টের পেলাম কাজগুলো খালিদের। খালিদকে দেখার পর অনেকেরই জবানে তালা পড়ে গেছে। এই রহস্যের ভেদ উন্মোচন করতে আরো কত বছর যাবে আমার জানিনা।

সকাল থেকেই আজ ডায়রী লেখার নেশা পেয়েছে আমাকে। লিখছি তো লিখছিই। কখন বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে টেরই পাইনি। আসরের আযান শুনে বোধোদয় হল। চুলায় চায়ের পানি চড়াতে হবে। একটু পরেই সব চা -খোরেরা হাজির হবে। চায়ের পানি চড়িয়ে অনুচ্চ স্বরে আব্রু আর হায়াকে ডাকলাম। বলার সাথে সাথেই ওরা চলে এলো। দুজনকে তাদের রুটিন ওয়ার্ক কাজগুলো ঠিকমত করেছে কিনা জিজ্ঞেস করে হেনার রুমে চলে এলাম। ওর টেবিলে দুধের গ্লাস রেখে বললাম,” তোর পরীক্ষা কেমন হলো রে? ”
” অালহামদুলিল্লাহ, ভালো। ভাইয়া কী চলে গেছে ? ”
” না, চা খেয়ে যাবে।” বলতে বলতেই ডাক পড়ল আমার।
” আনা…? ”
উনি আমাকে এভাবেই ডাকেন। ঠিক প্রথম দিনের মত করেই। টানা টানা সুরে। প্রতিবারেই বুকের ভেতর ভ্রমরের গুঞ্জন তুলে ডাকটা। ছটফটে পায়ে বেরিয়ে এলাম। অভ্যস্ত হাতে চা বানিয়ে তার সামনে রাখলাম।
ভারী স্বরে বললেন ,” চশমা কই আমার ? ” শুনে ফিক করে হেসে নিজের চোখের দিকে দেখালাম, ” এই যে। এটা পরে আমি লিখছিলাম। অক্ষরগুলো ঝাপসা লাগে আজকাল। ভাবলাম তোমার চশমা দিয়ে ট্রাই করি। বেশ পরিস্কার দেখা যায় জানো ? ”
” চোখটাকে নষ্ট করার শখ হয়েছে, তাই না ? ডাক্তারের কাছে গেলেই পারো।” বলেই তিনি আমার দিকে তাকালে আমি নিজের চোখ থেকে চশমাটা খুলে আঁচলে মুছে তার চোখে তুলে দিলাম। তিনি সেটা চোখে দিয়ে আমার লেখার টেবিলের দিকে তাকালেন,” কেন লেখো এসব? কে পড়বে ?”
” আমার নাতি নাতনীরা পড়বে।” হাসলাম আমি।
” কোনো দরকার আছে ? একজীবনে ওরকম ভুল কমবেশি আমাদের সবারই আছে। এটা জনে জনে গেয়ে বেড়ানোর দরকার নেই। তোমার ছোট মেয়েকে ডাকো। ভদ্রমহিলা আজ আমার সাথে রাগ করেছেন। ওর মান ভাঙানো দরকার। ”
মুচকি হেসে আমার সর্বকনিষ্ঠা কন্যা গহনাকে ডাকলাম। তিনি এলেন। ছোট ছোট পায়ে। অভিমানাহত ভঙ্গিতে। বয়সের তুলনায় তার ভারিক্কি মাঝেমধ্যে বাপকেও টপকে যায়। অথচ মেয়েটার বয়স মাত্র তিন। তবে সবচে ভাল যে ব্যপারটা সেটা হলো আমার তিনটা মেয়েই তাদের বাবার স্বভাব পেয়েছে। একাধারে হাসিখুশি আবার গম্ভীর। মেজাজটা আবার আমার কাছ থেকে পেয়েছে। আমি মনে করি মেয়েদের একটু আধটু মেজাজের দরকার আছে। একেবারে ডাল ভাত হলে আবার সমস্যা। সুযোগসন্ধানীরা সুযোগ নিতে সাহস পেয়ে যায়। তবে আমার তিন মেয়ের বেলায় সেই সুযোগ আমি রাখিনি। তাদের চারপাশে আমি গড়ে দিয়েছি অদৃশ্য দেয়াল। চাইলেই ওদের কাছে পৌঁছানো অত সহজ হয় না। প্রয়োজনের তাগিদেই আমি আজ বড় কঠোর। তার উপর বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে আম্মু আর হেনাতো আছেই। বাপি বাবা মারা যাবার পর থেকেই আম্মু শয্যাশায়ী। শরীরের একপাশ তাঁর প্যারালাইজড। আর হেনাকে পথে আনতে খুব বেশী কসরত করতে হয়নি। বাপির মৃত্যু আর রুনার সুইসাইড ওর জন্য একটা বড় ধাক্কা ছিল। পরবর্তী পরিস্থিতি সামলে নেবার জন্য আমি তো ছিলামই। সব দুঃখই একদিন সয়ে আসে। হেনারও এসেছিল। ওরই মধ্যে একদিন দেখি, কম্বলের তলায় আলো। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি ওভাবে লুকিয়ে মানুষ কখন গল্প পড়ে।যে গল্পটা সবার সামনে পড়া যায় না ওটা আর গল্প থাকেনা। অন্য কিছু হয়ে যায়। আচমকা কম্বল সরিয়ে টান মেরে মোবাইল নিয়ে দেখলাম সেই সস্তা গল্প। যেগুলো লেখার জন্য কোন প্রতিভার দরকার হয়না। আছাড় মেরে সেদিনই ওর মোবাইল ভাঙি আমি। চড় চাপড় তেমন দিতে পারিনি কারণ হাতে পায়ে বড় হয়ে গেছে। তারপরেও আমাকে কঠোর হতে হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে হেনা আজ বুয়েটের ছাত্রী। ওকে আমি মুনের মত বন্ধু গড়তে দেইনি যার ঠাঁই আজ কোথাও হয়নি। না ঘরে না বাইরে। বিগতযৌবনা মুন এখন যৌবনে কজনের মুন্ডু চিবিয়ে খেয়েছে সেই হিসেব কষে বসে বসে।

আক্ষরিক অর্থেই আমি এখন বাড়ির বড় মেয়ের ভূমিকায়। একই সাথে খালিদের বাড়ির বউ। তবে পথটা মসৃণ ছিলনা আমার জন্য। খালিদের পরিবার আমার মত অজাতকে মেনে নিতে চায়নি। খালিদের অনমনীয়তার কারণে তারা মেনে নিতে বাধ্য হলেও আমার সাথে তাদের আচরণ ছিল বিমাতাসুলভ। তা হোক, এতে আমি বিন্দুমাত্র দমে যাইনি। ভাল করেই জানি রাজত্ব পেতে হলে সততার সাথে কিছুটা সময় আর কাঠখড় একসাথে পোড়াতে হয়। তারপরেই আসে আধিপত্য। নইলে থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে বলা সস্তা স্লোগানে শেষ পর্যন্ত ঘরপোড়া গরু হয়ে মাঠে-ময়দানে চড়ে বেড়ানো ছাড়া আর উপায় থাকেনা। ওরকম ছাড়া গরু পেলে সবাই যে জবাই করার তালে থাকে সেটা এতোদিনে বেশ ভাল করেই জেনে গেছি। রাজিবের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ যে ও সেদিন আমাকে অপমান করেছিল নইলে এ ঘোর আমার সহজে কাটতো কিনা সন্দেহ। আর খালিদ ? বেচারা সেদিন আমার দুরবস্থা দেখে শেষ পর্যন্ত এফিডেবিট ছিঁড়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিল। একই দিনে বাপির চলে যাওয়া, আম্মুর শয্যাশায়ী হওয়া আর রুনার সুইসাইড আমাকে পাগল করে ফেলত যদি না সহমর্মী হিসেবে সেদিন খালিদ আমার পাশে দাঁড়াত। ওর কাছ থেকেই শিখেছি কীভাবে স্বার্থপরতা এড়ানো যায়। আজকাল বেশ খুশিমনেই স্বার্থ বিসর্জনের অপ্রীতিকর কাজটা করি। এখন আমি রোজ নিজ স্বার্থ বিসর্জন দেই এবং সে জন্য মোটেও অনুতাপ করিনা। আমার ঘরে এখন হেনা সহ চারজন উদীয়মান মহিয়সী। কারণ ওদের কোকিলা হবার পথে সবচে বড় বাধা যে আমি নিজেই। আমি চাইনা আমার মেয়েরা কোকিলা হোক। কাকের বাড়ি ডিম পেরে গান গেয়ে বেড়ানো উড়নচন্ডী কোকিলা আমার দরকার নেই। বরং তারা বাঁচুক বাঘিনী হয়ে। যার আত্মত্যাগ না হলে বাঘ প্রজাতি আজ বিলুপ্ত হয়ে যেত। তারা হোক প্যালিগনের মত মা যে প্রজাতিটা পৃথিবীতে টিকেই আছেই তাদের মায়েদের জন্য। পৃথিবীর প্রতিটা সৃষ্টির মত নিজের সৃষ্টি রহস্য জানুক আমার মেয়েরা। নিজেদের সম্মান তারা অর্জন করতে শিখুক। নিজের ভাললাগা চাপিয়ে দেবার মত মূর্খ বাবা-মা আমরা নই তবে সিদ্ধান্ত নিতে ওদের সাহায্য করতে সদা তৎপর। যেন তারা কখনও জ্ঞানপাপীদের মত নিজেদের নারীত্বে আক্ষেপের সুর তুলে না বলে, আমি কেন পুরুষের মত চলতে পারব না। এরচে বড় মূর্খতা যে আর নেই।

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here