কনে বদল পার্ট- ৪,৫

কনে বদল
পার্ট- ৪,৫
Taslima Munni
পার্ট- ৪

সেই দুই হাজার টাকা যদি না থাকতো তবে আজ তোমরা সারোয়ার সাহেবের ছেলের পরিচয় না, কামলা সারোয়ারের পুত পরিচয়ে বাঁচতা!!

বুঝতেই পারছো সেই ছেলেটা তোমার বাব!!আর সেই টাকাটা কে দিয়ে ছিলো জানো? শিখার বাবা।

মাহিরের চোখ ভিজে গেছে।

এখন যদি মনে করো সেই টাকা শোধ করার জন্য তোমাকে ব্যবহার করছি বা তোমার উপর চাপিয়ে দিচ্ছি তবে ভুল করছো।
বাবারে… কিছু ঋণের শোধ হয় না।
কোনো কিছুর বিনিময়ে সেই দুই হাজার টাকার মূল্য পরিশোধ সম্ভব হবে না।

শিখাকে যখন বিয়ে করাতে চেয়েছিলাম তখন শিখার বাবার পরিচয় জেনেই গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা যে শিখার বদলে অন্য মেয়েকে দেখিয়েছে সেটা তো জানতাম না।
ওর মায়ের সাথে কথা বলার পরে বিষয় টা পরিষ্কার হয়ে গেছে আমার কাছে। শিখার বাবা মারা যাবার পরে ওর চাচাদের অত্যাচারে ওদের জীবন বিষিয়ে গেছে। আর শিখার বিয়ের এসব সব ওর চাচাদের প্ল্যান অনুযায়ী হয়েছিলো।
কেন করেছিলো সে সব পরে জেনে যাবে।
মানুষের ভিতর দেখার চেষ্টা করো।তাহলেই মনে শান্তি পাবে।
এখন যাও আমি একটু বিশ্রাম নিবো।

মাহির খুব হতাশ হয়ে চলে গেলো।

কয়েকদিনের মধ্যেই মাহির নতুন বাসা নিলো। শিখা সাথে করে নতুন বাসায় উঠলো।
শিখা নিজের হাতে এই নতুন সংসার সাজালো।
মাহির এখন স্বাভাবিক ব্যবহারই করে শিখার সাথে।
একদিন ইভা ফোন দিলো মাহিরকে।ইভা শিখার কথা জিজ্ঞেস করতেই মাহির বললো
– শিখা ভালোই আছে।
– তোমাদের মধ্যে কি সব ঠিক হয়েছে?
– ভাবি, আমি অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু কিছুতেই মানতে পারছিনা।
– ও কিন্তু অনেক ভালো একটা মেয়ে।তোমার কতটা খেয়াল রাখে সেটা বোধহয় তুমি নিজেও বুঝতে পারো না।
– জানি। কিন্তু…. বাদ দাও ভাবি।
– হুম। ওকে একটু বুঝতে চেষ্টা করো।তাহলে তোমার জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে।
ভালো থেকো।রাখছি।

মাহির সত্যিই চাইছে মানিয়ে নিতে। কিন্তু শিখা সামনে আসলেই ওর মেজাজ বিগড়ে যায়। খারাপ ব্যবহার না করলেও স্ত্রী বলে ভাবতে পারছেনা।
সেই সকালে বেরিয়ে যায় মাহির।রাত আট টার পরে ফিরে। শিখা সারাদিন বাসায় একাই থাকে। মাহির এসে খাবার খেয়ে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে আবার কাজ করে কিছু। শিখার সাথে প্রয়োজনের বাইরে কথা বলার মতো সময় যেমন নেই, তেমনি মাহির নিজেও সময় খুঁজে না কথা বলার জন্য।
শুক্রবার দিনটা অর্ধেক ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয়।
এক শুক্রবার রাতে শিখা যখন সব কাজ সেরে রুমে আসলো, তখন মাহির কি মনে করে শিখাকে জিজ্ঞেস করে ফেললো
– তোমার বাসায় কে কে আছে?
এতো দিন এসব জানার প্রয়োজন বোধ করেনি।
– অনেক মানুষ আছে। মা আছে,আমার বোন শশী আছে। বড় চাচা, বড় চাচীমা,উনার এক ছেলে, দুই মেয়ে, ছোট চাচা-চাচি,উনাদের দুই ছেলে মেয়ে।
– বাহবা! এতো দেখছি বিরাট পরিবার।
– হা।সবাই একসাথেই থাকে।
– তোমার চাচারা নাকি অনেক… তোমার বাবা তো শুনেছি ভালো জব করতেন।
চাইলে তো তোমরা আলাদা থাকতে পারতে।
– এটাই নাকি আমাদের পরিবারের রেওয়াজ; যাই কিছু হয়ে যাক,কেউ আলাদা থাকতে পারবে না। আমার দাদু উনার সম্পত্তির যে উইল করে গেছেন, তাতে আছে কেউ একজন যদি আলাদা হয়ে যায় তবে শুধু সে বঞ্চিত হবে না,বাকি সবাইও বঞ্চিত হবে। কারণ সব তাহলে একটা ট্রাষ্টে চলে যাবে।
এই ভয়ে কেউ আলাদা হয়নি।আমাদের ও আলাদা হতে দেয়নি।
বাবা মারা যাবার পর পেনশনের একটা টাকাও মায়ের হাতে রাখতে পারেননি।সব চাচারা নিয়ে গেছেন।
– হুম। বুঝেছি।

সবকিছুর পিছনে তোমার চাচারা! বুঝলাম, কিন্তু এই বিয়ে নিয়ে এতো নাটকের কারণ তো বুঝলাম না।
শিখা মৃদু হেসে বললো
– আমি যে দেখতে ভালো নই।
তাই সবার বোঝা হয়ে গিয়েছিলাম।

বাবা মারা যাবার তিন বছরের মাথায়, ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর যখন ভর্তি হতে চেয়েছি,চাচারা পড়া বন্ধ করে দিলেন। মেয়েদের এতো পড়ার নাকি দরকার নেই।
অনেক চেষ্টা করেও আর পড়তে পারিনি।
মা চেয়েছিলেন বিয়ে দিয়ে দিতে।কিন্তু বড় চাচী প্রথম বাধা দিলেন। বললেন এতো তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই।
আসলে মা আর আমি সংসারে সব কাজ করতাম। প্রায়ই মা অসুস্থ হয়ে পড়তেন, তখন আমি আর শশী মিলে রান্না করা,কাপড় কাচা,ঝাড় দেয়া…. সব করতাম।
বিনে পয়সার চাকর কেউ এতো সহজে ছাড়ে!!

আমাদের পড়া বন্ধ হলেও অন্যরা সবাই ঠিকই পড়াশোনা করেছে।। কিন্তু উনার মেয়ের বিয়ে ভেঙে গেছে, কারণ মানুষের মুখে শুনেছে বাড়ির বড় মেয়ের এখনো বিয়ে দেয়নি। এজন্য অনেকেই উনাদের বদনাম করেছে।
পরপর কয়েকটি বিয়ে ভাঙার পরে চাচির টনক নড়ে। এবার আমাকে বিদায় করতে উঠে পড়ে লাগেন।

কিন্তু আমি তো সুন্দর নই, তার উপর বয়স ত্রিশের কোটা ছুঁয়েছে! এই মেয়েকে দেখতে এসে কেউ পছন্দ করবে??
বারবার চেষ্টা করেও যখন দেখলো কেউ আমাকে পছন্দ করছে না, তখন তারা আরও মরিয়া হয়ে গেলেন।
উঠতে বসতে অনেক অপমান করতেন তারপর গায়েও হাত তুলেছে। কারণ আমার অপরাধ হলো -আমার বিয়ে হচ্ছে না। কেউ পছন্দ করছে না।

তারপরে আমার মামাতো বোন দোলন কে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসলো। শুনলাম ওকে দেখতে আসবে এখানে। ওকে পছন্দ করলো।বিয়ে ঠিক হলো।।
বিয়ের আগের রাতে জানলাম বিয়েটা আমার। বুঝলাম আমার বদলে দোলকে দেখিয়েছে।এটা কত বড় অন্যায়! লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছিলো।

অনেক চেষ্টা করেছি, অনেক বুঝিয়েছি।কিন্ত শেষ পর্যন্ত মা বললেন, বিয়ে না করলে উনি বিষ খাবেন। বিষের শিশি হাতে নিয়ে বসে ছিলেন। তখন আমার আর কিছু করার ছিলো না।

আমার মা অনেক অসহায়। রোজ রোজ উনাদের কাছে আমার জন্য অপমান সহ্য করতে করতে উনি আর পারছিলেন না। আমাকে অই নরক থেকে বাঁচাতে অন্যায় জেনেও মা এটা করেছে।
মায়ের উপর অভিযোগ নেই।অভিমান আছে।
আর কিছু না পারলে তিন মা মেয়ে তো এক সাথে মরতে পারতাম!!

শিখার কথা শুনে মাহিরের চোখ কখন ভিজে গেছে টের পায়নি।

চলবে….
# কনে বদল
# পার্ট – ৫
# Taslima Munni

মায়ের উপর অভিযোগ নেই।অভিমান আছে।
আর কিছু না পারলে তিন মা মেয়ে তো এক সাথে মরতে পারতাম!!

শিখার কথা শুনে মাহিরের চোখ কখন ভিজে গেছে টের পায়নি।
বুকের ভেতর চিনচিন করে উঠলো। কত রঙের দুঃখ আছে মানুষের মনে!!
শিখাকে বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না মাহির। শুধু বললো
– ঘুমিয়ে পড়ো।
শিখা ঠিকই ঘুমিয়ে পড়লো, কিন্তু মাহিরের চোখে ঘুম আসেনি।

মাহির শিখার দুঃখের গল্প শুনে শিখার প্রতি কিছুটা নমনীয় হতে চাইলো।কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি মাহিরের মন ঠিক উল্টিয়ে দেয়।
মাহির ঢাকায় এসেছে বউ নিয়ে, এই কথা শোনার পরে মাহিরের এক সাইফ তার বউ নিয়ে আসে মাহিরের বাসায়।
শিখাকে দেখে একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করা মাহিরের চোখ এড়ায়নি।
শিখা অনেক আপ্যায়ন করলো মাহিরের বন্ধু আর বন্ধু-পত্নীকে।
শিখা কিচেনে ব্যস্ত ছিলো। মাহিরও একটু বাহিরে গিয়েছিলো।সাইফ আর সাইফের বউ বেলকনিতে বসে ছিলো।
মাহির ওদের ডাকতে এসে শুনলো সাইফের বউ বলছে
– তুমি দেখো বয়সে অনেক বড় হবে। মাহির ভাইয়ের পাশে একদম মানায়নি। গায়ের রঙ ও ময়লা!
– এটাকে ময়লা বলে না,শ্যামলা বলে।
– অই একই কথা। কেমন যেন!
– খুবই ভদ্র আর অমায়িক। হয়তো এতো সুন্দরী নয়।
– পেহলে দর্শনদারী, ফের গুণ বিচারি!! তোমার কি মনে হয় মাহির ভাই ওর সাথে সুখী হবে? উনার মতো হ্যান্ডসাম ছেলের পাশে একে দেখলে মানুষ বড় বোন ছাড়া কিচ্ছু ভাববে না।
উনি কিভাবে মানিয়ে নিয়েছেন আল্লাহ ই জানেন!!
– হুমম।।
এসব শুনে মাহিরের মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেছে।
কিন্তু ওদেরকে কিছু তো বলা যায় না। আর তারা সত্যি কথাই তো বলেছে। ভুল কিছু বলেনি।
ওরা সেদিন বিদায় নিলেও মাহিরের মনে আরও বিষাদ দিয়ে গেলো।

শিখার প্রতি যতটুকু দুর্বলতা তৈরি হচ্ছিলো সেটাও এখন অসহ্য মনে হতে লাগলো। আগে টুকটাক কথা বললেও এখন সেটাও বলে না।
সারাদিন একা বাসায় শিখার দম বন্ধ হয়ে আসে।মাহির রাতে ফিরে সকালে চলে যায়।শিখার দিকে খেয়াল দেবার প্রয়োজন বোধ করেনি।

এই বন্ধ অবস্থায় থেকে থেকে যেন শিখার প্রাণ হাঁসফাঁস করছে একটু মুক্ত নিঃশ্বাস নিতে।মফস্বলের মেয়ে শিখা।এই বন্দী দশায় ওর শরীরের অবনতি হচ্ছে কেবল।
না খেতে পারছে,না শান্তি পাচ্ছে। অসুস্থ বোধ করছে।কিন্তু কাকে বলবে?
মাহিরের সময় কই ওর দিকে ফিরে দেখার!!
দিন দিন শিখা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে।
ও কিছু খেতে পারছে না। সারাদিন কিছু খায় কিনা মাহির কখনো জিজ্ঞেস করেও দেখেনি।
রাতে মাহিরের সাথে খেতে বসলেও মাহির খেতে খেতে ফোন ঘাটে।
খাবার শেষ করে উঠে চলে যায়।
শিখা যে কিছুই খেতে পারছেনা সেদিকে ও খেয়াল করেনি।

এরমধ্যে হঠাৎ একদিন শিখা ঘুমিয়ে আছে,মাহির শিখার দিকে খেয়াল করে দেখে মেয়েটা অনেক শুকিয়ে গেছে।
মাহির ভাবলো হয়তো এখানে মানিয়ে নিতে পারছেনা।
পরদিন সকালে মাহির শিখাকে জিজ্ঞেস করলো
– তুমি কি অসুস্থ?
– না তো।আমি ঠিক আছি।
– কিন্তু তোমাকে দেখে অসুস্থ মনে হচ্ছে। অনেক শুকিয়ে গেছো।
– কিছু হয়নি। এখানে কেমন বন্দী বন্দী মনে হয়। ভালো লাগছে না আমার।
– হুম। আর তো দেড় মাস।দেখতে দেখতে চলে যাবে।
তোমার কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে বলো।
– আচ্ছা বলবো।

দুদিন পরে মাহির খেয়াল করে শিখাকে খুব অসুস্থ লাগছে।চোখে মুখে অস্বাভাবিক কিছু একটা বুঝতে পারছে।মাহির আরও খেয়াল করলো শিখা কিছুই খেতে পারছেন না।
– তুমি যে বললে অসুস্থ না! আমি তো দেখছি তুমি সুস্থ না।কিছু ই তো খাওনি।
কি হয়েছে তোমার? তোমার চোখে কেমন ফুলে গেছে!
– আমাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিবেন? আমার এখানে একদম ভালো লাগছে না।
– আচ্ছা সে দেখা যাবে।আগে তোমার ডাক্তার দেখাতে হবে।

দুদিনের মধ্যে মাহিরের সুযোগ হয়নি ডাক্তার দেখানোর।
সেই রাতে শিখার অনেক জ্বর উঠে। মাহির সারারাত জেগে জলপট্টি দেয় মাথায়।
শিখা এক রাতে যেন বিছানার সাথে মিশে গেছে! ঔষধ এনে খাওয়ানোর পরে জ্বর কমলেও শিখা যেন শরীরে কোনো শক্তিই পাচ্ছে না।
মাহির আর দেরি না করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো।
অনেক ঔষধপত্র নিয়ে তারা ফিরলো।

চার- পাঁচ দিন পরে মাহির ইভাকে ফোন করে বললো
– ভাবি, তুমি একটু ভাইয়া বা বাবাকে নিয়ে একটু ঢাকায় আসো।
– কেন মাহির? কি হয়েছে? কোনো সমস্যা?
– শিখা খুব অসুস্থ। ওকে একা রেখে আমি যেতে হয়।
কিভাবে কি করবো বুঝতে পারছি না।
একা রেখে যাবো ভরসা পাচ্ছিনা।তোমরা আজই আসো।
– কি হয়েছে শিখার?
– জানি না ভাবি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমরা আসো।
– ঠিক আছে তুমি চিন্তা করো না। আজই আসবো।

মাহিরের ভাবি আর বাবা এসে ঢাকা পৌছালো।
তারা এসে শিখাকে দেখে চমকে উঠলো।শিখা ঘুমে।উনারা আসবেন সেটাও শিখা জানে না।
– একি হাল হয়েছে মেয়েটার! একদম চেনাই যাচ্ছে না।
তুমি ওর দিকে খেয়াল রাখোনি? কি অবস্থা হয়েছে ওর! নিশ্চয়ই খাওয়া দাওয়া একদম করেনি।
– ভাবি, আমি সারাদিন বাসায় থাকলে তো! সকালে বের হই সেই রাত হয়ে যায় ফিরতে ফিরতে। আগেই বাবাকে বলে ছিলাম। বাবা তো বুঝেনি।
একা সারাদিন কি করে সেসব তো আমি খেয়াল রাখতে পারিনা।
আর এমনিতেই আমি প্রেশারের মধ্যে থাকি।

– যাই বলো ভাই,তোমার খেয়াল তো ছিলো না সেটা আমি জানি। তার সাথে অবহেলায় ছিলো।
মেয়েটা ভেতরে ভেতরে কেবল কষ্ট পেয়েছে। নিজের দিকে একটু ও খেয়াল করেনি।

মাহির, ইভা কথা বললেও সারোয়ার সাহেব গম্ভীর ভাবে বসে রইলেন।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here