এক_প্রহরের_খেলা ৭

এক_প্রহরের_খেলা

বাবাকে ইমারজেন্সীতে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই রুমকির ফোন পেলাম। ফোনের দিকে তাকাতে আপনা হতেই দীর্ঘশ্বাস পড়ল আমার। বাবার এই আচমকা অসুস্থতা দমকা হাওয়া হয়ে আমাদের মধ্যকার সমস্ত অভিমান এক নিমেষেই দুর করে কোথাও উড়িয়ে নিয়ে গেছে। রুমকির কণ্ঠস্বর সেই প্রথম দিনের মতই স্বচ্ছ আর অকপট। কে বলবে, এই মেয়ে গতরাতে আমার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি পর্যন্ত। অভিমানের তোড়ে কথার জবাব দেয়নি। অথচ এখন কত সহজ সুরে কথা বলছে,
-” বাবা কেমন আছেন ঋভূ? ”

রুমকির মুখে নিজের নামটা বড্ড অচেনা শোনাল। ক্ষণিকের জন্য আনমনা হয়ে গেলাম। নায়লা আর রুমকির ডাক একই। তবু শুনতে দুই রকম কেন কে জানে।
-” বাবাকে ভেতরে নিয়ে গেছেন। ডাক্তার দেখছেন ওনাকে । আমাকে ভেতরে যেতে দেয়নি।”
-” ওহ্ আচ্ছা। কী হয় না হয় জানাবেন। আম্মু খুব দুশ্চিন্তা করছেন।’
-” আম্মুকে দুশ্চিন্তা করতে মানা কর। এতে আম্মুও অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
-” জি, আমরা তাকে বোঝাচ্ছি। ইয়ে আপনি একটু ফ্রি হলে বড়চাচুকে ফোন করে দিন । রাতের ব্যপারটায় বড়চাচু না এলে কিভাবে কী করবেন। উনি এলে অনেক দিক সামলাতে পারতেন।” রুমকি বলামাত্রই কথাটা মনে পড়ল। তাই তো, আজ রাতেই তো প্রীতির আকদ হবার কথা। দীর্ঘশ্বাস চেপে বললাম,
-” কী বলব বড়চাচুকে? ” বলেই মনে পড়ল বাড়ীর ঘটনা তো আসলেই কিছু জানিনা আমি। কেমন করে এতসব ঘটল সেটা আগে জানা প্রয়োজন। নইলে কী বলব চাচুকে। রুমকিকে বললাম,
-” আচ্ছা, বাড়ীতে কী হয়েছিল বলতো? বাবা আপানের কোলের মধ্যে মাথা রেখে ওভাবে পড়েছিলেন কেন? কোন সমস্যা হয়েছে ? ”

ওপাশে রুমকি হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল। আমি বারদুয়েক হ্যালো বলার পর সে হালকা কেশে বলল।
-” জি, একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। কিন্তু অনুরোধ করব, আপনি দয়া করে অস্থির হবেন না কারণ সবাই মিলে অস্থির হলে পরিস্থিতি সামলাবে কে বলুন ? ”
-” কী হয়েছে বলো তো ? ” আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতেই প্রশ্নটা করলাম। এরপর রুমকি যা বলল তার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। শুনতে শুনতে মুখটা আমার রাগে লাল হয়ে উঠল। অজান্তেই গালি বেরিয়ে এল মুখ থেকে। বিশ্রী এক খিস্তি আউড়ে বললাম, ” ঐ হারামির বাচ্চার মনে যদি এই ছিল তাহলে বিয়েতে রাজী হয়েছিল কেন ? শালা অমানুষের বাচ্চা” বলেই থেমে গেলাম। মনে হল নিজেকেই গালি দিচ্ছি। ওপাশে রুমকিও চুপ। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, ” শুধু এটুকু শুনেই বাবা অসুস্থ হয়ে গেছেন নাকি আরো ঘটনা আছে? ”
-” আসলে কয়েকটা বিষয় মিলিয়েই বাবা আপসেট হয়েছেন।” নরম সুরে বলে চলল রুমকি।” মজনু মামা যখন ফোন করে বাবার কাছে ক্ষমা চাইছিলেন তার ছেলের অমন কীর্তির জন্য। তখন বাবা তাৎক্ষণিক ভাবে রেগে গেলেও পরে এই ভেবে মরমে মরে যাচ্ছিলেন যে তিনি প্রীতিকে বিয়ের আগেই এই ছেলের সাথে ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি দিয়েছিলেন বলে। পরক্ষণেই তিনি ফোন রেখে হুট করে আম্মুর উপর রেগে যান। কারণ বাবা নাকি আম্মুর পরামর্শেই অনুমতি দিয়েছিলেন প্রীতিকে আবিরের সাথে নৌ-বিহারে যাবার। নইলে বাবা অনুমতি দিতে চাননি। এসব কথা নিয়েই আম্মুর সাথে বেঁধে যায়। পরে বাবা নানুর ঘরে চলে যান। তারপর যা ঘটল তা তো দেখলেনই।” রুমকি থামল।

এবার আমি ভাবনায় পড়লাম। এতবড় অঘটন ঘটে গেল আর আমি কিছুই জানি না। অবশ্য রাতে আমি তো আর নিচে নামিনি। রুমকিও প্রীতির ঘরে দরজা বন্ধ করে রেখেছিল। গেস্ট রুমে প্রীতি আর রিয়া সহ ওর বান্ধবীরা ছিল। তারমানে মজনু মামা হয়ত সকালে ফোন করে এসব বলেছিলেন। আমি তো আজ ঘুম থেকে উঠেছিও বেশ দেরী করে। এরই মধ্যে এত কান্ড। আরেকবার দীর্ঘশ্বাস পড়ল আমার। বাবার কথা ভেবে খারাপ লাগছে । কারণ আমি তো আমার বাবাকে জানি। তিনি সরাসরি কোন মওলানা গোছের মানুষ না হলেও যথেষ্ট রক্ষণশীল মানসিকতার মানুষ তিনি। তাই বিয়ের সূত্র ধরে আবিরের সাথে প্রীতির যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানোর ব্যপারটা বাবার বুকে এখন কাঁটার মত বিঁধবে এটাই স্বাভাবিক । আর এর জন্যেও পরোক্ষভাবে আমিই দায়ী। কারণ আমার কথায় প্রভাবিত হয়েই আম্মু বাবাকে ইনসিস্ট করেছিলেন যেন ওরা দুজন একসাথে চলে ফিরে নিজেদের বুঝে নিতে পারে। সেই সুযোগেই প্রীতি গত কয়েক দিন আবিরের সাথে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়িয়েছে। ব্যপারটা আমার জন্য সাধারণ হলেও আমার রক্ষণশীল পিতার জন্য অসম্ভব কষ্টের , বিশেষ করে এখন। আর সেটা নিয়েই সাতসকালে আম্মুর সাথে বাবার বচসা বেঁধে গিয়েছিল। যার জেরে এই ঘটনা। দীর্ঘশ্বাসের পর দীর্ঘশ্বাস পড়তে লাগল আমার। মনটা ভীষণ রকম খারাপ হয়ে গেল। প্রবল ইচ্ছে হচ্ছে ছুটে গিয়ে আবিরের গলা টিপে ধরে বলি, এত আয়োজন হবার পর কেন কথাটা বললি। আগে কেন বললি না হারামজাদা। আমার বোন কী তোর পা ধরে সাধতে গিয়েছিল যে বিয়ের দিন সকালে ফোন করে বিয়েটা ভাঙলি? ভেবে রক্ত খলবলিয়ে উঠতে যাচ্ছিল। রুমকির মুখে সবটা শোনার পর ভাই হিসেবে কেন যেন কথাগুলো হজম করতে পারছি না। এখন তো আরেক ভয় হচ্ছে। উদ্বিগ্ন মন জানতে চায়, আবির প্রীতির সাথে কোন অন্যায় সুযোগ নেয়নি তো ? সম্ভবত নেয়নি , কারণ সে তো আর প্রীতিকে ভালবাসে না। যাকে ভাল না বাসবে তাকে অধিকার করতে যাবে কেন। কই, আমি নিজে তো রুমকিকে অধিকার করতে যাইনি। অনেক সুযোগ ছিল আমার কিন্তু আমি সে সুযোগ নেইনি আর এটাই হলো সততা। কারণ আমি তো জানি যে আমি রুমকিকে ভালবাসিনা। তাহলে আবির কেন প্রীতির সাথে এই অন্যায় সুযোগটা নিলো ! নিদারুণ অস্বস্তি নিয়ে ঘাড়ের চুলগুলো খামচে ধরলাম আমি। ইস, ঘটনাটা আমার বোনের সাথেই কেন ঘটল? এটা কী তবে রুমকির বদদোয়া?

রুমকির কথাগুলো মনে পড়াতে নিজেকে সামলে নিলাম। ফোন রাখার আগে সে মৃদুস্বরে বলেছিল, দেখুন, আপনি এ বাড়ির বড় ছেলে। আপনি ঘাবড়ালে চলবে কেন। তাহলে প্রীতি, বাবা-মা’ এদেরকে সামলাবে কে ! বিপদে ঘাবড়াতে হয় না। বিপদে স্থির থাকতে হয়। তাই আমার অনুরোধ থাকবে আপনার প্রতি। প্লিজ , মাথা ঠান্ডা রাখবেন। আর আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। সামনে হয়ত আরো কিছু অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি আসতে পারে। আপনি বেসামাল হবেন না। ইনশাআল্লাহ, সব ঠিক হয়ে যাবে।
ডান হাতের তালুতে মুখ মুছে বড় চাচুকে ফোন দিলাম। বাবার সংবাদটা সংক্ষেপে জানালাম তাকে। বড়চাচু সবটুকু চুপচাপ শুনে কেবল বললেন, ” আচ্ছা, আমি আসতাসি। তুই চিন্তা করিস না।”
বড়চাচুর বলা এই কথাটুকু আমার মনের জোর অনেকখানি বাড়িয়ে দিল। রুমকি সময়োপযোগী পরামর্শটাই দিয়েছে। একটু আগেও দিশেহারা মনে হচ্ছিল নিজেকে ।

আসলে কিছু সময়ে একজন অভিভাবকের ছায়া বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। যেমনটা আজ হল। তবে রুমকির প্রতি আজ আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে এই দিশেহারা মুহূর্তে আমাকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য।
রুমকির পরামর্শেই বড় চাচুকে ফোনটা দিয়েছি। অবশ্য বিয়ে উপলক্ষে তার এমনিতেও আসার কথা ছিল। কিন্তু সেটা হত আগামীকাল দুপুর বা বিকেলে। বড়চাচু আজ আসতে পারবেন না আগেই জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তো বড়চাচুর উপস্থিতি জরুরী। কারণ তিনি আমাদের সকল আত্মীয় স্বজনকে ফোন করে রাতের অনুষ্ঠানের ব্যপারটা মানা করে দেবেন তাহলে কেউ বাড়তি প্রশ্ন করার সুযোগ বা সাহস পাবেনা। রুমকি ঠিক জায়গামতোই বুদ্ধিটা দিয়েছিল।
বড়চাচু যদিও ঝিনাইদহেই থাকেন । তবুও ঢাকার আত্মীয়মহলে তাঁর অবস্থান এখনও দাপুটে। এর কারন বড়চাচুর নিঃস্বার্থ ভালবাসা। সব ভাইবোনের বিপদে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তে দেরী করেন না। আজও যেমন আমার ফোন পেয়েই তিনি ঢাকায় রওনা দিয়ে ফেলেছেন। অথচ ঢাকা তার চরম অপছন্দ। তাঁরও আপানের মতই গ্রাম্য প্রীতি প্রবল। ঢাকার পরিবেশ নাকি তাঁর কাছে দম বন্ধ হয়ে লাগে। তাই বছরের বেশীরভাগ সময়ই আপান তার কাছে থাকেন। বড়চাচার দুই ছেলেই দেশের বাইরে সেটেলড। তাঁরাও চাচুকে কয়েকবার নিতে চেয়েছে কিন্তু তিনি রাজী হন নি। বলেন, আমার দেশের মাটি ছেড়ে কোথাও যাবনা। সেই মানুষ আজ আমার ফোন পেয়ে আধাঘন্টার মধ্যেই ঢাকা রওনা দিচ্ছেন বলে আশ্বাস দিলে মনটা তার প্রতি নীত না হয়ে যায় কই ।

সন্ধ্যার আগে আগেই বাবাকে নিয়ে বাড়ী ফিরলাম। ডাক্তাররা তাকে ভর্তি রাখেন নি। কয়েক ঘন্টা অবজারভেশনে রাখার পর ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের মতে এটা একটা মাইনর এ্যাটাক ছিল তবে তিনি এখন যথেষ্ট সুস্থ। ইঞ্জেকশন পুশ করার পর তাঁর মুখের ও হাতের খিঁচুনীটা সম্পূর্ণ সেরে গেছে। তবে বাবাকে একগাদা ঔষধ আর পরামর্শ নিয়ে বাড়ী ফিরতে হয়েছে। পাশাপাশি তাঁকে এখন থেকে বেশ কিছু নিয়মও মেনে চলতে হবে।
বাবা আমার কাঁধে ভর দিয়ে পায়ে হেঁটেই বাড়ীতে ঢুকলেন। ডাক্তারের মতে আশঙ্কা অনেকখানিই কেটে গেছে। তবে তাকে পরবর্তী কয়েকদিন বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। আর একেবারেই উত্তেজিত হওয়া চলবে না।

বাড়ী ফিরে বড়চাচুকে দেখে কিছুটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। তবে তাঁকে পেয়ে আমি হালকা হতে গিয়েও ভারী হয়ে রয়ে গেলাম কারণ তিনি একা আসেন নি। তার সাথে রুমকির বাবা তথা আমার শ্বশুর মহাশয়ও রয়েছেন। আমি কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে তাকে সালাম করতেই তিনি আবেগে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। হয়ত আমার মত মেয়ের জামাই পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছেন । কিন্তু তাঁর শরীরের আতর খুশবুর গন্ধ আমার ক্লেদাক্ত মনের পাপী অনুভূতিটা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছিল। ভয় না হলেও লজ্জা হচ্ছিল এই ভেবে যে, ইনি যখন আমার আর রুমকির ব্যপারে জানবেন তখন তার অবস্থা নিশ্চয়ই আমার বাবার মতই হবে। কারণ আজ আবির যা করেছে তা হুবহু আমার মত না হলেও আমার কাজটাই সে করেছে। পার্থক্য এই যে, আমি নায়লাকে বিয়ে করে বাড়ী আনিনি। কিন্তু সে তার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে বাড়ী নিয়ে এসেছে। রুমকির কাছেই তো সেসব শুনেছি।
আপানের ঘরে ঢুকে আম্মুর সাথেও দেখা করলাম। আম্মু ভয়ে এখনও বাবার সামনে যায়নি। যদি বাবা আবার সকালের মত রেগে যান। তাই তিনি ঠিক করেছেন বাবা না ডাকা পর্যন্ত বাবার সামনে যাবেন না।

====

সারাদিন পর ক্লান্ত বিধ্বস্ত অবস্থায় নিজের রুমে প্রবেশ করলাম। বিচিত্র এক অনুভূতি নিয়েই গোসল করে ফেললাম কুসুম গরম পানি দিয়ে। হঠাৎ মনে পড়ল নায়লাকে তো সংবাদটা জানানো হয়নি। সে তো ঠিকই একটু পর শাইন পুকুর গিয়ে বসে থাকবে। দ্রুত বাথরুম থেকে বেরিয়েই চুল ভিজা রেখে গা না মুছেই ফোনটা হাতে নিলাম। আমার ঘাড়ের কাছের চুল চুইয়ে পানি পড়তে লাগল টপটপ করে। বা হাতে ধরা টাওয়েল পিঠে ছড়িয়ে দিয়ে ফোন কানে ঠেকাতেই রুমকিকে দেখলাম ট্রে হাতে ঘরে ঢুকতে। একই সময়ে নায়লা ফোন রিসিভ করে বলল, ” হাই জানু ! ”

থতমত খেয়ে রুমকির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে ইতস্তত স্বরে বললাম, ” আসলে একটা খবর জানানোর জন্য ফোন করেছি নায়লা।”
কথা বলতে বলতেই দেখলাম রুমকি সামনের টি টেবিলটার ওপর আমার নাস্তা খাবার সাজিয়ে দিয়েছে। ঝুঁকে থাকায় ওর মুখ দেখতে পাচ্ছিনা কেবল পিঠের ওপর উল্টো রঙধনুকৃতির জামার গলাটা ছাড়া। রুমকির ঘাড়ে যে এত চমৎকার একটা তিল আছে জানতাম না তো।
সেদিকে তাকিয়ে বললাম, ” আমি সারাদিন একরকম না খেয়েই আছি। এখন খেতে বসব। রাখি কেমন ।”

রুমকির হাত মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়ে থাকবে হয়ত। আমার তাই মনে হল। ফোন রেখে টাওয়েল দিয়ে দু হাতের ঘষায় চুল মুছতে শুরু করলাম। টাওয়েলের নিচ থেকেই দেখলাম রুমকি বেরিয়ে যাবার জন্য পা বাড়িয়েছে।
মনের আজান্তেই দ্রুত ডাকলাম,
-” এক মিনিট রুমকি। ” রুমকি থামল।
-” তুমি কী খুব বেশী ব্যস্ত? ”
-” এই তো, একটু। বলুন কী বলবেন ? “শান্ত ভঙ্গিতে বলল রুমকি।
হাতের ইশারায় বিছানা দেখিয়ে বললাম, ” খুব তাড়া না থাকলে একটু বসো না। জরুরী কিছু কথা বলব তোমাকে।”

রুমকি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানার একপাশে বসল। আমিও একপা ভাঁজ করে খাবারের সামনে বসে পড়লাম। নিজের কাছেই অন্যরকম লাগছে এই ঘরোয়া মুহূর্তটা। রুমকি একটু দুরে সরেই বসেছে। বিয়ের রাতের মত সহজ আর প্রানবন্ত নেই। যদিও ফোনে সে সহজ ভাবেই কথাবার্তা বলেছে। কারণ বাড়ীর পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিক। সেকারণেই রুমকি তার অস্বাভাবিক আচরণ ঝেড়ে ফেলে আজ স্বাভাবিক হবার ভান করছে। হয়ত আরো কয়েকদিন এই নকল স্বাভাবিকতা ধরে রাখবে। তারপর বাড়ীর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে যত স্বাভাবিক হবে আমাদের দুজনের আভ্যন্তরীন পরিস্থিতি ততই অস্বাভাবিক হতে থাকবে। তাই আমিও নিজেদের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হবার আগেই রুমকির সাথে একটা সমঝোতায় আসতে চাই। যদিও আমি এখনও বুঝতে পারছিনা। আমার কী করা উচিত। কিন্তু এ নিয়ে রুমকির সাথে পরামর্শতো করা যেতে পারে। কারণ এটা অনস্বীকার্য যে রুমকি ভাল মেয়ে এবং মানুষ হিসেবে বেশ ঠান্ডা মেজাজের। ওর কাছেই আমি পরামর্শ চাইব যে আমার কী করা উচিত। এটা তো সত্যি যে, আমি নায়লার কাছে দায়বদ্ধ। একটা সময় আমরা পরস্পরের কাছে ওয়াদা করেছিলাম যে কেউ কাউকে ঠকাব না। আজ পরিস্থিতির ফেরে আমি নায়লাকে যদি ধোঁকা দেই তবে আমিও তো আবিরের মতই হয়ে গেলাম।

-” তুমি খেয়েছ? ” পরোটার কোণা ছিঁড়ে মুখে দেবার আগে জানতে চাইলাম। রুমকি মুখ নামিয়ে ওড়নার প্রান্ত টেনে দড়ি পাকাতে পাকাতে বলল, ” জি।”
ওর বলার ভঙ্গি দেখে হঠাৎ গত রাতের কথা মনে পড়ল। খানিকটা অসহায়ের মত বললাম,
-” তুমি কী এখনও রেগে আছ আমার উপর? ”
রুমি উপর নিচ মাথা নাড়ল। আমি হাতের খাবার প্লেটে রেখে বললাম, ” আসলে আমি গতকালই স্যরি বলতে গিয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি। কিছু মনে করোনা। আমি বুঝতে পারিনি।”
-” কী বুঝতে পারেন নি? ” হঠাৎ রুমকি বলে বসলে ফের থেমে গেলাম। রুমকির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে সরাসরি তাকিয়ে আছে।
মৃদুস্বরে বললাম, ” ইয়ে, ঐ ঔষধটার ব্যপারে।”
-” সেটাই তো জানতে চাচ্ছি কী বুঝতে পারেন নি? ”
-” না মানে। আমার ধারণা হয়েছিল তুমি আমার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছ। মানে এরকমই ভেবেছি আরকি।”
-” কিভাবে নিতাম সুযোগ আপনিই বলুন। ওটা তো বার্থ কন্ট্রোল পিল ছিল। ওটা খেলে ইনফার্টিলিটি আসে। তাহলে আপনাকে ফাঁসাতাম কিভাবে ? ”

আমার মুখে এবার কথা যোগাল না। তাই তো…! এভাবে তো ভেবে দেখিনি। আমার কেবলি মনে হচ্ছিল রুমকি কোন সুযোগ নিচ্ছে না তো। মুখ নামিয়ে হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম।

-” আমি মেয়েলি ঔষধ সম্পর্কে তেমন স্বচ্ছ ধারণা রাখিনা তাই ভুল করে বসেছি।” কথাটা বলে ভাবলাম হয়ত রুমকি এতে নরম হবে। কিন্তু তাকে দুদিকে মাথা নাড়তে দেখে অবাক হয়ে তাকালাম। রুমকি বলল, ” নাহ্, আপনি কতটুকু ধারণা রাখেন তারচে বড় কথা হল আপনি খুব দ্রুত বায়াসড হয়ে যান। কে আপনাকে কী বুঝিয়েছে জানি না কিন্তু আপনার প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল এই ঔষধ আমি কেন খাই। তা না করে আপনি উদ্ভট একটা ধারণা করে নিলেন যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।”
আমি চুপ করে রইলাম।

রুমকি শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ” নিন, আপনি নাস্তা শেষ করুন আমি চা নিয়ে আসছি।”
-” এখনই চা ? ”
-” আরো পরে খাবেন ? ”
-” নাস্তাই তো শেষ করলাম না। আরেকটু বসো। আচ্ছা, তোমার বাবার মানে আব্বার থাকার ব্যবস্থা ঠিকমত করে দিয়েছ তো? ”
-” জি, দিয়েছি। একটা রাতেরই তো ব্যপার। আব্বা তো কাল সকালেই চলে যাবেন।”
-” এত তাড়াতাড়ি? ”
-” জি, ওনার কাজ আছে। উনি ভেবেছিলেন আম্মুকে বলে কাল আমাকেও সাথে নিয়ে যাবেন। শুনে আমিও ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু এরই মধ্যে….!”
-” তোমার কী এত তাড়াতাড়ি যাবার কথা ছিল? ” খাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে রইলাম। একবার মনে হল খাওয়া গলায় আটকে যাচ্ছে। রুমকির মুখ ফের অভিমানে ভার হতে দেখলাম
-” এত তাড়াতাড়ি যাবার প্ল্যান আমারও ছিল না কিন্তু আপনার ঐ কথাটা শোনার পর এখানে আর একদিনও না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম । কিন্তু হঠাৎ এসব ঘটে যাওয়ায়।”
-” আল্লাহ বাঁচাইসে..!” চাপা স্বরে বলে পরোটা মুখে পুরলাম।
-” ছিঃ কেমন ভাই আপনি। নিজের বোনের এতবড় দুর্ঘটনাকে ভাল বলেন কিভাবে? ”
-” ভাল তো বলিনি। শাপেবর হয়েছে বলেছি।”
-” আমি থাকলে আপনার লাভ কী ? শাপই বা কেন বর হবে। ”
আমি বোকার মত রুমকির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। উত্তরটা তৈরী নেই আমার।

রুমকি ফের উঠতে গেলে বললাম, ” এটা কী সত্যিই…?”
-” কোনটা ? ”
-” এই যে, থাকব না, ভাত খাবনা, সংসার করব না বললে ডিভোর্স হয়ে যায়? ”

রুমকি আমার মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ” মুমিনের মুখের কথা অনেক মূল্যবান। কাগজে লেখার চেয়ে। কারণ মৌখিক স্বীকৃতি দিয়েই মানুষ শাহাদা পড়ে ইসলামে ঢুকে। মুখে কবুল উচ্চারণ করেই মানুষ বিয়ের বন্ধনে জড়ায়, মুখে ঐসব বলেই মানুষ আলাদা হয়ে যায়। কাগজ কলম তো আজকের সৃষ্টি। আদিকাল থেকেই মুখের কথাতেই সব কিছু হয়ে আসছে। এটা এড়ানোর সুযোগ নেই কারণ এট্ই অন্তরের নির্যাস।”

-” তাহলে আমাদেরও কী হয়ে গেছে? মানে বি…বিচ্ছেদ…?” কথাটা বলতে গিয়ে কিছুটা কেঁপে উঠলাম। কেন জানি না রুমকিকে বড় আপন মনে হচ্ছে। একজন চমৎকার বন্ধু। যার সাথে বসে দুটো মনের কথা বলা যায়। ঐ ছাইপাশ বলে ফেললে যে এসব হবে কে জানত।

রুমকি কিছু না বলে উঠে দরজা পর্যন্ত গেলে আমি বললাম, ” আমি এটা সংশোধন করতে চাই রুমকি । ইসলামে নিশ্চয়ই এটারও সলিউশন আছে ! ”

রুমকি নির্নিমেষে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি উঠে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়ালাম। প্রায় ফিসফিসিয়ে বললাম
-” কী করতে হবে আমাকে একটু শিখিয়ে দাও। কিন্তু তোমাকে চলে যেতে দিতে চাই না। আমরা দুজন তো বন্ধু হয়েও থাকতে পারি। কী পারি না? ‘
-” তাহলে নায়লা ? ” রুদ্ধশ্বাসে বলল রুমকি। আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম। তাই তো, নায়লার কী হবে। আচ্ছা, দুই বিয়ের কথা কী বলব ? রুমকি রাগ করবে না তো ?
ইতস্তত করে মাথা চুলকে বললাম, ” ইয়ে, তুমি দস্যু বনহুর পড়েছিলে..?”

রুমকি বিস্মিত চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ” আমি কোনটা ? মনিরা না নুরী? ”

চলবে..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here