আরাধনায় বিহঙ্গ জীবন,২০ পর্ব,২১

আরাধনায় বিহঙ্গ জীবন,২০ পর্ব,২১
লেখা: জবরুল ইসলাম
২০ পর্ব
.
চারদিকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে।আগুনের তাপে যেন শরীর পুড়ে যাচ্ছে। জিসান লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে। দরজার ছিটকিনি নামিয়ে টান দিতেই দেখে খুলছে না। পাশের ঘরে গরু-ছাগল ডাকতে শুরু করেছে। বিছানার ওদিকে টিন ধসে পড়ার আওয়াজ হলো। চোখের পলকে আগুন ধরে গেল চাদরে। পাশের ঘরের অস্থির একটা গরু বাঁধন ছিঁড়ে ছিটকে এসে পড়লো মাঝের লিকলিকে টিনের বেড়ায়। একপাশের টিন ভেঙে এসে লাগে জিসানের পায়ে। কেটে গেল কি-না কে জানে৷ সেদিকে তাকানোর সময় নেই। সে ভাঙা বেড়া দিয়ে তাড়াতাড়ি চলে গেল গরু ঘরে। ছিটকিনি নামিয়ে টান দিতেই দরজা খুলে গেল। ততক্ষণে গরু-ছাগলের ডাকে সেতারা বেগম আর সিক্তারও ঘুম ভেঙে গেছে। সবাই উঠোনে বের হয়ে এলেন। সেতারা বেগম আর সিক্তা চাপাকল থেকে পানি মারতে লাগল। জিসান বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারছে না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে কি দেখছে সে? যেন কোনো স্বপ্ন দৃশ্য। হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে হাঁপাতে লাগলো। ছাগলের ডাক কানে আসায় দাঁড়িয়ে গেল। সাহস করে আবার গরু ঘরে ঢুকে পড়ে। উপরের টিন এবং বেড়া ভেঙে পড়া শুরু হয়েছে। আগুনের তাপে শরীর পুড়ে যাবার যোগাড়। তাড়াতাড়ি গরু-ছাগলের বাঁধন খুলে বাইরে নিয়ে এলো সে। ছিটকে পড়া গরুটি ছাড়া বাকী সব রক্ষা পেয়েছে। ইতোমধ্যে আশেপাশের লোকজনও জড়ো হয়ে গেছে। সবাই চাপাকল এবং পুকুর থেকে পানি মেরেও আগুন নেভাতে পারেনি৷ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সবকিছু। খবর পেয়ে এলেন ইজাজ মেম্বারও। তাকে খুব অস্থির দেখালো, পাড়ার লোকজনকে ডেকে নিয়ে বললেন ‘এরা মানুষ না-কি পশু দেখেন তো। এইযে সবজি বাগানের এই অবস্থা। বুঝাই যাচ্ছে দুশমনের দল বাড়িতে আগুন ধরিয়ে মাস্টারকে মারতে চাইছিল।’
ইজাজ মেম্বারের সঙ্গে সবাই একমত পোষণ করে। জিসানও জানালো তার দরজা বাইরে থেকে আটকানো ছিল। সুতরাং জিসানের কোনো ত্রুটিতে যে অগ্নিকাণ্ড হয়নি স্পষ্ট।
ইজাজ মেম্বার ভোরেই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করার পরামর্শ দিয়ে গেলেন পিয়াসকে। কিন্তু এ বাড়ির কারও কাছে সবজি বাগান কিংবা ঘর নিয়ে আফসোস করতে দেখা গেল না। কারও প্রতি মামলা করার মতো ক্ষোভও দেখা গেল না। তারা বরং আল্লাহ পাকের কাছে অশেষ শুকরিয়া জানাচ্ছে জিসানের কিছু না হওয়ায়। সিক্তা কাঁদছে। ভয়ে কাঁদছে কি-না জানার জন্য কেউ ঘাঁটাতে গেল না।
….

অন্তরা চা বসিয়েছে। সকালে বাইরে রাঁধতে এলে মনটা হালকা হয়ে যায়। এদিক-সেদিকে পাখি ডাকে। এখন চুলোর সামনের একটা ছোট্ট আমগাছে বসে বুলবুলি ডাকছে। ছোটবেলায় বুলবুলিকে দেখলে সুর দিয়ে, ‘বুলবুলি তর পুটকি কেনে লাল..’ বলার অঘোষিত নিয়ম ছিল।
কথাটি মনে পড়ায় সে মুচকি হাসলো। মাঝেমাঝে মন ভালো করার কিছু উপাদান খুঁজে পায়, পরক্ষণেই জিসানের জন্য বুকের বিষাদ সমুদ্রে যেন ঢেউ উঠে৷ ইচ্ছে করে সবকিছু ভেঙেচুরে ওর কাছে ছুটে যেতে। বক্কর ভাইয়ের কাছে শুনেছে জিসান এখন ময়নুল সাহেবের বাড়িতে থাকে। অন্তরা নিজ থেকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যায় না। এই লোকটাকে সে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না৷ চাচা যা বলেন সবই তার কর্ম।
হঠাৎ শুনতে পেল চেয়ারম্যান ছাদে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন। একটা কথা শুনে অন্তরার পিলে চমকে উঠলো, ‘আখলাছুর খবর পাইছ? ইজাজ মেম্বার লোকজন ডাইকা না-কি বলতাছে আমরা জিসান মাস্টারের ঘরে আগুন দিছি।’

কথাটি শুনে অন্তরার বুক ধুকপুক করছে৷ কান দিয়ে যেন গরম বাতাস বেরুচ্ছে। কি শুনলো সে? জিসানের কি কিছু হয়েছে? কীভাবে খবরটা জানবে এখন? অন্তরা কান পেতে দাঁড়াল। চাচার আর কথা শোনা যাচ্ছে না।
তখনই এলো বক্কর আলী। রোজকার মতো খাট টেনে চুলোর কাছে বসে বলল, ‘আইজ কি হইছে জানো? কারা জানি মাস্টারের দরজা বাইরে থাইকা বন্ধ করে আগুন লাগিয়ে দিছে।’

— ‘তারপর কি হইছে? মাস্টার এখন কেমন আছেন?’

— ‘আল্লা পাকের রহমতে ভালাই আছে।’

— ‘ও আচ্ছা।’

— ‘বইন তুমি ভয় পাইছিলা মনে হইল।’

— ‘তা তো সবাই-ই পাবে বক্কর ভাই। কারও ঘরে আগুন লাগছে শুনলে কি ভয় পাবে না?’

— ‘তাও ঠিক বইলছো।’

বক্কর আলীকে চা দিল অন্তরা। তারপর নিয়ে গেল চাচি এবং সায়মার জন্য। খানিক পর বক্কর আলী চলে গেল বাইরে। সায়মা ঘন্টা খানেক পর গেল স্কুলে।
তখন দুপুর। রাশেদা বেগম ঘুমাচ্ছেন। অন্তরা রান্নাঘরে টুকটাক কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ রান্না ঘরে একজন বোরকা পরিহিতা দেখে চমকে উঠলো সে।
— ‘আপনি কি অন্তরা?’

— ‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কে?’

সিক্তা নেকাব তুলে বলল, ‘আমাকে জিসান ভাই পাঠিয়েছে চুপচাপ আমার কথা শুনেন। এই চিঠি রাখেন। এখানে ভাইয়ের নাম্বার আছে। এই নেন মোবাইল। লুকিয়ে রাখবেন। চিঠি থেকে এভাবে নাম্বার তুলে কল দিবেন। আর মোবাইল দিয়ে এখানে গিয়ে রেকর্ডিং করতে হয়। এই দেখেন রেকর্ড করবে কীভাবে..এইতো হচ্ছে.।’

অন্তরা বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে আছে৷ ভয়ে তার শরীর কাঁপছে।

— ‘বুঝতে পারছেন সবকিছু? আমার তাড়াতাড়ি যেতে হবে শাশুড়ি অপেক্ষায় আছেন।’

— ‘হ্যাঁ বুঝতে পারছি৷ আপনি তাড়াতাড়ি যান কেউ দেখে ফেলতে পারে।’

সিক্তা হাত বাড়িয়ে গাল টিপে বলল, ‘অনেক মিষ্টি আছেন দেখতে। কিন্তু বোকা মেয়ে।’ তারপর নেকাব নামিয়ে বেরিয়ে গেল সিক্তা। অন্তরা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর তাড়াতাড়ি মোবাইল লুকিয়ে রাখলো রান্নাঘরে। চিঠি নিয়ে ঢুকে গেল বাথরুমে। গোটা গোটা অক্ষরে অনেক লম্বা চিঠি।
“অন্তরা চিঠিটা মনযোগ দিয়ে পড়ো। তুমি কেমন আছো আমি জিজ্ঞেস করবো না। কারণ তুমি ভালো কি-না সেটা বুঝার ক্ষমতা তোমার নেই। তুমি একটা পাগল, ছাগল মেয়ে। না, তুমি পাগল ছাগলও না। গতকাল ঘরে আগুন লাগায় ছাগলও বাঁচার জন্য চিৎকার চেঁচামেচি করেছে। তুমি চিৎকার করো না। তোমার কাছে মনে হয় এটাই জীবন। কাউকে যদি জন্মের পর থেকে একটা অন্ধকার ঘরে বন্দী করে রাখা হয়। তারপর একটা সময় গিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়। আচ্ছা তুমি যে ভোর-সন্ধ্য, আলো, বাতাস, নদী, গাছগাছালি, পাখির ডাক, সমুদ্র, চাঁদ-সূর্য কখনও দেখোনি? তোমার কি দুঃখ হয় না?
সে বলবে এগুলো কি? দেখতে কেমন? তার আসলেই কষ্ট হবে না। কারণ এসবের অভাববোধ করতে পারেনি। এগুলো স্বাদ, সৌন্দর্য কিছুই সে জানে না। তার কাছে ঐ অন্ধকারই জীবন। উদাহরণটা পুরোপুরি তোমার সঙ্গে মিলেনি। তবুও খানিকটা এরকমই। আচ্ছা, এসব থাক। তুমি বলো তো আমার কাছে বিয়ে বসতে রাজি হবে না কেন? আমার এক কবি বন্ধুকে সবকিছু বললাম। সে আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছে তুমি পাগল না হলে রাজি হওয়ার কথা। চেয়ারম্যান যেহেতু তোমাকে বিয়ে দিতে চায় না। যেদিকে সুযোগ পাও চলে যাওয়ার কথা। পুরুষ সঙ্গ কি এতো ফেলনা? জগতে অসংখ্য পুরুষ আছে বিয়ে করতে চায় না। অসংখ্য পুরুষ আছে করেও না। নায়ক, গায়ক, কবি-সাহিত্যিক অসংখ্য অবিবাহিত পাবে। কিন্তু সব মেয়েই মোটামুটি বিয়ের জন্য পাগল৷ অথচ বিয়ের পর মেয়েদেরই জীবন আর জীবন থাকে না। ছ্যাড়াব্যাড়া হয়ে যায়। দিনেও কাজ, রাতেও কাজ। এদিকে বাচ্চা হয়ে গেলে তো জীবন তেজপাতা।
আচ্ছা তাই বলে তুমি ভয় পেও না। একবার আমার সঙ্গে পালিয়ে দেখো। একবার শুধু বিয়ে বসে দেখো, তুমি নিজেকে বকা দিবে। ভাববে একটুর জন্য বোকামি করে মানুষটাকে হারাচ্ছিলাম।

এখন জরুরী কথায় আসি। নারায়ণ মাস্টারের খুনের আসামীতে ময়নুল সাহেব হাজতে আছে। বেচারার পরিবারের দিশেহারা অবস্থা৷ একমাত্র ছেলের কয়েকদিন আগে অপারেশন হয়েছে। যে মেয়ে তোমার কাছে চিঠি আর মোবাইল দিয়েছে ওর নাম সিক্তা। ভারী মিষ্টি মেয়ে। ও হচ্ছে ময়নুল সাহেবের ছেলে বউ। সবাই খুব বিপদে আছে। এদিকে আমার ঘরেও আগুন দিয়ে মারার চেষ্টা করা হয়েছে। সবাই ভাবছে তোমার চাচাই এসবে জড়িত। এখন ভাবো তো তোমার চাচা কাউকে মিথ্যে মামলায় ফাঁসিতে ঝুলাইবেন তুমি কি মেনে নিতে পারবে? সুতরাং তুমি শুধু পরীক্ষা করে দেখো তোমার চাচা এগুলো করাচ্ছেন কি-না। বৈঠক খানার সব কথা কয়েকদিন রেকর্ড করতে পারলেই কোনো সুত্র পেয়ে যাবে। বাকি কথা ফোনেই বলবো। তুমি সময় সুযোগ বুঝে কল দিও। মোবাইল লুকিয়ে রাখবে। আমি কখনও কল দেবো না। শেষ কথা বলি। যদি তুমি আমাকে চাও। তাহলে এখন আর ভয় নেই তোমার। কারণ মোবাইল যেহেতু তোমার হাতের মুঠোয় আছে। যেকোনো সময় তোমাকে নিয়ে পালাতে পারবো। তারপর তুমি মুক্ত বিহঙ্গ। আচ্ছা মুক্ত বিহঙ্গের কাহিনী তোমাকে কি বলেছিলাম? স্বপ্নে দেখেছিলাম, তুমি মুক্ত বিহঙ্গ হতে চাও। আচ্ছা ভালো থেকো৷ তুমি চাইলে ফোনে কথা হবে।’

চিঠিটা অন্তরা কয়েকবার পড়লো। তার এতো ভালো লাগছে, এতো ভালো লাগছে। চিঠি পড়াতেই যেন জীবনের সকল সুখ লুকিয়ে আছে। কেমন পাগলাটে কথাবার্তা৷ বারবার হাসি পাচ্ছিল তার। চোখবুঁজে চিঠিখানা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে খানিক্ষণ বাথরুমে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর কেমন ওম। কেউ যেন উষ্ণ ছোঁয়াতে তাকে আজ পুর্ণাঙ্গ নারী করে তুলেছে।
… চলবে…
লেখা: জবরুল ইসলাম

আরাধনায় বিহঙ্গ জীবন
.
২১ পর্ব
.
চোখবুঁজে খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল অন্তরা।
পুরো শরীরজুড়ে কেমন ওম। কেউ যেন তাকে উষ্ণ ছোঁয়ায় পুর্ণাঙ্গ নারী করে তুলেছে। মননে, শরীরে নারী। কোনো এক দৈব ইশারায় কি-না কে জানে, তার কাছে মনে হলো বেলা অনেক হয়ে গেছে। মানব জীবন বড্ড ছোট। এখানে হেলায় বেলা কাটানোর সুযোগ খুবই কম। অন্তরার মনের এইসব তুমুল পরিবর্তন জিসান জানে না। অথচ সেদিন থেকেই সন্ধ্যায় অন্তরা জিসানের হয়ে গেছে। সর্বক্ষণ অপেক্ষায় থেকেছে মানুষটা আবার তার সঙ্গে কবে সাক্ষাৎ করবে। হাওর-বিল সাঁতরে এসে আবার বলবে, ‘অন্তরা, আমি তোমার মতামত জানতে এসেছি।’
অন্তরা চিঠির দিকে আবার চোখ বুলালো। তারপর অস্ফুটে বলল, ‘আমি পাগল না জিসান। সত্যিই পাগল ছাড়া কেউ তোমাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না৷ যে মানুষটি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমার জন্য আজও অপেক্ষায় আছে তাকে আমি প্রত্যাখ্যান করতে পারি না।’

অন্তরা চিঠি ভাজ করে বুকের দিকে কামিজের ফাঁকে লুকিয়ে নিল। তারপর চুপিচুপি রান্নাঘর থেকে চলে গেল ছাদে। সতর্কভাবে চারদিকে তাকিয়ে চিলেকোঠার দেয়ালে হেলান দিয়ে আরাম করে বসে চিঠি থেকে সময় নিয়ে নাম্বার তুলে কল দেয়। রিং হচ্ছে। খানিক বাদেই ওপাশে জিসানের গলা শোনা গেল।
— ‘অন্তরা?’

— ‘হ্যাঁ।’

— ‘এতো তাড়াতাড়ি কল দেবে ভাবিনি।’

— ‘আপনার ভাবনার বাইরে দুনিয়ায় কতকিছু হয়।’

— ‘বাব্বাহ, ভালোই তো বলেছো।’

— ‘কিন্তু আপনার মুখে তো ভালো কথা নাই।’

— ‘মানে কি! আমি খারাপ কখন বললাম?’

— ‘চিঠিতে যে অনেক বকাঝকা করলেন।’

— ‘করবো না? তোমাকে পড়ানোর সময় মতামত জানতে চেয়েছি তুমি এড়িয়ে গেছো। একদিন উল্টাপাল্টা স্বপ্ন দেখে ভোরে আমার মাথা আউলা হয়ে গেছে। নামাজেও গেলাম না। তুমি এসে ডাকার পর ইমোশনাল হয়ে কি করেছি সেটার জন্য তুমি কতকিছু বলে চলে গেলে। এরপর থেকে আর দেখা নেই। পড়তেও আসো না। এদিকে আমার মাথা নষ্ট। চেয়ারম্যানের কাছে দিয়ে দিলাম বিয়ের প্রস্তাব। প্রত্যাখ্যান করা হলো। তবুও তোমার দেখা নাই। আমাকে লজিং থেকে বিদায় করে দেওয়া হলো। তবুও তোমার দেখা নাই। সেদিন রাতে গিয়েও ধরা পড়ে গেলাম। এরপর থেকেও তোমার সাক্ষাৎ পাই না। আচ্ছা তুমি হঠাৎ রাতে বাড়িতে পালিয়ে আমার কাছে চলে আসতে পারতে না?’

— ‘আপনি অনেক ঝগড়াটে।’

— ‘কি হলো তোমার গলা এরকম শোনাচ্ছে কেন?’

— ‘জানি না।’

— ‘আচ্ছা রেকর্ড করতে পারবে তো? শোন, তোমার একটা আইডিয়া আছে না কখন ওরা আড্ডা দেয়। ঠিক এর আগে ঘরের ডাস্টবিন বা কোনো একটা জায়গায় মোবাইল রেখে চলে আসবে। প্রায় সময় দেখবে মোবাইল রেখে আসছো কিন্তু ওরা বৈঠকখানায় আসেনি। আবার প্রায় সময় বসবে কিন্তু অন্য প্রসঙ্গে কথা বলে আড্ডা-টাড্ড দিয়ে চলে গেছে। তবুও তুমি কিছুদিন লেগে থাকবে। হঠাৎ একদিন এই প্রসঙ্গে কথা বলবেই। ঠিকাছে?’

— ‘হু, ঠিকাছে। রেকর্ড করা যাবে। তারপর কি করবো জনাব?’

— ‘তুমি কি ফাজলামোর মুডে আছো?’

— ‘না তো।’

— ‘তাহলে জনাব বললা কেন?’

— ‘জানি না। এখন বলুন রেকর্ড করার পর কি হবে।’

— ‘রেকর্ড করার পর তুমি জাস্ট আমাকে জানাবে হয়ে গেছে। এরপরই তোমার সুযোগ সময় মতো টাইম বলবে। আমি সিক্তাকে তোমাদের বাড়ির সামনে পাঠাব। আমি চলে যাবো লঞ্চঘাটে। তুমি মোবাইল নিয়ে একেবারে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়বে। সিক্তা আমার কাছে তোমাকে দিয়ে মোবাইল নিয়ে বাড়ি চলে যাবে। আর ওইদিনই আমরা দু’জন গ্রাম ছেড়ে পালাবো।’

— ‘বাবা।’

— ‘কি হলো, ভয় পাচ্ছ?’

— ‘আগে অনেক ভয় পাইতাম কিন্তু কিছুদিন হল পাই না।’

— ‘ভালো, ভয় পেয়ে লাভ নাই।’

— ‘আচ্ছা আমরা পালিয়ে গিয়ে কি করবো?’ কথাটা বলে অন্তরার ফিক করে হাসি চলে এলো৷ সে এক হাতে মুখ চেপে নিজেকে সামলে নিল।

— ‘আচ্ছা তুমি কি রসিকতা করছো? না-কি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছো না?’

— ‘যা বলছেন তা বুঝতে পারছি। কিন্তু যা বলেননি সেটা তো বুঝি না।’

— ‘কি বলিনি?’

— ‘এইযে এতো কাহিনির পর গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাব। তারপর কি হবে?’

— ‘এই তুমি হাসছো মনে হচ্ছে? এতো সাহস তোমার কোনদিন হল? এখন ফোন রাখো তো। কেউ দেখে ফেললে কি হবে বুঝতে পারছো? সব প্ল্যান কিন্তু মাটি হয়ে যাবে। রাখছি এখন।’

ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে গেল। অন্তরা উদাস মনে গাছের উপর দিয়ে আকাশে তাকাল। মনটা খারাপ হয়ে গেছে। আরও কিছুক্ষণ কথা বললে কি এমন হতো?মানুষটা শুধু কাজের কথাই বললো। আচ্ছা কাজের কথায় কি মন ভরে? কাজে পেট ভরতে পারে, অকাজে ভরে মন।

ঘরে আগুন লাগার পর থেকে জিসানের এখন থাকার খুব অসুবিধা হচ্ছে৷ রাতে ফার্মেসি ঘরে পাটি বিছিয়ে থাকে। দিনে আবার সেটা তুলে ফেলতে হয়। কারণ ছোট্ট ঘরে পিয়াস বারংবার এসে কাস্টমারদের ঔষুধ দেয়। সে বাইরে হাঁটাহাঁটি করে সময় কাটায়। অন্তরার কলের অপেক্ষায় ছটফট করে। ক’দিন থেকে নিজেকে কেমন উটকো ঝামেলা মনে হচ্ছে। গতকাল ময়নুল সাহেবের সঙ্গে দেখা করে এসেছে৷ মামলার পরিচালনার জন্য নতুন আরেকজন উকিলও পাওয়া গেছে৷ কিন্তু অন্তরার এখান থেকে আশানুরূপ কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। জিসানকে ফোনে জানিয়েছে রুমে মোবাইল রাখা কোনো সমস্যাই না। পালঙ্কের নিচে সে দু’দিন সন্ধ্যার আগে মোবাইল রেখে এসেছে। কিন্তু একদিন ওরা বৈঠকে আসেনি। আরেকদিন কেন জানি রেকর্ডই হয়নি। কাল সে রেকর্ড কীভাবে করতে হয় ফোনে বুঝিয়ে দিয়েছিল। এখন ফোন কলের অপেক্ষা করছে। দুপুরের এই সময়টাতেই অন্তরা বেশি কল দেয়। বসে আছে বাড়ির পেছনের পুকুর পাড়ে। পাশে একটা লাটিম গাছ। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে লাটিম। সে একটা লাটিম ছুড়ে মারলো পুকুরে মাঝখানে। ফোনটা তখনই বেজে উঠলো৷
— ‘হ্যালো, অন্তরা বলো।’

— ‘আজ রেকর্ড হয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছুই না। ইজাজ মেম্বারের কথা একটু আধটু বলছে আর এমনি হাবিজাবি গল্পগুজব।’

— ‘ও আচ্ছা। এগুলো থাকুক৷ কিছুই ডিলিট দিবে না।’

— ‘আচ্ছা।’

— ‘কেমন আছো?’

— ‘আমি তো সব সময় যেমন থাকি৷ আপনার জন্য সমস্যা৷ কত কষ্টে আছেন। এখন কোথায়, আপনার সেই লাটিম গাছের নিচে?’

— ‘হ্যাঁ।’

— ‘সারাক্ষণ পুকুর পাড়ে বসে থাকেন৷ আর মহিলারা গোসলে এলে দেখেন?’

— ‘ধুরো, এই টাইমে কেউ গোসলে আসে না। সিক্তা অনেক আগেই গোসল করে চলে গেছে।’

— ‘আচ্ছা রাখি এখন। চাচা আসছেন দেখা যাচ্ছে ছাদ থেকে।’

লাইন কেটে গেল। জিসান আবার পুকুরের মাঝখানে আরেকটা লাটিম ছুড়ে মারে।

পরেরদিন একই সময়ে জিসান অপেক্ষা করছে ফোন কলের জন্য। হঠাৎ বেজে উঠলো মোবাইল।
— ‘হ্যালো।’

ওপাশ থেকে ভয়ার্ত গলায় অন্তরা বলল,
— ‘জিসান কাল রাত থেকে আমার হাত-পা কাঁপছে। মানুষ এতো ভয়ানক হয় কি করে? রেকর্ড হয়েছে। সবকিছু নিয়ে একের পর কথা বলেছে ওরা। এখন কি করবে?’

জিসান দাঁড়িয়ে গেল,
— ‘কি রেকর্ড হয়েছে?’

— ‘সবই হয়েছে৷ চাচা রেকর্ডে আখলাছুরকে বলছেন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী থাকলে ভালো হতো। আখলাছুর বলছে কাজের মহিলা দাওয়াতের কথা বলতেই রাজি ছিল না। মিথ্যে সাক্ষী দেওয়ানো এতো সহজ না-কি? তারপর আরেকটা জায়গায় চাচা বললেন ইমামকে মারায় কাজের কাজ হইছে না হইলে বিরাট ঝামেলা ছিল। এরকম সবকিছুই আছে রেকর্ডে। এখন তাড়াতাড়ি বলো কি করবে। এখানে আমার ভয় করছে অনেক।’

জিসান খানিক ভেবে বলল,
— ‘এখন কি তুমি পালানোর জন্য প্রস্তুত আছো? কেউ কি বাড়িতে নাই?’

— ‘কেউ বাড়িতে নাই। চাচি শুধু নিজের ঘরে শুয়ে আছে৷ কিন্তু আমার অনেক ভয় করছে।’

— ‘অন্তরা ভয় পেও না। আমি এখনই সিক্তাকে বোরকা পরিয়ে তোমাদের বাড়ির সামনে পাঠাচ্ছি। তুমি ফোনে আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। এখন রাখি রেডি হও তুমি।’

ফোন রেখে জিসান তাড়াতাড়ি এলো সিক্তার রুমে। পিয়াস শুয়ে আছে। সেতারা বেগম আর সিক্তা রান্না ঘরে।
— ‘পিয়াস সিক্তাকে ডাকো। অন্তরা রেকর্ড করে কল দিয়েছে।’

কথাবার্তা শুনে সিক্তা আর সেতারা বেগম চলে এসেছেন। পিয়াস এখন মোটামুটি সুস্থ। উত্তেজনায় সে দাঁড়িয়ে গেল।
— ‘এখন কি করবে?’

জিসান সিক্তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বোরকা পরে নাও তাড়াতাড়ি। তুমি চেয়ারম্যানের বাড়ির সামনে থাকবে। অন্তরা মোবাইল নিয়ে বের হচ্ছে। আমি লঞ্চ ঘাটে আগে চলে যাচ্ছি। তুমি অন্তরাকে আমার কাছে দিয়ে বাড়ি চলে আসবে।’

পিয়াস বলল, ‘আমি বা মা কেউ একজন ওর সঙ্গে যাই?’

— ‘তুমি তো যেতেই পারবে না। আর আন্টিও বোরকা পরে গেলে দু’জন এক সঙ্গে দেখলে সন্দেহ করবে কেউ। তুমি বরং আমার সঙ্গে লঞ্চঘাটে চলো। সিক্তাকে নিয়ে চলে আসবে। ওর একা আসতে ভয় লাগতে পারে।’

সিক্তা এদের কথাবার্তার ফাঁকেই বোরকা পরে নিয়েছে। জিসানকে বলল,
— ‘আমি যাচ্ছি, আপনি লঞ্চঘাটে থাকবেন।’

সে বেরিয়ে গেল। পিয়াসের কেমন ভয় ভয় করছে সিক্তার জন্য। জিসানের সঙ্গে পিয়াসও লঞ্চঘাটের উদ্দ্যশ্যে বেরুলো। সে গেলে সিক্তা একা আসতে হবে না লঞ্চঘাট থেকে।
..

অন্তরার হাত-পা কাঁপছে। কি করবে গুছিয়ে ঠিক চিন্তা করতে পারছে না। হ্যাঁ বোরকা পরে নিতে হবে। কিন্তু তার বোরকা নেই। সায়মারটা ছোট হবে। তবুও সেটা পরে ফেলে। নেকাব নেই সায়মার। খানিক ভেবে কালো বড় একটা ওড়না ভালোভাবে পেঁচিয়ে নিল। মোবাইল কি করবে? সেটা শক্ত করে হাতের মুঠোয় নিয়ে উঠানে বেরুলো। আচমকা সামনে এসে পড়ে গেল বক্কর আলী। সে হাঁপাচ্ছে।
অন্তরার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ‘বইন তাড়াতাড়ি আমার সঙ্গে রান্নাঘরের দিকে চলো। এদিকে যেও না।’

অন্তরা থরথর করে কাঁপছে। কি হচ্ছে, কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না।
— ‘আরে বইন তোমার ফোনালাপ শুনেছি। আজকে তুমি পালাচ্ছো তাও জানি। আমি পাহারা দিচ্ছিলাম চেয়ারম্যান আর আখলাছুরকে। ওরা এতোক্ষণ চা’র হোস্টেলে ছিল এখন এইদিকেই আসতেছে। আমার পেছন পেছন চলো ভয় নাই।’

অন্তরা দ্বিধাদ্বন্দে ভুগছিল। মাথা যেন ফাঁকা হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত বক্কর আলীর সঙ্গে রান্নাঘরের দিকে গেল।
এদিকে রাশেদা বেগম ঘর থেকে চেঁচাচ্ছেন, ‘কে রে এতো ফুসুরফুসুর করে ঘরে? কে?’

অন্তরাকে রান্নাঘরে নিয়ে বক্কর আলী বলল, ‘আমার লগে নাওয়ের চাবি আছে হাওর দিয়ে পালাতে হবে।’

— ‘কিন্তু জিসান তো লঞ্চঘাটে অপেক্ষা করছে।’

— ‘সমস্যা নাই৷ আমরা বাড়ি থেকে হাওর দিয়ে বের হয়েই ফোনে যোগাযোগ করা যাবে মাস্টারের লগে। এদিকে যাওন রিস্ক। চেয়ারম্যান কাউকে ফোন দিয়ে রাস্তায় আটকিয়ে ফেলতে পারবে৷ তাছাড়া এখন বাড়ির দিকেই আসতেছে। মহাবিপদ তাড়াতাড়ি আসো আমার সঙ্গে।’

অন্তরার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। কি করবে কি করা উচিত কিছুই বুঝতে পারছে না। সে বক্কর আলীর সঙ্গে নাওয়ে উঠে গেল।

এদিকে সিক্তা অপেক্ষা করতে করতে অস্থির। এখনও অন্তরা বের হচ্ছে না কেন সে বুঝতে পারছে না৷ হঠাৎ তাকিয়ে দেখলো কয়েকজন এ রাস্তার দিকেই আসছে। বীমার ফাইলটা ওদের দিকে রেখেই সে হাঁটা দিল। খানিক দূরে গিয়ে দেখল ওরা চেয়ারম্যানের বাড়ির দিকেই ঢুকে গেছে।

চেয়ারম্যান সিগারেটে শেষ টান দিয়ে বললেন, ‘আখলাছুর এই মাইয়াটা এখানেই তো দাঁড়িয়ে ছিল?’

— ‘হ্যাঁ চেয়ারম্যান সাব। এইটা বীমার মহিলা মনে হয়।’

— ‘ওহ। কিন্তু কেমন যেন উঁকিঝুঁকি মারছিল মনে হচ্ছে।’

— ‘গিয়ে কথা বলবো না-কি?’

— ‘না থাক।’

তারা কথা বলতে বলতে বাড়িতে ঢুকে বৈঠক খানায় যায়। চেয়ারম্যান মাঝে মাঝে গরম পানি দিয়ে গোসল করেন। গরম পানি বসানোর জন্য অন্তরাকে বলতে রান্না ঘরে গিয়ে দেখেন সেখানে নাই। সায়মার ঘর খোঁজেন। বাথরুমেরও দরজা খোলা। ডাকতে ডাকতে ছাদে যান। কোথাও নেই। মাথায় হঠাৎ অন্যকিছু খেলে গেল। বৈঠক খানায় এসে ওদেরকে জানালেন। মতিন আর আখলাছুর রাস্তার দিকে বের হলো। উঠোনের মাথায়ই পেল নেকাব পরা একটি মেয়ে৷
— ‘এই মেয়ে কে তুমি? এতোক্ষণ যাবত এখানে উঁকিঝুঁকি মারছো যে?’

— ‘আমি বীমার মহিলা।’

আখলাছুরে খানিক ভেবে বলল,
-‘তাহলে চলুন। এ বাড়ির চাচি বীমা করবেন।’

সিক্তার কেমন যেন ভয় ভয় করছিল। সে আমতা-আমতা করে বলল, – ‘না অন্যদিন আসবো এদিকে।’

মতিন হাতে ধরে টেনে বলল, ‘আরে আসেন চাচি বীমা করতে চাইছেন কয়েকদিন থেকে।’

সিক্তা না পেরে তাদের সঙ্গে যায়। ঘরে যেতেই হাত জাপ্টে ধরে বলল, ‘এতোক্ষণ থেকে এখানে উঁকিঝুঁকি মারছিলে নেকাব তুলেন দেখি কিসের মহিলা।’

চেয়ারম্যানও এতোক্ষণে এসে গেলেন। মতিন মিয়া টান দিয়ে নেকাব তুলে অবাক হয়ে তাকায়,
— ‘আরে এ তো ময়নুল সাহেবের ছেলে বউ।’

চেয়ারম্যান অবাক হয়ে বললেন,
— ‘মেয়েটি তো অনেক সুন্দর। কিন্তু এখানে বীমার মহিলা সেজে কেন এলো?’

আখলাছুর ধমক দিয়ে বলল,

— ‘এই মেয়ে তুমি এখানে কোন উদ্দ্যশ্যে এসেছো বলো?’

সিক্তা কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। তার কান্না পাচ্ছে। হাত মোচড়াচ্ছে।

খানিক বাদেই চেয়ারম্যানের ইশারায় পুরো বাড়ির দরজা বন্ধ করা হয়। আখলাছুর সিক্তার মুখ চেপে ধরে। চেয়ারম্যান আর মতিন মিয়া টেনে হেঁচড়ে বৈঠক খানায় নিয়ে যায় সিক্তাকে। হাত-পা বেঁধে মুখে কাপড় ঠেসে দেয়। রাশেদা বেগম সেই কখন থেকে চেঁচাচ্ছেন, ‘শুনি ঘরে আজ এতো হৈহল্লা কিসের? কতক্ষণ থেকে যে চিল্লাচ্ছি কেউ কি শুনে না?’
…চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here