আমার_একলা_আকাশ #পর্ব_৩

#আমার_একলা_আকাশ
#পর্ব_৩
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
__________________
মাথায় হাত রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে আদনান। তার চোখে-মুখে ক্রোধ ও চিন্তা উভয়ই আছে। সুমনা বেগম নারিকেল তেল আর পানি মিশিয়ে প্রাপ্তির মাথার স্ক্যাল্পে আলতো করে ঘষে দিচ্ছেন। মেয়ের হঠাৎ এমন অসুস্থতায় তিনি নিজেও কিছুটা চিন্তিত। আদনানের কাছেই খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন তিনি। ঘরদোর পরিষ্কার করে এখন প্রাপ্তির মাথার কাছেই বসে আছে।

‘তুই এখনো এখানে বসে আছিস কেন? বাইরে যা। সবার সাথে সময় কাটা।’ প্রাপ্তির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন সুমনা বেগম।

আদনান চোখ-মুখ শক্ত করে বলল,’ভালো লাগছে না।’

‘তোর কী হয়েছে?’

‘কিছু হয়নি।’ বলে উঠে দাঁড়ায় আদনান। একটাবার শুধু প্রাপ্তির মুখের দিকে তাকিয়ে বাইরে চলে যায়।

প্রাপ্তি বিহীন সেতুর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। সেতু বেশ কয়েকবার সবার কাছে প্রাপ্তির খোঁজ করেছিল। আদনান জানিয়েছে, সিম্পল মাথা-ব্যথা তাই আসেনি। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে প্রাপ্তির কাছে আসার পর বিষয়টা মোটেও সেতুর কাছে সিম্পল মনে হয়নি। একদিনেই যেন প্রাপ্তির সে কি বিধ্বস্ত অবস্থা! নিজে ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও সে অনেকক্ষণ যাবৎ রাত জেগে প্রাপ্তির কাছে বসে থাকে। একটা সময় প্রাপ্তির পাশেই ঘুমিয়ে পড়ে।
.
রাত আনুমানিক আড়াইটা কি তিনটা বাজে। ছাদে একা একা পায়চারি করছে আদনান। সেই যে রাত একটায় কারেন্ট চলে গেছে, এখনো আসেনি। গরমে রুমে টেকা যাচ্ছিল না তাই ছাদে চলে এসেছে। আকাশও যেন গুমোট মেরে আছে। চাঁদ নেই, তারা নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিকে। কেমন যেন নিস্তব্ধ পরিবেশ!

হাঁটতে হাঁটতেই সে প্রাপ্তির কথা ভাবে। ছোটো থেকেই দুজনের দা-কুমড়ার সম্পর্ক ছিল। একজন আরেকজনের সাথে কখনোই মিলতো না। রেহেনা বেগম কিংবা সুমনা বেগম যদি কখনো একজনকে রেখে অন্যজনকে আদর করত তাহলে সেদিন বাসায় ভাঙচুর থেকে শুরু করে ভূমিকম্প পর্যন্ত হয়ে যেত। বয়সের পার্থক্যও কখনো ওদের মস্তিষ্কে হানা দিতে পারেনি। কতবার পরীক্ষার সময় প্রাপ্তি দোয়া করেছিল, আদনান যেন এক্সিডেন্ট করে। পরীক্ষা যেন না দিতে পারে। এর একটা কারণও অবশ্য আছে। প্রাপ্তির সঙ্গে আদনানের যখনই ঝগড়া হতো আদনান একটা কথাই বলত,

‘বেশি বকবক করবি না। একদম মাথায় তুলে আছাড় মারব। আমি তোর চেয়ে বড়ো জানিস না?’

মা-বাবা’ও সবসময় বলত,’আদনান তোমার বয়সে বড়ো। মারামারি, ঝগড়া এসব কেন করো? তুই করেও বলবে না।’

প্রাপ্তির ভীষণ রাগ হতো। বয়সে বড়ো বলে কি মাথা কিনে নিয়েছে নাকি। তাই সে খুব করে চাইত আদনানের এক্সিডেন্ট হোক, পরীক্ষা দিতে না পারুক। ক্লাস গ্যাপ যাক ইত্যাদি ইত্যাদি। বদদোয়া হোক বা যেটাই হোক, একদিন সত্যি সত্যিই আদনান রাস্তায় বাইকের সাথে এক্সিডেন্ট করল। বাম পা এবং ডান হাতে বেশ আঘাত পেয়েছে। তখন তার জে.এস.সি পরীক্ষার মাত্র দেড় মাস বাকি ছিল। ঐ অবস্থায় পরীক্ষা দেওয়াটা সম্ভব ছিল না বলে, পরীক্ষা দিতে পারেনি। যার ফলস্বরূপ আদনানের এক বছর নষ্ট হয়। প্রাপ্তি কেন জানি আদনান এক্সিডেন্ট করার পর খুশি হতে পারেনি। বরং সে লুকিয়ে লুকিয়ে খুব কান্না করেছিল। আদনান যখন এস.এস.সি পরীক্ষা দেবে তখন একদিন মুখ ফসকে প্রাপ্তি বলে ফেলেছিল,

‘আমায় কখনো রাগাবি না। এমন বদদোয়া দেবো, দেখবি সত্যি সত্যি আবার এক্সিডেন্ট করবি।’

আদনান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,’মানে কী?’

প্রাপ্তি তখন সব খুলে বলে। আদনান হতবাক। শত্রুও তো মনে হয় না এমন কামনা করে কখনো! সে ক্রুব্ধ হয়ে বলল,’তুই তো আচ্ছা অ’স’ভ্য মেয়ে! এসব বদদোয়া করতি? আর শোন, তোর বদদোয়া-টদদোয়া কিছু লাগেনি। এটা আমার ভাগ্যেই ছিল।’

প্রাপ্তি ভেংচি কাটে। আদনান বলে,’ভেংচি কাটিস আর যাই করিস এত খুশি হওয়ারও কিছু নেই। আমি এখনো তোর থেকে বয়সে বড়ো এবং ক্লাসেও এগিয়ে আছি ভুলে যাস না।’

দুজনের এত ঝগড়া আর মারামারি কমে এলো আদনান যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে চট্টগ্রাম চলে গিয়েছিল। তখন থেকে আদনানের প্রতি প্রাপ্তি অন্যরকম টান অনুভব করত। আদনান অবশ্য এসব কিছু ভাবে না। উলটো তার মাঝে দাম্ভিকতা এসে ভর করেছিল। ছুটিতে যেই বার ঢাকায় এলো তখন প্রাপ্তিকে কাঠকাঠ গলায় বলেছিল,

‘আমাকে খবরদার তুই করে বলবি না। তুমি করে বলবি।’

তখন থেকেই পরিবর্তন আসে একটু একটু করে। ভুলক্রমে প্রাপ্তি কখনো কখনো তুই-ও বলে ফেলে। তবে এখন আর আগের মতো ঝগড়াঝাঁটি নেই। বাড়িতে ফিরলে আদনান প্রায়ই প্রাপ্তির পেছনে লেগে থাকে। ঝগড়া করার চেষ্টা করে। তবে প্রাপ্তি এখন আর আগের মতো ঝগড়ুটে নেই। সে এখন চুপচাপ, শান্ত স্বভাবের হয়ে গেছে। তবে কখনো বাড়াবাড়ি মাত্রায় রেগে গেলে তখন ও’কে সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে।

বর্তমানে আদনান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ফাইনালে ইয়ারে পড়াশোনার পাশাপাশি একটা কোম্পানিতে জবও করে। প্রাপ্তি ঢাকাতেই ন্যাশনালে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে।

অতীতের স্মৃৃতিচারণ করতে করতে আদনান আনমনে কিছুটা হাসে। ছোটোবেলার দুষ্টুমির কথাগুলো মনে পড়ে যায়। সে এগিয়ে যায় প্রাপ্তিদের বাড়ির ছাদের দিকে। দুটো বাড়ি পাশাপাশি হওয়ায় মাঝখানে গ্যাপ একদম কম। চাইলেই এই ছাদ থেকে ঐ ছাদে যাওয়া যায়। সে রেলিঙের কাছাকাছি যাওয়ার পর নারী অবয়ব দেখতে পায় অন্ধকারে। ভ্রুঁ কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে,

‘কে ওখানে?’

কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। আদনান ফের আবারও ডাকে। এবারও কোনো সাড়াশব্দ নেই। এবার সে নিজেই ছাদ টপকে প্রাপ্তিদের ছাদে যায়। একটু একটু করে এগিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলে,

‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লাবিল্লাহ…ঐটা কে রে!’

তবুও কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। আদনান এবার জোরেশোরেই বলল,’ঐ কে? কথা বলে না কেন?’

‘আদনান, আমি!’ বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে বলল প্রাপ্তি।

‘ওহ তুই। আমি ভাবলাম কোন ভূত-পেত্নী।’

প্রাপ্তি কিছুই বলে না। আদনান ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলে,’তুই এত রাতে ছাদে কী করিস?’

‘হাওয়া খাই।’

‘এত খাস তাও তো মোটা হস না।’

‘তোমার মতো বেলুন হব নাকি?’

‘আমি বেলুন? তোর চোখ গেছে। আমি একদম ফিট আছি বুঝছিস।’

প্রাপ্তি নিরুত্তর। আদনান বলল,’মাথা-ব্যথা কমেছে?’

‘হু।’

‘এত রাতে একা একা ছাদে এসেছিস, ভয় লাগে না?’

‘না।’

অন্ধকারেই আদনান কিছুক্ষণ প্রাপ্তির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,’তখন আমি ওষুধ আনতে যাওয়ার পর রুমে কে এসেছিল?’

প্রাপ্তি শক্ত গলায় বলল,’কেউ না।’

‘মিথ্যে কথা বলবি না। কে এসেছিল বল?’

‘বললাম তো কেউ না।’

‘তোর গালে আমি স্পষ্ট আঘাতের দাগ দেখেছি। রায়হান এসেছিল?’

‘না।’

‘আবারও তুই মিথ্যে কথা বলছিস। কথা লুকাতে শিখে গেছিস খুব তাই না?’

‘আমি কিছুই লুকাচ্ছি না।’

‘রায়হানের সাথে সম্পর্ক কতদিনের তোর?’

প্রাপ্তি চমকে তাকায়। অন্ধকারে দুজনেরই দৃষ্টি সয়ে এসেছে। তাই প্রাপ্তির চমকে যাওয়াটাও আদনানের দৃষ্টিগোচর হয়। এদিকে সে নিজেও প্রাপ্তির চোখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। প্রাপ্তি আর তাকিয়ে থাকতে পারল না। দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

‘কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি।’ বলল আদনান।

প্রাপ্তি ক্ষীণস্বরে বলল,’তিন মাসের।’

‘আমি যদি ভুল না হই, তাহলে তোর গালে ভালোবাসার চিহ্ন নয় বরং আঘাতের চিহ্ন ছিল। রিলেশন করবি ভালো কথা। মানুষ চিনে করবি না? যার তার সাথে রিলেশন করলেই হবে?’

‘আগে থেকেই মানুষ চিনব কী করে? সেতু আপুর ক্লাসমেট বন্ধু হয় রায়হান। আপুও তো কত কত ভালো ভালো কথা বলেছে। রায়হান অনেক পাগলামি করেছিল। অনেক কান্নাকাটিও করেছিল। আর…আর..’

‘আর কী?’

‘আর তোমার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়েই আমি ওর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছি।’

‘আমার যন্ত্রণায়?’

‘হ্যাঁ। সারাক্ষণ তোমার হূরের গল্প শুনতে শুনতে আমি অতিষ্ঠ। আমরা যে এত বছরের বন্ধু কখনো আমায় একটু সেভাবে মূল্যায়ন করেছ? দেখা হলে, কথা হলেই কীভাবে ঝগড়া করা যায়,কীভাবে পেছনে লাগা যায় সর্বদা সেই মতলবে থাকো। সঙ্গে বকাঝকা, ঝাড়ি তো ফ্রি আছেই। মাঝে মাঝে শুধু আমি এটাই ভাবি, শুধুমাত্র মারটাই বা কেন বাকি রেখেছ।’

‘আমি কাপুরুষ নই প্রাপ্তি। মেয়েদের গায়ে হাত তোলা আমার পছন্দ না। আর এইযে রায়হানের সাথে তোর সম্পর্ক এটা কিন্তু ভালোবাসা না। রায়হানের পাগলামি, কান্নাকাটি এসব দেখে তোর মনে ওর জন্য একটা সিমপ্যাথি কাজ করেছে। আবার আমার ওপর নাকি রাগ, জেদ করেও তুই সম্পর্কে জড়িয়েছিস। তাহলে এসবের মধ্যে ভালোবাসাটা কোথায়?’

প্রাপ্তি নিশ্চুপ। আদনান বলল,’রাগ, জেদ, অভিমান, মায়া এসব ভালোবাসার অংশ; কিন্তু ভালোবাসা নয়। শুধু শুধু এরকম ট’ক্সি’স একটা রিলেশনশিপে থেকে নিজের জীবনটা নষ্ট করিস না। আমি বলছি না যে, ব্রেকাপ করে ফেল। একটু সময় নে। ভাব। ওর সাথে খোলামেলা কথা বল। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে সরাসরি কথা বলাটা অনেক বেশি জরুরী। মনে মনে কথা জমিয়ে রাখলে একটা সময়ে মানুষ ধৈর্যহারা হয়ে পড়ে। আর তখনই একটা সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটে।’

‘ব্রেকাপ হয়ে গেছে আমাদের। ও নিজেই করেছে।’

আদনানের কিছু বলার ভাষা নেই আর। প্রাপ্তিকে এসব ব্যাপারে এখন কিছু জিজ্ঞেস করা মানেই অযথা খুঁচিয়ে কষ্ট দেওয়া হবে। তাই সে একটু নড়েচড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঘাড় এদিক-সেদিক বাঁকিয়ে বলল,

‘ঘরে যা।’

‘পরে।’

‘এখনই যাবি। রাত কয়টা বাজে খেয়াল আছে কোনো? অযথা কোনো তর্ক শুনতে চাচ্ছি না আমি। যা ভেতরে।’

প্রাপ্তি বিরক্ত হয়ে হনহন করে নেমে যায় ছাদ থেকে। আদনান কিছুক্ষণ সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে নিজেদের ছাদে চলে যায়।
__________
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান মিস করায় প্রাপ্তির নিজেরও ভীষণ রকম মন খারাপ ছিল। তবে আজ সকাল থেকে সে বেশ সুস্থ অনুভব করছে। যদিও কদাচিৎ মাথা-ব্যথাও ক্ষণে ক্ষণে অনুভব করছে বটে; তবে সেভাবে পাত্তা দিচ্ছে না। বিয়ের অনুষ্ঠানও যদি মিস করে তাহলে আফসোসে আফসোসেই তার বাকিটা জীবন পার হবে।

সেতুর সাথে পার্লারে গেছে প্রাপ্তি। সঙ্গে আরো কয়েকজন কাজিন আর সেতুর কাছের দুজন বান্ধবীও এসেছে। সেতুর বিয়ে উপলক্ষে প্রাপ্তি লাল-খয়েরী রঙের একটা লেহেঙ্গা নিয়েছে। লেহেঙ্গার ওপর স্টোনের কাজ করা। মামা যখন নিজে পছন্দ করে প্রাপ্তিকে লেহেঙ্গাটি কিনে দিয়েছে, তখন তার সে কি খুশি!

আদনানের পার্লারে আসার কথা ছিল ওদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কাজে আটকে যাওয়ায় সে আসতে পারেনি। মামা এসেছে। অযথা একটু মনও খারাপ হলো প্রাপ্তির। মন খারাপের রেশ কেটেছে বাড়িতে গিয়ে। আদনানকে দেখার পর তার কী যে ভালো লাগছে! যতই ঝগড়া করুক, অহংকার দেখাক না কেন ছেলেটার মনটা ভীষণ ভালো। নিঃসন্দেহে ওর হূরপরী একজন ভাগ্যবতী নারী।

প্রাপ্তির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ও আদনান ও’কে খেয়াল করল না যেন। অথচ দুজনেরই চোখাচোখি হয়েছে। আদনান অফ হোয়াইট রঙের একটা পাঞ্জাবি পরেছে। শ্যামবর্ণের হওয়ায় পাঞ্জাবিটিও ভীষণ ফুটে উঠেছে শরীরে। ক্যামেরাম্যান সবার একসাথে গ্রুপ ফটো তুলে দিচ্ছিল। সেতুর সিঙ্গেল ছবি তোলার সময় আদনান প্রাপ্তির কাছে আসে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে,

‘একটু এদিকে আয় তো। কথা আছে।’

আদনানের পিছু পিছু যায় প্রাপ্তি। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আদনান বলে,’তোকে একটা কথা বলার আছে। তোর মামা সব কাজ দিয়েছে আমার ওপর চাপিয়ে। এখন গাধার খাটনি খাটতে হচ্ছে আমার।’

প্রাপ্তি মুখ ভার করে বলল,’এতই যখন অসুবিধা মামাকে তখন না করতে পারলে না?’

‘এটাই তো আসল সমস্যা। আমি আবার কাউকে কষ্ট দিতে পারি না। আমার মনটা অনেক ফ্রেশ কিনা! তুই মুখ ওরকম বানিয়ে রেখেছিস কেন?’

‘কী বলতে চাইছ সেটা বলো।’

‘বলছি। এত অস্থির হচ্ছিস কেন?’

‘আমি স্থিরই আছি।’

‘তুই কি আর রঙ খুঁজে পাসনি?’

‘মানে?’

‘মানে হচ্ছে বিয়েতে ড্রেস পরার জন্য আর রঙ খুঁজে পাসনি। একই কালার, আবার লেহেঙ্গা। তুই আর সেতু পাশাপাশি দাঁড়ালে মানুষ তো কনফিউজড হয়ে যাবে আসলে বউটা কে। তোর বিয়ে নাকি? তুই এত ভারী ড্রেস কেন পরেছিস?’

মনটাই খারাপ হয়ে গেল প্রাপ্তির। ইচ্ছে করছে আদনানকে দু’চারটে কথা শুনিয়ে দিতে। কিন্তু সে এমন কিছু করল না। চুপচাপ স্থান ত্যাগ করে একটা নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে বসে রইল। গালে হাত রেখে মনে মনে ভাবছে, আজকের দিনেও কি এমন বাজে ব্যবহার করা লাগল?

‘প্রাপ্তি।’

ভ্রুঁ কুঁচকে পেছনে তাকায় প্রাপ্তি। অপরাধীর মতো মুখ বানিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রায়হান। প্রাপ্তি তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে চলে আসার জন্য উঠে দাঁড়ায়। হাত টেনে ধরে রায়হান। আকুতি-মিনতি করে বলে,’প্লিজ! আমার কথাটা শোনো।’

‘আমার হাত ছাড়ো। কোনো কথা নেই আমার তোমার সাথে।’

‘এরকম কোরো না প্রাপ্তি। আমি দুঃখিত কালকে ওরকম ব্যবহার করার জন্য। এবারের মতো মাফ করে দাও প্লিজ!’

‘প্লিজ রায়হান হাত ছাড়ো।’

রায়হান এবার হাত ছেড়ে প্রাপ্তির পা পেঁচিয়ে ধরে বলে,’পা ধরে মাফ চাইছি। এবার তো ক্ষমা করে দাও। একটা সুযোগ দাও। ভুল তো মানুষেরই হয়। ক্ষমা করো প্লিজ!’

প্রাপ্তি আশেপাশে একবার তাকিয়ে চাপাস্বরে বলে,’এসব কী করছ? ছাড়ো। কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?’

‘তুমি আমায় ক্ষমা করেছ বলো। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না প্রাপ্তি। কেন বুঝতে চাচ্ছ না?’

প্রাপ্তি লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করে বলল,’ওকে। তুমি পা ছাড়ো। আমরা বসে কথা বলি।’

রায়হান পা ছেড়ে দেয়। দুজনে এখন মুখোমুখি বসে আছে। নিজে নিজে মনে কথাগুলো আগে গুছিয়ে নিয়ে প্রাপ্তি বলে,’আমি রিলেশন ঠিক করব। তবে একটা শর্তে।’

‘কী শর্ত বলো? তুমি যা বলবে আমি তাই শুনব।’

‘আমি যেসব কাজ পছন্দ করি না সেসব একদম আমার সাথে করা যাবে না।’

‘আমি রাজি। কোনো আপত্তি নেই আমার। তুমি শুধু আমায় ছেড়ে যেও না।’

রায়হানের কান্নাকাটিতে প্রাপ্তি আবার গলে যায়। দুজনের সম্পর্কটা বলতে গেলে নতুন করেই শুরু হয় আবার। রায়হান এখন আর আগের মতো আচরণ করে না। প্রাপ্তি যা বলে তাই শোনে।
.
.
বিয়ের পর আজ সেতু নাইওর এসেছে। সেজন্য সুমনা বেগম আর মামি মিলে ভালো ভালো খাবার রান্না করেছে। শুক্রবার আজ তাই আসাদ রহমানের অফিস বন্ধ। তিনি বাসায় থাকলে রেহেনা বেগম খুব একটা এই বাড়িতে আসতে পারেন না। তাই রান্না করা খাবারগুলো টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে প্রাপ্তিকে ডাকেন সুমনা বেগম।

প্রাপ্তি তখন রেডি হচ্ছিল রায়হানের সাথে দেখা করতে যাবে তাই। মায়ের ডাকে তাড়াহুড়া করে এসে বলে,’কী হয়েছে?’

‘খাবারগুলো ঐ বাড়িতে দিয়ে আয়।’

‘আমি কেন? আমি পারব না এখন। বাইরে যাব।’

‘যা। যাওয়ার আগে বাটিটা দিয়ে আয়। দশ মাইল দূরে তো আর না বাড়ি।’

আসাদ রহমান বাড়িতে বলে প্রাপ্তি নিজেও ওই বাড়িতে যেতে চায় না। কিন্তু কিছু করার তো নেই এখন। সে একেবারে রেডি হয়েই বের হয়। খাবারগুলো দিয়ে সোজা চলে যাবে। বাড়িতে আর আসবে না।

ও বাড়িতে গিয়ে কলিংবেল বাজানোর পর মেইড এসে দরজা খুলে দেয়। প্রাপ্তি আশা করেছিল রেহেনা বেগম দরজা খুলবে। তাহলে এখান থেকেই খাবারগুলো দিয়ে চলে যাওয়া যেত। কিন্তু তা তো আর হলো না। কী আর করার! সে যা ভাবে সবসময় তার উলটোটাই হয়। গুটি গুটি পায়ে সে ভেতরে যায়। আসাদ রহমানও ড্রয়িংরুমেই ছিলেন। ফোনে সম্ভবত নিউজ দেখছেন।

প্রাপ্তি বিড়বিড় করে বলে,’ফোনেই যখন নিউজ দেখবেন, তাহলে রুমে বসে দেখলেই তো পারতেন।’

প্রাপ্তিকে দেখে আসাদ রহমান গম্ভীর হয়ে বলেন,’কী ব্যাপার?’

প্রাপ্তি হাসার চেষ্টা করে। সালাম দিয়ে বলে,’আন্টি কোথায়?’

তিনি সালামের উত্তর নিয়ে বললেন,’গোসল করে। হাতে কী?’

‘জি, খাবার। মা পাঠিয়েছে।’

‘কেন? আমরা কি খেতে পাই না? ওই বাড়ির খাবারের আশায় বসে থাকি?’

মন ছোটো হয়ে যায় প্রাপ্তির। চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। প্রাপ্তি জানে লোকটা এমন, তবুও সে খারাপ ব্যবহার নিতে পারে না। কান্না পেয়ে যায়। কথাবার্তা শুনে আদনান তার রুম থেকে বেরিয়ে আসে। প্রাপ্তির কাঁদোকাঁদো মুখ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাবার ব্যবহারই এর কারণ।

‘কখন এসেছিস?’ জানতে চাইল আদনান।

প্রাপ্তি কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,’এখনই। এগুলো রাখো। মা পাঠিয়েছে।’

টিফিন ক্যারিয়ারটা নিয়ে টেবিলের ওপর রাখল আদনান। প্রাপ্তি চলে যাওয়ার সময় সেও পিছু পিছু যায়। মেইন দরজার কাছে গিয়ে প্রাপ্তির হাত ধরে বলে,’কাঁদছিস তুই!’

‘উঁহু!’

‘বাবা বকেছে আবার?’

‘সে তো সবসময়ই এমন ব্যবহার করে।’

‘স্যরি প্রাপ্তি। বাবার হয়ে আমি মাফ চাইছি।’

‘তুমি কেন মাফ চাইবে? সবসময় তুমি এমনটাই করো। কখনো তো প্রতিবাদ করো না।’

‘আমি তাকে সম্মান করি। তাই মুখের ওপর কখনো কিছু বলি না, তুই তো সেটা ভালো করেই জানিস।’

‘এমন বাবার ঘরে যে তোমার মতো ভালো মনের একটা ছেলে কীভাবে হয়েছে একমাত্র আল্লাহ-ই ভালো বলতে পারবে। তুমি রেহেনা আন্টির মতো হয়েছ।’ বলে প্রাপ্তি একটু হাসে। ওর সঙ্গে মৃদু হাসে আদনানও।

আদনানের থেকে বিদায় নিয়ে রায়হানের সঙ্গে দেখা করতে যায় প্রাপ্তি। রায়হানের খুব ইচ্ছে হয়েছে আজ দুজনে রিকশায় করে ঘুরবে। ওর ইচ্ছেটাই পূরণ করছে প্রাপ্তি।

রায়হান হঠাৎ বলে ওঠে,’থ্যাঙ্কিউ।’

‘থ্যাঙ্কিউ কেন?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল প্রাপ্তি।

‘আমার দুইটা উইশ পূরণ করার জন্য। এক. আমার কথামতো তুমি কালো রঙের থ্রি-পিস পরেছ। আর দুই. আমার সাথে রিকশায় ঘুরছ।’

প্রাপ্তি হাসল কিছুটা।

‘প্রাপ্তি।’

‘হু?’

‘খুব শীঘ্রই আমি বাবা-মাকে তোমার বাসায় পাঠাব বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। তোমাকে খুব ভালোবাসি প্রাপ্তি।’

একটু থেমে সে ফের বলল,’একটা কথা কিন্তু জানো না।’

‘কী?’

‘আজকে আমার জন্মদিন।’

‘হোয়াট! আমায় আগে কেন বলোনি? ধুর! কাজটা মোটেও ঠিক করোনি তুমি।’

‘আরে রাগ করছ কেন? আগে বললে গিফ্ট নিয়ে আসতে এইতো?’

‘গিফ্ট তো দেওয়াই লাগে তাই না?’

‘না। আমার গিফ্ট লাগবে না। আমি তোমার কাছে অন্যকিছু চাই। দেবে?’

‘দেওয়ার মতো হলে আর সামর্থ্যের মধ্যে হলে অবশ্যই দেবো।’

‘তোমার পক্ষে অসম্ভব এমন কিছুই চাইব না।’

‘আচ্ছা বলো কী চাও?’

রায়হান প্রাপ্তির কোমর জড়িয়ে ধরে কিছুটা কাছে এনে ফিসফিস করে বলে,’তোমাকে আজ সম্পূর্ণভাবে আমার করে চাই। সুন্দর একটা মুহূর্ত তৈরি করতে চাই। যেই মুহূর্তটুকুতে শুধু তুমি আর আমি থাকব। খুব করে কাছে চাই। তোমায় এতটা কাছে চাই, যতটা কাছে থাকলে দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাসও এক হয়ে যায়। তুমি বুঝতে পারছ তো প্রাপ্তি আমি কী চাচ্ছি?’

‘মামা, রিকশা থামান।’ বলল প্রাপ্তি।

রায়হান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,’কী হয়েছে?’

‘নামো।’ বলে প্রাপ্তি নিজেও রিকশা থেকে নামে। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে রায়হানকে বলে,

‘ইন্টিমেট হতে চাইছ তাই তো? ওকে, ওয়েট।’

প্রাপ্তি ব্যাগ থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে রায়হানের হাতে দিয়ে বলে,’আমি একচুয়ালি জানিনা রাস্তার মেয়েদের রেট কত। সম্ভবত ২০০/৩০০ তেও পাওয়া যায়। আমি তোমাকে ৫০০ টাকা দিলাম। সুন্দরী দেখে একটা মেয়েকে ভাড়া করে নিজের চাহিদা মিটিয়ে নিও।’

‘প্রাপ্তি!’ মৃদু চিৎকার করে ওঠে রায়হান।

‘আওয়াজ নিচে। একদম আমার সাথে চেঁচিয়ে কথা বলবে না। রাস্তাঘাটে কোনো রকম সিনক্রিয়েট করতে চাচ্ছি না আমি। একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো, আমি ভদ্র ফ্যামিলির মেয়ে; কোনো রাস্তার মেয়ে নই যে তোমার সাথে বিছানায় শুয়ে পড়ব। তোমার ইনটেনশন-ই তো শরীর পাওয়া তাই না? তো যাও না, রাস্তায়, পতিতালয়ে। এতে তোমারও চাহিদা মিটবে আর ওদেরও কিছু টাকা ইনকাম হবে। অযথা ভদ্র পরিবারের মেয়েদের পেছনে কেন পড়ে থাকো? আর হ্যাঁ, আজকের পর থেকে খবরদার আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। কোনো ক্যারেক্টারলেস ছেলের সাথে আমি সম্পর্ক রাখব না।’

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here