আকাশ_ছোঁয়া_ভালোবাসা ❤️সিজন_২,পর্ব_২২

আকাশ_ছোঁয়া_ভালোবাসা ❤️সিজন_২,পর্ব_২২
সাহেদা_আক্তার

রাতুল বলল, আমি মাইক্রো নিয়ে আসছি। বইলা পার্কের দিকে ছুইটা গেল। এদিকে আকাশকে দেখতেসি না। গাজরটা আবার কই গেল!

মাইক্রো আসতেই সবাই আগের মতো বসলাম। তবে রাতুলকে কই ঢুকাবে সেটা চিন্তা করতে করতে সে বলল, আমি সিএনজি ধরিয়ে চলে যাবো। তোমরা চলে যাও। আয়ান বলল, আমাদের সাথে আসতে পারো। আকাশ একটা কাজে গেছে। গাজরের কথা শুইনা মাইক্রো থেইকা কান খাঁড়া কইরা ফেললাম। কি কামে গেল? কিন্তু এর বেশি কিছু কইলো না। রাতুল রাজি হইয়া ওদের সাথে গেল গা।
.
.
.
.
সারা সন্ধ্যা ধুমাইয়া বৃষ্টি হইসে। আমি বসার রুমে সোফায় চিৎপটাং হইয়া লালু মিয়াগুলার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতেসি। আর কান খাড়া কইরা আছি। গাজরের অপেক্ষায় কত লালু আমার পেটে গেসে হিসাব নাই। আর এদিকে গাজরের খবর নাই। এত ঝড়বৃষ্টিতে কই যে গেল, কেমনে আসবে! চিন্তায় খালি খাইতেই আছি খাইতেই আছি। এক ঘন্টায় এক কেজি শ্যাষ। খেয়াল হইতেই পেটের ভেতর কেমন মোচড় দিয়া উঠল। মনে হয় লালু মিয়ারা পেটের ভেতর পানির বন্যার মধ্যে হাবুডুবু খাইতে খাইতে মিছিল করতেসে আমার বিরুদ্ধে। আমি উঠে বইসা পেট ধইরা ধানাই পানাই করতেসি। এমন সময় রাতুল আইসা বসল পাশের সোফায়। আমিও নড়াচড়া বন্ধ কইরা চুপ কইরা বইসা আছি। দশ পনের মিনিট পর রাতুল নিরবতা ভাইঙ্গা কইলো, এখানে বসে আছো? ফ্রেশ হওনি যে এখনো।

– এমনি টায়ার্ড লাগছে তাই আরকি।

– ও, আচ্ছা। আজকে কিছু কিনো নি?

– কিনেছি তো।

– আমি দেখি নি যে তাহলে। কি কিনলে?

– একটা ব্রেসলেট।

– ও, দেখাও তো।

আমার পেটে ভুটভাট করতেসে কেন বুঝতেসি না। এদিকে গাজরের টেনশন, বন্ধু আসছে ব্রেসলেট দেখতে। ভালা লাগে না। আমি কইলাম, পরে দেখামু।

– আচ্ছা, যাও ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর দেখবো।

– হুম।

আমি চুপচাপ নিজের রুমে চইলা আসলাম। কি কারণে যেন সেদিনের পর থেকে আগের মতো কথা বলতে পারি না। অস্বস্তি হয় বড়।

ফ্রেশ হইয়া বাইর হয়ে আম্মুর রুমের দিকে যেতেই দেখলাম দরজা ভেজানো। ভেতরে রাতুলের গলা শুনতে পাইলাম। কি যেন আম্মারে বলতেসে। আমি কান পাতলাম।

– ফুফু, প্লিজ আমার কথা রাখো।

– দেখ রাতুল, আমরা তোর কাছে কৃতজ্ঞ কিন্তু কখনোই আমাদের সিদ্ধান্ত ওর উপর চাপিয়ে দিতে পারব না। তার উপর তুই তো জানিস ওর অবস্থা।

– কিন্তু আমি যে পারছি না। বড্ড ভয় করছে। যদি হারিয়ে ফেলি। প্রতি মুহূর্তে এটা ভাবি।

– তুই ওর সাথে কথা বল। তোদের সম্মতি থাকলে অবশ্যই ধুমধাম করে অনুষ্ঠান করে তোদের চার হাত এক করে দেবো।

শুইনাই আমার মনে লাড্ডু ফুটতে লাগল। বন্ধুর বিয়া। কবজি ঢুবাই খাবো। ব্যাটা ডুবে ডুবে জল খাইতেসে আর আমাকে বলে নাই। দাঁড়া ধরমু চাইপা। আমি আবার কান পাতার আগেই পাশের বাসায় চাবির ঝুনঝুন আওয়াজ কানে আসল। শুইনাই দৌঁড় দিলাম দরজার দিকে। লুকিং গ্লাস চোখ লাগাইতেই দেখলাম আকাশ আসছে। বৃষ্টিতে ভিজে পুরো চুপসাই আছে। দরজার সামনে মাথার চুল হাত দিয়ে ঝাড়তে লাগল। উফ্! আমি পারতেসি না লুকিং গ্লাসের ভেতরে চোখ ঢুকাই দিতে। মাথা ঝাড়া শেষে সে হাতের দিকে তাকাই একটা মুচকি হাসি দিলো। আমি ভালো কইরা তাকাই দেখলাম হাতে একটা প্যাকেট। কিসের প্যাকেট যে সে এত সুন্দর কইরা হাসলো! যেন বউয়ের জন্য গিফট আনসে। হঠাৎ সে পিছন ফিরে আমাদের বাসার দরজার দিকে আগাইলো। আমি তো ভয়ে লুকিং গ্লাস থেকে সইরা দরজার সাথে হেলান দিয়া দাঁড়াইলাম। টের পাইলো নাকি!? দুই তিন মিনিটে কোনো সাড়া শব্দ না পাইয়া আবার তাকাইলাম। দেখলাম ও দরজায় মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়াই আছে। তারপর হঠাৎ মাথা তুলে তাকাইতেই আবার ভয় পাইয়া লুকিং গ্লাস থেইকা সইরা গেলাম। একটুপর দরজা বন্ধের শব্দ শুইনা তাকাই দেখলাম ও চইলা গেসে। আমি আইসা সোফায় বইসা টিভি ছাইড়া দিতেই রাতুল আম্মার রুম থেকে বাইর হইলো। আমি তাকাইতে খানিক হাইসা নিজের রুমে চইলা গেল। আর কি কথা হইলো জানা হইলো না।

সক্কাল সক্কাল ঘুম থেইকা উইঠা স্যুপ বানাইতে বসলাম। কালকে গাজর ভিজা বিলাই হই আসছে। একটু গরম গরম স্যুপ দিয়া আসি। এই সুযোগে একটু দেইখা আসমু নে। বানানো শেষ হইতেই ঘড়ির দিকে তাকাইলাম। আটটা বাইজা গেসে। আম্মা উঠতে দেরি আছে। রাতুলও এখনো রুম থেকে বাইর হয় নাই। তাই সুযোগ পাইয়া এক বাটি স্যুপ নিয়া বাইর হই আসলাম।

নক করলাম। কেউ দরজা খুলল না। কতক্ষণ ধইরা ধাক্কাইলাম। খবর নাই। তিন চারবার কলিং বেল টিপতে খট কইরা সাউন্ড হইলো। তারপর আবার দরজা খুলে না। কি মুশকিল! হালকা ধাক্কা দিতে ভারি লাগলো। কোনোমতে উঁকি মাইরা দেখি গাজরটা দরজায় হেলান দিয়া বইসা আছে ফ্লোরে। চোখ বন্ধ। আমি তাড়াহুড়া কইরা ঢুইকা বাটিটা রাখলাম। ওর কাছে আইসা কপালে হাত দিয়া দেখি জ্বরে পুইড়া যাইতেসে। কি যে করে না। কালকে ভিইজা ভিইজা কই থেকে যে আসছে!

সে ঝিমাইতেসে৷ আমি নিয়া বহু কষ্টে বিছানায় শোয়াই দিলাম৷ নায়ক নায়ক হইলে কি হইসে ওজন হাতির সমান হইবো মনে হয়। আমার হাড় গোড় সব শ্যাষ। একটা বাটি নিয়া পানি ভইরা নিলাম। ছোট একটা টাওয়াল নিয়া পানিতে চুবিয়ে ওরে জলপট্টি দিলাম। থার্মোমিটার খোঁজার জন্য উঠলাম। এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে টেবিলের ড্রয়ারটা খুললাম। সেখানে ভেতরে খুঁজতে গিয়া একটা ডায়রী চোখে পড়ল। অনেক পুরানো। কিন্তু দেখতে অনেক সুন্দর। নীল রঙের। ডায়রী পড়ার খুব ইচ্ছে হইতেসিলো কিন্তু গাজরের কথা ভাইবা আবার থার্মোমিটার খুঁজায় মন দিলাম। সব খুঁইজা অবশেষে পাইলাম। থার্মোমিটারটা ওর মুখে গুইজা দিলাম।

আধা ঘণ্টা পর জ্বরটা একটু কমলো। আমি বইসা বইসা জলপট্টি দিতে লাগলাম। আন্টি কই গেল কে জানে। দেখে তো মনে হচ্ছে কালকে ছিল না। সেই সুযোগে জ্বর বাঁধাই বইসা আছে মশাই। আমি আবার টেবিলের দিকে নজর দিলাম। ডায়রীটা…। শেষে লোভ সামলাইতে না পাইরা ডায়রীটা ড্রয়ার থেইকা হাপিশ কইরা দিলাম। বগলদাবা কইরা নিলাম। ওড়নার নীচে দেখা যাইবো না। আমি যখন টেবিলের সামনে কাউয়া মার্কা হাসি দিতেসি তখন পেছন থেকে কেউ একজন ডাকল, ছোঁয়া। আমি চোরের মতো তাকাই দেখি আকাশ পিটপিট কইরা আমার দিকে তাকাই আছে। আমি কইলাম, চোখ খুলেছেন? বাসায় স্যুপ বানিয়েছি তাই আমি আপনার জন্য স্যুপ এসেছিলাম। এসে দেখলাম জ্বর এসেছে আপনার। তাই আর কি। সাবধানে কাছে গিয়া মাথায় হাত দিয়া বললাম, জ্বর কমে গেছে। আমি স্যুপটা গরম করে আনি। তারপর একটা জ্বরের ওষুধ খেলে ঠিক হয়ে যাবেন। বইলাই রান্নাঘরে দৌঁড় দিলাম। ডায়রীটা একজায়গায় রাইখা স্যুপটা গরম কইরা নিলাম। তারপর তার কাছে নিয়া বসলাম। সামনে রাইখা বললাম, খান। সে আমার দিকে তাকাই রইলো।

– পছন্দ হয়নি?

– খেতে ইচ্ছে করছে না।

– খেয়ে নিন, ওষুধ খেতে হবে।

– উহু।

– খান বলছি।

সে খাচ্ছে না দেখে জোর কইরা এক চামুচ মুখে ঢুকাই দিলাম। ওমা! কি সুন্দর ভালো পোলার মতো খাই নিল! যত ঢং। এক চামুচ এক চামুচ কইরা মুখে দিলাম। সে আরাম কইরা খাইতে লাগল। এজন্যই ঢং কইরা বলসিলো খাইতে ইচ্ছে করতেসে না। তুমি খাইবা না মানে তোমার বাচ্চার বাপ খাইবো। জোর কইরা সব গিলাই একটা প্যারাসিটেমল খাওয়াই দিলাম। সব খাইয়া আধশোয়া হইয়া বসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আন্টি কোথায়?

– এক বাড়ি গেছে।

– ও। একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

– করো।

– কালকে ভিজে ভিজে কোথায় গিয়েছিলেন?

– তুমি জানলে কি করে ভিজেছি? আমাকে ভেজা অবস্থায় দেখছিলে নাকি দরজা দিয়ে?

হায় হায়! মুখ ফোসকে কি কইলাম! নিজের পায়ে নিজে পাথর ফালাইলাম। লজ্জায় লাল হইয়া বললাম, শব্দ শুনে একটু উঁকি মেরেছিলাম আর কি। তখন…

– তখন কি? আমাকে দেখছিলে? কেমন লাগছিল দেখতে?

– কে কে কেমন লা গ বে আর?

– উম…… কাল তো সাদা শার্টটা পরেছিলাম। সেটা তো পাতলা ছিল। ভেজা গায়ে লেপ্টে ছিল তাই অনেক অস্বস্তি লাগছিল। তাহলে তো বডি দেখা যাচ্ছিল, তাই না?

– হ্যাঁ… এই না না না…

আমার কান দিয়া ধোঁয়া বাইর হইতেসে। আসলেই কালকে……। মনে মনে কানতেসি আর বলতেসি, গাজরটা আমারে কিভাবে ফাসাইলো। এ্যাঁ…………

– এই একটু দেখলে কিচ্ছু হয় না।

– ওমা! আমার সরম করে না বুঝি? এবার কি হবে আমার!

আমি বেকুবের মতো তাকাই রইলাম। কি কমু!? হঠাৎ সে আমার হাত টান দিল। আমি তাল সামলাইতে না পাইরা একেবারে ওর মুখোমুখি পড়লাম। ও মুখ কানের কাছে আইনা ফিসফিস কইরা কইলো, আমার তো সব দেখে ফেললে ছোঁয়া৷ এখন তোমার কি দায়িত্ব বলো তো। বিয়ে করবে আমায়? শুইনা আমার হৃদপিণ্ড যেন বাইর হই যাতে চাইলো৷ আমি এক মুহূর্তে দেরি না কইরা বাসায় দৌঁড় দিলাম। একবারও পেছনে ফিইরা ওর দিকে তাকানোর সাহস হয় নাই।
.
.
.
.
আমার কি যে খুশি লাগতেসে। লুঙ্গি ডান্ড, স্কার্ট ডান্স, শাড়ি ডান্স সব দিতে মন চাইতেসে। আমি মনের আনন্দে দরজা মাইরা ইচ্ছা মতো নাইচা নিলাম। উফ! আমার গাজরটা আমারে প্রপোজ করসে। কিন্তু…… এভাবে কেউ প্রপোজ করে!? যা হোক, করসে তো। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। আহা! আহা! আমি হাওয়ায় উড়তে উড়তে বিছানার উপর ধপাস কইরা পড়লাম। বিছানা মট কইরা উঠল। আমি উঁকি মারলাম নাহ! খাটখান ভাঙে নাই। যাহোক নাচানাচি শেষে আমার জাদু থইলা থেইকা ডায়রীটা বাইর করলাম। আসার সময় নিয়া আসছিলাম। মনের আনন্দে ডায়রীটা পড়ার শুরু করলাম।

প্রথম পৃষ্ঠা পইড়া আমার হাবা (বাতাস) ফুস……………… কইরা বাইর হই গেল। হায়! হায় গো! আমার গাজরের খরগোশ আছে গো! আমার কি হবে গো! সে অন্য কাউরে পছন্দ করে। এজন্যই এমনে প্রপোজ করসে। নিশ্চয়ই বিয়ার কথা বইলা আমার সাথে মজা করসে। আমি আরো ভাবসি… এ্যাঁ……। আম্মা দরজা নক কইরা কইলো, ছোঁয়া উঠছিস? রান্না করতে হবে। আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। আমি নাক টাইতে টাইতে মনে মনে কইলাম, বন্ধু আসার পর থেইকা এই রান্নার জ্বালা আর ভালো লাগে না।

আমি মুরগী, সিম আর ভাত রান্না করসি। গাজরের উপর মেজাজ খারাপ হইতেসে। রানতে রানতে ইচ্ছা মতো বকসি গাজররে। রান্না শেষে রাতুলকে টেবিলে বসতে কইলাম। আমি পাশে দাঁড়াই বিড়বিড় করতেসি। আব্বু নাই। আম্মুর বিকালে ডিউটি তাই বাইরে গেসে গা। ঝিলিক এখনো কাউয়ার মতো গান গাইতে গাইতে গোসল করতেসে। রাতুলকে ভাত বেড়ে দিয়া সবজি আর মুরগী দিলাম। ও এক লোকমা মুখে দিতেই মুখ বাঁকাই ফেলল। মুরগীতে এক কামড় দিতেই লাফাই উইঠা বলল, ঝাল ঝাল ছোঁ য়া পা নি… আমি চিন্তার জগত থেইকা বাস্তবে আইসা তাড়াতাড়ি পানি দিলাম। জিজ্ঞেসু দৃষ্টিতে তাকাইতেই কইল, সবজিতে লবনের জাহাজ দিসো আর মুরগীতে ইচ্ছামতো ঝাল দিসো। আজকে কি হয়েছে তোমার? আমি মনে মনে কইলাম, মেজাজ খারাপ হইসে। এগুলা গাজররে খাওয়াইলে শান্তি পাইতাম।

চলবে…

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here