অবেলার_প্রেম #পর্বঃ২ (বর্ধিতাংশ)

#অবেলার_প্রেম
#পর্বঃ২ (বর্ধিতাংশ)
#অলিন্দ্রিয়া_রুহি

রাত গাঢ় হচ্ছে ধীরে ধীরে। ফাগুন ঘরের জানলাটা খুলে অপেক্ষা করছে স্নুপির জন্য। সে পাচিল টপকে কার্নিশ দিয়ে কী করে যেন উঠে চলে আসে। একটা পুরোনো প্লেটে কিছু ভাত ডাল দিয়ে মাখানো, স্নুপির জন্য রেখে দিয়েছে ঢেকে। এলেই খেতে দেবে। খোলা জানলা দিয়েই রাতের আকাশ দেখছে ফাগুন। মাঝে মাঝে হয় না,কোনো কারণ ছাড়াই মনটা বিষন্নতায় ডুবে যায়? ফাগুনের মনটাও আজ আঁধারে ঢাকা। কোনো কারণ নেই তবুও কান্না পাচ্ছে! অদ্ভুত কান্ড। ফাগুন নিজেই নিজের মুড সুইং দেখে অবাক হয় মাঝে মাঝে। একটা মানুষ সেকেন্ডে সেকেন্ডে এত পরিবর্তন হতে পারে কী করে!
-‘হোউউফ।’
শব্দ হলো। যার অর্থ,সরে দাঁড়াও। আমাকে ভেতরে আসতে দাও। ফাগুন মুচকি হেসে সরে দাঁড়াতেই মোটাসোটা বাদামী শরীরখানা নিয়ে জাম্প করে ভেতরে ঢুকলো স্নুপি। সে জানে কোথায় তার খাবার রাখা হয়। সেখানে গিয়ে মুখ দিয়ে ঠেলে ঢাকনা সরিয়ে খেতে লাগল আপন মনে। ফাগুন ধীর পায়ে কাছে এসে এক হাটু উঁচু করে বসল। স্নুপির নরম পশমি শরীর খানায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিলো। প্রশ্ন করল,
-‘আজকে ক্ষিদে বেশি লেগেছে বুঝি?’
-‘হোউউউফ!’ খাওয়ার মাঝেই মাথা ঝাকিয়ে প্রত্যুত্তর করে স্নুপি। ফাগুন খিলখিল করে চাপা স্বরে হেসে উঠল। জোরে হাসলে পাশের ঘর থেকে বাবা শুনতে পেয়ে চিৎকার শুরু করবে। দিনের বেলা বাবা থাকে না বলে যেমন খুশি তেমন উড়া গেলেও রাতের বেলা নিজেকে খোলসে ঢুকিয়ে নেয় সে। বাবার রাগ হয়- এমন কাজ ভুলেও করে না ফাগুন। তবুও বাবার সামনে পড়ে গেলে অহেতুক চিৎকার করে বলবে,
-‘সারাদিন শুধু ঘোরাঘুরি, পড়াশোনা নেই?’
ফাগুন বোঝে না,কেন বাবা মিলি আপাকে এত আদর করেন আর তাকে বকেন সারাক্ষণ? মিলির আপার চেয়েও সে সুন্দর, কিন্তু পড়াশোনায় মিলি আপার মতো অতটা ভালো না- এটাই কী তবে বাবার অনাদর পাওয়ার একমাত্র কারণ? ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে ভাবনার লাগাম টেনে ধরে সে। বিছানায় গিয়ে গুটিশুটি পাকিয়ে শুয়ে পড়ল। ক্ষণিক পর গায়ের সঙ্গে আরও একটি শরীর মিশে যেতে দেখে বুঝল স্নুপি আজ কোত্থাও যাবে না। রাতটা ওর সাথেই কাটাবে। ফাগুনের আনন্দ হয়। গল্প করার সাথী পাওয়া গেছে! মিলি আপা আলাদা ঘরে থাকেন। মাঝরাত অবধি পড়ে,বেলা করে ঘুম থেকে উঠেন। বাবা কত প্রশংসা করে! ফাগুন ওর ঘরে শুলে নাকি তার পড়া হয় না। তাই স্টোর রুম জাতীয় ছোট্ট এই রুমটা ফাগুনের ভাগ্যে পড়েছে। ফাগুনের অবশ্য তাতে মন খারাপ নেই। থাকার জন্য একটা আলাদা ঘর পাওয়া গেছে, এই-ই তো বড্ড বেশি!

-‘হ্যাঁরে স্নুপি, তুই রোজ ওই শুটকিটার সাথে কী করিস? আমি কিন্তু ছাদ থেকে সবই দেখি।’
কপট রাগ নিয়ে প্রশ্নখানা ছুঁড়তেই বিশ্বস্ত প্রাণীটা মুখ গুঁজে দেয় ফাগুনের কোলের ভেতর। যেন লজ্জা পেয়েছে,মাফ চাচ্ছে। ফাগুন ঠোঁটে হাসে। স্নুপির পেটের উপর হাত বুলোতে বুলোতে বলল,
-‘আজকে নতুন একজনের সাথে পরিচয় হয়েছে জানিস। উনার নাম দিগন্ত। পাশের বাড়িতেই থাকে। আমারচে অনেক বড়! লম্বা..গায়ের রংটা তামাটে কিন্তু উনার চোখ দুটো ভীষণ সুন্দর। আর গলার স্বর…উফ, এত ঘন কণ্ঠস্বর আমি এর আগে শুনিনিরে স্নুপি। উনার সাথে কথা হওয়ার পর থেকেই আমার পেটের ভেতর বুদবুদ করে রে কী যেন! খালি মনে হয়, উনি আমার আশেপাশেই আছেন, দেখছেন। এমন কেন হয় রে স্নুপি? তুই জানিস কিছু?’
স্নুপি জবাব দেয় না। ‘হোউউউফ’ জাতীয় কিছু উচ্চারণ ও করে না। হয়তো ও-ও জানে না এইরকম হওয়ার কারণ কী! ফাগুন একা একাই বকে যায়। ঘড়ির কাটা কখন যে এগারোটা ছাড়ায়,টের পাওয়া যায় না। একসময় স্নুপির গভীর শ্বাস পড়ে। ও ঘুমিয়ে গেছে বুঝতে পেরে ফাগুনও ঘুমিয়ে পড়ে আলতো হাতে ও’কে জড়িয়ে।

সকাল সাড়ে সাতটা।
ফাগুন দাঁড়িয়ে আছে দিগন্তদের বাসার সামনে। মেইন গেটে। আটটার সময় আসতে বলেছিল উনাকে, অথচ নিজেই আগে আগে এসে দাঁড়িয়ে আছে। উনি নিশ্চয়ই আটটার সময়ই আসবে। এই আধঘন্টা এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে তাহলে? ভোরে উঠে নিজের জন্য টিফিন তৈরি করে বেরিয়ে পড়তে খুব একটা সময় লাগেনি। যদি বুঝতো, এখন সাড়ে সাতটা বাজে তাহলে আরও আধঘন্টা পরই বের হতো। এখন তো ফিরেও যাওয়া যাবে না। মা সন্দেহ করবে। আবার এখানে দাঁড়িয়েও থাকা যাচ্ছে না। বাবা সাড়ে আটটার দিকে অফিস যান। কোনো কারণে আজ যদি আগেভাগে বের হয়ে দেখেন ফাগুন দাঁড়িয়ে আছে কলেজ না গিয়ে তবে খু’ন করেও ফেলতে পারেন! বাবাকে যমের মতো ভয় করে সে।
দাঁত দিয়ে নখ খুঁটতে খুঁটতে উপায়ন্তর না পেয়ে দরজার ভেতরে ঢুকে পড়ে ফাগুন। অনেকক্ষণ যাবত ভেতর থেকে দারোয়ান ব্যাটা ও’কেই ফলো করছিল। এবার ঢুকতে দেখে তিনি হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে আসেন। সন্দেহ নিয়ে তাকান, কপাল কুঁচকে জানতে চাইলেন,
-‘কারে চান?’
-‘ইয়ে…মানে…’
গলার স্বর বুজে আসে ফাগুনের। এখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা গেলে ভালো হতো। কিন্তু দারোয়ানের হাবভাব দেখে বোঝা যাচ্ছে সে কিছুতেই দাঁড়াতে দেবে না বেশিক্ষণ।
ফাগুন বলল,
-‘দি..দিগন্ত ভাইয়াকে। কত নাম্বার ফ্ল্যাটে থাকেন তা তো জানি না। উনার কাছে আমার একটা বই আছে। সেটা নিতেই..’
সন্দেহ দূর হলো না দারোয়ানের চোখ থেকে। তিনি বললেন,
-‘যান,বাইরে গিয়া দাঁড়ান। আমি খবর দিতাছি।’
অপমানিত বোধ করে ফাগুন। কথা বাড়ালো না। চুপচাপ বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। হাতঘড়িটায় বারবার তাকাতে তাকাতেই দিগন্ত চলে এলো। একেবারে ঘুম জড়ানো চোখ, শর্টস পড়া, উঠেই একটা গেঞ্জি গায়ে গলিয়ে দৌড়ে এসেছে। নিচে এসে ফাগুনকে দেখে জিভ দিয়ে দাঁত কাটলো সে। বইটা আনতে ভুলে গেছে! শিট!

ফাগুন বলল,
-‘আসলে আমি বুঝতে পারিনি সাড়ে সাতটা বাজে। একটু আগেভাগে বেরিয়ে পড়েছিলাম।’
-‘ইটস ওকে।’
বলে হাত দিয়ে মুখ ডলে সব ঘুম উড়িয়ে দিতে চাইলো দিগন্ত। ফাগুন এদিক ওদিক তাকাতুকি করে প্রশ্ন ছুড়লো,
-‘আমার বইটা?’
দিগন্ত অপরাধী কণ্ঠে বলল,
-‘আমি না..তাড়াহুড়ো করে নেমেছি তো। তাই আনতে ভুলে গেছি। তুমি এক মিনিট দাঁড়াও, আমি এখনই..’
-‘থাক, লাগবে না আজকে আর।’
কথার মাঝখানেই ফাগুনের ঠান্ডা কণ্ঠস্বর। দিগন্ত হুড়মুড় করে বলল,
-‘না,না, আমি এনে দিচ্ছি তো..’
-‘বললাম তো, আজ লাগবে না।’
এবার খানিকটা শক্ত গলা, দিগন্ত চুপসে গেল। নিভে যাওয়া গলায় বলল,
-‘ওকে।’
-‘আগামীকাল দিলেও চলবে। আপনাকে গরুর মতো দৌড়াতে হবে না বই আনতে।’
-‘আমি..আমি গরুর মতো দৌড়াই?’
দিগন্ত হতভম্ব, ফাগুনের চোখমুখ থেকে শক্তভাব সরে গিয়ে দুষ্টু রেখা ফুঁটে উঠল। অন্যদিকে দৃষ্টি সরিয়ে স্মিতহাস্যে বলল,
-‘আপনাকে তো গরু বলিনি। আপনার দৌড়ানোকে বলেছি। পাগল গরু যেমন দিগবিদিক হারিয়ে দৌড়ায়, আপনিও সেভাবেই দৌড়ে এসেছেন।’
সেকেন্ডের বিরতি, তারপর দিগন্তের চোখজোড়া নিজের দৃষ্টিতে মিলিয়ে নিয়ে শুধালো,
-‘আমি এত স্পেশাল কেউ না যে আমার জন্য এভাবে দৌড়ে আসতে হবে! আরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করাই যেতো। কী যেতো না?’

দিগন্তের মুখে কথা নেই। সে স্তব্ধ, এই পুচকে মেয়েটি কথার জালে ফেলে তাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। ফাগুন মিটিমিটি হাসছে। তার ঝিলমিল করতে থাকা চোখ দুটি দিগন্তকে অন্যরকম আনন্দ দিলো। মনে হলো, এই চোখজোড়ার সৃষ্টিই হয়েছে হাসিখুশি থাকার জন্য। এই চোখজোড়াতে কখনো বর্ষা নামতে পারবে না। দিগন্ত নামতে দেবে না।

-‘উহুম..উহুম।’
গলা খাঁকারি ফাগুনের। দিগন্ত সম্বিৎ ফিরে পায়।
ফাগুন হালকা হেসে বলল,
-‘আজ আসি। কলেজের দেড়ি হয়ে যাবে।’
দিগন্তের ঠোঁটেও হাসি ফুঁটে উঠল। ফাগুন চলে যেতে নিলে নিজের অজান্তেই প্রশ্ন করল,
-‘কোন কলেজে পড়ো তুমি?’
ফাগুন পেছন ফিরে ভ্রু কুঁচকালো,
-‘তা জেনে আপনার লাভ কী?’
-‘বন্ধু কোথায় পড়ে তা আরেক বন্ধুর জিজ্ঞেস করা বারণ বুঝি?’
-‘ভালোই কথা জানেন!’
ফাগুনের ঠোঁট ভাঙে হাসিতে। খলখল হাসি। দিগন্তের প্রাণ ভিজিয়ে দিলো। কলেজের নামটা বলে আবার পা বাড়ালো ফাগুন। দিগন্ত পেছনে আসতে আসতে ফের প্রশ্ন ছুঁড়লো,
-‘ছুটি হবে কয়টায়?’
হাঁটা থামালো না, হাঁটতে হাঁটতেই পেছনে তাকিয়ে ফাগুনের জবাব,
-‘আমাদের কলেজের সামনে ছেলেদের দাঁড়ানো নিষেধ। দাঁড়ালে ধরে নিয়ে বেদম কেলানি দিবে।’
-‘অনেকদিন যাবত হাত-পা ব্যথা করছে। একটু কেলানি খেলে মন্দ হয় না কিন্তু!’
পাল্টা জবাব শুনে ফাগুনের পা-জোড়া থেমে যায়। দিগন্তও থামলো। তার চোখে ধিকধিক কী যেন জ্বলছে। ওই চোখজোড়া সম্মোহনের মতো আমন্ত্রণ জানাচ্ছে ফাগুনকে। কীসের আমন্ত্রণ? ফাগুন দ্রুত নজর সরিয়ে নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে বলল,
-‘আ…আমি আসি।’
তারপর এক মুহূর্ত না থেমে লম্বা লম্বা পা ফেলে গলির মোড় ঘুরলো। রেখে গেল আবারও একটি থমথমে মুখ। মেয়েটা বারেবার এরকম পালিয়ে যায় কেন দিগন্তের থেকে? দিগন্ত বুকের বা পাশে হাত বুলায়। বিড়বিড় করে বলল,
-‘আজ যেতে দিচ্ছি, একদিন দেবো না।’

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here