অনুভূতির_সংঘাত-৭

অনুভূতির_সংঘাত-৭
ছামিনা-বেগম

চোখের সামনেই ডাক্তাররা বার তিনেক ডিফিব্রিলেটরের সাহায্যে হৃৎস্পন্দন পুনরায় চালু করার চেষ্টা করল । কিন্তু সব প্রচেষ্টাকে ব‍্যর্থ করে দিয়ে অহনা পাড়ি জমাল না ফেরার দেশে । স্তব্ধ হয়ে সমস্ত প্রক্রিয়াটিই দেখল শিমুল ।

হসপিটালে পৌঁছে যখন ডাক্তার শুধু মাত্র একজনকে রোগীর সাথে দেখা করার সুযোগ দেয় তখন সবার আগে শিমুল ঢোকে । তখনও অব্দি সব ঠিকই ছিল ।শিমুল অহনার কপোলে আলতে হাত রাখতেই চোখ মেলে তাকায় অহনা । ছলছল নয়নে অহনা কিছু বলার চেষ্টা করতেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায় ওর । শিমুল শশব্যস্ত হয়ে ইশারায় কিছু বলতে মানা করে । কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে শিমুলের চোখ বেয়ে । অহনা আলতো হেসে ক‍্যানোলা লাগানো হাতটা দিয়ে শিমুলের চোখের জল মোছার চেষ্টা করলে শিমুল হাতটা শক্ত করে ধরে আলতো চুমু খেয়ে নিজের গালে চেপে ধরে । আর তখনই টুট টুট শব্দ করে ডিভাইস গুলো জানান দেয় অহনার শারিরীক অবস্থার অবনতির ।

সমস্ত প্রচেষ্টা যখন নিষ্ফল , তখন ডাক্তার-নার্সরা রুম খালি করে বেরতে উদ‍্যত হয় । ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ডিজিটাল স্ক্রিনে হৃৎস্পন্দন নির্দেশক লাইন গুলো আস্তে আস্তে সোজা হতে দেখে শিমুল পাগলের মতো ছুটে গিয়ে ডাক্তারের পথ অবরোধ করে । উদ্ভ্রান্তের মতো বলতে থাকে ,

– কোথায় যাচ্ছেন আপনারা ? অহনাকে ফেলে চলে যাচ্ছেন কেন ? ওর ট্রিটমেন্ট শুরু করুন না । দেখুন ও কেমন চুপ হয়ে গেল ! একি ! আপনি সুইচ গুলো অফ করছেন কেন ? ছাড়ুন বলছি । সরে দাড়ান ।

বলতে বলতেই প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় পুরুষ নার্স টিকে । নিজে এলোমেলো হাতে সুইচ গুলো অন করার চেষ্টা করে । হচ্ছে না দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে । আবার ছুটে আসে অহনার কাছে ,

-এই অহনা । চোখ খোলো । দেখ আমাকে । দেখো , আমি এসেছি , তোমার শিমুল । অহনা , এই অহনা , তুমি তোমার শিমুলের কথা শুনবে না ? দেখো, ডাকছি তো আমি । চোখ খোলো না প্লিজ ।তাকাও আমার দিকে । অনেক কিছু বলার আছে তো তোমায় , শুনবে না আমার কথা ? অহনা। এই ……প্লিজ চোখ খোলো । এই আমি প্রমিজ করছি , তোমায় সব বলব । তোমার যে জানা উচিত সব । এভাবে মাঝ পথে তুমিও আমাকে ফেলে চলে যাবে ? এই অহনা ? মা ? ও কথা বলছে না কেন ? ওকে ডাকো না গো । তোমার সব কথা শোনে ও । ডাকো ওকে । বলো, আমি ডাকছি ওকে । বলো না । চুপ করে আছো কেন তুমি ?

অহনার ব‍্যান্ডেজ বাধা মাথাটা বুকে চেপে ধরে পাগলের মতো চিৎকার করে কেঁদে ওঠে শিমুল । কেবিনের অদূরে দাড়িয়ে নীরব অশ্রু বিসর্জন দেয় বকুল , পুতুল আর ডাক্তার রেশমি । নবজাতককে কোলে নিয়ে ক্রন্দনরতা শেফালী বেগম এগিয়ে এসে শিমুলের পাশে দাড়ায় । শিমুল ততক্ষণ পাথরের মতো নিঃস্তব্ধ হয়ে গেছে । শেফালী বেগম শিমুলের কাধে হাত রাখলে অহনাকে বুকে জড়িয়ে রেখেই তাকায় শিমুল । শেফালী বেগম নাতনিকে এগিয়ে দেয় ছেলের দিকে । নিজের সদ‍্যজাত কন‍্যাকে কোলে নিয়ে ফ‍্যালফ‍্যাল করে তাকিয়ে থাকে শিমুল । বাচ্চাটা মুখে একটা আঙ্গুল পুরে চুকচুক করছে , বন্ধ চোখের পাতা ইষৎ কাঁপছে । শেফালী বেগম সরে যেতেই শিমুল অহনার দিকে তাকায় । সাদা ব‍্যান্ডেজের আড়ালেও ওর শুভ্র মুখখানিতে পরম স্বস্থির মাখামাখি । জানালা কাচের পর্দা ভেদ করে সকালের সোনালী কিরণ ঝিকিমিকি করে খেলছে । সেই সোনালী রৌদ্রোচ্ছটায় অহনাকে দেখে মনে হচ্ছে পরম শান্তিতে ঘুমুচ্ছে সে । ওর ঠোটের কোণের মৃদু প্রসারিত কোণটা দেখলে যে কেউ বলবে জগতে তার থেকে সুখী বুঝি আর কেউ নেই । অথচ জগতের সবচেয়ে দুঃখি মানুষটাই বুঝি সেই ছিল । অদৃষ্টের ফেরেই কি না কে জানে নিজের স্বামীর কাছে নির্মম ভাবে ঠকে গেছে সে দিনের পর দিন । তবুও কেউ কিভাবে হাসতে পারে ?

******

এরপর দুটো বছর পেরিয়ে গেছে । গোরস্থানে অহনার কবরের ওপর পড়ে থাকা শুকনো পাতা গুলো কুড়িয়ে ফেলে দিয়ে পাশে বসে শিমুল । বিকেলের আলো ম্লান হতে শুরু করেছে । চারিদিকে গা ছমছমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে ।এই দুই বছরে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে অথচ শিমুল আজও আটকে আছে দুই বছর আগের সেই বৃষ্টি মুখর রাতটিতে । পাশেই একটি শিশুকন্যা নরম তুলতুলে হাত দিয়ে কবরের ওপর গজানো আগাছা উপড়ে ফেলে দিচ্ছে । হাতে লেগে থাকা মাটি নিজের সাদা ফ্রকে ঘষে মুছে ফেলতে চাইছে সে । শিমুল তাকে উদ্দেশ্য করে কোমল স্বরে ডাকল ,

– মাম্মাম , এদিকে এসো ।

বাচ্চাটি হাসি মুখে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এলো । শিমুল পকেট থেকে রুমাল বের করে হাত মুছিয়ে দিয়ে বলল ,

– মাম্মাম , আম্মুর সাথে দেখা হয়ে গেল । আম্মুকে কিছু বলবে না ?

বাচ্চাটি মাথা উপর নিচে করে সায় দিল । তারপর কবরের ওপর একটি হাত রেখে বলল ,

– আম্মু , আব্বু বলেতে আমরা বেরু দিতে যাব । অনেককক দূরে । তুমি তালাতালি তলে আববে তো । না হলে কিন্তু আমরা তোমায় রেখে যাব । আমি সেখানে অনেককক গুলো তকলেট কিনব , আব্বু আমাকে ডলও কিনে দেবে বলেছে । আম্মু, তুমি তালাতালি আসবে ,ঠিক আছে ? তাহলে আমি তোমাকে আমার সুন্দর ডলটা খেলতে দেব ।

তুলনের আধো আধো বুলিতে বলা কথা গুলো শুনে শিমুলের বুক ভার হয়ে আসে । মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে সে । দুফোটা জল গড়িয়ে যায় চোখের কার্নিশ বেয়ে । অনেক ক্ষণ অব্দি দৌড়ঝাঁপ করার কারণেই হয়তো তুলন ঘুমিয়ে পড়ে বাবার বুকে । ওকে ভালো করে জড়িয়ে ধরে শিমুল অহনাকে উদ্দেশ্য করে বলল ,

– আমি তোমার অপরাধী অহনা । কিন্তু এই ছোট্ট শিশুটা কি দোষ করে ছিল বলবে ? ওকে কেন জন্মের পরেই মাতৃহারা করলে তুমি ?ওর এই অভাব আমি পূরণ করতে পারিনি অহনা । জানি , কখনোই পারব না । ও আজও যখন জানতে চায় ওর আম্মু কোথায় ? আমি কিছু বলতে পারি না । ওর চাওয়ার আগেই আমি পৃথিবীর সব কিছু ওর সামনে হাজির করে দিতে পারি । কিন্তু অন্য বাচ্চাদের যখন তাদের মায়েদের সাথে খেলতে দেখে তোমার বায়না জুড়ে ,তখন আমি তুলনের কাছে ওর আম্মুকে এনে দিতে পারি না । এ আমার চরম ব‍্যর্থতা অহনা । আমি না একজন ভালো স্বামী হতে পেরেছি না ভালো ছেলে । বাবা হিসেবেও আমি ব‍্যর্থ । জানো , ও যখন প্রথম কথা বলতে শিখেছিল ওর প্রথম বলা শব্দটা কি ছিল ? ও ওর আম্মিকে ডেকেছিল । জানো অহনা , তুলন মানতেই চায় না ওর মাম্মাম আর কখনো ফিরবে না । ও আজো তোমার অপেক্ষা করে । ও এখনো ভাবে তুমি ঘুমিয়ে আছ , একদিন ঠিক ওর কাছে ফিরে যাবে । আমি ওর অবুঝ মনে কষ্ট দিতে পারি না । অহনা , আমি জানি আমি ভুল করেছিলাম । নাহ, ভুল নয় , পাপ করেছি আমি । আমার পাপের শাস্তি আমাকে দিতে পারতে । এই বাচ্চাটাকে কেন দিলে তুমি ? তার তো কোনো দোষ ছিল না । তুমি বলেছিলে মেয়ে আসার পর তুমি ঘুরতে যাবে পাহাড়ের দেশে । সমুদ্রের তটে তিনজনে শুয়ে শুয়ে সূর্যোদয় , সূর্যাস্ত দেখব আমরা । এই সব যে করা বাকি আছে এখনো অহনা । আমি না হয় তোমায় দেওয়া কথা গুলো পূরণ করতে পারিনি । তুমি আমার কাছে কৈফিয়ত চাইতে পারতে । তুমুল ঝগড়া করে দুদিন- একসপ্তাহ কথা বন্ধ রাখতে । কিন্তু তুমি সব কিছু থেকে ফাঁকি দিয়ে দিলে । একজন ফাঁসির আসামীর কাছ থেকেও বিচারক শেষবারের মতো তার ইচ্ছে জানতে চায় । কিন্তু তুমি আমাকে শেষ সুযোগটাও দিলে না কৈফিয়ত দেওয়ার । অহনা তুমি আমায় মন থেকে উজাড় করে ভালো বেসেছিলে , তোমার পরেও আমাকে বেঁচে থাকার এত সুন্দর , নিষ্পাপ একটা অবলম্বন দিয়ে গেছ । অথচ আমি তোমার অপরাধী হয়ে রয়ে গেলাম । তোমায় আমি ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না অহনা । তুমি আমার শূন্য হৃদয়ে পূর্ণতা এনে দিয়েছিলে । রাধার চোরাবালিতে থেকে আমাকে টেনে তুলেছিলে তুমি । ধীরে ধীরে হলেও আমি সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসেছিলাম । তোমাকে কখনো বলা হয়নি অহনা , তুমি আমাকে সেই সুযোগ টা দাওনি । আর এজন্য আমিই দায়ী । আমার উচিত ছিল ডায়েরিটা নষ্ট করে দেওয়া । কিন্তু কোন মোহ বলে আমি তা যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম আমি জানি না অহনা । আর এটাই আমার জীবনের সব থেকে বড়ো ভুল হয়ে গেল । তুমি আমাদের একা করে দিয়ে চিরতরে হারিয়ে গেলে । আমাকে ক্ষমা করে দিও তুমি । আচ্ছা , তুমি কি আমায় ক্ষমা করবে অহনা ? আমাকে কি ক্ষমা করা যায় ?

নিজের পাপ পূন‍্যের হিসাব করতে করতে বিকেল পেরিয়ে যায় । তুলনকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে শিমুল । ঘুমন্ত মেয়েকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে কপালে আলতো চুমু এঁকে দিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে বসে । বকুল কিছু কাজ করছিল ল‍্যাপটপে । মুখ না তুলেই বলল ,

– কোথায় ছিলে সারাদিন ?

– একটু ব‍্যস্ত ছিলাম । কেন ?

– মিস্টার রয় কল করেছিল । ওবাড়ির কাজকর্ম সব প্রায় শেষের দিকে । আমি আজ বিকেলে দেখে এসেছি । এ সপ্তাহের মধ্যে আমরা ওখানে শিফট হতে পারব ।

– ওহ ।

শিমুলের নিস্পৃহ আচরণে বকুল মুখ তুলে চাইল । শিমুল একমনে টিভির খবর দেখছে । বকুল ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করে আবার নিজের কাজে মন দিল । শেফালী বেগম ট্রে হাতে ড্রয়িং রুমে এসে দুই ছেলের সামনে কফি মগ রেখে বসে পড়লেন সোফায় । নিজের চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল ,

– বিকেলে তোদের কেয়ারটেকার আঙ্কেল এসেছিল । বাড়ির মালিক নাকি এ সপ্তাহেই ফিরবে । ওনার বড়ো ছেলের বিয়ে দেবেন এবার এসে । তাই বাড়ি খালি করতে বলে গেছে । তা ওবাড়ির কাজ কতদূর এগুলো বকুল ?

– মা , তোমাকে তো তখন বললামই ওবাড়ির কাজ প্রায় শেষ । আমরাও এ সপ্তাহেই সিফ্ট করতে পারব । তুমি প‍্যাকিং শুরু করে দাও ।

– ওহ ! বলেছিস বুঝি ? ভুলেই গেছি । আজকাল কি যে হয়েছে ? কিছুই মনে রাখতে পারি না ।

-এজন্যই তো বলি পুতুলকে সাথে নিয়ে একবার ডাক্তার দেখিয়ে এসো । আমার কথা তো শুনলে না …..

ক্ষোভ মেশানো গলায় বলল বকুল । শেফালী বেগম আলতো হেসে বললেন ,

– আরে বাবা, এতে রাগ করার কি আছে ? আমার বয়স হয়েছে । এই বয়সে এই রকম কত সমস্যা দেখা দেবে ! সবের জন্য যদি ডাক্তারের কাছে ছুটি , তাহলে এত প্রেসার কি শরীর সইবে ? দৌড়াদৌড়ি করতে করতেই তো বাকি জীবনটা শেষ হয়ে যাবে ……

– মাআআ !!!তুমি আবার শুরু করেছ ? আমি কতবার বলেছি এসব কথা মুখেও আনবে না আর । তবুও তুমি বাটপারি করে যাও কেন বলো তো ?

পুতুল মুখ ফুলিয়ে মায়ের গা ঘেষে বসে । শেফালী বেগম হেসে কন‍্যার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় । রান্নাঘরে চুলায় নিজের দেড় বছরের ছেলের জন্য সুজি রান্না করতে করতে মুখ বাকায় ঈষা । বিড়বিড় করে বিরক্তি মেশানো কন্ঠে বলে ‘ যতো সব আদিখ্যেতা ! এক এক জনের ঢং দেখলে গাঁ জ্বলে যায় । ‘

(চলবে ….)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here