স্বচ্ছ_প্রণয়াসক্ত #পর্ব_১৬ #মুসফিরাত_জান্নাত

#স্বচ্ছ_প্রণয়াসক্ত
#পর্ব_১৬
#মুসফিরাত_জান্নাত

জনমুখে একটি প্রবাদ বাক্য বহুল প্রচলিত রয়েছে।সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না।তার নিজস্ব গতিতে বয়ে চলে অবিরাম।তেমনি দেখতে দেখতেই খুব দ্রুত কে’টে গেলো কয়েকটি দিন।আজকে আনোয়ার খাঁনের রিলিজের দিন।বিপদের সময়টা মানুষকে তার শুভাকাঙ্খী চেনাতে সাহায্য করে।এই অসুস্থতার দিনগুলোতে আনোয়ার খাঁনও তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের শণাক্ত করতে পারলেন।সেই সাথে বুঝতে পারলেন তার বড় মেয়ের চয়েজটা একেবারে খারাপ নয়।এই কয়দিনে রাসেলের চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শীতা মুগ্ধ করেছে তাকে।সাথে তার অমায়িক আচরণ হৃদয় কেড়ে নিয়েছে।ছেলেটির পারিবারিক পটভূমিও মন্দ নয়।সব মিলিয়ে হসপিটালের বেডেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়ের পছন্দনীয় পাত্রের দ্বারেই মেয়েকে তুলে দিবেন তিনি।বিষয়টা খোলাসা করতেই খুশি হলো সবাই।সবার সান্নিধ্যে এমন সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করায় লজ্জিত হলো তাবাসসুম।সেই লজ্জার রেশ দেখা গেলো রাসেলের মুখেও।সবাইকে সালাম করে বেড়িয়ে গেলো সে কেবিন থেকে।তাবাসসুম আড়চোখে একবার পরখ করলো রাসেলকে।এতোদিন এড়িয়ে চলায় ছেলেটা অভিমান করেছে নিশ্চয়ই।ছেলেটির অভিমান ভাঙানো দরকার।কোনো একটা বাহানা দিয়ে রাসেলের পিছু নিলো সে।

আগে আগে কদম ফেলে এগিয়ে চলেছে রাসেল।তার পিছনে রয়েছে দুইটি নার্স।আর তাদের পিছন দিয়ে রাসেলকে ধরার চেষ্টায় চঞ্চল পা ফেলছে তাবাসসুম।বিষয়টা কারো অগোচরে নয়।হসপিটালের বেশ কিছু মানুষের দৃষ্টিতে এলো বিষয়টা।হয়তো কোনো জরুরি প্রয়োজনে ডাক্তারের পিছু নিয়েছে ভেবে পাত্তা দিলো না কেও।সে সোজা হেঁটে তার চেম্বারে চলে এসেছে।বেশ কিছু রুগী বসিয়ে রেখে হবু শশুরকে বিদায় জানাতে গিয়েছিলো সে।এখন ব্যস্ত পায়ে নিজ চেম্বারে যাচ্ছিলো বলে পিছু নেওয়া রমনীকে খেয়ালে আসে নি তার।তাই তো পরবর্তী রুগী প্রবেশ করানোর জন্য শব্দ সৃষ্টিকারী বোতামে চাপ দিলো।অনুমতি পেতেই সিরিয়াল অনুযায়ী পরবর্তী রুগীকে ডাকলো বাহিরে অবস্থিত সাহায্যকারী মেয়েটি।তার স্থলে নিজ উদ্যোগে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টায় পা ফেলতেই গলা পরিষ্কার করে বোনকে ডাকে ঐশী।সিঁড়ি মাড়িয়ে উপরে ওঠার সময় বোনকে চঞ্চল পায়ে ওদিকটায় যেতে দেখে উঁকি দিয়েছিলো সে।বিরক্ত হয়ে এগিয়ে আসে তাবাসসুম।

“সমস্যা কি?ডাকিস কেন?”

ঐশী থমথমে মুখে জবাবে বলে,

“সমস্যা কি জিজ্ঞেস করছিস?তুই নিজেই তো একটা মহা সমস্যা।”

“মানে?”

ভ্রু কুটি করে তাবাসসুম।ঐশী ধাতস্থ কণ্ঠে বলে,

“তুই যেভাবে ওখানে গিয়েছিলি।আমি না ডাকলে পাব্লিকের সাথে গোলযোগ বাঁধতে দু দণ্ড সময় লাগতো না।ভুলে যাস না এটা ভাইয়ার ওয়ার্ক প্লেস,ডেটিং প্লেস নয়।”

মুখ বাঁকায় তাবাসসুম।

“কিন্তু তুমি তো এই চিন্তা আগেই ব্রেক করে বসে আছো।ট্রিটমেন্ট প্লেসকে প্রেম স্টার্টিং প্লেস বানিয়ে এখন আমাকে জ্ঞান দিতে আইছো।”

“আমাদের হিসেব আর তোর হিসেব এক হলো?আমরা বিবাহিত।এখানে একত্রে সময় কাটালেও কিছু হবে না।কিন্তু তুই এমনটা ভেবে সিরিয়ালের রোগী বসিয়ে প্রেমালাপ করলে ভাইয়ার রেপুটেশন নষ্ট হবে।”

চোখ পাকিয়ে কথাগুলো বলে ঐশী।মেয়েটির কপট রাগত দৃষ্টি দেখে হেসে ফেলে তাবাসসুম।রগড় করে বলে,

“আচ্ছা বইন বুঝেছি।কিন্তু আমাকে বোঝাতে গিয়ে তোর চায়ের কাপ অবুঝ হয়ে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে সে খেয়াল আছে?”

সম্বিৎ ফিরে ঐশীর।সাদাতের সাথে একত্রে থাকার শেষ সময়টা উপভোগ করতে দু কাপ চা নিয়ে যাচ্ছিলো সে।চা ঠাণ্ডা হয়ে গেলে সময়টা আর উপভোগ্য হবে না।তড়িঘড়ি করে চলে যায় সে।সেদিকে তাকিয়ে স্মিত হাসে তাবাসসুম।তার বোনটার সম্পর্ক তবে গোছানোর পথে এগোচ্ছে।
_________

বসন্তের আগমনে ধরনী অপরুপ সাজে সজ্জিত হয়েছে।গাছে গাছে কমলা রঙা পলাশ,মন মাতানো পবন ও কোকিলের কুহুতানে মুখরিত পরিবেশ। এই পরিবেশটাকে আরও মধুময় করতে দুই কাপ চা হাতে আগমন হয় ঐশীর।সাদাতের পাশে এসে গলা খাকাড়ি দিয়ে একটু শব্দ উৎপাদন করে সে।ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সাদাত।স্নিগ্ধ এই সকালে স্নিগ্ধ রমনীর এক ভিন্ন রুপ দেখতে মুগ্ধ হয় সে।সাদাতের দিকে এক কাপ চা এগিয়ে দেয় ঐশী।

“ভোর থেকে অনেকটা ধকল যাচ্ছে আপনার উপর দিয়ে।এই চা টা পান করুন।প্রশান্তি লাগবে।”

ভ্রু কুঁচকে ঐশীর হাতের দিকে তাকায় সাদাত।দুই হাতে দুই কাপ কড়া করে বানানো ধোঁয়া ওঠা দুধ চা।সামনের দিকে দৃষ্টি ঘুরায় সাদাত।স্মিত হেসে বলে,

“চায়ের কাপে প্রশান্তি পাই বা না পাই,রমনীর এই আবেদনে প্রশান্তি ঠিকই খুঁজে পেয়েছি।তা রমনী কি জানে না দুধ চা আমি খাই না?”

তড়িৎ জিভ কাটে ঐশী।লজ্জিত হয় খানিকটা।সে জানতো না সাদাতের অপছন্দের তালিকায় দুধ চায়ের অবস্থান অন্যতম।ক্ষণেই মন খারাপ হয় তার।এতোদিন হলো বিয়ে হয়েছে অথচ সাদাতের পছন্দ অপছন্দ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান লাভ করে নি সে।ভারাক্রান্ত মনে পিছু ফিরতে নেয় ঐশী।ভরাট কণ্ঠে ডেকে ওঠে সাদাত।

“চা না দিয়ে কোথায় যাও?”

বিষ্মিত হয় ঐশী।

“মাত্রই তো বললেন আপনি দুধ চা খান না।”

“খাই না তবে আজকে খাবো।”

গম্ভীর গলায় জবাব তার।ঐশী অবাক হয়ে শুধায়,

“কিন্তু কেনো?”

“তুমি এনেছো বলে।”

নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিলো সাদাত।চিত্তবিক্ষেপ ঘটলো ঐশীর।নিষ্কম্প দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে।মাধুর্যতা খুঁজে পেলো বাক্যটার অভ্যন্তরে।শুধুমাত্র সে এনেছে বলে খাবে।সমাহিত হতে বাধ্য হলো ঐশী।তার হাতে ধরা চায়ের কাপটা নিয়ে তাতে অধর ছোঁয়ায় সাদাত।পরিমিত মিষ্ট স্বাদের কড়া লিকারের অপছন্দনীয় চায়ের মাঝে আজকে হুট করেই অমৃতের স্বাদ অনুভব করলো সাদাত।কে জানে,তার স্বাদের এই বদলটা শুধুমাত্র ঐশীর যত্নে আনা চা বলেই কি না।আরও একবার চায়ের কাপে চুমুক দিলো সে।বিভ্রান্ত হলো সাদাত।আশ্চর্য তো!এবারেও স্বাদটা একই লাগছে।লম্বা শ্বাস টেনে নিলো সে।আকাশ পানে দৃষ্টি ফেলে নিস্পৃহ কণ্ঠে বললো,

“তোমার যত্নে আনা বিষও হয়তো আমার নিকট সুস্বাদু হয়ে যাবে।এটা তো কেবল দুধ চা।”

থমকালো হলো ঐশী।মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো লোকটার দিকে।প্রতিটা নিঃশ্বাসে কেমন মুগ্ধতা অনুভব করছে সে।হারিয়ে যাচ্ছে অন্য জগতে।শুধুমাত্র তার নিয়ে আসা বলে চায়ে স্বাদের ছোঁয়া পেয়েছে সাদাত?একটা মানুষের নিকট কতোটা বিশেষ স্থান অধিকার করলে এমনটা বলতে পারে তা ঐশীর ধারনার বাইরে।তবে সে যে সাদাতের জীবনের বিশেষ কেও হয়ে উঠেছে তা বুঝতে বাকি রইলো না বিচক্ষণ রমনীর।মুগ্ধ হলো সে।তড়িৎ হৃদয়ের দুয়ার খুলে দিলো।এমন কথা শোনার পরও কি আর মনের দ্বার না খুলে থাকতে পারে?সাদাতের দিকে দৃষ্টি রেখে মনে মনে ভাবে ঐশী। আচ্ছা, লোকটা কি যাদু জানে?একটা দুইটা কথায় কিভাবে আকৃষ্ট করে ফেলে তাকে।একটু একটু করে প্রেমের অতল সমুদ্রে টেনে নেয়।অপছন্দের শীর্ষ তালিকা থেকে ধীরে ধীরে প্রেম নদীর টানে টেনে নেওয়া তো কোনো দৈবাৎ ঘটনা নয়।নিশ্চয়ই যাদু জানে সে।কঠিন যাদুবিদ্যা।যা অল্প কথাতেই প্রেমের বান মা’রে ঐশীর উপর।একবুক নিঃশ্বাস টেনে চায়ের কাপের সঙ্গী হয় সে।টুকটাক কথাও হয় দুইজনের।আলাপে আলাপে শূন্য হয় চায়ের কাপ।ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে রাখা ঝুড়িতে ওয়ান টাইম কাপ দুটো ফেলে যায় তারা।সাথে পেছনে ফেলে যায় মধুময় কিছু সময়।

______
নিজস্ব সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে হসপিটালের সাধারণ নিয়মকানুন যথাযথ পুরণ করে আনোয়ার খাঁনকে নিয়ে বাড়ি ফেরে তারা।বাড়ি অবধি পৌঁছে দেয় সাদাত।অবশেষে হসপিটালের ঝামেলা থেকে পরিত্রাণ মেলায় স্বস্তি পায় সকলে।শুধু স্বস্তি মেলে না একটি প্রাণের।ঐশীর মনে মেঘ জমেছে।সাদাত ও তার প্রেমের কাপে বিচ্ছেদের কড়া লিকার পড়েছে।যার তিক্ততায় ছেয়ে আছে তার মন।এভাবে আবারও একত্রিত হওয়া হবে কি?হবে কি আলাপে আলাপে সময় কাটানো?সময়ে অসময়ে প্রেমের বাতাস বইবে কি এ ধরায়?জানা নেই ঐশীর।সে শুধু জানে বুকের মাঝে খাঁ খাঁ শূন্যতা অনুভব করতে যাচ্ছে সে।পুরো দুনিয়া পেলেও যে শূন্যতায় পূর্ণতা মিলবে না।এই শূন্যস্থান পুরণের একমাত্র কারিগর তো সাদাত।এই শেষবেলায় সবকিছু গুছিয়ে শশুরবাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে একেবারের জন্য চলে যেতে উদ্যত হয় সাদাত।সবার থেকে বিদায় নিয়ে বের হওয়ার সময় মস্তিষ্ক বলে দেয় বিদায় নেওয়ার তালিকার উর্ধ্বে যে ব্যক্তিটির নাম থাকার কথা সেই ব্যক্তিই বহিষ্কৃত হয়েছে।নিজের সংঘটিত ভুল শুধরাতে ঐশীর রুমে যায় সাদাত।সাদাতের আগমনের অপেক্ষায় যেনো ছিলো মেয়েটি।সাদাতকে দেখে ব্যগ্র হয়ে এগিয়ে যায়।স্মিত হাসে সাদাত।ধাতস্থ কণ্ঠে বলে,

“এখানে আমার আর কোনো প্রয়োজন দেখছি না।তাই চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

সাদাতের বাক্যদুটির বিরুদ্ধে অঘোষিত তীব্র প্রতিবাদ জানালো ঐশীর ব্যথিত মন।কে বলেছে লোকটির আর প্রয়োজন নেই?এই যে তার জীবনে সাদাতের অসীম প্রয়োজন, তা কি লোকটি বুঝতে পারছে না?অথচ মুখে কোনো শব্দের উৎপত্তি হয় না।স্থির রয় সে।কোনো জবাব না পেয়ে সাদাত ধীর কণ্ঠে বলে,

“থাকো আসি এখন।”

তিনটি শব্দ,অথচ এতোই ব্যাথাতুর ছিলো যার আঘাতে ঐশীর হৃদপিণ্ড টন টন করে উঠলো।সে খুব করে চাইলো লোকটা থাকুক।কিন্তু কোন বাহানায় আর কাছে চাইবে তাকে?অনিচ্ছা সত্বেও মাথা কাত করলো সে।দুই কদম ফেলে এগিয়ে গেলো সাদাত।কি একটা ভেবে থেমে গেলো আবার।সবটাই শূন্য নয়নে দেখে গেলো ঐশী।

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে কাছে এগিয়ে এলো সে।ঐশীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,

“যার পুরোটার দখলদারিত্ব তোমার,সে যত দুরেই থাকুক না কেনো মন খারাপ করতে নেই।দূরত্ব সব সময় একে অপরকে আলাদা করেনা।কিছু কিছু সময় দূরত্ব অতি নিকটেও এনে দেয়।আমি তোমার সান্নিধ্যে থাকলে তোমার দেহের সান্নিধ্যে আমার বিচরণ থাকে, অথচ দূরে চলে গেলে সর্বদা তোমার মস্তিষ্কে আমার বিচরণ থাকবে।তাই আমি তোমার আরও কাছে থেকে যাবো।তবুও মন খারাপের কোনো কারণ আছে?”

মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয় ঐশী।সাদাত স্মিত হাসে।

“তাহলে আর মন খারাপ করে থেকো না।ওই মনে মেঘ থাকলে যে আমি ভুলেও বাড়ি ফিরতে পারবো না।”

শব্দের যাদুকর তার কন্ঠ নালী দিয়ে উৎপন্ন বাক্য দ্বারা এবারেও রমনীকে মুগ্ধ করতে ব্যর্থ হলো না।একবুক প্রশান্তি নিয়ে চেয়ে রইলো সে।ফিরতি পথে পা বাড়ালো সাদাত।সেদিকে নিষ্কম্প নয়নে তাকিয়ে রইলো ঐশী।সে স্পষ্ট বুঝলো,তাদের দেহের দূরত্ব হতে যাচ্ছে অথচ মনের ব্যবধান ঘুচে গিয়েছে।তারপরও কি আর মনের মেঘ থাকে?একবুক শ্বাস টেনে সাদাতের যাত্রা পথে দু চোখ মেলে তাকিয়ে রইলো ঐশী।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here