বৃষ্টিভেজা_আলাপন (২৮)

#বৃষ্টিভেজা_আলাপন (২৮)

এক দৃষ্টিতে অভিরাজের দিকে তাকিয়ে আছে লাবণ্য। কতটা ভালোবাসা থাকলে মানুষ এভাবে বিচলিত হতে পারে সেটাই ভাবছে সে। অজান্তেই কি না অভি’র জীবনে ভিলেন হয়ে উঠেছে সে। অথচ অভিরাজের সবথেকে প্রিয় বন্ধুর তালিকা করলে লাবণ্যকে শীর্ষে রাখা হবে। লাবণ্য অপরাধবোধে ভুগছে। সে এতটা বেপরোয়া হতে চায় নি। কিন্তু ঝোঁকের বসে কাজটা করে ফেলেছে। অভি’র বিচলিত মুখটা তাকে আরো বেশি কষ্ট দিচ্ছে। দেড় ঘন্টা পর হসপিটালে পৌছাল ওরা। উষশী’র ট্রিটমেন্ট শুরু হয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছেন এডমিট থাকতে হবে। তাই হসপিটালের পোশাক পরানো হয়েছে। মেয়েটিকে এই পোশাকে দেখে অভিরাজের বুকটা কেঁপে উঠল। চোখ বন্ধ করে আছে কিশোরী। চোখের কোণে জল। সকলকে বাইরে পাঠিয়ে কিশোরী’র হাত মুঠোয় নিল অভিরাজ। শুরুতেই উষশী’র প্রশ্ন।
“আমি খুব বাজে হয়ে গিয়েছি তাই না?”

অভি নিরুত্তর। সে মেয়েটির হাতটা শক্ত করে চেপে রেখেছে।
“কথা বলেন না কেন? আমাকে বাজে দেখাচ্ছে নিশ্চয়ই? খুব বিশ্রি। লাইক বিস্ট?”

এবার ও অভিরাজের উত্তর নেই। ঠোঁট কামরে ধরল উষশী। অভি কি তাকে আর ভালোবাসবে না?
“খুব খারাপ দেখাচ্ছে আমায়। আপনি আমাকে আর ভালোবাসবেন না তাই না? একটা বাজে দেখতে মেয়েকে কেন কাছে টানবেন।”

ডুকরে উঠল উষশী। তাতেও অভিরাজের খেয়াল নেই। সে হুট করেই মেয়েটির ঠোঁটে নরম স্পর্শ করল। অভিকে খামচে ধরল কিশোরী। যেন একদমই মিশিয়ে নিবে নিজের সাথে।
“ইউ আর দ্য মোস্ট বিউটিফুল ইন দ্য ওয়াল্ড। ফর এভার এন্ড এভার। মন ছোট কর কেন উষশী? তোমার কি মনে হয় শুধুমাত্র এই শারীরিক সৌন্দর্যের জন্য তোমায় ভালোবাসি আমি? আকর্ষণ সৌন্দর্যে আসলেও ভালোবাসাটা মনের বিষয়। তুমি বিস্ট হয়ে গেলেও আমার ভালোবাসা হয়েই থাকবে। অভিরাজের ভালোবাসা।”

এক মনে অভিরাজের দিকে তাকাল উষশী। সত্যিই কি এভাবে ভালোবাসা যায়? তার অনুভূতি ও কি এমনি? অভিরাজ যেমন করে ভালোবাসে সেও কি সেভাবেই ভালোবাসে? এই প্রশ্নটা বড়ো জটিল। উষশী’র পনের বছরের জীবনে শারীরিক ভালোবাসা ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে নি। নাকি পড়েছে সে ধরতে পারে নি।

হসপিটাল থেকে ফিরে আসার পর উষশী’র প্রতি সকলেরই খেয়াল বেড়েছে। মেয়েটা বিদেশের মাটিতে বড়ো হয়েছে। এখানকার সবকিছু সহজেই মানাতে পারবে না। ওর খাওয়া দাওয়ায় বদল হয়েছে। তবে এ জীবন পছন্দ নয় কিশোরীর। সে আগের মতো ঘুরে বেড়াতে চায়। নতুন খাবারের স্বাদ নিতে চায়। কিন্তু অভি সচেতন। সে কিছুতেই মেয়েটির যত্নে ক্রুটি করতে দিবে না। দুপুরে অভি’র টি শার্ট পরে বসে আছে উষশী। বাড়িতে বড়ো রা কেউ নেই। দাওয়াতে গিয়েছে তারা। ছোটরা কেউ আগ্রহী ছিল না। তাই বাড়িতে থেকে গিয়েছে। গোসল করে এসে উষশীকে দেখল অভিরাজ। তার গায়ে টি শার্ট দেখে মৃদু হাসল। উদাম শরীরে দাঁড়িয়ে অভিরাজ। অন্য কেউ হলে নিশ্চয়ই লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিত। তবে উষশী তা করল না। সে একরাশ উল্লাস নিয়ে তাকিয়ে রইল। মেয়েটি খুব কম লজ্জা পায়।
“লু চু কিশোরী। এভাবে আমার যৌ ব ন শুষে নিচ্ছ!”

“যৌ বন আছে? অলরেডি বুড়ো হয়ে গিয়েছেন মিস্টার রাগি।”

“এতটা অবিশ্বাস? প্র্যাক্টিকাল দেখতে চাচ্ছ মনে হলো।”

“দেখালে সমস্যা নেই।”

“আসলেই?”

“হুম।”

“পরে দোষ দিবে না।”

“দোষ কেন দিব?”

অভিরাজ মজা করেই উষশী’র একদম নিকটে চলে এল। উষশীও কম যায় না। সে একদমই ভয় পাচ্ছে না। উল্টো অভি’র গলা জড়িয়ে ধরেছে।
“ভয়ঙ্কর মেয়ে তুমি।”

“এইটুকুতেই দমে গেলেন?”

“আপনি আমাকে বিচলিত করতে চাচ্ছেন রেইন। কিন্তু একটুও বিচলিত নই আমি। সব তোলা রইল। বিয়ের পর বোঝাব,অভি কি করতে পারে।”

“বুড়ো মানুষের এত তেজ?”

“ষাট বছরেও অভির ভালোবাসায় কেঁপে উঠবে তুমি। আর এখন তো সবে পনের।”

বাক্যটি শেষে অভিরাজ উঠে এল। উষশীও পেছন পেছন এসেছে। অভি শরীরে শার্ট জড়িয়ে বলল,”টি শার্ট পরে আছ কেন?”

“লম্বা পোশাক গুলোতে গরম লাগছে খুব।”

“আচ্ছা পরে থাকো। তবে বাইরে যাবে না।”

“ঠিক আছে। কিন্তু আমার যে খুব আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে।”

“বিকেলে এনে দিব।”

“না,না ঐ মাঠে তিন চাকার ভ্যানে করে আইসক্রিম আনা হয়েছে। ঐ গুলো খাব।”

“বরফ গোলার কথা বলছো?”

“হুম।”

“বাড়ির অন্যদের বললেই তো হতো।”

“অন্যদের বলতে ভালো লাগে না।”

উষশী’র এই বাক্যে খুব একটা খুশি হতে পারল না অভিরাজ। মেয়েটি সবার সাথে মানিয়ে নিতে পারছে না। তাদের ভবিষ্যৎ এ এটা নিয়ে ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেখানে সবাই লাবণ্যকে পছন্দ করে সেখানে উষশীকে কি করে বসাবে সেটাই বুঝতে পারছে না। অনেক গুলো ঝড় দেখতে পারে সে। দিন শেষে সত্যিই সম্পর্কটা ভীষণ অনিশ্চিতের দলে।

উষশী’র ঘাড়ের লালচে দাগ গুলোতে ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছে লাবণ্য। বাড়িতে ফেরার পর তার যত্ন লাবণ্যই নিয়েছে। খারাপ লাগার পরিমাণ ও কম নয়। ইদানীং ইচ্ছে হয় সব ছেড়ে কোথাও হারিয়ে যেতে। উষশী বরফ গোলা খাচ্ছে। ঔষধ লাগানো শেষ হতেই অভিকে খুঁজতে বের হলো লাবণ্য। অভি বাগানে আম পাড়তে গিয়েছে। তার সাথে আছে জাবেদ সিনহার দুই ছেলে জাবিন আর জোভান। তারা নিচে দাঁড়িয়ে আর অভি আম গাছে।
“গাছে উঠেছিস কেন অভি? পড়ে যাবি তো।”

“এতটাই বেক্কেল মনে হয় আমায়?”

“যদি পড়ে যাস। নেমে আয়। অন্যভাবেও তো পাড়া যায়।”

“তাতে কি মন ভরে রে লাবণ্য।”

বলতে বলতে আম ছিড়ে নিচে ফেলল অভি। সেটা গিয়ে লাগল লাবণ্য’র মাথায়। সে শক্ত চোখে তাকাল।
“সরি, সরি। তুই এখানে কেন দাঁড়িয়েছিস।”

“ঠিক হলি না তুই। ছোট বেলাতেও এমন করে মাথায় আম ফেলতি।”

দুষ্টুমির হাসি হাসল অভিরাজ। ছেলেটা ইচ্ছে করেই এমন করেছে। সে যেন ছোট বেলায় ফিরে এসেছে। জোভান আম কুড়াতে কুড়াতে বলল,”অভি ভাইয়া,আরো লাগবে। এ কটায় কিছু হবে না।”

“অপেক্ষা কর।”

আরো কিছু আম পাড়ল অভিরাজ। বেশ বড়ো আর উঁচু গাছ। অভি নামার সময় লাবণ্য’র দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। একটু পা হড়কে গেলেই শেষ! অভিরাজের সাথে অবশ্য তেমন কিছুই হলো না। সে বেশ সাবলীল ভাবেই নেমে এল। কিন্তু লাবণ্য বিপদটা ঘটিয়েই ফেলল। অসাবধানতাবশত চলতে গিয়ে গাছের মোটা শিকরের সাথে পা আটকে গেল। ফলস্বরূপ মচকে গেল পা। ব্যথায় দু চোখে জল বেরিয়ে এসেছে।
“ব্যথা পেলি কি করে। বোকা মেয়ে,দেখে চলবি না।”

লাবণ্যকে ধরল জোভান আর জাবিন। তারা কোনো মতে ধরে দাঁড় করালেও চলতে পারছে না মেয়েটি। অভিরাজকে আসতেই হলো। সে আম গুলো জাবিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,”যা,বাসায় নিয়ে কুচি করে ফেল।”

জাবিন চলে গেল। জোভান সরঞ্জাম নিয়ে চলতে লাগল। লাবণ্যকে দু হাতে জাপটে ধরল অভিরাজ।
“অদ্ভুত। এইটুকু পথ চলতে পারছিস না। কোলে না নিতে হয়।”

লাবণ্য নাক ফুলিয়ে বলল,”থাক আর ধরতে হবে না। ছাড় এমনি যেতে পারব।”

আশ্চর্যভাবে অভিরাজ তাকে ছেড়ে দিল। একটু কষ্ট পেল লাবণ্য। কিন্তু এক পা চলতে গিয়েই পড়ে গেল। অভি তাকে উঠিয়ে নিল। এবার আর হাত ধরে নয় একেবারে কোলে তুলে নিয়েছে। লাবণ্য অবাক হয় নি। ছেলেটার কোলে চড়ার অভিজ্ঞতা এর পূর্বেও রয়েছে। একবার নয় বহুবার রয়েছে। তাদের সম্পর্কটা অন্যদের তুলনায় বেশ ভিন্ন। আর সেই জন্যেই পরিবারের লোক একটা শক্ত পোক্ত নাম দিতে চেয়েছে। অথচ শুরুর দিকে দুজনেই হেলায় নিয়েছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অনুভূতি’র রঙ ব‍দলায়। নিজের ভেতর এর অনুভূতি কিছুতেই অস্বীকার করতে পারে না লাবণ্য। তার আজকের অনুভূতি ভীষণ ভিন্ন। যদি কোনো ভাবে অভি তার নামে দলিল হয়। নিজেকে বড়ো ভাগ্যবতী বলেই মনে হবে।

উষশী উল্লাসিত হয়ে বের হলো। শুরুতেই চোখে পড়ল অভিরাজের কোলে থাকা লাবণ্যকে। সে দ্রুত নেমে এল।
“আপু’র কি হয়েছে?”

“পা মচকে ফেলেছে।”

অভি লাবণ্যকে বসিয়ে দিয়ে শ্বাস নিল। কপালে জমে থাকা ঘামটুকু মুছে বলল,”তুই এর ভারী কেন লাবণ্য?”

একটু লজ্জা পেল লাবণ্য। তবে সে অতও ভারী নয়। তার ওজন চুয়ান্ন কেজি। অবশ্য তার তুলনায় উষশী একদমই কম ওজন। কিশোরীকে দেখলেই বোঝা যায় চল্লিশ এর খুব বেশি নয়। বিষয়টা কল্পনা করতেই মন খারাপ এসে স্পর্শ করে গেল।

চলবে….
কলমে~ফাতেমা তুজ নৌশি

**বৃষ্টিতে কোচিং এ আটকে ছিলাম। বাসায় ফিরেছি ৯ টায়। আমার টেস্ট এক্সাম চলছে। গল্পটা একদিন পর পর দেওয়া হবে।**

‘বিয়ে থা’ এক অন্যরকম ভালোবাসার গল্প। পড়ে আসুন।

https://www.facebook.com/100076527090739/posts/273925078501727/?app=fbl

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here