Monday, April 13, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প অনুভূতির মায়াজাল অনুভূতির_মায়াজাল,পর্ব_৮(অন্তিম পর্ব)

অনুভূতির_মায়াজাল,পর্ব_৮(অন্তিম পর্ব)

#অনুভূতির_মায়াজাল,পর্ব_৮(অন্তিম পর্ব)
#নাজমুন_বৃষ্টি

তখন সবেমাত্র মাধ্যমিক শেষ করে কলেজে পা দিয়েছে নীলাদ্রি। সদ্য কিশোরী মেয়ের চঞ্চলতায় ভরফুর ছিল নীলাদ্রি। একই কলেজের দুই ক্লাস উপরে পড়তো মাহতিম। সেই হিসেবেই দুরন্ত, চঞ্চল নীলাদ্রিকে দেখেই তার প্রথম অনুভূতি হয়েছিল কিন্তু নীলাদ্রিকে বলার সাহস কোনো-কালেই পায়নি। দূর থেকেই নীলাদ্রির সবকিছুতে খেয়াল রাখতো মাহতিম । নীলাদ্রি প্রথম প্রথম বুঝতে না পারলেও কয়েকদিন যেতেই বিষয়টা খেয়াল করলো। এরপর আস্তে আস্তে নীলাদ্রির মনেও মাহতিম জায়গা করে নিল। নীলাদ্রিদের বাস ছাড়ার আগ পর্যন্ত নীলাদ্রির সিটের জানালার পাশে মাহতিম দাঁড়িয়ে থাকতো কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা থাকত না। দুইজনেই সময়টা চুপচাপ উপভোগ করতো। এভাবেই চলছিল, নীলাদ্রি-মাহতিমের প্রণয়। প্রতিদিন কলেজ যাওয়ার আগে মাহতিম সাহস করে বলতো,’আজ নীলাদ্রিকে প্রপোজ করবোই।’ কিন্তু কলেজ এসেই তার সব সাহস চুপসে যেত। কেন জানি, নীলাদ্রিকে দেখলে তার অনুভূতি ফাঁকা হয়ে যেত। নীলাদ্রিও প্রতিদিন কলেজ আসার সময় মনে মনে উৎফুল্ল হতো, হয়ত আজ মাহতিম ভাই নীলাদ্রিকে তার মনের কথা বলবে আর নীলাদ্রি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হতো না। দুইজন দুইজনের পাশ দিয়ে হেটে চলে যেত কিন্তু সাহস কুলোতো না। আবার আড়ালে ঠিকই একজন আরেকজনের খেয়াল রাখতো। সেইবার মাহতিমের সাথে একটা ছেলের সে কী ঝগড়া! ছেলেটি নীলাদ্রির ক্লাসেই পড়তো। নীলাদ্রিকে নোট দেওয়ার সময় মাহতিম দেখে ফেলেছিল। আরেকবার তো নীলাদ্রি একটা মেয়ের চুলই টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিল কারণ হচ্ছে মেয়েটি আরেক মেয়ের সাথে গল্পঃ করতে করতে মাহতিমের সৌন্দর্য বর্ণনা করছিল। সেদিন থেকেই সম্পূর্ণ কলেজের সবাই নীলাদ্রি-মাহতিমের সম্পর্কটা জানতো। কেউ সাহস করে তাদের মাঝখানে আসতো না অথচ নীলাদ্রি-মাহতিম একে অপরের সাথে কাজের ছাড়া কোনো কথায় বলতো না। আস্তে আস্তে তাদের দুজনের দিনই সুন্দরভাবে চলে যাচ্ছিল কিন্তু একদিন হুট্ করে মাহতিমের মা মারা যায়। তখন থেকেই মাহতিম ভেঙে পড়ে। মাহতিম তার মাকে প্রচুর ভালোবাসতো। মা মারা যাওয়ার পর ঠিকমত পড়াশোনা করে না, ক্লাসে আসে না। এক রুমে নিজেকে বন্ধি রাখতো। নীলাদ্রি অনেক বার মাহতিমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল কিন্তু পারেনি। এরই মধ্যে নীলাদ্রির উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হলো। ঠিক সেসময় একরকম জোর-জবরদস্তি করে নেহাল আহমেদ নীলাদ্রির সাথে আরিয়ানের বিয়ে দেয়। নীলাদ্রি বিয়ের আগে অনেকবার মাহতিমের সাথে দেখা করার চেষ্টা করেও দেখা করতে পারলো না। একসময় বিয়ে হয়ে গেল আর নীলাদ্রিকে নিয়ে আরিয়ান ঢাকায় চলে গেল। তখনও মাহতিম মায়ের শোক পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যেদিন শুনলো, নীলাদ্রির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সেদিন কীই না পাগলামি করেছিল কিন্তু নীলাদ্রির দেখা আর পায়নি। দেখা পাবে কী করে!নীলাদ্রি যে নতুন সংসারে ব্যস্ত! এইখানে আর পড়াশোনা হবে না বলে মাহতিম বাবাকে রাজি করিয়ে পাড়ি দেয় এক অচেনা দেশে। এরপর পাঁচ বছর দুজনের পথ দুইদিকে ছিল। কারো সাথে আর দেখা হয়নি। দুজনের গন্তব্য ভিন্ন হয়ে গেল! সমাপ্ত হয়ে গেল ভালোবাসার পথ চলা!

————
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রাতের চাঁদ দেখতে দেখতে কোন সময় জানি অতীতে চলে গিয়েছিল তা নীলাদ্রির খেয়ালে ছিল না।

নীলাদ্রি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাড়ি নিয়ে বসে পড়লো। ঠিক তখনোই মোবাইলটা তীব্র ঝংকার তুললে সে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো বাবা কল করেছে।

-‘হ্যাঁ, বাবা।’

-‘কেমন আছিস মা?’

-‘ভালো আছি, তুমি কেমন আছো? মায়ের কী অবস্থা?’

কথা শেষ হতেই নেহাল আহমেদ কিছু বলতে চাচ্ছিল, নীলাদ্রি চুপ করে রইল।

-‘আমি তোমার মেয়ে নই? তুমি আমাকে কথা বলতে সংকোচ করছো বাবা?’

-‘আসলে কী যে বলি। লোকমান সাহেবের ছেলের জন্য তোর সম্বন্ধ আসছে মা। কী যে করি! আমি তোর মতামত নিয়ে জানাবো বলেছি।’

নীলাদ্রি থমকে তাকালো। তার মানে, মাহতিমের সাথে তারই বিয়ের কথা তুলেছিল লোকমান সাহেব! আর মাহতিম! সেও তাহলে নীলাদ্রিকেই বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল! কথাটা মনে আসতেই নীলাদ্রি চট করে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ইসস! গতকাল যদি বাবাকে কথাটা বলার জন্য জোরাজোরি করতো তাহলে বোধহয় আজ মাহতিমের সামনে যেতে হতো না, আর না বিয়ের ব্যাপারটা তুলতে হতো! এখন মাহতিম কী ভাববে!

———–

দিন যতই যায়, নীলাদ্রির শাড়ির ব্যবসা ততই প্রসিদ্ধ লাভ করে। প্রথম প্রথম নীলাদ্রি শাড়ি নিয়ে বসে থাকতো, কেউ আসতো না। এরপর নিজেই বিভিন্ন দোকানে দোকানে নিয়ে গিয়ে দেখাতো। কেউ কেউ এতোগুলো শাড়ি থেকে বেছে শুধু একটা নিতো আবার কেউ কেউ একটাও নিতো না। হঠাৎ একদিন এক দোকানদারের নীলাদ্রির একটা শাড়ি চোখে পড়লো। তিনি সাথে সাথে বেশ কয়েকটা অর্ডার দিয়ে ফেললেন। নীলাদ্রিও এই প্রথম কোনো কাস্টমার পেয়ে দিনে-রাতে করে কয়েকদিনের ভেতর অনেক শাড়ির কাজ করে ফেলল। এরপর পর দোকানদারটা সেই শাড়ি বিভিন্ন শপিংমলের পরিচিত দোকানগুলোতে পাঠিয়ে অনেক লাভবান হন। আস্তে আস্তে নীলাদ্রির অনেক অর্ডার আসতে থাকে। নীলাদ্রিও খুশিমনে সব করে। আস্তে আস্তে লাভ হতে লাগলো, দোকান একটার জায়গায় তিনটা হলো। আরও অনেক অসহায় মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নীলাদ্রি আরও অসংখ্য নীলাদ্রি গঠন করলো। সবাই ভীষণ খুশি। আস্তে আস্তে নীলাদ্রি শাড়ির ব্যবসার নাম ডাক বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে নীলাদ্রির ডিজাইন করা শাড়ি নিতে আসে ব্যবসায়িরা।

———-

দেখতে দেখতে আরও কয়েক মাস কেটে গেল। নীলাদ্রিও সম্পূর্ণ আত্মমর্যাদাবান নারী হিসেবে সবার কাছে পরিচিত লাভ করেছে। অনেক অসহায় নারী-মেয়ে নীলাদ্রির দোকানে কাজ করে নিজেদের ব্যবসা অগ্রগতি করছে। অনেক অসহায় মেয়ের অনুপ্রেরণা নীলাদ্রি। নীলাদ্রি কীভাবে এতটুক পথ পাড়ি দিয়েছে তা সবারই জানা।

কয়েকমাস যেতেই নীলাদ্রি আরও কয়েকটা ব্যবসার সাথে যুক্ত হলো। সবকিছুর পর সমাজে সে নিজের একটা অবস্থান তৈরী করলো। এসব কিন্তু মোটেও একদিনের ব্যাপার নয়, প্রায় পাঁচবছর কষ্টের ফল এসব। মাহতিমও এতদিন নীলাদ্রির পাশে থেকে যথেষ্ট অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এখন শুধু তাদের বিয়ের পালা।

ধুমধাম করে তাদের বিয়েটা সম্পন্ন হয়ে গেল। পরিশেষে তাদের ভালোবাসা এক হলো। নীলাদ্রি কোথাও যেন একটা তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করলো। হয়ত আগের বিয়ের কথা মনে পড়ছে।

————–

বিশাল এক কামরার ফ্ল্যাটে শীত চলে যাওয়ার আগে শেষ হিমেল পরশটুকু বুলিয়ে দিচ্ছে একবার। মাহতিম হাতের কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই মনে পড়লো,’আরে আজ তো বৃহস্পতিবার!নীলাদ্রি তাড়াতাড়ি আসবে যে!’ ভাবতেই পাশ থেকে আনভিরা কেঁদে উঠল। মাহতিম তাড়াতাড়ি আনভিরাকে কোলে নিয়ে বারান্দায় ছুটলো। বারান্দায় আসতেই আনভিরা সাথে সাথে চুপ হয়ে গেল। ঠান্ডা এলোমেলো হাওয়ারা উত্তর দিক থেকে ছুটে আসছে। মাহতিম আনভিরাকে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিল।
এই মেয়েটাও না, হয়েছে একদম মায়ের মতো। হাজার ঠান্ডা পড়ুক, বারান্দায় আনলেই শান্তি।

নীলাদ্রি তাড়াতাড়ি করে রুমে ঢুকে বারান্দার দিকে বাবা-মেয়ের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে হাসলো এরপর ব্যাগ রেখে মুখে পানির ঝাপ্টা মেরে মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসতেই মাহতিম মেয়েকে একপাশে কোলে রেখে নীলাদ্রির দিকে কফির মগ বাড়িয়ে দিল। নীলাদ্রি মুচকি হেসে তা গ্রহণ করে নিল।

-‘কেমন কাটলো দিন!’

-‘তা ভালো। উনারা তো ছাড়তেই চান না। সপ্তাহের এই একটা দিনই তো যায়। শুনো, আজ আরও দুইজন মা’কে পেয়েছি। উনাদেরও একসাথে রেখে এসেছি বিদ্যাশ্রমে। কাল আপনাকে নিয়ে যাবো বলছিলাম। আপনি তো সারাদিন এই কোম্পানি-ওই কোম্পানি করে করে থাকেন। কাল শুক্রবারে আমরা যাবো। মনে রাখিয়েন।’

-‘কিন্তু কাল তো আমার মিটিং আ…’ মাহতিমকে থামিয়ে দিয়ে নীলাদ্রি রাগী নজরে তাকিয়ে বলে উঠল,
-‘আপনার তো একদিনও সময় হয় না। এতকিছু শুনতে চায় না, কাল আপনি বিদ্যাশ্রমে যাচ্ছেন, ব্যস!’

-‘যথা আজ্ঞা মহারানী।’ মাহতিম হেসে মাথা নেড়ে সাঁই দিল।

-‘বাবা-মা’রা খেয়েছেন!’

-‘হ্যাঁ, খেয়ে অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে।’

নীলাদ্রি আনভিরাকে কোলে নিয়ে চুমু খেল। আনভিরাও এতক্ষন পর মা’কে দেখে খুশিতে হাত-পা ছুড়াতে লাগল।

————-

সকালে নীলাদ্রি আর মাহতিম বিদ্যাশ্রমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠতেই প্রতিমধ্যে গাড়ি খারাপ হয়ে যাওয়াতে ড্রাইভার জানালো, কিছু সময় লাগবে। নীলাদ্রি আনভিরাকে কোলে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। মাহতিমও পাশে দাঁড়ালো।

ফুটফাটের পাশেই অদূরে একটা মসজিদ। সে মসজিদের গেটে চোখ যেতেই নীলাদ্রির দৃষ্টি থমকে গেল।
অনেকদিন ধরে বিদ্যাশ্রমে আসা-যাওয়া করছিল নীলাদ্রি। সবসময় অগোছালোভাবে লম্বা দাঁড়ি, জীর্ণ-শীর্ণ শার্ট পরিহিত এক পাগলকে সে বসে থাকতে দেখতো। কোনো কোনো সময় গাড়ি থেকে ড্রাইভারকে দিয়ে টাকাও দিতো। আজ হঠাৎ কেন জানি, পূর্ণ দৃষ্টি দিতেই মনে পড়লো এটা অনেক চিরচেনা একটা মুখ। নীলাদ্রি একটু কাছে এগিয়ে বুঝতে পারলো তার ধারণা সঠিক কিন্তু ও এই অবস্থানে কেন!

-‘আ-আরিয়ান!’নীলাদ্রি পরপর আরও কয়েকবার ডাকার পরেও ওই লোকটির কাছ থেকে কোনো সাড়া-শব্দ পেলো না। লোকটি নীলাদ্রিকে কাছে যেতে দেখে, বসা থেকে উঠে দৌড় লাগালো। নীলাদ্রি বুঝতে পারলো, সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। তার হঠাৎ কেন জানি ভীষণ খারাপ লাগল!

মাহতিম এই সব খেয়াল করে পাশের এক দোকানদারের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানাল, এখানে তার ভালোবাসার মানুষটার কবর। হঠাৎ কোনো এক দুর্ঘটনায় সে মারা যায়। এরপর থেকেই লোকটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এখানে বসে থাকে।

নীলাদ্রি স্তব্ধ দৃষ্টিতে অদূরে আরিয়ানের চলে যাওয়া দেখতে লাগলো। আরিয়ান সামনের দিকেই দৌঁড়াতে লাগলো। আস্তে আস্তে অদৃশ্য হতেই নীলাদ্রির চোখ ঝাঁপসা হয়ে এলো। কোন মানুষ আজ কোন জায়গায়! সে তো এমন কিছু চায়নি। সবকিছুর পরেও সে চেয়েছিল, মানুষটা যেন তার ভালোবাসার মানুষটার সাথে ভালো থাকে কিন্তু এমন কেন হলো! নিয়তি কাকে কোথায় নিয়ে যায়, সেটা কেউ বলতে পারে না। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে নীলাদ্রির অবস্থান ছিল অনেক নিম্ন আর আরিয়ানের! অথচ আজ কে কোথায়!

মাহতিম এসে নীলাদ্রির কাঁধে হাত রাখতেই নীলাদ্রি পেছন ফিরে মাহতিমকে জড়িয়ে ধরলো। মাহতিম এক হাতে আনভিরাকে কোলে রেখে অন্যহাতে নীলাদ্রির মাথায় পরম আদরে হাত বুলিয়ে অদূরে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠল,
‘আল্লাহ ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না।’

#সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here