Wednesday, April 15, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প যাত্রাশেষে যাত্রাশেষে( পর্ব-১)

যাত্রাশেষে( পর্ব-১)

যাত্রাশেষে( পর্ব-১)
হালিমা রহমান

মাস কয়েক আগে,তুষারের স্ত্রী মহিমা যখন অন্য আরেকজনের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল;তখন পুরো এলাকার মানুষ বিস্ময়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল।সবার একটাই প্রশ্ন –” মহিমা কি মানুষ?যার শরীরে মানুষের রক্ত বইছে,সে কীভাবে এমন কাজ করতে পারে?তুষারের মতো একটা ঠান্ডা মানুষকে কীভাবে ফেলে যেতে পারলো?আচ্ছা,ঠিক আছে তুষারকে ছেড়ে যেতে নাহয় কষ্ট হয়নি কিন্তু নিজের নাড়ি ছেড়া ধন?তাকে কী করে মানুষ ফেলে যেতে পারে?এটা কি মা নাকি ডাইনি?
মহিমা যখন পালিয়ে গেছে,তখন তুষার বাড়ি ছিল না।মহিমা তাদের মেয়ে মৃত্তিকাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেই বেরিয়ে গেছে।মৃত্তিকার বয়স তখন মাত্র তিনমাস।মহিমা তৈরি হয়ে,হাতে একটা ছোট ব্যাগ ঝুলিয়ে, দরজায় বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দ্রুতপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল যখন,তখন সিড়ির গোড়ায় রিদিতার সাথে দেখা।রিদিতা একই বাড়ির পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। রিদিতা মহিমাকে দেখে একগাল হাসে।মহিমাকে তার খুব পছন্দ।তাই, আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করেঃ” কই যান, ভাবি?মৃত্তি কই?”
—” আমি একটু সামনেই যাব ভাবি।আমার বড় ভাই আসছে চৌরাস্তার মাথায়।ওর সাথে কথা বলে চলে আসব।আপনি মৃত্তিকার দিকে একটু খেয়াল রাখতে পারবেন? ও ঘুমাচ্ছে।ঘুম থেকে উঠলে হয়তো কাঁদবে।আমি এই যাব আর আসব।”
মহিমার কন্ঠে খুব ব্যস্ততা।যেন পালাতে পারলেই বাঁচে।তার পা কাঁপে,গলা শুকিয়ে আসে,ঠোঁটের উপর ও কপালে ঘাম জমে।বাম হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে তা মুছে নেয় সে।একটু ভয় পেয়ে যায় রিদিতা।এই অবস্থা কেন ভাবির? উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করেঃ” কোনো খারাপ খবর নাকি ভাবি?”
—” না,না।কোনো খারাপ খবর নেই।আসছি ভাবি।মৃত্তিকে একটু দেখবেন প্লিজ।”
দরজা পেরিয়ে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে যায় মহিমা।রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা খালি রিকশায় চেপে হুড তুলে নেয়।রিকশাওয়ালাকে তাড়া দেয় তাড়াতাড়ি চালিয়ে যাওয়ার জন্য।
মহিমাকে এভাবে চলে যেতে অনেকেই দেখেছে।কিন্তু, কেউ বুঝতে পারেনি এরকম ভরদুপুরেই সবার নাকের ডগা দিয়ে পালিয়ে যাবে মহিমা।তুষার যখন খবর পেয়েছে তখন বোধহয় বিকাল পাঁচটা বাজে।দুপুর দুটোর দিকে ঘুম ভাঙে মৃত্তিকার।দুধের বাচ্চা উঠেই কান্না শুরু করে দেয়।সেই কি কান্না তার! কান্না ছাড়া যার ভাষা নেই,সে আর কিইবা করতে পারে! রিদিতা ঘুমিয়ে ছিল।তার নিজেরও একটা একবছর বয়সী ছেলে আছে।মৃত্তিকার উচ্চস্বর কানে আসতে সময় লাগে না তার।ধরফরিয়ে উঠে রিদিতা।মৃত্তিকা কাঁদে কেন? তার মানে মহিমা ভাবি এখনো আসেনি? কেমন বেয়াক্কেল মানুষ! রিদিতা ছুটে যায় পাশের ফ্ল্যাটে।দরজা খুলে কোলে নেয় মৃত্তিকাকে।একদম নরম একটা পুতুল।এই কতক্ষণেই প্রস্রাব-পায়খানা করে পুরো পিঠের নিচ পর্যন্ত ভরিয়ে ফেলেছে।সব পরিষ্কার করে রিদিতা।কল করে মহিমার ফোনে।কিন্তু,ফোন বন্ধ।একদিকে মায়ের ফোন বন্ধ, অন্যদিকে মেয়ে দুনিয়া উজার করে কাঁদছে।এই দুজনের চক্করে পরে রিদিতারও হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।কোনো উপায় না পেয়ে মৃত্তিকার মুখে ছেলের ফিডারের সবটুকু দুধ ঢেলে দেয়।বুভুক্ষের মতো তা গিলে নেয় মৃত্তিকা।রিদিতার খারাপ লাগে খুব।মুখ থেকে এমনিই বেরিয়ে আসে সহানুভূতির সুর।আহারে!মেয়েটার পেটে কত ক্ষিদা ছিল।
“মহিমা বাড়িতে নেই, মৃত্তিকা অনবরত কাঁদছে”— কথাটা কানে যেতেই প্রায় উড়ে আসে তুষার।আসতে আসতে শ্বশুরবাড়ি ফোন দেয় খবর নেওয়ার জন্য।মহিমা ওখানে গেল নাকি কে জানে!রিদিতা যখন তুষারকে ফোন দিয়েছিল, তখন তার কোলে ছোট্ট মৃত্তিকা কাঁদছে।কলিজার টুকরার কান্না কানে আসতে দেরি হয়নি তুষারের।তাই মনে মনে ক্ষোভ জমে মহিমার উপর।যেখানেই গেছে যাক।কিন্তু মৃত্তিকাকে নিয়ে গেলে কি হতো?আশ্চর্য মানুষ তো! এইটুকু মেয়ে কি মাকে ছাড়া থাকতে পারে?আজ মহিমা বাড়ি এলে খবর আছে তার।একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে তুষার।
তুষার ঘরে ঢুকে মেয়েকে কোলে জড়িয়ে নেয়।চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয় পুরো মুখ।ছোট্ট পুতুলটাও যেন বাবাকে চিনে।বাবার কোলে যেয়েই কেমন শান্ত হয়ে গেছে!মহিমার বাবার বাড়ি থেকে কোনো খবর পাওয়া যায়নি।তারা জানে না কোথায় গেছে মহিমা।তাদের ওখানেও যায়নি সে।এই খবর পেয়ে একটু চিন্তা হয় তুষারের।কোনো বিপদ হলো না তো মেয়েটার! এই শহরে বিপদ ঘটতে দেরি লাগে না।চিন্তার ভাঁজ পরে কপালে।এমন সময় রিদিতা আসে তুষারের ফ্ল্যাটের সামনে।ঠকঠক আওয়াজ করে দরজায়।
—” তুষার ভাই,ভাবির কোনো খোঁজ পেয়েছেন?”
—” না,আপা।”
—” ভাবির বড় ভাইরে ফোন দেন।ভাবি তো দুপুরে তার সাথেই দেখা করতে গেল চৌরাস্তার মাথায়।যাওয়ার সময় আমার সাথে দেখা হয়েছিল।তখন আমাকে বলেছে।”
অবাক হয়ে যায় তুষার।ছোট বোনের সাথে দেখা করতে হলে বাড়িতে আসবে।চৌরাস্তায় কেন দেখা করতে হবে?তুষার ফোন দেয় মহিমার বড় ভাইকে।প্রথমবার কল ধরে না কেউ।দ্বিতীয়বারের বেলায় মহিমার বড় ভাইয়ের গলা শোনা যায়।
—” কি অবস্থা তুষার?”
—“এইতো ভাই।মহিমা কোথায় আছে?ওকে একটু বলবেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে।”
—” মহিমা কোথায় আছে মানে?ও বাড়িতে নেই?”
—” নাহ,ওতো দুপুরে আপনার সাথে দেখা করতে গেল।আপনি না চৌরাস্তার মাথায় এসেছিলেন ওর সাথে দেখা করতে?”
—” কি বলো এইসব! আমি তোমার ভাবিরে নিয়ে কুয়াকাটা আসছি দুইদিন আগে।”
অবাক হয়ে যায় তুষার।আজ বোধহয় তার অবাক হওয়ার দিন।এটা নিশ্চিত মহিমা অন্য কোথাও গেছে কাউকে না জানিয়ে।চিন্তায় মাথা ছিঁড়ে যাওয়ার জোগাড়। সেই রাতে পুরোটা সময় মেয়েকে বুকে জড়িয়ে শুয়েছিল তুষার।একফোঁটা ঘুমায়নি সারাটা রাত।মাথায় বিভিন্ন চিন্তা।সবচেয়ে বেশি চিন্তা মহিমাকে নিয়ে।ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে এসেছিল তুষারের।ঘুমটা হয়তো গাঢ় হতে পারতো।কিন্তু,হলো না বিস্ফোরক একটা খবরের জন্য।একটু আগে তুষারের ছোট শ্যালক ফোন দিয়ে জানিয়েছে,মহিমার পালিয়ে যাওয়ার খবর।মহিমা নাকি তাকে শেষ রাতে ফোন করে জানিয়েছে।মহিমা পালিয়ে গেছে! খবরটা কি সত্যি! প্রথমে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তুষারের।আশ্চর্য! কেন পালাবে মহিমা?তাদের মাঝে তো কোনো সমস্যা হয়নি।বেশ সুখী দম্পতিই ছিল তারা।তবে?গতকাল এই সময়েও মহিমা এইঘরে ছিল।এই যে এই বিছানায় মৃত্তিকার গা ঘেষে শুয়েছিল।কালকে যেন একটু বেশি আদুরে দেখাচ্ছিল তাকে।তুষার নয়টার দিকে দোকানে যাওয়ার আগে যখন ব্যবসায়ের হিসাব-নিকাশ করছিল, তখন মহিমাও পাশে বসা ছিল।দু-তিন মাস যাবৎ কেবল ক্ষতিই হচ্ছিলো ব্যবসায়ের।চারদিকে দায়-দেনা বেড়ে গেছে গেছে।তুষারের চিন্তিত মুখ দেখে তার কাঁধে হাত বুলায় মহিমা।সান্ত্বনার সুরে বলে —” চিন্তা করছো কেন?আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে।”
এইছিল তুষারের সাথে মহিমার শেষ কথা।কালকের আচরণ তবে অভিনয় ছিল!কিছু ভাবতে পারে না তুষার।মাথাটা কেমন খালি খালি লাগছে।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।অক্সিজেনের অভাব পরলো নাকি চারপাশে?বিছানায় কেঁদে উঠে মৃত্তিকা। হয়তো মায়ের শরীরের উষ্ণতার অভাব টের পেয়েছে।মেয়ের কান্না শুনে ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকায় তুষার।মেয়েটা খুব কাঁদছে।হয়তো ক্ষিদে পেয়েছে।তুষার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নেয়।ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করে শরীরের সবটুকু উষ্ণতা। রিদিতার থেকে ধার করে আনা এক ফিডার দুধ মেয়ের মুখে গুজে দেয়।তারপর মেয়ের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলেঃ” কাঁদে না মা।আজ থেকে তোমার নতুন দিন শুরু।মায়ের নরম কোলের আদর ভুলে যাও।তোমার জন্য বাবা আছি,আর বাবার জন্য আল্লাহ আছে।আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে।”

***

দিন আসে, দিন যায়।ছোট পুতুল মৃত্তিকা এখন আর আগের মতো ছোট নেই।তার এখন এক বছর। সে এখন বিছানায় থাকার চাইতে মাটিতে থাকতে বেশি পছন্দ করে।একটু একটু হাঁটতে পারে।এই দুপা হাঁটে আবার কিছুক্ষণ পরেই ধপ করে পরে যায়।দুটো দাঁত উঠেছে তার।এ নিয়ে তার বাহাদুরির শেষ নেই।তুষারের কোনো কথা পছন্দ না হলেই,কুট করে দাঁত বসিয়ে দেয়।আধো আধো বুলিতে যখন “বা বা,বা বা” বলে ডাকে, তুষার তখন স্বর্গীয় সুখ লাভ করে।তবে,ইদানিং মেয়েকে সামলাতে বেশ বেগ পেতে হয় তাকে।ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি একটা এক বছরের দুষ্টুকে সামলানো সহজ কথা নয়।তুষারের মা-বাবা নেই।বড় কোনো ভাই-বোনও নেই।এই শহরে অভিভাবক বলতে শুধু একটা খালা আছে।তিনি গুলিস্তানে থাকেন।এক্ষেত্রে, বেশ সুবিধা হয়েছে তুষারের।তুষার কাজে যাওয়ার আগে মেয়েকে সেখানে রেখে যায়।আবার বাসায় ফিরার সময় সাথে করে নিয়ে যায়।অনেক সময়,কাজের ফাঁকে কয়েকবার দেখতেও যায়।
তুষারের খালা-খালু বেশ কয়েকবার বলেছে তুষারের বিয়ের কথা।কিন্তু,তুষার একবারেই রাজি না।খালা-খালু যখন বিয়ের সুফল বুঝায়,প্রয়োজনীয়তা বুঝায়; তখন তুষার মুচকি হেসে বলেঃ” এখন ইচ্ছে নেই খালা।বিয়ের ইচ্ছে হলে তোমাকে জানাব।”এরপর আর কোনো কথা থাকে না।তুষারের খালাও চুপ মেরে যান।তুষারের দিকটাও বুঝেন তিনি।এরকম একটা দূর্ঘটনার পর কোনো মেয়েকে বিশ্বাস করা সহজ কথা নয়।তুষারের যখন ইচ্ছা হবে তখনই নাহয় বিয়ের কথা তুলবেন।
কিন্তু,একটা কথা আছে না।মানুষের ইচ্ছা- অনিচ্ছার উপর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে না।মানুষ পরিস্থিতির শিকার।পরিস্থিতির চাপে পড়ে মানুষ চরম অপ্রিয় কাজটাও করতে বাধ্য হয়।তুষারের সাথেও তাই হয়েছে।তুষারের খালা-খালু হজ্বে যাবে এইবছর।একটা দীর্ঘসময় তারা থাকবে না।তখন মৃত্তিকার কী হবে?কার কাছে থাকবে সে?প্রথমে,তুষার বলেছিল সারাদিন মৃত্তিকাকে নিজের কাছেই রাখবে।কিন্তু,এ কি হওয়ার মতো?জীবনতো আর সিনেমা নয় যে, মা-ছাড়া একটা বাচ্চা সারাদিন বাবার সাথে বাবার কর্মস্থলে থাকবে।এই পরিকল্পনা যখন কাজে এলো না, তখন তুষার ভাবলো একটা আয়া ঠিক করবে।কিন্তু এতেও তীব্র আপত্তি তুষারের খালার।তিনি চিন্তিত মুখে বলেনঃ”না,বাবা।আয়ারা টাকার জন্য কাজ করে।তার আমার নাতনির যত্ন নিবে না ঠিক মতো।তুমি তার চাইতে একটা বিয়েই করো।আজ হোক, কাল হোক বিয়েতো করবাই।সারাজীবন তো আর একলা কাটানো সম্ভব না।তাহলে,পরে করে কি লাভ?এখনই করো।মেয়েটা একটা মা পাক।তাছাড়া, বড় হওয়ার পর মিত্তি নতুন কাউরে মা ডাকতে চাইবে না।তার চেয়ে তুমি বরং এখনই একটা বিয়ে করো।”
তুষারও ভেবে দেখলো।খালার কথা মন্দ নয়।তাই অনেক ভেবেচিন্তে অবেশেষে তুষার বিয়েতে মত দিয়েই ফেললো।তুষারের খালা মনে আনন্দ নিয়ে বউ খোঁজার কাজে নেমে পড়লেন।কিন্তু,এখনকার দিনে ছেলের জন্য মেয়ে খোঁজা কি সহজ কথা! মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, অভিজ্ঞ চোখে সবটা দেখে অবশেষে ছেলের জন্য মেয়ে ঠিক করলেন।মেয়ের নাম মহুয়া।আজিমপুরে থাকে। একটা স্কুলে চাকরি করে।মেয়ের পরিবারব খুব ভালো,নম্র-ভদ্র।সবই ঠিক আছে,কিন্তু একটা জায়গায় একটু গোলমেলে।মহুয়া ডিভোর্সি।তার আগের সংসার ভেঙেছে এক বছর আগে,তারপর থেকেই সে বাবার বাড়ি আছে।।

চলবে…

বি.দ্রঃ(ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here